কাগজের ফুল

ভোরের শিশির ৪ নভেম্বর ২০১৫, বুধবার, ০৯:৩৭:৫৮পূর্বাহ্ন গল্প ১৫০ মন্তব্য

ঘুটেকুড়োনির মেয়ে। মা’র চেহারায় বনেদীয়ানা ছিল বলে সবাই ভেবেছিল মেয়েও অমন হবে! কথায় আছে

‘ছেড়া কাঁথায় শুয়ে চাঁদ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখতে নেই’,

আর তাই তো মায়ের কিচ্ছুটি না পেয়ে বাপেরটুকুই পেলো- গরীবিয়ানা! সবাই ভাবছেন

‘মেয়েটির কপাল নিশ্চয় খারাপ ভবিষ্যতে’? না! মোটেও তা না। বনেদী চেহারা মা’র গর্ভে যে সন্তান আর গরীবের গরীব বাপের যে গুণ পায় তার ভবিষ্যৎ সব সময় খারাপ হয় বা হবে কেউই বলতে পারে না যদি তাঁদের জীবনাচরণ আর পরিবেশ তাঁদের মতোই হয়।

হ্যাঁ, নাম তার ‘ছেলিনা’ একেবারে সাদাসিধে একহারা গড়নের ছেলিনা। বাবা মা মারা যাওয়ার পর সহায় বলতে পেয়েছিল তার পরিবেশ আর পরিবেশের অদ্ভুত সারল্যতা। ছেলিনাদের কাছে অর্থের মূল্য নেই। যে যা পারে তা করেই বিনিময় প্রথার মাধ্যমে নিত্য কাজ সারে, কাঁথা হতে মাথার তেল পর্যন্ত সবই এই বিনিময় প্রথার মধ্যেই। ‘অতি’ বলে কিছু নেই ওদের কাছে, যা আছে সবই সবার; এদিক আর ওদিক করেই।

 

যাই হোক,

এই হচ্ছে ছেলিনা ও তার সবাই। নিজে নিজেই বেড়ে ওঠে সে মায়ের মতো ঘুটের কাজ নিয়ে। সপ্তাহান্তে সবার সাথে সেও হাটে যায়, ঘুটের কাজের বিনিময়ে নিজের যা না হলে নয় তাই নিয়ে চলে আসে। অবশ্য ছেলিনা এতোই  সাধারণ যে তার জন্য যে আলাদা কিছু লাগবে বা লাগতে পারে তাও কেউই ভাবেনি সেদিন পর্যন্ত যেদিন সে ‘অতি’ কিছুতে ছেলিনা মুহুর্ত সাজিয়েছিল।

আবারো ভাবছেন কাহিনী কি? না, কাহিনী নয়। বরং ছোট্ট একটি গল্প-

হাটে যেতে সবাইকেই নদী পার হতে হয়, যেদিন যার কিছু থাকে না সেদিনও সে নদীর বালি-মাটি কিংবা এক ডুবে যা হাতে আসে তাই নিয়েই চলে যায়। হাটটিও ছিল বেশ সাধারণ, অসাধারণত্ব বলতে অন্যপারের হাট মাত্র। একেবারে নদীর পাড় ঘেষেই বসতো সে হাট। হাটে যাওয়া আসা ছিল সবার কাছেই স্বাভাবিক আর হবেই না বা কেন? এমন কিছুই যে হতো না যাতে কেউ কিছু ভাবতো। তবে একদিন, একদিন কেউ কিছু একটা ভেবেছিল আর এ’জন্যেই ছেলিনার গল্প বলা। ঘুটে কুড়ে আর কতোই বা চলে দিন! সব দিনতো আর ঘুটে কুড়িয়ে পাওয়া যেতো না, তবু সবার সাথে ছেলিনার হাটে যাওয়া চাইই চাই।

