হে গুরু তোমায় স্যালুট!

“হে মহান গুরু দিয়েছ শিক্ষা, দিয়েছ দিক্ষা জ্ঞানে করেছ বীর, তোমাকে সালাম,তোমাকে স্যালুট করি উন্নত মম শির”।

আজ আমার কলেজের অতি প্রিয় একজন শিক্ষককে নিয়ে লিখব। অল্পসময় ছিলেন তিনি আমাদের মাঝে। হঠাৎ করে একজন ভালো শিক্ষক চলে যাবার কষ্ট অনেকেরই ছিল। কেন কলেজ ছেড়েছিলেন এতদিন প্রশ্ন ছিল?  কদিন আগে জানলাম ব্যক্তিগত কারনেই ছেড়েছিলেন।

আমার কলেজ জীবন শুরু হয়েছিল রংপুর বেগম রোকেয়া কলেজ থেকে। মামাতো-খালাতো ভাই বোন সবাই কুড়িগ্রামে মজিদা আদর্শ ডিগ্রী কলেজ এ। আমি একাই রংপুর। বুকের ভেতর কষ্ট আর কষ্ট। ছোটখালার বাসায় থাকলেও মন পড়ে থাকে কুড়িগ্রামে। খেতে পারিনা, ঘুমুতে পারিনা পড়াশুনা তো অনেক পরের ব্যাপার। তিনমাস পর বাড়িতে এলাম। ভাইবোনদের সাথে তাদের কলেজ এ গেলাম। কতকমবয়সী স্যার ম্যাডাম কি সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে ক্লাস নেন। আর রোকেয়া কলেজের গেট তালাবদ্ধ বের হওয়া অসম্ভব। শিক্ষকরা তো সেই কড়াকড়ি। আর এরা কত মজা করছে। চাইলেই সিনেমা,ঘুরতে যাওয়া সব সম্ভব। কলেজে আটকে পড়ার ঝামেলা নেই কারন কলেজের গেটই নাই। যেদিক সেদিক ঘুরে বেড়ানো যায়। নদীর পাড় সিনেমা হল সব কাছেই। তারা কত মজায় আছে আর আমি কতদুরে। নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে দিলাম। উপায়ান্তর না দেখে আমাকে ফেরত নিয়ে আসা হল। মামা কলেজ এর অধ্যক্ষ তাই তিনি ম্যানেজ করলেন।

অঙ্কুর হল টিম লিডার, আমি এসিস্ট্যান্ট বাকি সদস্যসহ পুংটা,  ফাঁকিবাজ একটা দল যাদের কাজ সারাদিন ঘোরাঘুরি করা। উপস্থিতি ম্যানেজ করতাম পিয়নকে টাকা দিয়ে। প্রায় প্রতিদিনই বিচার করতে করতে মামা প্রায় হাঁপিয়ে উঠলেন। কারন তার মেয়েও এ দলের সদস্য। তিনি মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে শংকিত। আমাদের ডেকে অনুরোধ করলেন। তোমরা যা করার কর আমার সম্মান আছে আমার মেয়েকে সাথে নিওনা। আমাদের সে বোনটি এখন অষ্ট্রেলিয়ায় থাকে। আমরা তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। কিন্তু তাকে ছাড়া আর জমলনা কোনকিছুই। সে যেহেতু ক্লাসে তাই আমরাও সবাই ক্লাসে উপস্থিত থাকি, তাও সবার শেষ বেন্চে। সাধারণত ভালো স্টুডেন্টরা সব সামনে থাকে। শিক্ষক তাদের নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটান। পেছনের স্টুডেন্টদের খোঁজ তেমন রাখা সম্ভব হয়না। এখন শিক্ষকতা করে সেটা ভালো বুঝি।

কলেজে ইংরেজি শিক্ষক তিনজন। জাকির স্যার, কাকলী আর মুক্তা ম্যাম। সেদিন মুক্তা ম্যাম এর ক্লাস। মিথুন হ্যাঁ করে তাকিয়ে- যাহ্!এত কিউক আর ছোট টিচারহয় কি করে। সে রীতিমতো প্রেমে পড়ে গেল। গায়ে মাংস তেমন নেই। পাতলা ফরসা ছিমছাম মেয়েটি। আমরা ভাবলাম হয়ত কথাই বলতে পারবেনা।

