“ভুতের সাথে এক রাত্রী”

মনির হোসেন মমি ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার, ১২:৩৯:৩৩অপরাহ্ন গল্প, বিবিধ ২৪ মন্তব্য

আমি যে কেমন মানুষ আমি নিজেই জানি না।জীবনের এ পড়ন্ত বেলায় বুঝি না কোন ভাল মন্দ,বুঝি না ছল-চাতুরীঁ,মনে নেই কোন ডর-ভয়,নেই কোন বিশ্বাসে আস্তা অবিশ্বাসে ঘৃণা;কেবলি মনে হয় এ জীবন কিছুই নয়রে পাগল হবে যখন সাঙ্গ রঙ্গ এ মেলা।এ একটা বয়সে মনে হয় সবারই এমন মনে হয়,সব কিছুইতে কেবলি অসার ভাবা হয়।তবে ছোট বেলা মানে শিশু কিশোর কালের জীবনটাই বোধহয় জীবনের চরম স্বার্থকতা।নেই চিন্তা নেই,নেই ভাবনা,নেই জীবনের হায় হুতাস।যাই চাই তাই পাই সামর্থ্যের নেই ভাবনা।তবে সেই অপরিপক্ক জীবনে থাকে ভয়,থাকে রোমাঞ্চ,থাকে রিভেঞ্জের স্প্রিহা।সেই সময়টার কিছু ভয়ংকর স্মৃতি আজও আমায় ভাবায় সত্যিই কি সেদিন এই আমি ছিলাম?সত্যিই কি সেই সময় আমি এতোটা ভয় পেয়েছিলাম যা বড় হবার পর মামা-মামী বলতেন।…তুইই কি এতো ভিতু ছিলি?

মামার সাথে কিছু ভয়ার্ত ঘটনা যা আজ স্বপ্ন বলে মনে হয়।
ভুতের সাথে এক রাত্রী
কথায় আছে মামা ভাগ্নে যেখানে বিপদ নেই সেখানে।তাইতো রাত তখন এশার আযানের সময়।গ্রামের রাত সন্ধ্যা হলেই রাজ্যের অন্ধকার নেমে আসে।গ্রামের সহজ সরল মানুগুলো বিল হাওরে সারা দিন হার ভাঙ্গা খাটুনির পর,পরদিন পাখি ডাকা ভোরেঁর স্বাক্ষী হওয়ার আশায় সন্ধ্যায় নাক ডেকে ঘুমায়।মামা আমাকে রাত্রীর পূর্বেই জানিয়ে ছিলো,,,আমি যখন সিস দিব তুই ঘর হতে চুপি চুপি বের হয়ে আসবি।
যেই কথা সেই কাজ।সময় মতন সিস দেয়ার শব্দ পেয়ে ঢালাই ঘুমানো এক এক করে সবাইকে ডিঙিয়ে নিঃশব্দে বের হয়ে এলাম।মামা বাহিরে টর্চ লাইটের আলো এ দিক সে দিক মেরে আমাকে নিয়ে চলছেন গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে।শীতের শিশিরে ভেজাঁ ঘাসগুলো যেন আমার পা ধুয়ে দিল।আশ পাশে ঝি ঝি পোকার ডাক,কখনো কখনো শিয়ালের ভয়ার্ত ডাক মনে ভয় ডুকিয়ে দেয়।মামা অভয় দিয়ে বলত…ওরে ভয় পাইসনা আমিতো আছি।কিছু দূর এগিয়ে আমরা ছোট একটি নৌকায় উঠলাম।নৌকা প্রবল গতিতে চলছে।মামা আমাকে তার হাতের টর্চ লাইটটি দিয়ে বলল,গতির সামনে লাইট মারতে।শীতে ঝড়োসরো হয়ে বসে বসে এদিক সেদিক লাইট মারছিলাম।নৌকা শাপলা শালুখ ডিঙিয়ে দ্রুত চলছে।লাইটের আলোতে জলে কখনো কখনো কিছু একটা লাফ দিতে দেখে চমকে উঠি।যতক্ষণ লাইট জ্বলে ততক্ষণই পৃথিবী দেখতে পাই।এমনি এক কোয়াশাঁ ছন্ন পরিস্থিতিতে মামা জলে টলটল নীরব এটি স্থানে নোংঙর ফেলালেন,মানে তার লম্বা কঞ্চি বাশের বৈঠাটা জলের তলে মাটিতে গেথে স্থির করলেন নৌকাটাকে।তার পাশেই বিশাল বিল।কোয়াশারঁ ঘনত্বে বিলের আশ পাশে কোন ঘর বাড়ী দেখতে পাচ্ছিলাম না।

