লা বিয়েত্রা

বিষণ্ণ শুভ্রতা...
বিষণ্ণ শুভ্রতা…

খ্রীষ্টমাস ট্রি যখন সাদা বরফে ঢেকে যায়, লা বিয়েত্রা তোমায় খুব মনে পড়ে। তোমার ঠোঁটের চুরুট আভিজাত্যকে পূর্ণতা দিতো গলিপথ থেকে রাজপথ মাড়িয়ে সাদা ঘোড়ার গাড়ী। শৈত্যপ্রবাহে যখন আমার কাঠের বাড়ী ঠকঠকিয়ে কাঁপতো, তোমায় ভাবতাম আমি। কেন জানো? তোমার নি:সঙ্গ আভিজাত্যকে আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম। কখনো সাহস হয়নি বলবার;
কারণ বাবা বলতো অলক্ষ্মী আমি, আর মা অসহায় চোখে আমায় দেখতো।
তারপর যতো ধরণের অভিশাপ আছে, সবই আমার গা সওয়া হয়ে গিয়েছিলো।
হারানোর বড়ো ভয় ছিলো তোমাকে লা বিয়েত্রা, তবুও কিছুতেই পারিনি তোমাকে এড়িয়ে যেতে।
কতোবার তোমার চলার পথে দাঁড়িয়ে থেকেছি নিজস্বতা বিসর্জন দিয়ে। জানো, কতো প্রার্থনা করতাম! একটিবার যদি ঘোড়াটা তোমার থেমে যেতো!

চুরুট আমার খুব অপছন্দ, ইচ্ছে হতো ওটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এই ঠোঁট তোমার ঠোঁটে ছোঁয়াবো।
পৃথিবীতে কোথাও শান্তি নেই, যুদ্ধের সাইরেণ বাজার শব্দ শুনি কেবল। আততায়ীর পায়ের শব্দও আজ নি:শব্দ হয়ে আসে। কে জানতো একদিন আমি আর তুমি ঠিকই এক উত্তপ্ত গ্রীষ্মে ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াবো সমাজ-সংসার ভেঙ্গে! চারদিকের সবুজ আদর বিলোবে হাওয়ার দোলায় চঞ্চল পাতা উড়িয়ে, নীল ওই আকাশ চেয়ে দেখবে আমাদের এই একত্রিত হওয়ার দৃশ্যকে!! কখনোই কি ভেবেছি? ওই আকাশ জানে, দেখেছে সব—
কাঠের ঘরে শীতের কাঁপুনি, আগুণ নিভে যাওয়া, ভেঁজা কাঠ কেটে এনে শুকানোর বৃথা চেষ্টা আর,
তোমার জন্য একটুকরো প্রতীক্ষা।

বরফ গলে যখন রঙচঙে পাতাদের হাসিতে ভরে যাচ্ছিলো চারদিক, তুমি পথে পা ফেললে। সেদিন আমি তোমায় চিনতেই পারিনি, ঠিক সামনে এসে দাঁড়ালে। লা বিয়েত্রা আমি ওক গাছের শূণ্যতা মাখিয়েই তো শ্বাস নিচ্ছিলাম। সেদিন কেন দাঁড়ালে? যদি এসেছিলেই, তবে কেন চলে গেলে? আচ্ছা যুদ্ধ যারা করে, ঘরের বাইরের সকলকেই কেন শত্রু ভাবে? আমরা তো ভালোবাসার ফুল ফোঁটাতে চেয়েছিলাম! বাবা যে আমায় অলক্ষ্মী বলতো, আসলেই সত্যি।

আমার পুরোনো পৃথিবী তছনছ করে দিয়ে এখন ওই মৃত্যুপুরীতে কেমন আছো? একদিন প্রিয় বন্ধু বলেছিলো, “পেয়ে হারানোর চেয়ে না পেয়ে হারানো অনেক শান্তির।”

লা বিয়েত্রা ভালো থেকো না-ফেরার দেশে।

উড়ে যাওয়া অজানায়...
উড়ে যাওয়া অজানায়…

হ্যামিল্টন, কানাডা
২২ জুলাই, ২০১৬ ইং।

** প্রথম ছবিটি গতবছরের তুষারপাতের ভেতর তোলা।
** দ্বিতীয় ছবিটি গতকাল আমার ছেলে নভোনীল তীর্থ তুলেছে।

মোট পড়েছেনঃ ৭৮৬জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

৪৬টি মন্তব্য

  1. হারানো হারানোই, তা পেয়ে হোক বা না পেয়ে।
    সে থাকুক ভাল ওপারে, এপারের ভেজা নিশ্বাস ছুঁয়ে।