ক্লাস শুরুর পরে বোঝাগেল বাবা- এতো ধানিমরিচ। নির্ভীক কন্ঠস্বর, সুন্দর বাচনভঙ্গি আর মুক্তো দানার মতই ঝকঝকে একজন স্বচ্ছ, স্পষ্ট ভাষী একজন মানুষ। আমার অসম্ভব ভালো লাগলো তার ক্লাস। বোঝানোর ক্ষমতা থেকে সব কিছুই। আমি ইংরেজির জাহাজ পালিয়ে রইলাম পেছনেই। কিন্তু ক্লাস করলাম নিয়মিত। মোটামুটি ভালো মার্কস পেয়েছিলাম ইংরেজিতে।

দলের পুংটা মিথুন একদিন কাঁদতে কাঁদতে হাজির

– কি হয়েছে তোর, কাঁদছিস কেন?

– ম্যাম বিবাহিত। এখন আমার কি হবে?

আমরাও জানতাম না তিনি বিবাহিত কিনা। আমরা তাকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম সিনেমা দেখতে। নায়িকা হারিয়ে যাচ্ছে সিনেমায়। হারানোর বিরহে সিনেমাহলে মিথুন জোরে জোরে কাঁদতে লাগলো। পরে তাকে বুদ্ধি দিলাম তুই ভেবে নে ম্যামের বিয়ে হয়নি। তারপর যা খুশি ভাবতে থাক।

বেচারা প্রায়ই লালচোখে ক্লাসে বসে থাকত। সারারাতই বোধহয় স্বপ্ন দেখত।

আমরা বেড়িয়ে আসার কিছু দিন পর মিথুন আবার কাঁদতে কাঁদতে নদীর পাড়ে।

– মুক্তা ম্যাম চাকুরী ছেড়ে দিয়েছেন। আমি এখন কাকে দেখব।

– মানে তুই ম্যাম এর জন্যে গেটে দাঁড়িয়ে থাকতিস। চিন্তা করিসনা এখন বাসার আশেপাশে থাকিস দেখতে পাবি।

বেচারা খুব কেঁদেছিল। তারপর যে যারমত ভার্সিটি লাইফ শুরু করি। মাঝেমাঝেই টুকটাক কথা হয়।

ব্লগে এসে প্রথম থেকেই চেনা চেনা লাগছিল। ফেসবুকে রিকোয়েস্ট দিলাম সাহস হলনা নক দেবার। গতকদিন আগে তিনি আমায় নক দিয়েছেন। পরিচয়ে জানতে পারলাম তিনি আমার সেই শিক্ষক “আরজু মুক্তা”। আমি ভালো স্টুডেন্ট না আর আড়াই তিনশ স্টুডেন্টদের মধ্যে মনে না থাকারই কথা। তবে আমি এতটাই খুশি হয়েছি যে নেট অফ করে আবেগে কাঁদতে বসে গিয়েছিলাম। তিনি এখনও বানান শেখান। ম্যাম আমার ইংরেজি বানান আরো খারাপ।

আমার সেই বন্ধু এখনও দেখা হলে জানতে চায় আপনার কথা। তাকে বলব আপনার কথা। আর লেখালেখির সুবাদে অনেক দুষ্টুমি করেছি। আপনার সাথে দুষ্টুমি বন্ধ করতে আমি নারাজ। কিন্তু আপনার জন্য ভালোবাসা অগাদ আর স্থান আমার মাথায়।

আর এই যে, আপনারা বহুত জ্বালিয়েছেন বকা দিয়েছেন। জানেন আমি কার স্টুডেন্ট? জানলেন তো এবার যতইচ্ছা বেশি করে বকুন! ও আমার অভ্যাস। ছোট বড় সবাই বকে, না খেলে থাকতে পারিনা।

শুভ কামনা সবার জন্য।

মোট পড়েছেনঃ ১,৫০৫জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

৩৯টি মন্তব্য

  1. অনলাইন জগৎটা ঈশ্বরের আর্শীবাদ।এ জগতে অনেক চোখের আড়াল হওয়া বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজন খুজেঁ পাওয়া যায়।আপনিও পেলেন তাও সহ ব্লগার(অজানা)হিসাবে।আর এ সুবাদে আমাদের প্রিয় আপু ব্লগারকে নতুন করে আবারো চিনলাম। ভাল থাকুন।সুস্থ থাকুন আর জ্ঞানের আলো জ্বেলে রাখুন আমাদের মাঝে।

