দৈনন্দিন আতঙ্ক এবং একটি অনুরোধ

কিভাবে লেখা শুরু করবো ভেবে পাচ্ছিনা। মন ভীষণ ভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। টিভিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রেস ব্রিফিং(এর বেশিরভাগ তথ্যই মাথার উপ্রে দিয়ে যাচ্ছে), ভিডিও কনফারেন্স, লাইভ আলোচনা অনুষ্ঠান দেখে,অনলাইনের নিউজ সহ সোশ্যাল মিডিয়ায় নানারকম তথ্য,তর্ক/বিতর্ক, বিভিন্ন জনের নানারকম লেখা পড়ে পড়ে যতটুকু ধারণা পাচ্ছিলাম তাতে মোটামুটি পজেটিভ অবস্থানে থেকেছি। কিন্তু মাত্র দুইদিন না যেতেই চারপাশের মানুষদের আচরণ, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি দেখে আতঙ্কিত বোধ করছি। নিজে কিছু ভাবার মতো মানসিক অবস্থা হারিয়ে ফেলেছি। সত্যি বলতে চরম মাত্রায় ভীত এবং হতাশ হয়েছি। সরকারের, নিয়োজিত কর্তৃপক্ষের, বা ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কিছু লিখছিনা। সচেতন নাগরিকদের প্রতিও কোনো অভিযোগ নেই। লেখাটি নিজের তাগিদে।

মার্চের ১৭ তারিখ থেকে একটানা বাচ্চাদের নিয়ে নিজ গৃহে অবস্থান করছি। এরমধ্যে ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে আধা ঘন্টার জন্যে একবার বাইরে যেতে হয়েছে। ২৭শে মার্চ বাইরে গিয়ে কি দেখলাম সেটা আগে বলছি,

* চায়ের দোকান, রেস্টুরেন্ট, বিকাশের দোকান সহ ছোট বড় বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ।

* মেইন রাস্তায় পুলিশ টহল দিচ্ছে, কিন্ত এলাকার রাস্তায় অল্প সংখ্যক মানুষের আনাগোনা।

* সবার মুখে মাস্ক পরা। কেউ কেউ হ্যান্ড গ্লাভস পরেছেন।

* রাস্তায় কোন রিক্সা, সাইকেল কিচ্ছু নেই।

* তিন ঘন্টার জন্যে এলাকার বাজারটি খুলে রাখা হয়েছে। দোকানীরা ভীত দিশাহীন হয়ে কোনো রকমে ক্রেতাদের কাছে জিনিস পত্র বিক্রি করছিলেন।

* জনস্বার্থে স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাত ধোয়ার জন্যে এলাকার প্রায় প্রতিটি এপার্টমেন্ট/ বাড়ির সামনে সাবান,পানির ড্রাম রাখা হয়েছে।

স্বাভাবিক ভাবেই এই দৃশ্য অত্যন্ত স্বস্তিকর। যা দেখার পর মানসিক ভাবে আশাবাদী হওয়া যায়। এতে আমি/ আমরা ভেবে নিয়েছিলাম আমাদের এলাকাটি ভাইরাস সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত।

৩১শে মার্চ পর্যন্ত এমনই ছিলো। তারপর হলো কি, মানুষের মধ্যে দমবন্ধ-দমবন্ধ একটা ভাব লক্ষ্য করা গেলো। তারা ছোট ছোট দল বেধে এলাকার বিভিন্ন মোড়ে দাঁড়িয়ে করোনা সম্পর্কে মানুষদের জ্ঞান বিতরণ শুরু করলো। মাস্ক নিয়ে ঘর থেকে বের হলেও ওটা সঠিক স্থানে খুব কম মানুষ পরেছেন। কারো এক কানের পাশে ঝুলিয়ে, কেউ হাতে ব্যান্ডেজের মতো আটকিয়ে, আবার কেউ নাক টা খোলা রেখে শুধু ঠোঁট গুলো ঢেকেছেন।

জ্ঞান বিতরণের বিরতিতে রাস্তার পাশে বসে/দাঁড়িয়ে হিসু করছেন কেউ-কেউ। তারপর উঠে এসে ভালো করে হাত ধুচ্ছেন একেকটি বাড়ির সামনে রাখা সাবান-পানি দিয়ে। তারা তাদের আলোচনায় এতই মগ্ন যে,হাত ধোয়া শেষে পানির ট্যাপটাও ঠিক মতো বন্ধ করতে ভুলে যাচ্ছেন।