    ব্যাপ্ত যন্ত্রণা লেখার ধার বাড়িয়ে দিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে,

    1. তুষারে ঢাকা এ ছবিটি-ই লিখিয়ে নিলো এই লেখাটি।
      পেয়ে গেলে আর হারানো যায়না।
      একটা জিনিস খেয়াল করলাম দুঃখের ভাব নিয়ে প্রচুর লেখা আসে,
      কিন্তু আনন্দে্র ভাব নিয়ে লেখা খুবই কঠিন। ঘটনা কি বলুন তো? ;?

    1. সব হারানোতেই কষ্ট। কি জানি!
      দুঃখের লেখা লিখিনা মোটেও। ভালো লাগেনা আমার। কিন্তু সেদিন এই ছবি দুটো লিখিয়ে নিলো।

      ভালো থাকুন আপু 🙂

  2. তোমার নতুন লেখা গুলোর মাঝে এই লেখাটিকে সেরা লেখা হিসেবেই গন্য করলাম আমি।
    এই লেখায় নীলাঞ্জনা নীলাকে পরিপুর্ন ভাবে চেনা যাচ্ছে, কি লিখতে পারে সে।
    হাহাকারের সুন্দর উপস্থাপনা।
    শুভ কামনা।

    1. নানা এই দুঃখ-হাহাকারের লেখাটা হলো সেরা তোমার কাছে? 🙁
      এই দুঃখ রাখি কোথায়?
      ও নানা একটা রুমাল দাও, নাকের সর্দি আর চোখের জল মুঁছি। :p

      তোমার জন্য। -{@

    1. মনির ভাই আমিও মানি এ কথাটা। কোনোকিছু নিজের করে পাবার পর যদি হারিয়ে যায় তখন আফসোস কাজ করে কেন পেয়েছিলাম! এই কথাটা আমার বন্ধু বলেছিলো অনেক বছর আগে। সেই লাইনটাই এখানে লিখলাম।

      হুম লা বিয়েত্রা ভালো থাকুক।

    1. লা বিয়েত্রা শব্দের অর্থ নেই। এখানে আমার এক ক্লায়েন্টের নাম লা বিয়েত্রা। তবে স্পেনের একটি জায়গার নাম লা বিয়েত্রা।

      আপনাদের ভালো লাগা আছে বলেই তো এখনও লিখতে পারি। অসংখ্য ধন্যবাদ।

  3. সিগারেট আমারও খুবই অপছন্দ।
    পেয়ে হারানোর ব্যাথা সত্যি অনেক। সামনে এসেই চলে যায়, অজানা থেকে অজানার পথে।
    লেখাই বলে দেয় তোমার লেখা।
    অনেক শুভেচ্ছা নিও।

    1. মৌনতা আপু সিগারেট শুধু না, যে কোনো নেশাই আমার কাছে অপছন্দ। সে চা কিংবা কফি হলেও।

      ইস লা বিয়েত্রা বলে কেউ যদি থাকতো, ইস!

      ভালো থেকো তুমি।

    1. এতো ভালো লেগেছে? সত্যি আমি কৃতজ্ঞ।
      চেষ্টা করবো যেনো সামনের লেখাও আপনাদের সকলের মনের মতো হয়।

      ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য।

  4. চারদিকে এমনিতেই কেবল হাহাকারের ধ্বনি, এই কবিতায়ও তার প্রতিধ্বনি দেখছি। 🙁
    এতো হাহাকার কেনো?
    পেয়ে হারানো হোক আর না পেয়ে হারানো – কোনো হারানোই কাম্য নয়। 🙁

    1. নন্দিনীদি এই হাহাকারের কারণ ওই বরফে ঢাকা গাছের ছবিটি। কি হাহাকার না গাছটার দিকে চাইলে?
      তবে এমন হাহাকার এ জীবনে নেই।
      আর ঈশ্বর যেনো এমন জীবন কাউকে দেয়ওনা।