  2. হায়! রে ! রংপুর বেগম রোকেয়া কলেজএর সামনে কতদিন দাঁড়িয়ে থেকেছি তাঁর কোন ঠিক নাই। যেতাম অর্ডার দিতাম সেজেগুজে তাঁর পর বের হতেন নবাবজাদিরা। তাও ভালো এখন রংপুরা মানুষের লেখা পড়ছি। কতদুর আর যাওয়া হবে কিনা জানিনা।
    ভাল থাকুক আরজু মুক্তা আপু।
    আপনারা সবাই ভাল থাকুন।

    1. পুরো দেশটাই আমাদের ভাইয়া। কামাল ভাই এর চোখে পড়েননি রোকেয়া কলেজের সামনে এটা আপনার কপাল।
      শুভ কামনা।

      1. কেন আপু। আমিতো সেই ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সালের কথা বলছি। কামাল ভাইককে চিনিনা। আপনার বাড়ি কি কুড়িগ্রাম সদরে। সাবেক আইঞ্জীবি ইদ্রিস সাহেবের ছেলে আমার বন্ধু। কুইড়িগ্রাম সদর।

  3. আমি বাকরুদ্ধ। এভাবেই যেনো সবার ভালোবাসায় বাকি জীবন পাড়ি দিতে পারি। দোয়া করবেন।
    তবে, বিস্তারিত নিয়ে রাতে আবার কমেন্ট লিখবো।
    রুকু, আপনার জন্য দোয়া সবসময়।

  4. সত্যিই দারুন অনুভুতি ফিরে পাওয়া। হাসতে হাসতে শেষ ছাত্রের কান্ড দেখে।

    নতুন পরিচয় পেয়ে ভালো লাগছে। শুভকামনা।

  5. লেখাটি পড়ে সত্যিই বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। মুক্তা আপুর এই পরিচয়টা জানা ছিলো না আপনার কল্যাণে জানা হলো । এজন্যই আপু এতো নিখুঁত করে ভুল ধরে বানানের, শিক্ষকের মতোই। দুজনের জন্যই শুভেচ্ছা ও শুভকামনা রইলো। মিথুন ভাইয়ার জন্য ও শুভকামনা রইলো। এমন ভালোবাসা ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকেই পাওয়া সম্ভব।

    1. সত্যিই একজন নিখুঁত মানুষ। তার কাছ থেকে অনেক শেখার।
      শুভ কামনা ও ভালোবাসা অবিরাম দিদি আপনার জন্যও।
      ভালো থাকবেন।

  6. ফেসবুকে এসে আমিও আমার অনেক হারিয়ে যাওয়া বন্ধু-বান্ধব ফিরে পেয়েছি। আর প্রিয় শিক্ষককে ফিরে পাওয়া তো পরম সৌভাগ্য। আন্তরিক শুভকামনা রইল দু’জনের জন্যেই।

  7. ছবির চেনা আপুটা আপনার গুরু সেটা জানার
    ব্যকুল আগ্রহে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এক নিমিষেই
    করলাম শেষ।
    তারপর নিশ্চিত হলাম সত্যিই মুক্তা আপু আপনার শিক্ষক বটে।
    আপনি শিক্ষক জানা হল। গুরু কি করে হয় নি জানা।
    ভাল থাকবেন তাই শুভ কামনা।

  8. এ এক অন্যরকম অনুভূতি। খুব ভালো লাগছে। ছাত্রী আর শিক্ষকের এ মিলন খুশির আনন্দে ভরে উঠুক এটাই চাওয়া।

    শুভকামনা দুজনার জন্যই।

  9. সোনেলা ব্লগ আপনার ম্যাডামকে আবার আপনার কাছে নিয়ে এলো। ধন্যবাদ সোনেলাকে দিতেই হয়।
    আরজু মুক্তা এখনো স্পস্টবাদী, যা বলেন দৃঢ় ভাবেই বলেন।
    শ্রদ্ধা এবং শুভেচ্ছা রইল আপনার ম্যাডাম আর আমাদের ব্লগার আরজু মুক্তার প্রতি।

    চমৎকার উপস্থাপনা, স্মৃতিকথাও কত সুন্দর ভাবে বলে গেলেন।
    আপনার সব উপস্থাপনাই অনন্য।
    শুভ কামনা।