ইয়াং ছেলেরা আরেকটু বেশি উদ্দিপ্ত হয়ে বাইক নিয়ে গোটা এলাকায় চক্কর দিয়ে নিজেদের সুস্থ্য থাকা প্রমাণ করতে লাগলো। সচেতন (?) মহিলারাও আর নিজেদের ধরে রাখতে পারছিলো না। তাদের স্বামী-সন্তান কই কই ঘুরছে খোঁজ নিতে দল বেধে রাস্তায় নেমে এলো। মেয়ে মানুষ,অল্পতেই কাহিল, খুব একটা হাটাহাটি তাদের পোষায় না, তাই তারা এলাকার ভিতরে অবস্থিত গ্যারেজ গুলো থেকে রিক্সা নিয়ে অনুসন্ধানের কাজে নামলো। কাজের অত্যাবশ্যক অংশ মনে করে তারা চেষ্টা করলেন, পাশের এলাকায় থাকা বান্ধবীর বাসায় গিয়ে তাদের খবরাখবর জেনে আসতে। এইসব মহিলারা মাস্ক পরা আবশ্যক মনে করন না। অনেকেই বোরখা পরে হিজাব নেকাব পরেন। আর বাকিদের ওড়নাই ভরসা। যখন-তখন প্রয়োজন মনে করলে ওড়নার এক কোন দিয়ে নাক-মুখ চেপে ধরছেন।

যেই ব্যাক্তিকে জুম্মার নামাজে ঠেলেঠুলে মসজিদে পাঠাতে হতো, সেও এখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়েই আদায় করা শুরু করেছেন। যদিও এলাকার মসজিদ থেকে বারবার বলা হচ্ছে “ ঘরে থেকে নামাজ পড়ুন “। কে শোনে কার কথা!

জানালার সামনে বসে, সারাদিন ধরে এসব দেখে দেখে আমি সত্যিই খুব হতাশ। আসলে হতাশ বলা ঠিক হবেনা, আমি ভয় পাচ্ছি। আমি, বা আমরা যারা নিজেদের নিরাপদে রাখার জন্য, সবার নিরাপত্তার খাতিরে, ভালো রাখার তাগিদে নিজেদের অবরুদ্ধ করে নিয়েছি, আমাদের কথা কি কেউ ভাবছে না? যারা নির্বিঘ্নে স্বাস্থ্য বিধি অমান্য করে চলেছেন, তাদের জন্যে কি ব্যবস্থা করা হয়েছে?

যারা নিয়মের বাইরে ঘুরছেন ফিরছেন তাদের প্রতি অনুরোধ আপনারা সচেতন হোন। নিজেদের জন্যে না হোক অন্যদের কথা ভেবে, মানবিকতার স্বার্থে যত্রতত্র ঘোরাঘুরি করা বন্ধ করুন। “আমাদের জীবনেও ওষুধ খেতে হয়নি,কোনোদিন ডাক্তারের কাছে যেতে হয়নি,আমাদের কিছু হবেনা” ইত্যাদি ইত্যাদি বলা ভাই-বোনদের বলছি, আল্লাহর কাছে দোয়া করি আল্লাহ তায়ালা যেন আপনাদের চিরকাল সুস্থ্য রাখেন। আমরা আপনাদের মতো আ্যন্টিবডি নিয়ে জন্মাইনি। দয়া করে আমাদের এইটুকু উপকার করুন। ঘরে থাকুন, আমাদেরও বাঁচতে দিন, প্লিজ।

★ ০৪/০৪/২০২০ ইং পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭০ জন। ঢাকার ৩৮ জন। শুধু মাত্র মিরপুরে পাওয়া গেছে ১০ জন।

★ আমি ঢাকা-মিরপুরের বাসিন্দা। এজন্য অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে আছি।

মোট পড়েছেনঃ ১,১৭৯জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

৩৫টি মন্তব্য

    1. ডেঞ্জার জোনই বটে। আজ আরও দুজন সনাক্ত হয়েছেন রাস্তার ওপাড়ে। যেকোনো সময় আমাদের এলাকাটিকে লকডাউনের আওতায় আনা হবে।