সেদিনও তাই। ছেলিনা যায় হাটে আর নিয়ে আসে বাঁশের ঝুড়ি। দোকানিকে বলেছে এই ঝুড়ি ভর্তি করেই ঘুটে দিয়ে যাবে পরের বার। কিন্তু পরেও তা আর হয়ে ওঠে না ছেলিনার। বেশ ক’বার এভাবেই চলে। দোকানিও কিছু বলে না, শুধু খুবই সাধারণ ছেলিনার খুবই সাধারণ চোখের সততা আর সরলতায় আস্থা রাখে।

এদিকে ছেলিনা নিজেই মরমে মরে, ভাবে ‘দোকানি কি ভাবছে! দিন তো অনেক পার হলো কিন্তু ঝুড়ির বিনিময়ে কি দেবো! এই মৌসুমে তো কিছুই নেই আমার!’ তবু ছেলিনা ভেবে ঠিক করে সে বিনিময়ের মূল্য শোধ করবে আর দুই হাট পরেই তৃতীয় হাটে। তাই সে পরের হাটে গেলো সেই ঝুড়ি হাতে নিয়ে; খালি ঝুড়ি। হাটে গিয়ে সে ঝুড়ির বদলে নেয় পুরনো কাগজ। সেই ঝুড়ির দোকানিকে বলে যে  এই পরের হাটবারে পরের হাটে সে আসবে তার কাছে।

-এবারো ভাবছেন পুরনো কাগজ! জ্বী, পুরনো কাগজ, কেউ কুড়িয়ে এনেছিলো কার না কা লাগে তাই আর ছেলিনা তাই নিয়ে যায়।-

পুরো সপ্তাহ জুড়ে ছেলিনা সেই কাগজ নিয়ে কাজে লেগে যায়। আশেপাশের সবাই তেমন কিছুই ভাবে না এ নিয়ে, কারণ আর কিছুই নয় বরং এটাই সবার সারল্যতা।

৫ দিনের মাথায় ছেলিনা কাগজ দিয়ে তার কাজ শেষ করলো। কাজ শেষ ছেলিনা ভাবলো ‘এ তো আরো পুরনো দেখাচ্ছে!’ যেই ভাবা সেই কাজ- নতুন করি তবে! (নদীর এই পাড়ের কেউ মনে হয় এই প্রথম ভাবলো!) সে গেলো সবচাইতে পুরনো অথচ শক্তপোক্ত ঘরের দুয়ারে যেখানে আজ আর কেউই থাকে না। সেই শক্ত ঘরের মাটি কে কবে চুন দিয়ে লেপেছিলো কেউই জানে না তবে চুনের দাগ বেশ আছে। এই ঘর নিয়ে আরো গল্প মুখে মুখে, এই ঘর নাকি আদিকালে কোন এক আদিবাসী মোড়লের। ছেলিনা সেই ঘরের মাটি খুবলে নিয়ে আসে সাথে করে। শুরু করে রোদের মধ্যে পাথরে সেই শক্ত মাটি ঘষা। মাটি ঘষে সে চুন আলাদা করবে! অনেক ঘাম আর সময়ের বদলে (প্রকৃতিও এখানে বিনিময়প্রথা চালু রেখেছে!) ছেলিনা পেলো কিছু চুন তাও কাদাটে। সেই চুন-মাটির দলা নিয়ে ছেলিনা তার বানানো ‘পুরনো কাগজ’র কাজে ধীরে ধীরে লাগাতে থাকে।

