জ্ঞানের কান্ডারী শিক্ষক...
জ্ঞানের কান্ডারী শিক্ষক…


শামসুল হক স্যার
:-

জীবনে অনেকগুলো স্কুল পেয়েছি। শমশেরনগর গার্লস স্কুলে তখন সায়েন্স বিভাগ শুরু হয়নি। তাই ক্লাশ নাইনে শ্রীমঙ্গল বি.টি.আর.আই স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সুযোগ পাই। সেই সময় ভারতেশ্বরী হোমসেও চান্স পাই আমি। কিন্তু এতোদূরে যেতে চাইনা। ভাগ্যক্রমে আমার মাসতুতো ভাই শোভনদা বাপিকে বললো আমার মনটা অন্যরকম, জোর করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। যদিও বাপি জোর করেনি কোনোকিছুতেই। শুধু বলছিলো “সবাই চান্স পায়না, গেলে ভালো করতি।” যাক সেখানে ভর্তি হলাম। অঙ্ক শিক্ষক হিসেবে পেলাম শামসুল হক স্যারকে। উনাকে সবাই যেমন ভালোবাসতো, তেমনি বাঘের মতো ভয়ও পেতো। একসময়কার ভালো রাজা-বাদশাহেরা রাতের অন্ধকারে প্রজাদের দুঃখ-দুর্দশা নিজের চোখে দেখতো, আর আমাদের শামসুল হক স্যার পুরো বি.টি.আর.আই চক্কর দিতেন কোন ছাত্র-ছাত্রীরা পড়ছে না। দুর্ভাগ্যক্রমে আমি যে বাসায় থাকতাম, তার পাশের বাসা ছিলো স্যারের। একদিন খুব গরম পড়েছে, জানালা হাল্কা খুলে দেয়া। হঠাৎ দেখি জানালার ফাঁকে একটা চোখ। আমি তো চিৎকার। কারণ স্যারের এ অভ্যাস তো জানতাম না। আমি মাত্র নতূন এসেছি দাদুর বাসায়। জানালা দিয়ে বলতে লাগলেন, “ওই চুপ, চুপ! আমি শামসুল হক স্যার।” আমি ভয়ে শেষ, অন্যদিকে অবাকও! এসব কি!! স্যার খাঁটি কুমিল্লার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেন। স্যার প্রাইভেট পড়ালেও টাকা নিতেন না। তাও বাসায় গিয়ে পড়াতেন না। নিজের বাসায় একসাথে কয়েকজনকে। তবে সবাইকে নয়, যাঁদেরকে উনি ভালোবাসতেন শুধু তাদেরকেই। আমি জানিনা স্যার আমায় কেন ভালোবাসতেন! একদিনও কথা বলিনি। জ্বী স্যার, আচ্ছা স্যার—এটুকুই। গণিত ক্লাশে কথাব্যয় করতে লাগেনা।

স্যার যতোটা রাগী, উনার স্ত্রী অনেক বেশী নরম। তবে অন্যায় সহ্য করতেন না ম্যাডাম। ম্যাডামের সাথে আমার একটু ভাব হয়ে গেলো স্যারের মেয়ে রুমীর জন্য। স্যারের দুই মেয়ে, এক ছেলে। রুমী সবার বড়ো, তবে অনেক ছোট্ট আমার থেকে। কিন্তু বেশ বন্ধুত্ত্ব হয়ে গিয়েছিলো। রোজ বিকেলে আমার কাছে গল্প শুনতে আসতো। স্যারের জীবনে বড়ো ট্র্যাজেডি, উনার একটি সন্তানও বেঁচে নেই। স্যার আর ম্যাডাম দুজন চাচাতো ভাই-বোন ছিলেন, বিয়ের পর দেখা গেলো একই ব্লাড গ্রুপ। একই গ্রুপের জন্য সব কয়টি সন্তানেরই থ্যালাসমিয়া হয়ে গিয়েছিলো। প্রতি মাসে ঢাকা গিয়ে তিন ব্যাগ রক্ত দেওয়াতে হতো। স্যার পয়সাওয়ালা ছিলেন না, আবার টিউশনিও করতেন না। আমি শ্রীমঙ্গল ছেড়ে যখন চলে আসি তখন জেনেছি ছোট মেয়ে রুনী আর ছেলেটা পৃথিবী থেকে চলে গেছে। ভাগ্য ভালো রুমী বেঁচে গিয়েছিলো তখনও। আমি যখন বেলজিয়ামে ২০০৯ সালে, তখন জেনেছি রুমীও আর নেই। মেয়েটি নাকি ডিগ্রী পরীক্ষা দিয়েই মারা গেছে ওই রোগে। রুমী এখনও চোখে ভাসে পোটকা মেয়েটা কোলে এসে “আন্টি, আন্টি” করতো। স্যার মুচকি মুচকি হাসতেন রুমী আর আমার গল্প শুনে।

