হেমন্ত বন্দনা – ছত্রিশ বছর হতে চললো হেমন্ত এলোনা

১৯৮৩ সনে ছাত্রাবস্থায়ই বুঝে গিয়েছিলাম যে ব্যবসা করতে হবে আমাকে। চাকুরীতে পোষাবে না। যেমন ভাবা তেমনই কাজ। পেশা হিসেবে নিয়ে নিলাম ঠিকাদারি ব্যবসা। সবাই লেখা পড়ার পাশাপাশি পার্ট টাইম কিছু করে। আর আমি ব্যবসার পাশাপাশি পার্ট টাইম লেখা পড়া আরম্ভ করলাম।
একটাই অভিষ্ট লক্ষ্য- প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। সেই যে দৌড় আরম্ভ এখনো চলছে। সারা সময় কেটে যেতো কিভাবে কাজ পাবো, কিভাবে চলতি কাজ দ্রুত শেষ করবো, কাজ শেষ হবার পরে বিল তুলবো। এর ফাঁকে ফাঁকে পড়াশুনা। সময় কই মাস কাল এর হিসেব করা?

পড়ালেখার পাট শেষ করার পর আমাকে আর কে ফেরায়? কখন কোন ঋতু আসে তার কোন খেয়াল আর নেই। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেই মটর বাইক নিয়ে বেড় হতাম বিভিন্ন দিন বিভিন্ন সাইটে। এমনো হয়েছে, শীতের দিন কুয়াশা ভরা সকালে জ্যাকেট টুপি মাফলার গায় জড়িয়ে হেড লাইট জ্বালিয়ে ছুটছি দ্রুত, ৭০ কিলোমিটার দূরের কাজের সাইটে গিয়ে দেখতাম লেবাররা ঘুমে তখনো। শীতের সকাল ছয়টা তখন, ঘুমাবে না কি করবে? ডেকে তুলতাম তাঁদের, আজ যে ব্রিজের ফাউন্ডেশন ঢালাই, জোয়ার হবে দুপুর একটায় তার আগেই ঢালাই শেষ করতে হবে যে।

শীত নেই, বর্ষা নেই ছুটেছি এমনি করে ঝড়ের বেগে। প্রচন্ড বৃষ্টির রাত দুইটায় রেইনকোট গায়ে দিয়ে পটুয়াখালী ছুটেছি দাতে দাঁত টক টক করে আওয়াজ করতে করতে। তখন তো আর মোবাইল ছিল না যে ইঞ্জিয়রকে বলব অপেক্ষা করতে সকালে আসবো। উনি সকাল ছয়টায় ঢাকা রওয়ানা দিবেন তাই ঝড় উপেক্ষা করেই বেড় হয়েছি।

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর খুব সকালে বের হয়েছি, সাইট- অফিসের কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেছি। বাসায় ফিরে আবার নিজের অফিসে- রাত বারোটা , একটা পর্যন্ত জেগে আগামী কালের প্রগ্রাম বানিয়েছি।

বর্ষা, শীত, বসন্ত হেমন্ত আসার সময় কোথায় আমার কাছে? ঠিকাদারি ব্যবসার জন্যই ১৯৯৬ সনে আরম্ভ করলাম ব্রীক ফিল্ডের ব্যবসা। ধীরে ধীরে সাইটে যাওয়া কমিয়ে দিলাম। স্টাফদের দিয়ে সাইট মেইনটেইন করতাম।

হেমন্ত শুরু তো কার্তিক মাস থেকে। কার্তিক মাসের প্রথম দিন থেকেই ব্রীক ফিল্ডের কাজ শুরু হয়। ইট বানানোর মাঠ পরিষ্কার করা, দশ বারোটা অস্থায়ী সেড নির্মান করা, প্রায় চারশত অস্থায়ী শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা, সব কিছু নিখুঁত ভাবে সম্পন্ন করতে করতেই কার্তিক মাসের অর্ধেক শেষ। এরপর ইট বানানো, তা শুকানো, তা ইট পোড়ানো ক্লিনের মধ্যে দেয়া, ইটা পোড়ানো , ইট বেড় করে তা স্টক দেয়া, জ্বালানী সংগ্রহ করা, মাটির হিসেব করা, ইট বিক্রী করা এসব তদারকিতে চলে যেত জৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত। হেমন্ত আর আসেনা আমার কাছে গত ছত্রিশ বছর যাবত।