আমি চারদিক তাকাচ্ছিলাম।কিছুই দেখতে পাচ্ছি না কোয়াশারঁ চাদরেঁ ঢাকা পৃথিবীর পূর্ণিমা চাদেরঁ সৌন্দর্য।মামা আমার হাবভাব দেখে বলল।…কিরে ভয় লাগছে?ভয়ের কিছুই নাই…তবে মাঝে মাঝে তোর উপর দিয়ে ভুত-পেত্বী ওড়ে গেলেও তোরে কিচ্ছু কইবো না।আমিতো মামার কথা শুনে আরো ভয় পেয়ে গেলাম।….আরে ভয় পাইস না তোর মামা থাকতে কে আছে ভাইগনারে ছোঁ মারে।
মামা নৌকার মাচার নীচে রাখা মাছ রাখার একটা ঢুলি বের করে বললেন,নে যা মাছ উঠবে এখানে রাখবি।খবর দার ভুলেও ঢুলির মুখ খোলা রাখবি না এই ল এই গামছা দিয়া সব সময় ঢেকে রাখবি যাতে ভুত-পেত্বী নিতে না পারে।মামার এমন কথায় ভয়ে প্রায় কেদেই দিলাম।…মামা তুমি না কি কও যে….।কেন,এমন কথা হুনিস নাই,,,,বিলে মাছ ধরতে এলে বেখেয়ালে থাকলে ভুতেরা সব মাছ খাইয়া লায়?…হুনসিতো তয় এখানেও কি আইবো নি!মামা যখন বুঝতে পারল আমি খুব ভয় পেয়েছি তখন সে আবারো অভয় দিল,,,,,আরে ধ্যাত সব মিছা কথা।বলে জলের চার পাচ দিকে চার পাচটা বড়শি ফেললেন।প্রথম কয়েক মিনিটে বেশ কয়েকটা বড় ছোট মাছ ধরে ফেললেন।আমি আনন্দে মাছগুলো বড়শি হতে ছুটিয়ে ছুটিয়ে ঢুলার ভিতর ভরে ভেজাঁ গামছা দিয়ে ঢেকে রাখছি।কিছুক্ষণের মধ্যে এতো মাছ বড়শিতে ধরা হল যে আমি অবাক হচ্ছি।…মামা এতো মাছ বড়শিতে ধরা পড়ছে,,,তুমিতো দেখছি প্রতিদিন এমনি ভাবে মাছ ধরো তাই না?…আরে না আজকে মনে হয় ওদের ভাগ দিতে হবে তাই ওরাই সহযোগিতা করছে।আমার কৌতুহল হল…ওরা কারা?,,,ওরা মানে…!!!মামা আমার ভয়ার্ত চোখের দিকে তাকিয়ে কথাটা থামিয়ে দিল।…থামলে কেন?বলোনা ওরা কারা?
শেষ পর্যন্ত মামা আমার প্রশ্নের কোন উত্তর দিলেন বরং সে আমার কথাটা এড়িয়ে আমাকে মাছে ভর্তি একটি ঢুলা সযত্বে অন্যত্র সরিয়ে নতুন আরেকটি ঢুলা নিতে বললেন।আমি তাই করলাম।মাছ ভর্তি ঢুলাটি নৌকার এক পাশে রেখে অন্য ঢুলা রেডি করে বসে আছি।এর মাঝে চোখে ঝিমুনি আসে।বেশ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ঘুমালাম।মামাও ডাক দিলেন না।নাহ্ এতো ভয়ার্ত পরিবেশে ঘুম এলো না।চোখে জলের ছিটে দিতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম নৌকায় রাখা মাছ ভর্তি ঢুলাটা নেই।আমিতো হতভম্ভ!মামাকে বলাতে মামাও যেন কিছুই জানেন না।উল্টো আমাকে শাষালেন…নাহ্ তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না দিলিতো সব গুলো মাছ ভুতের পেটে।মামার এমন কথা শুনে আমি আরো ভয় পেলাম।এরই মধ্যে হঠাৎ মামা আমাকে জলে ফেলানো বড়শির সিপগুলো ধরতে বললেন।আর বললেন জলে সিপে বড়শিতে মাঝে মাঝে লাইট মেরে মাছ আটকে কি না দেখতে বলে নৌকা হতে এক লাফে বিলের দৌড় দিলেন।এ ভাবে একা আমাকে রেখে হঠাৎ মামা চলে যাওয়াটা আমার মনে ভয়ের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিল।মামাকে শত ডাকাডাকিতেও সে থামল না।বলল এইতো আমি আসছি….।ভয়ে আমার হাত পা কাপা শুরু হয়ে গেল।আবারো মামাকে দেখার চেষ্টা করছি।ততক্ষণে মামা চোখের আড়ালঁ হয়ে গেল।তবে কূয়াশারঁ চাদরেঁ ঢাকা বিলের মধ্যে কিছু আগুনের স্ফুলিঙ্গের হাওয়াই নড়াচরা আমাকে আরো ভাবিয়ে তুলে।আবারো লক্ষ্য করলাম বিলে কি যেন ধস্তাধস্তিতে মত্ত।মনে মনে ভাবলাম মামা হয়তো কো ভুলেরঁ সাথে যুদ্ধ করছেন।

