প্রায়শ্চিত্ত

রোকসানা খন্দকার রুকু ১৯ জুলাই ২০২৫, শনিবার, ০৮:৫২:৪৫পূর্বাহ্ন ছোটগল্প ২ মন্তব্য

লাশের উপর দু- একটা মাছি ভনভন করছে। আঁতর আর কর্পূরের গন্ধকে তোয়াক্কা না করে তারা ডিম দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে গেছে। মৃত ব্যক্তির পাশে কোরআন তিলাওয়াত করার যে প্রচলন তা এখানে হচ্ছে না। প্রচুর লোক কিন্তু কারও চোখে মায়া কারও চোখে ক্রোধ। কেউ ফিসফাঁস করছে। এবং কৌতুহলী পাশাপাশি দুটো জমায়েত। একটা লাশ দাফনের আর একটা লাশ দাফন করতে না দেয়ার।

যিনি মারা গেছেন তিনি প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। কাজল চোখের নুরানী চেহারার একজন মানুষ। তিন ছেলের জনক। বড় ছেলে সরকারি কর্মকর্তা। বাকি দুজনও চাকরি করে তবে সরকারি নয়। তারা উপস্থিত থাকলেও বড় ছেলে এখনও আসেননি। আদৌ আসবেন কিনা তা কারও জানা নেই। তিনি ফোনও বন্ধ করে রেখেছেন।

প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী খুব কাঁদছেন। বয়স তার ষাটের ঘরে। আমার ইচ্ছে করছে কান্নারত মানুষটাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদি। প্রিয়জন যার যায় সেই শুধু বোঝে এর কতোটা জ্বালা।

কান্নারত মহিলা আমার শাশুড়ী মা। তবুও আমি তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারছি না। প্রথম হলো ধরা পড়ার ভয়ে, দ্বিতীয় ঘৃনায়। কারন এই শাশুড়ী মা একজন নারী হয়ে আর একজন নারীর ক্ষতি করেছেন। আমার বুক খালি করেছিলেন, আজ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন বুক খালি হলে তার হাহাকার, ব্যাথা কতোটা তীব্র হয়!

লোকজন বোরকার কারনে আমাকে হয়তো চিনতে পারেননি। তবুও একজন আমার চোখের দিকে অনেকক্ষন তাকিয়ে। মানুষের চোখ অন্য চোখের ফাঁকি বোঝে। আমি ধরা পরার ভয়ে সরে যাচ্ছিলাম।

তিনি বলেই ফেললেন- মা, আফনে নাহিয়ান বউমা না?
আমি চুপ থেকে কোনমতে পার হয়ে গেলাম। ধরা পড়তে চাই না। এই ধরা না পরতে চাওয়ার পেছনেও একটু স্বার্থপরতাও লুকিয়ে আছে।

ছোটবেলায় দেখেছি একটা গাছের সাথে পাশাপাশি দুজনকে বেঁধে এলাকাবাসী বেদম পেটাচ্ছে। একজন চোর আর মহিলা চোরের বউ। রাতে চুরি করতে গিয়ে চোর ধরা পড়েছে আর চোরের বউ সকালে তাকে উদ্ধার করতে গিয়েছে। লোকজন ছেড়ে দেয়ার বদলে তাকেও বেঁধে পেটাচ্ছে।

আজ আমিও বোরকায় কেন ঢাকা চোরের বউ। আর যিনি মারা গেছেন তিনি সম্পর্কে আমার শশুর। আর তার বড় সরকারী কর্মকর্তা আমার জামাই। আর এই চোর এখনও আসেনি বলেই মাটি হচ্ছে না। লিভার সিরোসিস এর রোগী। মারা যাওয়ার দুইদিন হচ্ছে প্রায়। পেট ফুলে গেছে, মুখ দিয়ে রস পরছে। সেই রসে মাছি বসছে। তবুও লোকের মন গলছে না। গলবেই বা কেমন করে করে। তিনি যে চোরের বাবা। চোর সন্তান জন্ম দিয়েছেন আবার কথায় কথায় বলতেন — দুধ কলা দিয়ে মানুষ করেছেন।

