সম্বোধনে আপনি-তুমি-তুই//

একটু বড় হবার পর থেকেই দেখেছি বা শুনেছি আব্বার চমৎকার বাচিক উচ্চারন। সেই ছোটোবেলা থেকেই দেখতাম আব্বা খুব সুন্দর করে কথা বলেন। আমাদের ভাইবোনদের সাথে তখন তুমি তুমি করে কথা বলতেন। আম্মা মাঝে মাঝে বলতেন তুমি করে। যখন খুব রেগে যেতেন, তখন তুই তোকারি করতেন। ভেবেই নিয়েছিলাম সেই ছোট্ট বয়সে যে “তুই” শব্দ সম্বোধনের জন্য রেগে যেতে হয়। তুই শুধু মাত্র রাগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়া উচিত। এই ধারনা আমার বহুদিন যাবৎ বলবৎ ছিলো। একটু একটু করে বড় হতে হতে সম্বোধনের রহস্য বুঝতে শিখেছি। কিন্তু তারপরও মেনে নিতাম না, অনেকের তুই বলে সম্বোধন করাটা। মেনে নিতাম না, তাহলে কি করতাম? ভীষণ বিরক্ত হতাম মনে মনে।

স্কুলে এক দিদিমনি ছিলেন, তার বর ছিলেন হাই স্কুলের শিক্ষক সুনীল স্যার। স্যারের স্ত্রী প্রাথমিকের মানে আমার দিদিমনি। শুকনা, একহারা গড়ন, খুব ফর্সাটাইপ লম্বাটে মুখ। তাঁর কপালে আর মাঝবরাবর সিঁথিতে, কপালের শুরু থেকে চান্দির মাঝখান পর্যন্ত টকটকে লাল সিঁদুর পড়তেন। ফ্রক পরা ছোট্ট শিশু বয়সে আমাকে তাঁর রুপ সৌন্দর্য মুগ্ধ করতো। ক্লাশের ফাঁকে তিনি কি পড়াতেন কানে যতটুকু না যেত!তারচেয়ে বেশি মুগ্ধতায় চেয়ে থাকতাম তাঁর দিকে। আর অবাক হয়ে ভাবতাম! দিদিমনি এত সুন্দর ! কিন্তু তাঁর গলার স্বর অমন কর্কশ কেন? প্রাথমিক পেরিয়ে তখন ক্লাশ সিক্সে উঠে গিয়ে প্রাইমারী সেকশনের গন্ডি পার হয়ে বিভাজনের ওপারে চলে গিয়েছি। প্রাইমারী আর বয়েজ্ সেকশন আলাদা করেছে প্রমাণ সমান উঁচু দেয়াল। সেদিন একা ফিরতে হচ্ছিলো বাসার পথে, দিদিমনি প্রাইমারী সেকশনের এক ক্লাশরুমের জানালায় কলিগের সঙ্গে দাঁড়িয়ে হয়তো কোনো আলাপ করছিলেন, আমাকে যেতে দেখেই ডাক দিলেন, প্রথমত হকচকিয়ে গেলাম……আমার ধারনা ছিলো সবসময় দিদিমনি বা স্যাররা ছাত্র/ছাত্রী ‘দের একমাত্র অন্যায় টন্যায় না করলে ডাকেন না। এক মুহুর্তে পেছনের সময় হাতরে এলাম। নাহ্ এমন তো কিছু মনে পড়ছেনা! সামনে গিয়ে দেয়াল ঘেঁসে দাঁড়াতেই তিনি উচ্চারন করলেন ” কিরে খিদা বেশি লাগছে? এমন দৌড়াইয়া যাচ্ছিস যে?” পাঠকগন বিশ্বাস করুন! ঠিক ওই মুহুর্তে আমার ইচ্ছা করছিলো ঝেড়ে দৌড় দিয়ে তাঁর সামনে থেকে চলে যাই: বেয়াদবি করা যাবে না। কড়ায় গন্ডায় শিখিয়েছেন আব্বা আম্মা। কোনোদিন বেয়াদবি করা যাবে না কারো সাথে। বেয়াদবির মিনিং চবনপ্রাশের মতো করে বাসায় সবসময় গেলানো হতো। মাথা নিচু করে সব সহ্য করে যেতাম। কিন্তু!! মনে মনে দিদির সৌন্দর্য আমার কাছে ম্লান হতে থাকে। যে দিদিমনি বাচ্চাদের সাথে তুই তোকারি করে সম্বোধন করতে পারেন! তার সৌন্দর্য আমাকে বেশিদিন আকৃষ্ট করতে পারলো না। যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতাম তাঁর সামনে থেকে। এমন ভাবেই বেড়ে উঠছিলাম তুই /তুমির হেফাজতে।

আমার পরিবারে আজো অনেক চাচা,চাচি, দাদি সবার সাথেই তুমি করে সম্বোধন করে চলেন। আমরা একে অন্যের প্রতি আত্মিক সম্পর্কের টান এবং টানাটানির প্রয়োগ করে থাকি সম্বোধনের আধিক্যে।

