১৮ জুলাইয়ের গল্পটা বলা হোক।

দেশ তখন পুরোদমে উতপ্ত। দুদিন আগে রংপুরে আবু সাঈদ শহীদ হয়েছেন। প্রায় অনন্তকাল ধরে যে জগদ্দল পাথর বাঙালির বুকে চেপে বসেছিল, সেটা কাঁপতে শুরু করেছে। সারাদিন নানান জায়গা থেকে হরেক রকম খবর আসতে থাকে। আরও কয়েকজনের মৃত্যুর খবর শোনা যায়। দেশ কোনদিকে যাচ্ছে, ঠিকঠাক বুঝতে পারি না। তবে বুঝতে পারি- কেউ আর আগের মত নেই, কিছুই আর আগের মত নেই।

১৮ তারিখে আমাদের অফিস খোলা ছিল। আগেই বলে দেওয়া হয়েছিল, কেউ যদি না আসতে চায়, না আসবে। আমরা কয়েকজন অফিসে গেছি। কিছুক্ষণ পর পর খোঁজ নিচ্ছি কোথায় কী অবস্থা। মিরপুরে একজনের মারা যাওয়ার খবর শুনলাম। ফেসবুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়া মানুষের ভিডিও ঘুরে বেড়াতে লাগল।

শুনলাম বিইউপির সামনে খুব ঝামেলা হচ্ছে। আন্দোলনকারী একদল ছেলেমেয়ে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পশ্চিম দিক দিয়ে মিরপুর DOHS-এ ঢুকে পড়েছে। ওদিকে পূর্ব দিকে পুলিশ সশস্ত্র অবস্থান নিয়েছে। DOHS সংরক্ষিত এলাকা বলে পুলিশ ভিতরে ঢুকতে পারছে না।

আমি বের হলাম দুপুরের পর। কয়েকশ ছেলেমেয়ে আমাদের অফিসের সামনের রাস্তায় জমাট বেঁধে আছে। খুব টানটান উত্তেজনা। আন্দোলনকারীরা মাঝে মাঝে ধাওয়া দিচ্ছে, পুলিশ পিছু হটে যাচ্ছে। আবার পরক্ষনেই পুলিশ এ্যাকশনে যাচ্ছে- গুলি, টিয়ারশেল, সাউন্ডগ্রেনেড। ছেলেরা দৌড়ে ভিতরের দিকে চলে আসছে। পুরো রাস্তাজুড়ে ইটের টুকরো। এখানে ওখানে ধোঁয়া উড়ছে। মাঝে মাঝেই গুলির শব্দ।

সাহস ভর করলে মানুষ কী হয়ে যায়, সেদিন বুঝলাম। আমি কখন সবার সাথে মিশে গেছি, টেরই পাইনি। হুড়োহুড়ি, ছুটোছুটি করছি বটে; মনে হচ্ছিল নিজের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সবাই যা করছে, আমাকেও তা-ই করতে হবে। DOHS-এর প্রবেশপথের ঠিক সামনেই একটা হ্যাংলা-পাতলা ছেলে পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়ে দিল। ধীরে ধীরে পুরো গাড়িতে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। কয়েক হাত দূরে, ধাওয়া খেয়ে পিছিয়ে যাওয়া পুলিশের দল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি অপার বিস্ময়ে দেখলাম, বুকে দ্রোহের আগুন জ্বললে মানুষ কী না করতে পারে!

একটু পর পুলিশের দৌড়ানি খেয়ে সবাই ভিতরের দিকে চলে গেল। ১০ নম্বর এভিনিউটা একটু বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে, ছেলেরা সব ৯ নম্বর এভিনিউতে ভিড় করেছে। এবং তখনই আমি আমার জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ দৃশগুলোর মধ্যে একটা দেখলাম।

বড় বিপদ মানুষকে কাছাকাছি আনে। আশেপাশের প্রত্যেকটা বিল্ডিং-এর জানালা, বারান্দা আর গেটে বাসিন্দারা দাঁড়িয়ে আছেন। কারও হাতে পানি, কারও হাতে খাবার, সিদ্ধ ডিম, পাউরুটি, বিস্কুটের প্যাকেট, লাঠি, ব্যান্ডেজ, বরফ। টিয়ারশেলে চোখ জ্বালাপোড়া করলে টুথপেস্ট লাগালে আরাম হয়। জানালার ফাঁক দিয়ে মহিলারা টুথপেস্টের টিউব ফেলে দিচ্ছেন। কাগজে আগুন জ্বালালে চোখের জ্বলুনি কমে, বারান্দা থেকে বয়স্ক লোকেরা খবরের কাগজ ছুঁড়ে দিচ্ছেন। ৭১-এর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে আপামর মানুষের সহযোগিতার যে গল্প আমরা শুনেছি, বইপত্রে, নাটক-সিনেমায় দেখেছি- হুবহু সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন! অভূতপূর্ব এই দৃশ্য দেখে আমি বুঝে ফেললাম, জেগে ওঠা দূর্বার এই জাতিকে আর কেউ ঠেকাতে পারবে না।