      দোয়া করবেন ভাইজান।
      শুভ কামনা 🌹🌹

    1. আসলেই তাই। আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন। চেষ্টা করছি ভয় দূর করে সচেতন থাকার।

      ভালো থাকুন,
      নিরাপদে থাকুন।
      শুভ কামনা 🌹🌹

  1. আমাদের স্বভাব পাল্টাবে না এত দ্রুত,
    সমস্ত বিশ্ব এখন লক ডাউনের মধ্যে আছে, কোথাও কোথাও কারফিউ দিচ্ছে।
    আর আমরা বাসায় অতিষ্ঠ হয়ে রাস্তায় ঘোড়া ঘুড়িতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি।
    নিজের এবং নিজ পরিবারকে যে বিপদের মুখোমুখি করছি তাও ভুলে যাচ্ছি।

    একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনার মত আতংকের মাঝে থাকাই স্বাভাবিক।
    বাসায় থাকুন, সাবধানে থাকুন।
    শুভ কামনা।

    1. কিছু মানুষকে ঘরে রাখা আসলেই মুসকিল। তারা শুধুমাত্র নিজেদের নিয়মে চলতে অভ্যস্ত। এদের কারণে বাকিরাও বিপদে পড়ছে।

      ভালো থাকুন,
      নিরাপদে থাকুন।
      শুভ কামনা 🌹🌹

  2. হতাশার জায়গাটা এখানে
    কিছু মানুষ আছে নিয়ম ভাঙার জন্য
    কিছু আছে বিপদ আসলে অতি ধার্মিক হয়ে যায়
    কিছু আছে জ্ঞান আহরন বিতরনের আই মিন
    কৌতুহল মিটানোর জন্য জটলাটাই বেছে নেয়।
    আর দোষ গুন সরকার আর স্রষ্টার উপর ছেড়ে দেয়।
    সবশেষে বলি,
    সাবধানতার মাইর নাই
    আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নাই।
    ভাল থাকবেন।

    1. এই কিছু কিছু মানুষের কারনে বিপদের পরিমাণ কেবল বেড়েই যাচ্ছে। করোনা নিয়ে নয়, ভয় পাচ্ছি এসব মানুষদের। এরা নিজেরাই করোনাকে দাওয়াত দিয়ে আনছে 🙁

      আপনিও ভালো থাকবেন দাদা,
      শুভ কামনা 🌹🌹

  3. চরম ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের হুশ হবে না কোনোদিন আপু। আফটার অল উই আর বাঙালি বলে কথা। সাবধানে থাকবেন আপু
    আল্লাহ ভরসা

    1. ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার পর চেতনা ফিরলেই কি আর না ফিরলেই কি! বাইরে বের হওয়ার জন্য এদের বাহানার শেষ নেই। আবার রোগে পড়ে গেলে এরাই চিৎকার চেচামেচি বেশি করে।

      আপনিও ভালো থাকবেন।
      শুভ কামনা 🌹🌹

  4. আমাদের স্বভাব হচ্ছে যা করতে বলা হয় করি তার উলটো। মসজিদগুলোতে এখনো মানুষ যাতায়াত করছে। মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা সবকিছুতেই ভীর।

    অহেতুক এবং ইচ্ছেকৃত মানুষের ঘোরাঘুরি কিছুতেই কাম্য নয়। আপনারা সতর্ক থাকবেন আপু।

    1. একদম তাই। খবরে দেখলাম এক সাংবাদিক এক চায়ের দোকানে গিয়ে এক লোককে জিজ্ঞেস করছিলেন ” বের হয়েছেন কেন? এটাতো ঠিক না। উত্তরে সেই বয়স্ক লোকটা বললো, আমি কি কোনো কাজে বের হইছি? নাকি সারাদিনের জন্যে বাইরে আসছি? আমি চা খেতে এসেছি। এখন কি চাও খাবো না? ” এই হলো অবস্থা 🙁

      আপনিও ভালো থাকবেন তৌহিদ ভাই।
      শুভ কামনা 🌹🌹

  5. ঘরে বসে বসে আমিও হাঁপিয়ে উঠেছি। কিন্তু পারছি না বাইরে যেতে। কী যে দম বন্ধ অবস্থা। আমারও মন চাইছে ওদের মত করতে। কিন্তু করছি না। সব মিলে অসহনীয় একটা অবস্থা!

