নদী (৩য় পর্ব)

ইঞ্জা ১৩ জানুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার, ০৯:১৯:০৩অপরাহ্ন গল্প ২৮ মন্তব্য

images-17

 

 

জীবন হাসতে লাগলো আর নদী নাবিলাকে কোলে বসিয়ে চকলেট খাওয়াচ্ছে।
আপনার বাড়ী কোথায়, জীবন জিজ্ঞেস করলো।
বিক্রমপুর কিন্তু ঢাকাতেই সেটেল্ড, নদী জবাবে বললো।
তা কে কে আছেন দেশে?
বাবা, মা, ছোট ভাই।
আর আপনি হাসবেন্ডের সাথে এখানে।
নদীর চেহেরা বদলে গেল, চোখে মুখে বেদনার ছাপ পড়লো, ছোট করে বললো হাঁ।
জীবন খেয়াল করলো নদীর বদলে যাওয়া চেহেরা, জীবন কথা ঘুরালো, কতোদিন এই জব করছেন?
এই প্রায় এক বছর।
সপ্তাহে ছয়দিন করেন?
সব সময় না বলতে গেলে প্রতিদিনই করি।
ঠিক আছে আজ আমরা আসি, আরেকদিন কথা হবে, তা কতো হলো বিল?
বেশি না, বারো পাউন্ড।
জীবন ক্যাস পে করে মেয়েকে বললো, বেবি চলো আজ যায়।
ড্যাড আন্টিকে একদিন লাঞ্চে ইনভাইট করনা, ইংরেজিতে বললো লাবিলা।
তা শুনেছেন তো মেয়ের আবদার, আপনি সময় দেবেন কি?
না না এখন নয় মামনি, এনাদার টাইম ওকে?
প্রমিজ ইউ উইল হ্যাভ লাঞ্চ অর ডিনার উইত আস, নাবিলা চেপে ধরলো।
ওকে আই উইল ল্যাট ইউ নো লেটার।
ওকে বা বাই
বাই সুইট হার্ট।
আসি তাহলে বাই, জীবন বললো।
বাই, নদী জবাবে বললো।

জীবন মেয়েকে নিয়ে ঘরে ফিরছে, মেয়ে বললো, ড্যাড ওয়াট ইউ থিংক এবাউট নদী?
সি ইজ গুড।
আচ্ছা ড্যাড নদী মানে কি?
নদী মিন্স রিবার?
এইটা আবার কি ধরণের নাম ড্যাড?
বাংলাদেশে এই ধরণের নাম হয় এন্ড সি হ্যাভ আ নাইস নেইম।
ড্যাড আমাকে একটা কথা বলবে, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড।
এনি থিং সিরিয়াস মাই লিটল প্রিন্সেস?
নট লাইক ড্যাট।
তাহলে জিজ্ঞেস করে ফেলো।
ওয়াই মাম্মি লেফট আস এন্ড ওয়াই সি হ্যাভ আ নিউ বয় ফ্রেন্ড?
আই ডোন্ট নো বেবি।
আই ডোন্ট লাইক হার বয় ফ্রেন্ড।
মি টু বেবি মি টু।
ডু ইউ লাইক নদী?
সি ইজ গুড গার্ল।
আমারো তাই মনে হয় বলেই মেয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল।
জীবন বুঝতে পারছে অনেকদিন পরে মেয়ে নদীর আদর সোহাগ পেয়ে ওর মাকে মনে করছে, যে মা ওকে তেমন আদর সোহাগ করতোনা, সারাক্ষণ এইটা ওটার জন্য বকাঝকা দিতো আর একদিন জীবনের সাথে অনাখাংকিত ভাবে ঝগড়া করে বাড়ী ছেড়ে যায় আর যাওয়ার সময় মেয়ের দিকে ফিরেও দেখেনি আর আজ প্রায় আট মাসের মতো হলো মেয়ের খবরই নেয়নি।