হাট পেরিয়ে হাটের বার চলে আসে আবার। দুই হাটের পরে তিনের হাটবার। ছেলিনা সেই তার কাজ নিয়ে যায় সবার সাথে অন্যপাড়ে হাটে। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার এই পাড়ের মানুষ ভাবে ‘ছেলিনা এ কি করছে!’। ফুরফুরে মন নিয়ে ছেলিনা যায় হাটের সেই ঝুড়ি দোকানির কাছে আর যেতেই বলে ‘এই নাও ঝুড়ির বদলে কুঁড়ি, ফুলের কুঁড়ি’! দোকানি হা’করে চেয়ে থাকে ছেলিনার দিকে আর বলে ‘এ নিয়ে আমি কি করবো?’। ছেলিনা হেসে উত্তর দেয় ‘যত্ন করে বানিয়েছি কাগজের ফুলের এই কুঁড়ি, আমাদের সেই পুরনো ঘরের চুনমাটি দিয়ে নতুন করেছি। নিজের কাছে রেখে দাও তবে জলে ভিজিয়ো না’। দোকানি বলে ‘এই দুই হাট জুড়ে এই করলে শুধু ঝুড়ির জন্য!’। ছেলিনা মুচকি হেসে বলে ‘আর তো কিছু ছিলো না আমার, ঝুড়ির দামে কাগজ এনেছি, মনের দামে সাজিয়েছি। আর তো কিছুই নেই আমার!’ দোকানি আর কিছুই বলে না। ছেলিনার সরলতা আর মনের ভাব বুঝতে পেরেই দোকানির চোখে জল চলে আসে। ছেলিনা এই চোখের জল দেখে জানতে চাইলো ‘খারাপ লেগেছে! ভাল হয়নি বুঝি! চোখে জল কেন?’ দোকানি নিজের চোখের জল আড়াল করতে সেই ফুল ধরা হাত নিয়ে গেলো চোখের জল মুছে নিতে। ঠিক তখনই ছেলিনা চেঁচিয়ে ওঠে ‘ও দোকানি, ও কি করছো! চোখে লাগবে তো!’ কিন্তু ততোক্ষণে যা হবার হয়ে যায়, দোকানির চোখে লেগে যায় সেই চুন লাগানো কাগজের ফুলের পাঁপড়ি আর সাথে সাথেই চেঁচিয়ে ওঠে ‘আমি দেখতে পাচ্ছি না তোমাকে ছেলিনা!!!!!!!!’

তারপর?

তারপর শুধু  দু’লাইন এই গল্পের-

ছেলিনা মনের যন্ত্রণায় এক ছুটে হারিয়ে যায় নদীর তীর ঘেঁষে, সেদিনের পর থেকে কেউই দেখেনি তাকে! আর দোকানি চোখে চুন লাগায় অন্ধ হয়েও মনের টানে ছেলিনা খুঁজে চেঁচিয়ে, বলে ‘ছেলিনা, একবার কথা বলো’ কিন্তু ছেলিনা এতোই সাধারণ ছিল যে দোকানি আলাদা করতে পারে না কাউকেই- কে ছেলিনা নয় আর কে ছেলিনা, ভাবে এই তো ছেলিনা!।

সেই থেকে সেখানে আর যাই হোক কোন কিছুর বিনিময়ে ফুল দেওয়া বা নেওয়া সবাই বন্ধ করে দেয় আর বলে-

‘বলেছিল সে মিষ্টি হেসে
আর যাই কর তুমি ভুল করোনা
কারো হাত থেকে তুমি ফুল নিও না
ফুল থেকে ভালবাসা হতেও পারে
ভালবাসা হলে নাকি কষ্ট বাড়ে’

 

পুনশ্চঃ অরুনি মায়ার একটি পোস্টে আমার মন্তব্যের জবাবে বলেছিলো-

“বলেছিল সে মিষ্টি হেসে
আর যাই কর তুমি ভুল করোনা
কারো হাত থেকে তুমি ফুল নিও না
ফুল থেকে ভালবাসা হতেও পারে
ভালবাসা হলে নাকি কষ্ট বাড়ে”

আপনার ঐ মন্তব্য জবাবে অনুপ্রাণিত হয়ে এমন করে ভাবা। আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা ভাবানোর জন্য। ধন্যবাদ।

 

 

২৫৪২জন ২৫৩৯জন
0 Shares

১৫০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