আমার এ সময় মনে হচ্ছে – দুধ কলা দিয়ে রাসেল ভাইপার পুষেছেন। আজ তাই তার লাশে পচন ধরেছে।

আমার জামাই পুরোদস্তুর একজন দিনদার ভদ্রলোক। যেখানে সেখানে নামাজ পড়েন। গালভরা দাড়ি,কপাল ভরা কালো কড়া।

আর এই কপালের কড়া দেখেই আমার মা পুরা পাগল। তার উদ্ভট,উশৃঙ্খল বাবাহারা মেয়ের গতি করার জন্য এই জামাই- ই তার লাগবে।

অবশ্য বাবা থাকলে বলতেন- তোর কড়ার মায়রে দুচি। ছি! ছি! এই খাটো- বেটে কামলা জাতীয় মানুষটার বিশ্বাস ছিলো না বলতেও পারতেন। জমির আইলে বসে পান্তা আর মরিচ পেয়াজে কামড় দেয়া লোক। মুখ বেজায় খারাপ।

এই খারাপ লোকটাও লিভার সিরোসিসে মারা গিয়েছিলেন। সেদিন কোরবানী ঈদ, দিনভর ঝুম বৃষ্টি ছিল। বৃষ্টি আর ঈদের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে হাজারো লোকের জমায়েত হয়েছিল।

লোকজন হাউমাউ করে কেঁদে বলেছিল- বড়ো ভালো মানুষ ছিলেন। আমরা একটা ভালো মানুষ হারালাম। আমি ভেবে পাইনা লোকে এই মুখ খারাপ, বদমেজাজী লোকটাকে ভালোমানুষ কেন বলে?

এদিকে আমার বিধবা মাকে সরকারি কর্মকর্তা জামাই এর যৌতুকের টাকার জন্য জমি বন্ধক রাখতে হলো, দোয়াল গাই বিক্রি করতে হলো, বাড়ির ফল ধরতি ছোট বড় গাছ বিক্রি করতে হলো। জামাই চাকরীর প্রশ্ন কিনে পরীক্ষা দিয়েছেন, ভাইভাও হয়ে গেছে। এখন শুধু ১৫ লক্ষ টাকা লাগবে। তারপর জীবন ভরা সুখ আর টাকা।

আমি তখন এনজিও তে চাকরী করি। আমারও কিছু জমানো টাকা ছিল। আমিও তা দিয়ে কবুলে অংশগ্রহণ করলাম। কম কথা সরকারি অফিসারের বউ হবো, অংশগ্রহণ তো জরুরি।

ওদিকে শশুরমশাই আরও বিরাট অংশের ভাগিদার। প্রশ্ন কেনার সময় তিনি তার পেনশন অর্ধেক দামে বিক্রি করে ছেলের হাতে দিয়ে দিলেন। বাকি ছেলে এবং নিজের কথা একবারও ভাবলেন না। আর ভাবারই বা কি আছে। একজন উপরে উঠে গেলে তো পইপই করে সব লাইনে উঠে যাবে।

একরাতে আদর করতে করতে জামাই আমার কাছে জানতে চাইলো- বউ এনজিওতে তোমার কাজ কি!

আমি বললাম- ডাউরি এন্ড জেন্ডার ইকুয়ালিটি।

সে আঁতকে উঠে নেমে গেল। পানি খেতে খেতে বললো- এসব এনজিও হলো হারাম, ভাওতাবাজি। খ্রিষ্টানদের চাল। মেয়েগুলোকে খারাপ করার পায়তারা। ডিভোর্সি বানানোর পায়তারা। সাহায্যের নামে মুসলমানদের খ্রিস্টান বানাতে চায়। শুনেছি, উড়ুতে নাকি সিলও মেরে দেয়। তুমি কিন্তু সাবধানে থেক। এসব হলে আমার সাথে আর থাকা হবে না। আর যতোদিন আমাদের সচ্ছলতা না আসে তোমার চাকরিটা চলুক। পরে আর করতে হবে না।

আর যৌতুক আবার কি? মেয়ের সুখের জন্য বাবা- মা যদি কিছু হেল্প করে তাহলে সমস্যা কি? সব উল্টো দিকে নিয়ে যাওয়ার পায়তারা।

আমি চুপ থাকি। এই হারাম পয়সায় তার চাকরি হলো। আর আমি ও আমার বিধবা মায়ের চলার পথ।

আমরা দুজন আলাদা থাকি। জামাই ঢাকায় থাকেন। সেবার আমার কাছে এলো। কোন এক কারনে সে ভীষন খুশি। চাকরির তো দুবছর হয়নি, প্রমোশন তো আর হবে না। তাহলে এতো খুশি কিসের?