বিকেলের দিকে উত্তেজনা যখন একটু কমে এসেছে, তখন একটা বিশ-বাইশ বছরের ছেলে দৌড়ে এসে একটা বাড়ির সামনে পড়ে গেল। হাত দিয়ে কাঁধ চেপে ধরে আছে। আমরা কাছে ছুটে গেলাম। দেখা গেল হালকা আঁচর। সম্ভবত গুলি, চামড়ার উপর দিয়ে চলে গেছে।

মাগরিবের আজানের দুই-চার মিনিট আগে বা পরে হবে- শোরগোল শোনা গেল ছাত্রলীগের গুন্ডারা DOHS-এ ঢুকছে। ছাত্রলীগ যে পুলিশের চেয়ে ভয়ংকর, সেটা কে না জানে! সবার মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ল। ভয়ে সবাই বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়তে লাগল। আমি কয়েকটা ছেলেকে নিয়ে অফিসের ভিতরে চলে এলাম।

নামাজের সময় চলে যাচ্ছে। ছেলেগুলোকে বসিয়ে, কফি খেতে দিয়ে অজু করতে গেলাম। বাথরুমে ঢুকে আমার প্রথমবারের মত হুশ হল! এতক্ষণ কী হল, কোথায় ছিলাম- প্রথমবারের মত ভাবার সুযোগ পেলাম।

অজু করে বের হয়ে শুনি নিচে ভাংচুরের শব্দ। ছাত্রলীগ-বাহিনী চলে এসেছে। প্রতিটা বাড়ির গেট, গ্রিল যা সামনে পাচ্ছে, ভাঙ্গার চেষ্টা করছে। তাড়াতাড়ি নামাজ সেরে নিচে নামলাম। সবার চোখেমুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু কেউ সেটা প্রকাশ করছে না। দারোয়ান শাহজাহান ভাই একটা রামদা হাতে নিয়ে পায়চারী করছেন। থমথমে মুখে বললেন- “স্যার, একটারে সামনে পাইলে কল্লা নামাইয়া দিমু”। ওদিকে নাহিদ ছাদে গিয়ে উপর থেকে ইট-পাটকেল ছুঁড়ে মারছে। গেট বন্ধ। অন্ধকার। বাইরে ছাত্রলীগ, ভিতরে আমরা। গুলিটুলি করে বসতে পারে, সেই ভয়ে আমি সবাইকে সরিয়ে দিয়ে উপরে চলে গেলাম।

তারপর একসময় ঝড় থেমে গেল। আমরা ধীরে ধীরে বাইরে এলাম। এ যেন এক মৃত্যুপুরী। মনে হল, দুঃখের রাত যেন মাত্র শুরু হল।

বাড়ি ফিরতে হবে। গাড়িঘোড়া কিছু নেই। অফিসের নিচে এক মিলিটারি ইউনিফর্ম পরা ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। আতংকে সাদা হয়ে গেছেন। নাহিদকে অনুরোধ করছেন, যেন মোটরসাইকেলে করে বাসায় রেখে আসে। আমি নাহিদকে নিষেধ করলাম, এই সময়ে মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়লে দুইজনের কেউই জান নিয়ে ফিরতে পারবে না।

কোথায় বাসা জিজ্ঞেস করায় উনি বললেন- “ইসিবি”। আমি বললাম- “আমার বাসাও ইসিবিতে। আমার সাথে আসেন।” উনি সুড়সুড় করে আমার পিছনে হাঁটা শুরু করলেন। সেদিন এই কাজটা আমি কেন করেছিলাম, এখনও বুঝতে পারি না। এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার মত সাহসী মানুষ আমি কখনোই ছিলাম না।

রিকশা, অটোরিকশা- কিছুই নেই রাস্তায়। আমরা হাঁটতে লাগলাম। ভদ্রলোককে বললাম- “ইউনিফর্ম খুলে ফেলেন।” উনি ইতস্তত করতে লাগলেন। ততক্ষনে একটা অটোরিকশা পেয়ে গেলাম। রিকশায় উঠেই উনি ইউনিফর্ম খুলে ফেললেন। পুরো রাস্তা চোরের মত গুটিসুটি মেরে বসে থাকলেন।

ইসিবিতে নামলাম। আমি ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে দেখি ভদ্রলোক নেই। নাম, পরিচয় জানা হল না।

বাসায় ঢুকলাম রাত সাড়ে ৯টার দিকে। ততোক্ষণে যুদ্ধের নতুন চ্যাপ্টার শুরু হয়েছে। সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে।

৬০০জন ৫৪৬জন

একটি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য