প্রারম্ভ

জিসান শা ইকরাম ২৪ জুলাই ২০১৬, রবিবার, ০১:৩৬:৩৯পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৫৫ মন্তব্য

কোন কোন রাত জোছনার সোনালী আলোতে উদ্ভাসিত, জোছনার সিড়ির পর সিড়ি চাঁদের সাথে মিলে যায়।
কোন কোন রাত অন্ধকারের অন্ধকারে ডুবানো থাকে, চোখ থেকে পাপড়িকে চোখ খুলেও দেখা যায় না। নিকষ কালো অন্ধকারে দূর থেকে ভেসে আসা শিয়ালের ডাক, কিছুটা দূরের কুকুরের বিরক্তিকর ঘেউ ঘেউ ডাক, জানালার পাশের গাছের ফল খেতে আসা বাদুড়ের ডানা ঝাপটানোর খস খস শব্দেরা সাথী হয়। অথচ অতি তাজা স্মৃতিতেই রাতগুলো ছিল নিজেকে ফিরে পাবার একান্ত আপন সময়। রাত্রির গভীর তলদেশের প্রতি পদক্ষেপে নিজ সত্ত্বার অনু পরমাণুর অযুত নিযুত কোটি ভগ্নাংশও যেন একটি আমি হয়ে যাওয়া।

সবচেয়ে প্রাচীন স্মৃতির সেই ডাইনোসর যুগের উড়ন্ত লাল কালো সাদা পশমের, রক্তিম ঝুটির ডাইনোসর আমার মাথা ছুঁই ছুঁই উপর থেকে কক কক কক করে উড়ে যাওয়া আতংক ফিরে আসে বারবার প্রতিবার। ডোরা কাটা লোমহীন পায়ের দশটি ধারাল নখ যেন বিদ্ধ হয়ে আছে আমার মাথার খুলিতে, যে কোন সময়েই উড়িয়ে নিয়ে যাবে আমাকে।

ড্রাগনের মুখ থেকে নিঃসৃত আগুনের গোলা পুড়িয়ে, ঝলসে দিতে চায় আমাকে অঙ্গার বানানোর আকাঙ্ক্ষায়। হাওয়ায় ভেসে ভেসে কক্ষের চার দেয়াল ঘিরে ঢেউ খেলিয়ে চলা ড্রাগনটির পরিভ্রমণ শেষ হবার নয়।

নিকট প্রাচীন স্মৃতিতে দড়ি টানা ফেরি ছিল দুই জেলার সীমানায়। ছোট নদীতে একটি ছোট ফেরী যানবাহন পারাপারের। নদীর দুপারে দুটো মোটা কাঠের খুটিতে বাঁধা থাকতো অজগর সাপের মত মোটা এক বিশাল পাটের দড়ি। ফেরির পাটাতনে দাঁড়িয়ে ক্রীতদাসের মত একঘেয়ে ভাবে দড়ি টেনে যেতো একঘেয়ে ভাবলেশহীন মুখের ছয় জন মানুষ। আমাদের মত যারা অধৈর্য্য যাত্রী, ফেরির দীর্ঘ সময়ে অপেক্ষা না করে ছোট ডিংগি নৌকায় নদী পার হয়ে চলে যেতাম অন্য পাঁড়ে। গাড়ি থেকে নেমে কার আগে কে নৌকায় উঠে অন্য পাঁড়ে যাবে এমন একটি হালকা স্নায়বিক যুদ্ধ লেগেই থাকতো। সব সময় সবকিছু যে ঠিক ঠাক হবে এমন তো না। একদিন জিগিরি দোস্ত আর আমি গাড়ি থেকে নেমেই নৌকার উদ্দেশ্যে দৌড়। যাত্রী পূর্ন দুটো নৌকাই ছেড়ে দিল। পাড় হতে কিছুটা দূরে যাবার পরে দেখা গেল জিগিরি দোস্তের দু পা দুই নৌকায়। নৌকা নিকটবর্তী সমান্তরাল হয়ে চলা অত্যন্ত কঠিন। নদীর ঢেউয়ে দুই নৌকার দুরত্ব বাড়ছে। আহারে আমার দোস্তের দু পা দুদিকে ফাঁক হতে হতে ছিড়ে যাবার মত অবস্থা। যখন প্রায় ছিড়ে ছিড়ে যায় যায় কোনভাবে লাফ দিয়ে উনি এক নৌকার পা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ালেন আমার বিপরীত নৌকায় একটি নৌকায়। ফলাফল চমৎকারঃ যে নৌকায় উনি দাঁড়ালেন, নৌকা কাত হয়ে গেলো ডুবে, ডুবে যাবার আগে আগে ঐ নৌকার সমস্ত যাত্রী লাফ দিয়ে আসলেন আমার নৌকায়, গেল আমার নৌকাও ডুবে। এরপর নদী সাতরে পানি পুনি খেয়ে অন্য পাঁড়ে পৌঁছলাম। দুই নৌকায় পা রেখে চলার কি পরিণাম তা দেখার সৌভাগ্য হয়ে ধন্য হয়ে গেলাম।