    1. সোনেলা ব্লগের কাছে আসলেই অনেক ঋণ হয়ে গেল। এত ভালো ভালো মানুষদের কাছে থাকবার সৌভাগ্য করে দিয়েছে। আর ম্যাডামকে তো সবাই জানেই এমন মানুষ কমই হয়। আর আমাকে আপু ডাকার আর দুষ্টুমির অনুমতি দিয়েছেন।
      অসাধারন মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ ভাইয়া। শুভ কামনা।

    2. আমিও কৃতজ্ঞ। কীভাবে মিলে যায়? আর সোনেলা ব্লগের কারণে আমাকে নতুন করে সবাই চিনে। এটা ভালোই লাগে। আর মিথ্যা আমার অপছন্দ।
      রুকু এতো সুন্দর করে তুলে ধরেছেন। যার অনেকটাই অজানা। গত রমযানে বাড়ি আসবো। চট্টগ্রামে স্ট্যান্ডে ওয়েট করছি। এই সময় দাড়িওয়ালা একজন এসে পা ছুঁয়ে সালাম করলো। আমি একটু হতবাক হলাম। ও নিজের পরিচয় দিয়ে বললো নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন এবং আমার ছাত্র। আবার এক স্টুডেন্ট খুব গরীব। ও মাদ্রারাস পড়তো। আমি ওকে ফ্রিতে পড়াতম। ও সারা বাংলাদেশে সেকেন্ড স্ট্যান্ড করেছিলো। আমাকে খুঁজতে খুঁজতে টাউন হলে পেলো ৩ টায়। তখন পা ছুঁয়ে সালা করে বললো। ম্যাডাম এটা আপনার জন্য। আমার তো অতো টাকা নেই। বমি বাড়ি ফিরে দেখি ৫ কেজি জিলাপি।
      এই রকম ছোট ছোট ভালোবাসায় সিক্ত আমি।
      আর ঋণী সোনেলা ব্লগের কাছে।
      অকৃত্রিম দোয়া রুকু ও সব ছাত্রছাত্রিদের জন্য

  10. আপু লেখাটা পড়ার আগে ছবির মানুষটাকে চিনলাম,আর কৌতুহল বসত পুরো লেখাটা পড়ে রিতি মতো মুগ্ধ হলাম আপু।
    মিথুন ভাইয়ার জন্য খারাপ লাগলো সুন্দরী ম্যাম হলে যা হয় তাই হলো ☺
    আরজু মুক্তা আপু আর আপনার সম্পর্কটা আরো গভীর হোক, প্রিয় মানুষদের ফিরে পাওয়ার আনন্দ সত্যি কাউকে বুঝানো যায় না।
    দুজনের জন্য শুভ কামনা রইল আপু

    1. মিথুন রীতিমত এখন লোক। বিয়ে করে সংসার করছে কিন্তু ম্যামের কথা উঠলে হাসে।
      স্টুডেন্টরা যে কত পাগল হয়। ভালোই লাগে।
      শুভ কামনা আপনার জন্য। ভালো থাকবেন।

  11. খুব বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে গেলাম তোমার লেখা পড়ে। আর মনে পড়ে গেল আমারও একজন ক্রাশ ম্যাডাম ছিল কলেজে অর্থনীতি নুসরাত ম্যাডাম রংপুর ক্যান্ট পাবলিক কলেজ। তখন ক্লাসে শুধু ম্যামের দিকে তাকিয়ে থাকতাম আর অনেক দুস্টুমি করতাম। ম্যাম এত সুন্দর সেজেগুজে এত স্মার্ট আর এত সুন্দর করে পড়াত যে শুধু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। আজ আমিও একটা কলেজে আছি,যখন আমার ছাত্র ছাত্রীরা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, আমার সাথে দুস্টুমি করে তখন আমার কলেজ লাইফের কথা মনে পড়ে যায়,আর একা একা হাসি এবং ইনজয় করি।আজ তোমার লেখা পড়ে আবার মনে পড়ে গেল,,,,,,,ভালো থাক, তুমি আর মুক্তা আপু।

    1. আবেগী মেয়েটা তোমার অভিজ্ঞতাও মধুর। পাগল স্টুডেন্ট থাকে। তারা ছাড়া চলেও না। বেশি না বলি অন্যদিন লিখে ফেলা যাবে।
      শুভ কামনা।

মন্তব্য করুন