      ভালো থাকুন।

  5. লা বিয়েত্রা এপাড়েও পেয়েছে, ওপাড়েও পাচ্ছে উদ্দাম একজনের ভালোবাসা, তবে অলক্ষ্মী সে কী করে হলো!! এমন করে ভালোবাসা যে পায়, সে ওপাড়েও ভালো থাকে, উড়ে যাওয়া অজানায়।
    কী অদ্ভূত সুন্দর প্রথম ছবিটা, আমি এখনো বরফ দেখতে পারলাম না, অথচ মাত্র ২ ঘণ্টার পথ দূরেই বরফের পাহাড়। ইচ্ছ করে ভীষন, এমন পবিত্র শুভ্রতা দেখলে আরো আরো ইচ্ছে করে। অনেক ভালো লিখেছ নীলাপু। -{@

    1. বরফ দেখোনি, বেশ হয়েছে। আর আমরা বরফ দেখতে দেখতে অসহ্য। গ্রীষ্মকাল চলে যাচ্ছে। আর মাত্র কিছুদিন। 🙁
      প্রথম ছবিটা গতবছর তুলেছিলাম। আর নীচের ছবিটা আমার ছেলে তুলেছে।
      তবে শোনো আফসোস রেখো না, বেড়িয়ে এসো। দেখে এসো বরফের পাহাড়।

      অফুরান ভালোবাসা। -{@

  6. যা পাওয়ার পরে হারিয়ে ফেললাম তা অনেক কষ্টের। আর না পেয়ে হারানো সেটা কি! যেটা পাইনি সেটা পাইনি!
    লা বিয়েত্রা একা এতো ভালোবাসি নিয়ে কি করবে? ভেবেই পাচ্চি না!

    1. পিচ্চি আপু এতো ভালোবাসা নিয়ে স্বর্গে নাকি নরকে আছে, কে জানে!

      না পেয়ে হারানো অবশ্যই আছে। যেমন ধরুন ফুচকার ছবি দেখছেন, ইচ্ছে করলেও খেতে পারছেন না। আবার ফুচকা চোখের সামনে কিন্তু কেনার টাকা নেই, নয়তো পেটের অসুখ। এবার বুঝেছেন? 😀

  7. বারবার ছবি দুটোর দিকে তাকিয়েছি। খুব সুন্দর ছবি। বেশ কিছুদিন পরেই আপনার লেখা আবার পড়ার সৌভাগ্য হলো। আর এই সৌভাগ্যের তৃপ্তি পেলো এই অধম পাঠক।

    আবৃত্তি করার কণ্ঠ নেই, তবে যদি লেখাটি কেউ আবৃত্তি করে শুনাতো তাহলে আকাঙ্খার পূর্ণতা পেতো। তেমনি একটি হাহাকার জাগানো লেখা। চমৎকার।

    1. আবৃত্তি করতে পারেন কি পারেন না, সেটা তো শ্রোতা মানে আমরা বলবো। আগে তো শোনান।
      আপনি যদি নিজেকে উত্তম পাঠক না বলেন, সমস্যা নেই। আমরা আছি না বলার জন্য? আপনার মতো উত্তম লেখকের থেকে উত্তম মন্তব্য পাওয়া কি কম কিছু?
      শুনুন লা বিয়েত্রা আপনার আবৃত্তি শুনতে চায়, নইলে ভুত হয়ে আসবে কিন্তু। 🙂

      1. আজগুবি কথা সব আপনার। আমি পারলে আমাকে বলতেও হতো না। কেউ একজন করুক সেটা মনে প্রাণে চাচ্ছি। ভুতে ধরলে ঘাড় মটকাবে। আপনিই না হয় একবার ট্রাই করুন প্লিজ।

    1. আমরা মানুষরা জেনে-বুঝেই দুঃখ গ্রহণ করি কিন্তু। আর এতেই এক ধরণের সুখ মেলে। দুঃখ-বিলাস শব্দটার জন্ম এ কারণেই। আমার বুড়ো (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) লিখেই তো গেছেন,
      “আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান।”

      আপনার বিরহে পদ্ম ফুঁটুক।

  8. নীলাদি কত অদ্ভুত সুন্দর করে লিখেছেন এই লেখা। বারবার পড়েও মনে হয় আবার পড়ি। এমন লেখা প্রিয়তে না নিয়ে পারি?
    আমাকে তো ভুলেই গিয়েছেন 🙁

    1. ভাভু বাইয়া আপনাকে ভুলবো, সে কি সম্ভব!!!
      যে মানুষটা সবাইকে এতো হাসায়, আর যার লেখা পড়লে আমার মুখে হাসির ফোঁয়ারা ছোঁটে। তাকে কি করে ভুলবো?