ঘন কোয়াশাঁ ভেদ করে কিছুক্ষণের মধ্যেই মামা ফিরে আসেন।আমার মন যেন একটু শান্তি পেল।ফিরে যখন এলেন তার শরির কদামক্ত দেখে আবার ভয়ও লাগছে।সত্যিই এটা মামা।তাই মামা আসার সঙ্গে সঙ্গে তাকে একটা চিমটি দিলাম।মামা রেগে গিয়ে,বললেন..আরে বোকা আমি ভুত নই।মামা নৌকায় উঠে বৈঠা হাতে নিয়ে বললেন,তাড়াতাড়ি বড়শিগুলো তুলে ফেল বাড়ী চলে যাব।আজ আর মাছ ধরা হবে না।আমিও যেন তাই ভাবছিলাম।মনে শখ ছিলো।বাপের জন্মের শখ মেটালাম এবার ভালই ভাল বাসায় যেতে পারলেই হল।

বাসায় গিয়ে দিলাম একটা লম্বা ঘুম।ঘুম থেকে উঠেই মাথা নষ্ট।গতরাতের কিছু ঘটনার রহস্য আমাকে জানতেই হবে।তা না হলে ঢাকায় গিয়েও শান্তি পাব না।মামার খোজঁ নিয়ে জানতে পারলাম মামা গঞ্জে গেছেন।ফিরতে ফিরতে বিকেল হবে।অপেক্ষার প্রহর শেষে মামা এলেন।এলেন।মামাকে জিজ্ঞাসা করাতে প্রথমে অনিহা জানায় বলে,,,পরে বলবোনে।আমি নাছোরবান্দা তার কাছ হতে উত্তর বের করতেই হবে।
প্রথমত মাছ ভর্তি ঢুলিটা উদাও এর আসল রহস্য কি?
দ্বিতীয়ত মামা যখন দৌড়ে বিলের দিকে গেলেন তখন কোয়াশাঁ ছন্ন বিলে আগুনের কুন্ডলির খেলা এবং ধস্তাধস্তির পর মামার কাদামাটি শরির অক্ষত অস্থায় কি ভাবে ফিরে এলেন?এ কথাগুলোর সঠিক উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমার মন শান্ত হচ্ছে না।অবশেষে মামা আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন।সে আমার মামাতো ভাইকে ডাকলেন।এরই মধ্যে মামার এক বন্ধুও এলেন বাড়ীতে।মামা আমাদের সবাইকে নিয়ে উঠোনেতে শীতল পাটি বিছিয়ে বসলেন।
মামা ভুত সম্পর্কে লম্বা কিচ্ছা গাইলেন।তার সার মর্ম হল দুনিয়াতে ভুত-টুতের কোন অস্তিত্ব নেই।সবিই মানুষের সৃষ্টি।মনের দিক ভ্রম।শাক চুন্নি,ব্রহ্ম দৈত্য,মামদো, গেছো,পেতনি।জানোত এদের অশরীরী ঠিকানা কোথায়?বেলগাছ,শেওরা গাছ,তেঁতুল গাছ।তাল গাছও ভূত থাকে।সত্যি বলতে কি আগে গ্রামগঞ্জে শৌচাগার বলতে সবাইকে মাঠেই যেতে হত।রাতের অন্ধকারে এই সুখ ক্রিয়া কর্মটি সারতে বেলগাছ বা তাল গাছের তলায় বসলে বিপদ তো মাথায় চড়ে বসবেই।তাই না! এইজন্য গুরু জনদের মানা থাকে এইসব গাছের তলায় সুখ ক্রিয়া না করার।তবে জ্বীন বলে এখনো আছে।এরপর আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিলেন।
প্রথম প্রশ্নের উত্তর ছিল…মাছ ধরার একটা সময়ে আমার চোখে মুখে ঘুম ভর করেছিলো ঠিক সেই সময় আমারি এক মামাতো ভাই এসে মাছ ভর্তি ঢুলিটা নিয়ে যায়।পাশে বসা মামাতো সেই ভাইটি মাথা নেড়ে হ্যা জানালো।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর ছিল।বিলে কোয়াশারঁ মাঝে যে দুটো আগুনের কুন্ডলি দেখেছি তা ছিলো মামা এবং তার বন্ধু দুজনে তখন সিগারেট পান করছিলেন।আর মামার সাথে ধস্তাধস্তি ছিলো,,,একটি গরুকে বদ করা।বলতে পারো এতো রাতে সেখানে গরু এলো কি করে?সকালেই বিলে গরু বেধে বন্ধু চলে গিয়েছিলো হাউজিং মানে জুয়া খেলতে।ভুলে গিয়েছিল গরুটির কথা।যখন মনে পড়ে ততক্ষণে অনেক রাত।এদিকে গরুও যেন কাউকে চিনতে পারছিলো না তাই তাকে বশ করে বন্ধুকে সহযোগিতা করা।পাশে বসা বন্ধুটি মিটমিট করে হাসলেন।

সুতরাং;
ভুত বলে কিছুই নেই…
মানুষের চেয়ে বড় ভুত পৃথিবীতে আর একটাও নেই”

১০৮৪জন ১০৮২জন

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

মাসের সেরা ব্লগার

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