যাক স্যারের ক্লাশে মনে পড়ে প্রত্যেককে বোর্ডে ডাকতেন। জি.এম ফারুক স্যারের প্রিয় ছাত্র ছিলো। ফারুক এখন ডাক্তার সবাই ওকে জি.এম ডাকে। কিন্তু প্রথম শুনি স্যারের মুখে ফারুককে জি.এম বলে ডাকতে। মুক্তি ছিলো মহাদুষ্টু, কিন্তু স্যার ভালোবাসতেন। স্যারের আরেক প্রিয় ছাত্রী রানী। মোট কথা আমাদের ক্লাশের কাউকেই স্যার অপছন্দ করেননি। স্যার আমার পুরো নাম ধরে ডাকতেন বোর্ডে। ঈশ্বর জানে কেন যে কাঁপতে কাঁপতে যেতাম। আর ওই কাঁপুনীর জন্য স্যারের ক্লাশে একদিনও সঠিক ভাবে অঙ্ক করতে পারিনি বোর্ডে। স্যারের বাসায় যখন যেতাম, বেশ রেগে গিয়ে বলতেন কেন পারিনি? কি করে বলবো কেন পারিনি, আজও জানা হলোনা খাতায় পারা অঙ্ক বোর্ডে কেন করতে পারিনি? শুনেছি স্যার ঢাকায় আছেন। ঠিকানা জানিনা, দেশে থাকলে আমি ঠিক সংগ্রহ করতে পারতাম। স্যার ভালো থাকুন, এটুকুই চাই।

রীতা ম্যাডাম :-

এই একজন শিক্ষক যাকে মনে রেখেছি ভালোবেসে নয়, বিতৃষ্ণায়। উনি নতূন এলেন আমাদের স্কুলে ইলেক্টিক ম্যাথ করাতে। প্রথম যেদিন ক্লাশে যাই, উনার পড়ানোর ধাঁচ পছন্দ হয়নি। কারণ উনি অঙ্ক বোঝাতেন না, মুখস্থর মতো বলতেন। আর দু’/একটা বোর্ডে লিখতেন। আমি মোটেও বুঝতাম না। কেউ জিজ্ঞাসা করতো না, একা আমি-ই বলতাম ম্যাডাম একটু বুঝিয়ে দেবেন? এভাবে বলতে বলতে একদিন উনি বললেন আমার উচিৎ ইলেক্টিক ম্যাথ বদলে খাদ্যপুষ্টি-গার্হস্থ্য নিয়ে পড়তে। কথাটা এভাবে বলেছিলেন, “নীলাঞ্জনা তোমার মাথা আসলে ইলেক্টিক ম্যাথের জন্য না, খাদ্যপুষ্টি-গার্হস্থ্যর জন্য। ওই বিষয়টাই নাও।” সারা ক্লাশ হেসেছিলো, আমি তখন মাথা নুয়ে চুপ করে দাঁড়িয়েছিলাম। সেদিনও কান্না আমার সাথে বেঈমানী করেছিলো। যেদিন চলে আসি শ্রীমঙ্গল থেকে ক্লাশরুমে গিয়ে সব শিক্ষকদের প্রণাম করেছিলাম। শুধু রীতা ম্যাডামের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, আমার মতো শিক্ষার্থীদের সব শিক্ষকরা বুঝতে পারেননা। যাঁরা আমাদের বোঝেন, তাঁরা শিক্ষক হিসেবে জয়ী। নমষ্কার ম্যাডাম। চলে আসি ওই কথা বলে।