তারপরেও প্রানের মাঝে নিজেকেই যেন বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় ছাদ বাগান করি। প্রচুর গাছ লাগিয়ে সবুজ একটা বেষ্টনী তৈরী করেছি। সবুজের মাঝে বেঁচে থাকার ইচ্ছে যে আমার প্রবল। ফুলের উপরে শিশির কনা দেখে বুঝতে পারি শীত এসেছে প্রকৃতিতে।

আগুন, ইট, পাথরের মাঝে থেকেও চেষ্টা করি ফুল ফুটাতে। ফুলেদের সাথে হাসি আনন্দে থাকি। কথা বলি আমার নতুন সৃষ্টির সাথেই। বেশী দিন দূরে থাকলে অভিমানী ফুলেদের গায়ে মমতার হাত বুলাই। তাঁদের বলি, ইচ্ছে না থাকলেও তোমাদের থেকে দূরে থাকতে হয় মাঝে মাঝে।

শখের বসে একটি বটবৃক্ষ লাগিয়েছি আমারই ব্রীকফিল্ডের পাশ থেকে বয়ে যাওয়া শান্ত নদীর তীরে। অদ্ভুত এক অনুভুতি জাগে মনের মাঝে এই বটবৃক্ষের কাছে আসলেই।

একদিন হয়ত এখানে বসবে হরিয়াল, বক, ঘুঘু
বাবুই ও চড়ুই এর কিচিরমিচির হবে সারাক্ষণ
ফিঙ্গে, টুনটুনি, মৌটুসি,  ঠিকানা পেয়ে বাসা বাঁধবে এ বৃক্ষে
কাঠ ঠোকরা ঠক ঠক করে জানান দেবে তার অস্তিত্ব
হলদে পাখি বসবে ডালে
খঞ্জনা পাখি এসে বলবে ‘নামটি আমার খঞ্জনা’
নাম না জানা পাখিরা এসে রঙ্গিন ঠোটে ক্ষুধা নিবারণে ফল ঠোকরাবে
পরিযায়ী পাখিরা আসবে হয়ত দূর কোন দেশ হতে।

হয়ত এর নীচে বসে প্রচণ্ড গরমে কোন পথিক পাবে শীতলতা
হয়ত কোন পথিক লাল বৃত্তাকারে শুয়ে থেকে পাখির গানে ঘুমিয়ে যাবে
হয়ত বাজার বসবে এই বৃক্ষের নীচে নাম হবে হয়ত বটতলা।

পাখিরা কি জানবে তাদের এই আশ্রয়স্থল কে গড়ে দিয়েছিলো
অথবা পথিক ?

আশাবাদঃ
সবার হেমন্ত যেন আসে প্রতিবছর কাশ ফুলের নরম ছোঁয়ায়।

 

মোট পড়েছেনঃ ১,৯৩৪জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

৩৪টি মন্তব্য

  1. জীবন যার বসন্তে গড়া তার কাছে হেমন্ত ফিকে হয়ে যায়। এতো ফুলের সমারোহ, বৃক্ষের সাথে বৃত্তবন্দী আবাস আর পাখির অভয়ারণ্য গড়তে কি সবাই পারে! তাই হয়তো হেমন্ত আপনার সামনে আসতে লজ্জা পায়। উদ্যমী মন, কর্মঠ জীবনে শুধু রঙ্গীন ফুল মানায়। ঝিরিঝিরি কাশফুল, কাটা ফসলের মাঠ দেখে হঠাৎ থমকে যাওয়া পথিক হয়েছেন নিশ্চয়ই। সেটাই হেমন্তের আমন্ত্রন। আপনার নিমন্ত্রণে হেমন্ত বসন্ত হয়ে আসে।

    দারুন লিখেছেন।
    শেষমেশ হেমন্তকে কিন্তু লেখায় আনিয়েই ছেড়েছেন 🙂

    1. ঝিরিঝিরি কাশফুল, কাটা ফসলের মাঠ দেখে থমকে দাড়িয়েছি অবশ্যই, অথবা চলতি পথে মুগ্ধ নয়নে দেখেছি, ফটো তুলেছি।
      তবে ব্যস্ততায় হেমন্তের গভীরে প্রবেশ করতে পারিনি।

      সবুজকে ভালোবাসি, ডেকে আনি ফুলের দলকে আমার মনকে আনন্দ দেয়ার জন্য।

      এত সুন্দর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।
      শুভ কামনা।

  2. যাক শেষপর্যন্ত হেমন্ত বন্দনায় লেখা দিলেন!