মাঝে মাঝে জীবন অবাক হয়ে ভাবে কেন নীলিমা এইভাবে সব ছেড়ে ছুড়ে চলে গেল, জীবন খুব ভালোবাসতো ওকে, ওর যা যা শখ ছিলো সব মিটানোয় সচেষ্ট থাকতো, নীলিমা খুব বিলাসী জীবন যাপন করতো যার ফলশ্রুতিতে জীবনের সারা মাসের বেতনের বেশ অর্ধেক খরচা হতো, নাবিলার জম্ম হওয়ার পর থেকেই জীবন মেয়ের ডাইপার চেইঞ্জ করা, পরিষ্কার করা সব কিছুই ও করতো, মেয়েকে ব্রেস্ট ফিডিং করার প্রচন্ড অনিহা থাকায় মাত্র চার মাস বয়সের বাচ্চাকে ফিডার দিতে বাধ্য হয়েছিলো জীবন, মেয়ের খুদা আর সহ্য করতে পারেনি জীবন, দৌড়ে গিয়ে শপ থেকে দুধ আর ফিডার নিয়ে এসে মেয়েকে খাওয়াই আর এরপর থেকেই মেয়ের অন্ন হলো ফিডারের দুধ এরপরে মেয়ে বড় হতে লাগলে মেয়ের জন্য খাবার বানানো হতে সব কিছু ওই করতে লাগলো, মেয়ের তিন বছর আট মাস হলে মেয়েকে নিয়ে গিয়ে স্থানিয় স্কুলে ভর্তি করে দিলো প্রিপাটরীতে আর এইভাবেই মেয়ে বড় হতে লাগলো আর নীলিমার উদাসীনতা বাড়তে লাগলো আর এক সময় ছেড়ে গেল জীবন আর মেয়ে নাবিলাকে, জীবন একটা বড় নিশ্বাস ফেললো।

বাসায় পোঁছে জীবন মেয়েকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলো, মেয়েকে বললো, তুমি টয়লেটে গিয়ে ফ্রেস হয়ে আসো আর আমিও ফ্রেয হয়ে আসছি, তোমার হোম ওয়ার্ক গুলো দেখে দেবো, ওকে?
ওকে ড্যাড, বলেই মেয়ে সিড়ি দিয়ে উপরে চলে গেল আর জীবন নিজের কোট হ্যাংগারে ঝুলিয়ে দিয়ে উপরে নিজ রুমে চলে গেল।
ফ্রেস হয়ে নিচে এসে দেখলো মেয়ে আগে থেকে বসে আছে হোম ওয়ার্ক নিয়ে, জীবন ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলো, তোমার কি এখনই হেল্প লাগবে নাকি পরে ডাকবে?
আমি করছি দরকার হলে ডাকবো, তুমি যাও তোমার কাজ কর।
ওকে, তা আজ কি খাবে বলো?
টরটিলা আর বিফ কারি, ও সাথে মিক্সড ভেজিটেবল।
ওকে সুইট হার্ট হেসে বললো জীবন, মেয়ে ওর মতো ঘরে বাঙ্গালি ফুড পছন্দ করে আর বিফ হলো ওর জন্য স্পেশাল ফুড এরপর চিকেন হলো রেগুলার ফুড।
জীবন ফ্রিজ থেকে বিফের প্যাকেটটা নিয়ে হাল্কা গরম পানির মধ্যে রেখে দিলো বরফ গলার জন্য আর গাজর, ফুলকপি, ব্রকলি বের করে ভালো করে ধুয়ে নিয়ে কাটতে শুরু করলো, মাঝে মাঝে মেয়েকে গিয়ে পড়া দেখিয়ে দিতে লাগলো।
রান্না শেষে টেবিলে খাবার দিতে শুরু করে মেয়েকে ডাক দিলো, বেবি ডিনার রেডি, চলে এসো।
মেয়ে এলে দুজনে বসে গেল খেতে, বাবাকে হাতে খেতে দেখে মেয়ে বললো, ড্যাড তুমি হাতে খাও কেন?
মা আমার দেশের খাবার এইভাবেই খেতে ভালো লাগে।
বাট এইটা হাইজেনিক না ইউ নো।
জীবন হাসলো।