      লেখাটার জন্ম উপরের ওই দুটো ছবি দেখেই কিন্তু। বুঝেছেন? 🙂 -{@

  9. লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার দিন থেকে কয়েকবার পড়েছি। কয়েকবার পড়ার পিছনে কারনটা ভালো লাগা-
    “পেয়ে হারানোর চেয়ে না পেয়ে
    হারানো অনেক শান্তির।”
    কথাটিও।

    1. এই একটি লাইনই ভালো লাগলো? তবে আমিও কথাটি বিশ্বাস করি।
      হাহাকারধর্মী লেখা লিখি কম। কিন্তু ছবিটা লিখিয়েই নিলো।
      আর আপনাদের সকলের মন খারাপ করিয়ে দিলো। 🙁

      ভালো থাকুন। 🙂

  10. আপনি যতই এড়িয়ে চলুন না কেনো, মন খারাপ করার মতো লেখাগুলোতে শক্তিশালী কিছু বার্তা থাকে যা আমাদের ভাবতে,ভাবাতে বাধ্য করে।

    1. মন খারাপ করা লেখা সহজে লিখিনা আমি। কিন্তু কিছু কিছু ছবি আমায় লিখিয়ে নেয়।
      আপনার ভালো লেগেছে কষ্টের লেখাটি, ভালো লাগলো।
      ধন্যবাদ। 🙂

  11. তোমার কি এখনো আকাশ দেখতে ইচ্ছা করে?
    আমার কিন্তু ইচ্ছা করে, কিন্তু পারি না। তুমি হীনা একটা আমি কি করে আকাশ দেখবো?

    ভালো লাগলো দিদি, শুভ কামনা।

  12. কখনোই কি ভেবেছি? ওই আকাশ জানে, দেখেছে সব—
    কাঠের ঘরে শীতের কাঁপুনি, আগুণ নিভে যাওয়া, ভেঁজা কাঠ কেটে এনে শুকানোর বৃথা চেষ্টা আর,
    তোমার জন্য একটুকরো প্রতীক্ষা।

    আসলেই পেয়ে হারানোর ব্যথা বড় কঠিন। হারোনার ব্যথা, সঙ্গে যুক্ত হয় স্মৃতির দাহন। বড়ই ব্যথা! ব্যথা আর ব্যথা।

    1. লেখাটার কৃতিত্ত্ব পুরোটাই ওই বরফে ঢেকে যাওয়া ছবিটির। গত বছর যখন এই ছবিটি সেলক্যামেরা বন্দী হয়, মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম তোলার আগে। পেয়ে কখনো হারাইনি, আবার যা হারানোর সে হারাবেই। তাই চলমান এ জীবনে আফসোস নেই। হারানো বলে কিছু নেই, সাথে সাথেই কতো কিছু পেয়ে যাচ্ছি আমরা সবাই। কেউ খবর রাখে, কেউ না।

      ধন্যবাদ সুন্দর মন্তব্যের জন্য। ভালো থাকুন।

      1. হয়তো পেয়ে হারানো বলে আমার কাছেই কিছু আছে। কষ্টের যে প্রাপ্তি তা যদি হারিয়ে যায় হুট করে তবে ব্যথা লাগবেই আপু।

        একটা চোখ হারিয়ে লক্ষ কোটি টাকা পেলেও চোখ হারানোর ব্যথা কিন্তু থাকবেই আপু।

      2. আসলে সহজ করে সহজভাবেই রাখি পাওয়া এবং না-পাওয়া।
        বিশ্বাস করার কথা না, তবে আমি এ জীবনে কখনো আফসোস করিনি।
        এক্সিডেন্ট করার পর নিজেকেই বলেছি এর থেকেও খারাপ কিছু হতে পারতো।

মন্তব্য করুন