বিশাল আকৃতির অক্টোপাসটি জাপটে ধরেছে আমাকে। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে একবার শুধু দেখেছি একজোরা টকটকে লাল চোখ। চোখের পাতা গুলো কুঁচকানো, কপাল, মুখমণ্ডলে সহস্র বছরের চামড়ার ভাঁজ।
কিভাবে যে কক্ষের ভিতরে আসল এটি বুঝলাম না। চিন্তা করারও তো সময় পাচ্ছি না। ওর শরীরের ওজনে চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছি আমি বিছানায়। এক হাত সরিয়ে দিচ্ছি তো অন্য হাতে পেঁচিয়ে ধরছে। আমার দুই হাত দুই পা দিয়ে সর্বশক্তিতে নিজেকে মুক্ত করার নিষ্ফল চেষ্টা করে যাচ্ছি। হাতির শুঁড়ের মত আটটি হাত পায়ের সাথে পারবো কিভাবে আমি!

সেই ছেলেটি এসেছিল আমার কাছে, আহা সেই গোল গাল মায়ার হাসি মাখানো ছেলেটি। দশ বছর মাত্র বয়স। বিকেলে সাথীদের সাথে টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিল। সজোড়ে ব্যাট চালানোয় বল চলে যায় এক জানালা গলিয়ে এক বাসায়। ছেলেটি নিয়ে ঐ বাসায় গিয়ে বল নিয়ে আসে, মুখে চকলেট। পকেটেও আছে আরো কয়েকটা। চকলেটে এত স্বাদ সে কোনোদিন পায়নি। সন্ধ্যার আগেই খেলা শেষ। সবাই বাসায় চলে গেলেও ছেলেটি যায় বল চলে যাওয়া সেই বাসায়। আরো চকলেট পাওয়া যাবে, আর কি একটা খেলনা দেবে বলেছে লোকটা। গাল টিপে দেয় লোকটা। মিষ্টি খেতে দেয়, আরো চকলেট এনে রাখে টেবিলের উপর। এবং তারপর ছেলেটিকে সে নিজের কোলে বসায় পরম আদরে। একসময় ছেলেটির প্যান্ট খুলে ফেলে, …………… আতংকিত ছেলেটি কাউকে বলতে পারেনি একথা। এই যুবক বয়সেও ঐ লোকটি যে এখন বৃদ্ধ হয়েছে, তাকে দেখলেই ছেলেটির সবকিছু থমকে যায়। নীল আতংক সরীসৃপ এর মত বয়ে যায় মস্তিস্কে, উড়ে যায় জীবনের সমস্ত আনন্দ, সুখ।

হাল ছেড়ে দেয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে শরীরের সমস্ত মনযোগ কেন্দ্রীভূত করলাম আমার হাতের আংগুলে। ভুলে গেলাম আমার শরীরের উপর বিশাল এক অক্টোপাস। অনুভব করছি আমার শরীরে অন্য কিছুর অস্তিত্ব নেই। আমার পা নেই, পেট নেই, বুক নেই, মাথা নেই, মুখ নেই, আছে কেবল দুই হাতের মধ্যমার দুটো আঙ্গুল আর দুটো চোখ। সমস্ত ইচ্ছে শক্তি একত্রিত করে আঙ্গুল দুটো সোজা পেরেকের মত ঢুকিয়ে দিলাম অক্টোপাসের দুচোখে, অপ্রত্যাশিত এই আক্রমনে অক্টোপাস থমকে গেল কিছুটা। এরপর সজোড়ে আট হাত পা দিয়ে পিষে মারার চেষ্টা। বাঁচার শেষ চেষ্টা আমার। চোখ টেনে বের করে ফেলেছি। বিকট চিৎকারে ছেড়ে দিল আমাকে।
দৌড়ে গিয়ে রান্না ঘর থেকে মাংশ কাঁটার ছেনি এনে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে চলেছি এর সম্পূর্ণ নরাচরা বন্ধ হবার আগ পর্যন্ত। অবাক হয়ে দেখলাম সবুজ রক্তে রুম ছপছপে হয়ে গিয়েছে।

ভোরের আলো দেখা যাচ্ছে। খুব দ্রুত অক্টোপাশের গোশতের বেশ কয়েকটি টুকরা বারবিকিউ করে, পেট পুর্ন করে ঘুমিয়ে গেলাম। আবার আবার বার বার প্রতি ভোরে,

৪৭০জন ৪৬৯জন
0 Shares

৫৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