সে জানালো, একজন বড়মাপের মন্ত্রীর সাথে তার পরিচয় হয়ে গেছে। উপরে উঠতে আর তার কোন বাঁধা নেই।

দেশে একটা বড় সেতু তৈরি হবে। মন্ত্রী বলেছেন, অনেক শ্রমিক লাগবে। আর সেগুলো জোগার করার দায়িত্ব তাদের ভাগ করে দিয়েছে। আমি খুঁজে পেলাম না সেখানকার সেতু তৈরি আর শ্রমিকের সাথে তার উপরে ওঠার সম্পর্ক কি?

সেবার আমরা তাদের গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে গেলাম। সাত সকালে আমার হাতে একটা একহাজার টাকার নোট গুজে দিয়ে তিনি উধাও হলেন। ফিরলেন সেই সন্ধ্যায়। আমার শশুর মশায় খুব বকলেন। শাশুড়ী পক্ষ নিয়ে স্বামীকে থামালেন। আমি ভাবলাম, হয়তো সারাদিন বাইরে ছিল এজন্যই বকছে।

বিয়ের দুবছর হতে চলেছে। ভদ্রলোক আমাকে তেমন কিছুই কিনে দিতে পারেনি। এবার ঈদ থেকে ফেরার পথে আমি যেন যা মন চায় কিনি এমন আদেশ এলো। আমি বরারব খরুচে মানুষ হলেও অন্যের টাকায় কিছু কেনা আমার ধাচে যায় না। তাই কিছুই কেনা হলো না। শুধু ভাবতে থাকলাম,ঈদে কি লটারী পেল নাকি? এতো টাকার গরম!

কমাস পর আমার শশুর বেশ অনেক টাকা দিয়ে জায়গা কিনলেন। বালু ভরাট করে বাড়ির কাজ শুরু করলেন। আমার এনজিওর ব্যস্ত চাকরী। সময় কম আর আমার সব বিষয়ে নাক না গলানোর অভ্যাস সবসময়।
তবুও জানতে চাই, এতো এতো টাকা কোথা থেকে আসছে? বেতন তো তোমার বেশ কম।

আমাকে বলে- সরকারী চাকরী, সব দিকে টাকা আসে। তোমার এনজিও না, ওসব বুঝবে না। আমিও আর মাথা ঘামাই না। নিজেকে ছোট লাগে।

এরও কমাস পর ফোন এলো। আজকের সেই চাচা। যিনি আমাকে বোরকায় ঢাকা থাকার পরও চিনতে পেরেছেন। তিনি আমার সাথে দেখা করে যা বললেন তা শুনে আমার মাথা ঘোরা শুরু হয়ে গেল।

সেই ঈদের দিন সে নামাজ শেষ করে ঈদগাহ মাঠের পাশেই মিটিং করেছে। সেতুর কাজের জন্য অনেক লোক নেয়া হবে। মন্ত্রীর নির্দেশে সে কাজ করছে। আর সে চায় এলাকার মানুষ উপকৃত হোক। প্রতিজন ৫০ হাজার করে টাকা দিবে। আর তার সুযোগ আছে ১০০ জনকে চাকরী দেয়ার। ৩০ হাজার বেতন আর অন্যান্য সুবিধা দেয়া হবে। চাকরী করা যাবে যতোদিন সেতুর কাজ চলবে ততোদিন। এরপর অভিজ্ঞতা হয়ে গেলে ঢাকায় বিভিন্ন সেক্টরে চাকরি দেয়া হবে।

গ্রামের সহজ- সরল ভূখা মানুষ। কপালে নামাজের দাগ ফেরেশতাকে সবাই বিশ্বাস করে ফেললো। একদিনে বায়নার টাকা নিলো আর ঢাকা যাওয়ার পর সবাই ব্যাংকে টাকা পাঠায় দিলো। সেই টাকায় জমি কেনা হলো। বাড়ির কাজ চললো।

