কালজয়ী দুঃখ

শুন্য শুন্যালয় ১৭ মার্চ ২০১৬, বৃহস্পতিবার, ০৫:৪১:৫৭পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৫৯ মন্তব্য

জেনে বুঝে পুচ্ছে অঙ্গুলী প্রদান একটি গর্হিত কর্ম। নারে ভাই, খাতা-কলম আর প্র্যাক্টিকেলে বিস্তর ফারাক। ধরে বেন্ধে বাক্সবন্দী না করে ঘটনা টা খুলেই বলি। ইহাতে কিন্তু কোন রটনা নাই, আসলেই ঘটনা।
আমাদের সার্জারি বিভাগের হেড অফ দ্যা ডিপার্টমেন্ট স্যারকে আমাদের দেখা হয়নাই চক্ষু মেলিয়া অবস্থা। তবে তারে আমি চোখে দেখিনি, তার অনেক গল্প শুনেছি। প্রতিমাসে বিশিষ্ট গুনের মাধ্যমে তিনি ঢাকায় বসেই তার স্যালারি পেয়ে যেতেন। তাই সম্ভবত তিনি, আমাদের কলেজের উদ্দ্যেশ্যে ছোর আয়ে হাম ও গালিয়া টাইপ ভাব ধারন করিয়া থাকতেন। সিনিয়াররা আমাদের আশ্বস্ত করিলো, দেখা হইবে, অবশ্যই দেখা হইবে, ফাইনাল প্রফেশনালে তোমাদের মনের বাসনা পূরন হইবে। ফাইনাল প্রফে হেড অফ দ্যা ডিপার্টমেন্টকেই ইন্টারনাল এক্সামিনার হতে হয়, একারনে তিনি আসতে বাধ্য হন, আমরা সবাই অবশ্য শলা-পরামর্শ করিয়াছিলাম, সবাই মিলে ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষা দিয়া আসিলে কেমন হয়? বেচারার কষ্ট কিছুটা কমিতো।
এলো সেই ফাইনাল প্রফেশনাল। তিন বিভাগের মধ্যে সার্জারী টা সবচাইতে কঠিন, এটাতে আই, ই,এন,টি, অর্থোপেডিক আর জেনারেল সার্জারি সহ চারটা বোর্ড। লিখিত ছাড়াও প্রত্যেকটির ভাইভা, হার্ড পার্ট আর কেস প্রেজেনটেশন, অর্থাৎ ১২ টা বোর্ড ফেস করা রীতিমত পুলসিরাত পার করার মত ছিল।
জেনারেল সার্জারির যেসব কেস সচরাচর পরীক্ষাতে আসে, তার একটা হচ্ছে BPH (Benign Prostatic Hypertrophy)। বয়ষ্ক পুরুষদের প্রোস্টেট গ্ল্যান্ড বড় হয়ে গেলে যেই সমস্যা টা হয়। এই কেসে PR (Per Rectal) এক্সামিনেশন মাষ্ট। অর্থাৎ পুচ্ছে অংগুলি দিয়ে প্রোস্টেট গ্ল্যান্ড টাকে এক্সাম করতে হবে। শুধুমাত্র একজন রেজিস্ট্রারের তত্ত্বাবধানে আমাদের এত স্টুডেন্ট এর ক্লাস করতে হতো, অনিচ্ছা কিংবা মাথার উপরে লাঠির ভয় না থাকলে যা হয়, এই টেস্ট টা বরাবরই এড়িয়ে গিয়েছি। ভয় হচ্ছিল, যদি এই কেসটা আমার ভাগে পড়ে এবং বিধাতার সাথে না জানি আমি কিসের শত্রুতা, হলোও তাই। তবে শত্রু তুমি, বন্ধু তুমি, তুমি আমার সাধনা, ফি আমানিল্লাহ বলে কেস দেখা শুরু করলাম।
সিনিয়ারদের শিখিয়ে দেয়া মতো, PR ফাইন্ডিংসগুলো খাতায় লিখে রাখলাম, আর গ্লাভস এ জেল মেখে রেখে দিলাম।
প্রত্যেকটা বোর্ড আশার চাইতেও যথেষ্ট ভালো করেছিলাম, অনেকটা ফাটিয়ে দিয়ে আসার মত অবস্থা আর কি, শুধুমাত্র এই কেসটা হলেই শেষ। যখন দেখলাম, আমার কেস প্রেজেন্টশন নেবে আমাদের হেডু স্যার, আনন্দে প্রায় বগল বাজাতে যাচ্ছিলাম, কারন ইন্টার্নালরা ফেল করায় না। এক্সটার্নালদের থেকে বরং বাঁচায়।
স্যার এসে খাতা নেড়েচেড়ে দেখে, PR করেছ?
জ্বি স্যার করেছি।
স্যার একটু হেসে, দেখি গ্লাভস দেখাও। স্টুল (হাগুর চিহ্ন) কই গ্লাভসে?
স্মার্ট হইলে কইয়া দিতাম, রুগী সেইইইই সক্কালেই হাগু সেরে ফেলেছে, তাই কোন চিহ্ন নাই, তবে সত্যি হইলো, রেকটাল ডিসচার্জ মার্কস থাকেই, তাই মাথাটা নীচু করে দাঁড়ায় থাকা ছাড়া কিছু করার পেলাম না।
স্যার কিছুক্ষন অপেক্ষা করে বললো, তুমি যদি সত্যি বলতে, আমি PR করিনি, আমি কিচ্ছু বলতাম না, তুমি মিথ্যা বললে ক্যান? ক্যাম্নে বলি, আমারে এমনেই শিখায় দিছে সবাই কইতে। সারাজীবন ক্লাস না নিয়া তার এহেন মাতব্বরিতে মেজাজ খারাপ হচ্ছিল, কিন্তু স্যরি বলা ছাড়া কিছু করা হলোনা। স্যারের কান পর্যন্ত আমার মিনমিনে স্যরি পৌঁছালো না।
তিনি রাগে গজগজ করতে করতে আমার খাতায় কলম দিয়েই মার্কস বসিয়ে দিলেন, এমন মার্কস যা অন্য সব বোর্ডে ফুল মার্কস পেয়েও কাভার হবার নয়। সাধারনত নাম্বার পেনসিল দিয়ে দেয়া হয়, যাতে পরে সেটা টিচাররা মডিফাই করতে পারে, চাইলে।
কিন্তু আমার কপালে কলমের কালি। 🙁
রেজাল্ট বেরুলো। এক ব্যাচ জুনিয়ার মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, আপু রেজাল্ট দিয়েছে না? কি অবস্থা?
বললাম সার্জারিতে ফেলটুস। কাঁটা ঘায়ে নুনের পুরা বৈয়াম উলটে দিয়ে বলে গেলো, মাত্র একটা?