    আসলে আমাদের এরকমই হয়। কাজের ব্যস্ততা, সংসার জীবন এসবের মাঝে হেমন্ত যে কোনদিক দিয়ে এসে আবার চলেও যায় তা কেউ কেউ বুঝতে পারলেও সবাই কিন্তু হেমন্ত বন্দনায় মেতে উঠতে পারেনা।

    আপনার কর্মব্যস্ততার ফাঁকেফাঁকে প্রকৃতিপ্রেম ভাল লাগলো। এ কারনেই আপনি চির তরুণ এইবার বুঝলাম ☺

    ছবিগুলি কিন্তু দারুণ তুলেছেন। নদীর ধারে বটগাছটার নীচে একবার বসার ইচ্ছে জাগলো মনে।

    ভালো থাকবেন ভাই।

    1. কাজের ব্যস্ততায় অনেক কিছুই আসেনা জীবনে।

      আসুন একবার আপুকে নিয়ে। বটগাছের নীচে গানের আসর বসাবো তাহলে।

      শুভ কামনা।

  3. এই লেখার মাধ্যমে আপনার সম্পর্কে অনেক জানতে পারলাম। লাইফে অনেক স্ট্রাগল করেছেন। ভালো থাকুন সবসময়। শুভকামনা ও ভালোবাসা রইল।

  4. শিরোনামে ছত্রিশ বছরে…….দেখেই মনে পড়ে গেলো “তেত্রিশ বছর কাটলো কেউ কথা রাখেনি”……..
    একদিন হয়তো এখানে বসবে ফিঙে, টুনটুনি, হরিয়াল,বক,ঘুঘু,বাবুই,চড়ুই, মৌটুসি…..ঠিকানা পেয়ে তারা বাসা বাঁধবে এ বৃক্ষে।

    জীবন জীবিকার কর্মযজ্ঞে প্রকৃতির রূপ মাধুর্য উপভোগ করার আপনি যে মস্ত আয়োজন করেছেন, তা কয়জনে করে? ব্যাবসায়ী যোগসুত্রিতায় আপনি টেনে রেখেছেন হেমন্ত বসন্ত আগমনী বার্তা পাবার অনুপম উপায়।
    লেখা খুব খুব খুব ভালো লেগেছে। আরো অনেক কিছু লিখতে চেয়েছিলাম। লিখলাম না। খুব দ্রুত শেষ করার ইচ্ছা আছে”কবিতা লেকতে পারো”
    আজো একটা লেখা লিখতে চেয়েও পারলাম না। আপনার জন্য সুস্থ্যতা, শুভ কামনা রইলো।

  5. জীবন যার বসন্তে গড়া তার কাছে হেমন্ত ফিকে হয়ে যায়।
    আপনার লেখা পড়ে, নতুন করে জীবন সাজাতে শুরু করলাম ভাইজান, জীবনে যে এত কিছুকরা যায় তা এখন বুঝলাম।
    হেমন্তের শুভেচ্ছা, হেমন্ত যেন আসে প্রতিবছর কাশ ফুলের নরম ছোঁয়ায়।
    শুভ কামনা ভাইজান 🌹🌹

  6. প্রকৃতির হেমন্ত প্রকৃতির আর কর্মের হেমন্ত অহর্নিশ। যে যাই বলুক ভাই, ক্ষুধা নিবারণ চাই। কর্মের মাঝেই থাকুন। এটাও কর্মের অংশ, তা শখে আর প্রফুল্ল চিত্তে।
    ভাল লাগল ভাইয়া।

  7. ইট পোড়ানো ক্লিনের মধ্যে দেয়া, ইটা পোড়ানো , ইট বেড় করে তা স্টক দেয়া, জ্বালানী সংগ্রহ করা, মাটির হিসেব করা, ইট বিক্রী করা,,,, মাটি পুড়িয়ে শক্তি ইটে পরিণত করা যার কাজ সেও হতে পারে প্রকৃতি প্রেমী ফুল প্রেমী। ইটের মত শক্ত হৃদয় না হয়ে জলের মতো স্বচ্ছ ফুলের মত কোমল হৃদয়।
    ভোর ছয়টা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যেও যে প্রকৃতি প্রীতি বাঁচিয়ে রেখেছেন, ইট সুরকির মাঝে প্রকৃতির ছোঁয়া এনেছেন, সবুজের সমারোহ সৃষ্টি করেছেন সত্যি দারুণ

  8. কিছুটা আমার জীবনের সাথে মিল আছে৷

    ঠিকাদার, সাইট ইঞ্জিনিয়ার এরা পাশাপাশি কাজ করে৷

    ঢালাই মেশিনের মবিল পোড়া গন্ধ, ভাইব্রেটরের আওয়াজ, ব্রিক ফিল্ডের ইট পোড়া গন্ধ এগুলো আমার অনেক দিনের চেনা৷

  9. হেমন্ত বন্দনায় নিজের জীবনের বাস্তবতার দিক সাথে ফুল ও প্রকৃতিকে নিয়ে এতো ভাবনা।
    আমি মনে করি আপনার জীবনে ছত্রিশ বছরে হেমন্ত এসেছে না হলে কি এতোটা প্রকৃতি প্রেমী আর নিজের কাজে সফল হতেন?