শ্রীমঙ্গল বি.টি.আর.আই স্কুলে আরোও কয়েকজন শিক্ষক যাঁদের ক্লাশ ভালো লাগতো, তাঁদের মধ্যে হরিপদ স্যার আমাদের বাংলা পড়াতেন। স্যার খুবই ডিসিপ্লিনড ছিলেন। শুনেছি বেঁচে নেই। উনার ছেলে হিল্লোল আমাদের সহপাঠী, স্যার ওকেও শাস্তি দিতে পিছ পা হননি। স্যারকে ক্লাশের বাইরে কখনো পাইনি, ওই যতোটুকু ক্লাশেই। শাহ আলম স্যার আমাদের জীববিজ্ঞান পড়াতেন। উনি বেত নিয়ে আসতেন এবং পিটিয়ে খুবই শান্তি পেতেন। স্যারের এই মার বেশী পেতো রঞ্জিত। চোখে ভাসে রঞ্জিতের মুখ চেপে দাঁতে দাঁত লাগিয়ে দাঁড়ানো। আরোও অনেক শিক্ষক ছিলেন ঠিক মনে পড়ছে না। আর কয়েকজন আমাদের ক্লাশ না নিলেও আমি আদাব-নমষ্কার দিতাম, সেই সূত্রে আমায় পছন্দ করতেন। আমার নামও জানতেন।

যাক ক্লাশ টেনে বিশাল একটা এক্সিডেন্ট হলো, প্রি-টেষ্ট পরীক্ষা দিতে পারিনি। বি.টি.আর.আই স্কুল মারাত্মক স্ট্রীক্ট ছিলো, আমায় টেষ্ট পরীক্ষা দিতেই দিলোনা। শামসুল হক স্যার যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন আমায় যেতে না দিতে। কিন্তু পারেননি। সেখান থেকে চলে আসি কমলগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ে। বছর যাতে নষ্ট না হয় কুমিল্লা বোর্ডে গিয়ে কতো যে দৌঁড়-ঝাঁপ বাপির। ঈশ্বরের কৃপায় সেই স্কুলে ক্লাশ শুরু করি। একজন শিক্ষক যাঁর নাম শিবাণী ম্যাডাম আমার জীবনের একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে এখনও এই মনে আছেন। শিবাণী ম্যাডামের গল্প পরের পর্বে। সবশেষে একটা কথা না বললেই নয়, শামসুল হক স্যারের সাথে শেষ দেখা হয় যেদিন, মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন আঞ্চলিক ভাষায়(আমি শুদ্ধ ভাষায় লিখলাম লাইনটা), “জীবনে যতো ধাক্কা খাওয়া যায়, ততোই লাভ। যেখানেই ওই ধাক্কা খাবে, সেখানেই একদিন ফিরে আসা হবে। তবে খেতে নয়, দিতে।” হুম মাষ্টার্স পাশ করার পর বি.টি.আর.আই কলেজে আমার চাকরী হয়েছিলো। ইন্টারভিউতে পাশ করেছিলাম। কিন্তু চাকরী করিনি, শমশেরনগর সুজা মেমোরিয়াল কলেজে জয়েন করেছিলাম। ইন্টারভিউ শেষে ফিরে যখন আসি, সেদিন স্কুলের ওই মাঠে দাঁড়িয়ে স্যারের ওই কথাটি মনে এসেছিলো।

ক্রমশ

হ্যামিল্টন, কানাডা
২৬ জুলাই, ২০১৬ ইং।

**পুনশ্চ, যাঁরা এই ধারাবাহিকটির পাশে আছেন মন থেকে, তাঁদের সকলের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা।

আপামনি, লীলা ম্যাডাম(ছোট দিদিমনি), মওলানা স্যার, ধীরেন্দ্র স্যার – যাঁদের কাছে ঋণী এ জীবন : পঞ্চম ভাগ

৭০৬জন ৭০৬জন
0 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