পরের ঈদে জামাই জানালো এবার ঢাকায় ঈদ করবে। অনেক ঝামেলা হয় তাই আসবে না। ঈদের পর আসবে। অগত্যা আমি একাই ঈদ করতে গেলাম শশুরবাড়ি। নামাজের পর লোকজন জমায়েত হলো। বাড়ির বড়ছেলের কান্ড- কীর্তি ফাঁস হয়ে গেল। একবছরেও যেহেতু চাকরি হয়নি, সে আর ফোনও ধরে না তাই তারা টাকা ফেরত চায়। আর কতোদিন অপেক্ষায় থাকবে। তারা আর অপেক্ষা করতে পারবে না।

অর্ধলক্ষ টাকা। আমি জীবনে চোখেও দেখিনি। শশুর জানালেন – ছেলের সাথে তার সম্পর্ক নেই। আমার আসলে তাদের বলার কিছুই ছিলো না। তবুও যতোটুকু আশ্বাস দেয়া যায় দিলাম।

ঈদের পর আমাদের অনেক ঝগড়া হলো। সে অর্ধেক টাকা দিয়েছে মন্ত্রীর পিএসকে আর বাকিটা বাপকে। টাকা ফেরত দেবে কোথা থেকে? এরপর অনেকদিন সে আমার কাছে এলোই না। আমার শশুর মশাই আমাকে এসবে নাক না গলাতে বললেন। এটা তাদের পারিবারিক ব্যাপার। আমি আমার সংসার বাঁচাতে চুপ হয়ে গেলাম।

তবুও আমার রক্ষা হলো না। আমাকে ভীষণভাবে সন্দেহ করলো। আমার শাশুড়ী ছেলেকে আসতে মানা করলেন। আমার সাথে যেহেতু তার গ্রামের লোকজনের ভালো সম্পর্ক। আমি সে এলে ধরিয়ে দিতে পারি।এসবের কারনে আমার সাথে সংসার করতে তার মন চাইলো না। শেষে চরিত্রহীন, বদরাগী, বেহায়া, ইহুদি এসব মহিলার সাথে আর যাই হোক সংসার যায় না। আমার শাশুড়ী লোকজনকে বলে বেড়ালেন, আমি চরিত্রহীন মহিলা তাই তার ছেলে বিয়ে করেছে। আমি তাকে সুখী করতে পারিনি। এখন সে বেহেস্তে আছে।

আমাদের ডিভোর্স হলোনা। ১০ লাখ টাকা দেনমোহর, আর যৌতুকসহ বিরাট অংকটা সে খরচ করতে চায়নি। আমারও ইচ্ছে হয়নি। হয়তো তাকে ভালোবাসি বলেই বাঁচিয়ে দিতে চেয়েছি।

আজ ১৩বছর পর চোর বাড়ি আসছে। প্লেনে করে নতুন বউসহ আসছে। বাধ্য হয়ে আসছে। বাবাকে লোকজন মাটি দিতে দিচ্ছে না তাই আসছে তা না হলে মাটি দিতেও হয়তো আসতো না। শুধু লাশ আটকে গেছে বলেই আসতে হলো।

আমি নিঃশব্দে বেড়িয়ে এলাম। আমার প্রয়োজন অনেক আগেই তার কাছে শেষ হয়ে গেছে। আমি তার জীবনের প্রথম লোভ আর প্রয়োজন ছিলাম। ভালোবাসা হয়তো অনুপস্থিত ছিল। কারন প্রয়োজন আর ভালোবাসা এক নয়!

তবে ভীষণ ইচ্ছে করছিল তার ধ্বসে পড়া পাপের সিঁড়ির অবস্থা আজ কি হয় সেটা দেখার। সবসময় বোধহয় সব ইচ্ছে পূরণ হয় না। লোকজনের হৈ হৈ শব্দে বেশ বুঝতে পারলাম আজ আর তাকে বাঁচানোর কেউ নেই। আজ তার প্রায়শ্চিত্তের দিন।

ছবি- অনলাইন

৮৩৩জন ২৬৭জন

২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য