    সত্যিই অসাধারণ উপস্থাপনা দাদা।
    আমার কাছে বেশ ভালো লাগলো।

  10. ব্যাবসায়ী হয়েও হিসেবের বাইরে গিয়ে বটবৃক্ষ রোপণ করে পাখিদের কূজন আর ক্লান্ত পথিকের প্রতীক্ষায় থাকে যে মন, তাকে যে সব ঋতুই দোলা দিয়ে যায় গোপনে, সে আমরা ঠিক বুঝতে পারছি।
    অপূর্ব লাগলো ভাইয়া আপনার হেমন্ত বন্দনা।

  11. আমিও খুব অল্প বয়সেই পড়ালেখার সাথে সাথে ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়ি, প্রায় ৩২/৩৩ বছর ধরে নিয়ম মাফিক অফিস, পাবলিক, অফিস করেই কাটছে।
    গরম এলে বুঝি গ্রীষ্ম এসেছে, শীত করলে শীত এসেছে বুঝি, কখন হেমন্ত এলো গেলো কখনোই খেয়াল করিনি ভাইজান।

  12. একজন সফল জীবন যোদ্ধার গল্প,
    আসলে লক্ষ যেখানে নির্ধারিত- পড়াশোনা সেখানে চতুর্থ বিষয় হয়ে যায়। বিশেষ করে প্রথম থেকেই সফল হয়েছেন যারা তাদের জন্য।
    অনেক ভাল লাগল অজানা জানতে পেরে।
    আরও ভাল লাগে আপনার অনুভুতি-

    একদিন হয়ত এখানে বসবে হরিয়াল, বক, ঘুঘু
    বাবুই ও চড়ুই এর কিচিরমিচির হবে সারাক্ষণ
    ফিঙ্গে, টুনটুনি, মৌটুসি, ঠিকানা পেয়ে বাসা বাঁধবে এ বৃক্ষে
    কাঠ ঠোকরা ঠক ঠক করে জানান দেবে তার অস্তিত্ব
    হলদে পাখি বসবে ডালে
    খঞ্জনা পাখি এসে বলবে ‘নামটি আমার খঞ্জনা’

    মাটির টান, গন্ধ খুব বেশি দুরে না-
    আমার তো মনে হয় আপনার আপনার সারাটা জীবন নবান্নে কেটেছে। কষ্টের ফসল এসেছে নিয়মিত।

    অনেক শুভকামনা ভাইজান।
    সুদীর্ঘ জীবন কামনা করছি।

  13. মেইন কথা হলো গতকাল থেকে সোনেলায় কেনো লেখা আপলোড করতে পারছি না। মানে বার বার চেষ্টা করার পরও সোনেলা আমায় গ্রহণ করছে না। ব্যাপারটি বুঝতে পারছি না!!

  14. কেউ কথা রাখে না জীবদ্দশায়,
    না থাকলে, মনে করতে বয়েই গেছে;
    হেমন্ত -ফেমন্ত না আসাই ভাল, এগুলাইন দুষ্ট হয়।
    এ জন্যই আপনি ভাল আছে, সব কিছু ফকফকা;

  15. আগেই পড়া হয়েছিল । আমার কম্পিউটারের ঝামেলায় ব্লগে বেশী আসতে পারিনি। ব্লগিং করা ও বয়সের দিক দিয়েও সিনিয়র ভাইজান আপনি আপনার এ লেখাটা পড়ে ভাবলাম।সিনিয়ররা এমন চমকপ্রদই লিখেন।
    হেমন্তকে কৈ থেকে কই নিয়ে এলেন!হেমন্তকে যেন একেবারে জীবনে ধারণ করে নিলেন। ছবি ও কথায় চমৎকার হেমন্ত বন্দনা। তবে শেষে যে বটবৃক্ষ লাগানোর ছবি দিলেন কবিতায়তো সেই বৃক্ষে অনেককেই আমন্ত্রণ করলেন আমি ভাবছি শেষে না বটবৃক্ষটিতে ঘিরে জিসান শাহ মাজার গড়ে উঠে হা হা হা।তবে মনে রাখবে এ পৃথিবী আপনাকে আপনার এমন কর্মকে।
    খুব ভাল লাগল।

মন্তব্য করুন