ড্যাড ইউ নো দিস বিফ কারি ইজ সো ডিলিসাস, তুমি খুব ভালো রান্না করতে পারো, হু টিচ ইউ?
আমার মা।
গ্রেন্ড মা!
ইয়াপ, উনি খুব ভালো রান্না করতে পারে।
দ্যান ওয়াই নট ইউ ব্রিং হার ইন হিয়ার?
উনি আসবেন না মামনি, দেশে উনার ছেলে মেয়ে সবাই আছে, ওদের ছেড়ে আসবেন না, চোখ গড়িয়ে পানি নেমে এলো জীবনের গাল বেয়ে।
ওয়াই ইউ ক্রায়িং ড্যাড, আমি আছি তোমার সাথে, বাবার চোখে পানি দেখে মেয়ে বিচলিত হলো।
না মা আই এম ওকে, চোখ মুছলো জীবন আরর বললো ইউ ফিনিসড?
ইয়েস।
তাহলে তুমি গিয়ে ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসো আমি আসছি, বলেই জীবন প্লেট আর বাটি গুলি নিয়ে ধুতে গেল, ময়লা গুলো ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে সব ডিস ওয়াসিং মেসে ঢুকিয়ে দিয়ে অন করে দিলো আরর নিজে হাত ধুয়ে নিলো এন্টিসেপ্টিক লোশন দিয়ে।
একটু পর আপেল পাই নিয়ে ড্রয়িং রুমে মেয়ের পাশে বসলো, মেয়ে ফর্ক দিয়ে খেতে শুরু করলে জীবন রিমোট নিয়ে চ্যানেল চেইঞ্জ করে বিবিসি দেখতে লাগলো সাথে মেয়ের সাথে খুনসুটি করতে লাগলো এরপর সেলফোন নিয়ে দেশে কল দিলো মার সাথে কথা বলার জন্য।
মা কেমন আছো?
অপর পাশ থেকে ওর মার বললো, ভালো আছি বাবা, তুই কেমন আছিস?
ভালো মা, ভালো আছি।
আমার দাদুমনি কেমন আছে?
হাঁ মা ও ভালো আছে।

কিছু বললিনা বাবা?
মা মিনার বিয়ের কথাবার্তা হয়ে গেল একবারও বললেনা, সব রেডি তারপর বলছো, অভিমানের সুর জীবনের গলায়।
তুই এতো ব্যস্ত থাকিস আর তুই ফোন দিলি অনেকদিন পরে।
মা এইসব নিশ্চয় এক দুই দিনে ঠিক হয় নাই আর এই ইন্টারনেটের দিনে কল করা কি বেশি সমস্যার?
আচ্ছা হয়েছে ভুল করে ফেলেছি মাফ করে দে, মায়ের কন্ঠে অভিমান ঝড়ে পড়লো।
থাক মা বাদ দাও, তা কতো পাঠাতে হবে বলো?
দুই লাখ।
কখন লাগবে?
কয়েকদিনের মধ্যে হলে ভালো হয়, বিয়ে তো আগামী মাসে।
ঠিক আছে মা আমি পাঠিয়ে দেবো।
তোরা আসবিনা?
দেখি মা।
পারলে আসিস।
ঠিক আছে মা এখন রাখি।
আল্লাহ্‌ হাফেজ
আল্লাহ্‌ হাফেজ।
কল কেটে দিয়ে জীবন বড় একটা নিশ্বাস ফেললো আর ভাবলো, দেশে থাকিনা বলে সবাই আমাকেই ভুলে আছে অথচ এই সংসারের জন্য সে কম চেষ্টা সে করেনি।
উঠে টিভি বন্ধ করে দিয়ে মেয়েকে বললো, বেবি ইউ গো ফর দা বেড আই এম কামিং, খালি বাটি গুলো নিয়ে ও চলে গেল কিচেনে।

………….. চলবে।
ছবিঃ Google

৭১৪জন ৭১৫জন

২৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

মাসের সেরা ব্লগার

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য