আমাকে এভাবে ফেল করিয়ে দেয়ায় অন্য স্যারেরা খুব অসন্তষ্ট হয়েছিলেন হেডু স্যারের উপর। তিনি নাকি আমার স্যরি শুনতে পায়নি, স্যরি বললে নাকি ফেল করাতো না আমাকে। তবে আমি খুশি স্যারের উপর বদলা নিতে পেরেছিলাম। তিন মাস পর সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা দেবার সময় যখন এক্সটারনাল টিচার রা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, তোমার মত স্টুডেন্ট আগেরবার ফেল করেছিল কি করে? বোর্ডে বসা টিটো স্যার বলে উঠলেন, আর বলেন না, একজন টিচারের খামখেয়ালীপনার কারনে। হেডু স্যার মাথা নীচু করে চুপ করে বসে থেকেছিল তখন।

তিনমাস অনেক কঠিন আর ঝড় ঝঞ্ঝার সময় পার করেছি তখন, বিধ্বস্ত মানসিকতায় স্যারের কাছে আমি ঋনীও ছিলাম। শিখেছিলাম, যার যা প্রাপ্য তাকে তা দিতেই হবে, পুচ্ছে অঙ্গুলি দেয়ার হলে, তাই-ই সই।

৫০২জন ৫০২জন
0 Shares

৫৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