    1. আমরা চাইলেও বাইরে যেতে পারছিনা। আর যারা বাইরে অকারণে ঘুরছেন তারা কিন্তু চেষ্টা করলেই বাসায় থাকতে পারেন। কিন্তু এরা তা করছে না। কোনো নিষেধাজ্ঞা মানে না। মনে হয় শুধু বোমা পড়লেই ভয় পায়, ভাইরাসকে নয়।

      কিছু করার নেই। আমাদের ধৈর্যের সাথে এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবে। দেখতে দেখতে দুঃসময় কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ।

      ভালো থেকো, নিরাপদে থেকো।
      শুভ কামনা 🌹🌹

  6. সচেতন হতে বাধ্য করার বিকল্প কিছু নেই, অন্য দেশের মত সান্ধ্য-আইনের কথা খণ্ড কালীন হলেও
    ভাবার সময় এসেছে। এ বিশজ্যে এত কিছু পড়েছি যে সত্যি আমি ভয় পাচ্ছি, আর বেশি করে পানাহ চাচ্ছি।
    আপনিও নিরাপদে থাকুন।

    1. সচেতন হতে আসলে বাধ্য করা যায়না। বল প্রয়োগে হয়তো নিয়মের আওতায় আনা যেতে পারে। প্রশাসন নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যবস্থা নিবেন।

      ভালো থাকবেন মহারাজ,
      শুভ কামনা 🌹🌹

    1. মহান আল্লাহু তায়ালার দয়ায় ইনশাআল্লাহ আমরা তা কাটিয়ে উঠবো।

      ভালো থাকুন,
      নিরাপদে থাকুন।
      শুভ কামনা হালিম ভাই 🌹🌹

  7. ভয় পাওয়ার মতোই অবস্থা তৈরি হয়েছে দিদি।
    তবে দিদি সচেতন হতে বাধ্য করার বিকল্প কিছু নেই।

    আপনিও ভালো থাকবেন সুস্হ থাকবেন নিরাপদথাকবে সব সময়।
    শুভ কামনা 🌹🌹

    1. চেষ্টা করি সব সময় সাবধানে থাকতে। বাকিটা আল্লাহ ভরসা। আপনিও ভালো থাকবেন দাদা। যতটুকু সম্ভব নিরাপদে থাকার চেষ্টা করবেন।

      শুভ কামনা 🌹🌹

    1. মেইন রোড গুলো পুলিশের নিয়ন্ত্রণে থাকছে। কিন্তু এলাকা গুলোতে পুলিশের উপস্থিতি খুব কম। তাছাড়া বেহায়া লোকদের পাহারা দিয়ে রাখা খুব কঠিন। এরা এদের মতোই চলে।

      ভালো থাকুন কামাল ভাই।
      দোয়া করবেন,
      শুভ কামনা 🌹🌹

  8. ভয় পাচ্ছি আমরা সবাই-
    যা দেখছি, তাতে প্রতি মিনিটে ভয় বাড়ছেই।

    আল্লাহ বিশেষ রহমতের মাধ্যমে আমাদের মতো আধা নির্বোধ জাতিকে রক্ষা না করলে, আর রক্ষা নাই।

    1. যা দেখছি তাতে ভয় না পাওয়াটাই অস্বাভাবিক। দিনে দিনে ভাইরাস বিস্তার হচ্ছে, নিত্ত নতুন বাহক পাচ্ছে। আর আধা নির্বোধ, একগুয়ে মানুষগুলো হাসতে হাসতে নিজেদের বলির পাঁঁঠায় পরিনত করছে। আমরা কিছুই করতে পারছিনা। এখন শুধু আল্লাহ ভরসা। তিনি যদি আমাদের দয়া করেন তাহলেই হয়তো বেঁচে যাবো।

      ভালো থাকুন বাবু ভাই,
      শুভ কামনা 🌹🌹

  9. মাথার ডানপাশটা টনটন করছে ব্যাথায়।
    লেখাটা পড়ার পর থেকে।কি মন্তব্য করবো?
    বুঝতে পারছি না। সার্বিক পরিস্থিতী বয়ান করলে যেভাবে! জানিনা, কতদিন টিকবো?
    কতদিন টিকবে পরিচিত অঙ্গন? ভালো থেকো।সাবধানে থেকো। নিরাপদে থেকো।
    মহান আল্লাহ্ আমাদের সকলের সহায় হোন।
    আমিন

মন্তব্য করুন