কোনো আত্মীয়স্বজন বেড়াতে এসেছে, সমবয়সী কেউ আছে আতিসয্যেই হোক আর অহংকারেই হোক তুমি তুমি করে সম্বোধন করছে। মাথায় নিতে পারছিনা, জানতে হবে সে কোন ক্লাশে পড়ে। জানার পরে যখন বুঝি, সে আমার থেকে নিদেন পক্ষে এক ক্লাশ নিচুতে পড়ে। ব্যাস্, হয়ে গেলো তাঁর সাথে আমার আত্মিকতার টানাপোড়েন। আমি তো তোমার বড়, তুমি আমাকে তুমি করে বলছো কেন? আত্মীয় মেয়েটা এমন ভাবে ঠোঁট ওল্টায়!যেন “কি আমার বড় রে!! এরে আবার আপনি করে কওয়া লাগবো!!! মেজাজ তখন থেকেই একটু একটু করে বিগড়াতে লাগতে লাগতে একসময় আমি রাগের ডিপো হয়ে গেলাম।

আমার বড় ফুপুর একটা ননদ আছে, সেও এলো বেড়াতে আমাদের শহরে, সেও মনে করে আমরা সমবয়সী , ওর নাম বিউটি। তুমি তুমি করে নাম ধরে ডাকাডাকি। পছন্দ হচ্ছিলো না। কিন্তু বিউটিকে আমার খুব পছন্দ হচ্ছে তখন। চমৎকার বুদ্ধিদীপ্ত এবং মেধাবী আচরনে আমি আকৃষ্ট বিউটির প্রতি। বইপড়ুয়া। বিভিন্ন বই সম্পর্কে আলোচনা চলে। ভালো লাগে। কিন্তু!….. ওই একজায়গায় গিয়ে বিতৃষ্ণা বাড়ছে। শেষমেষ বলেই ফেললাম ছোটোফুপু +বন্ধু মুক্তিকে, বিউটির তো আমি বড়! ও আমাকে নাম ধরে ডাকছে কেন? খালা ডাকতে কি লজ্জা লাগে? মুক্তি তৎক্ষনাত বিউটিকে বলে দিলো আমার সামনেই। চমৎকার ভাবে মেনে নিলো।বললো, ঠিক আছে, আজ থেকে তোমাকে আমি খালা তুমি বলেই ডাকবো। আশ্চর্যের বিষয় হলো। খালা বলাতে লজ্জাটা আমিই পাচ্ছিলাম তখন।

আপনি/তুমি/তুই এর সংঘর্ষ কাল চলে আসছে আজও।

চলবে–
******************************
বানান ভুলের বিষয়টা ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখবেন সকলে আশা করি।

মোট পড়েছেনঃ ১,০০৪জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

২৭টি মন্তব্য

  1. “বানান ভুলের বিষয়টা ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখবেন সকলে আশা করি।”
    ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে কেন দেখতে হবে এটি আগে বলুন! কারণ বলতে হবে!

    আসলে আমাদের সমাজে তুই/তুমি/আপনি একটি প্রচলিত ব্যবস্থা, আমরা তা মানি, যেহেতু এভাবেই আমাদের শেখানো হচ্ছে।
    এটি ভুল বা ঠিক এর বিষয় নয়, যেমন ধরুন, আমাদের এখানে দিদি ‘তুই’ খুব-ই প্রচলিত। আবার আমি কাউকে কাউকে জানি ছেলে মেয়েদের
    সাথেও আপনি করে বলে সবসময় একদম ছোট বেলা থেকে বড়-বেলা পর্যন্ত।
    চলুক, পাঠক সাথে থাকবে।

    1. অসাধ্য চেষ্টার পরেও যখন বানান সুদ্ধ করতে পারিনা, তখন ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আর বলবো? তারপরও আছে ভাষা সম্বন্ধে অজ্ঞানতা। যথাযথ চেষ্টা চলতেই থাকে। তারপরও ব্যার্থ হই। তাই ক্ষমাটুকু চাওয়া।

      সাথে পাচ্ছি বলেই লেখা এগিয়ে নিতে উৎসাহ পাই বা পাবো আগামীতেও আশা রাখতেই পারি।
      শুভ কামনা।

    1. আমার কাছে আপনি নতুন। দুঃখিত এখনো আপনার কোনো লেখা পড়তে পারিনি। সে আমার লজ্জা এবং ব্যর্থতা।
      আপনাকে স্বাগতম অভিনন্দন জানাচ্ছি।
      সাথেই থাকুন, লিখুন। সোনেলা আমাদের সবার সোনালী উঠোন।
      আমরা সবাই সবার জন্য এক পরিবার।
      শুভ কামনা শুভেচ্ছা রইলো আপনার জন্য।

      ধন্যবাদ লেখা পড়ার জন্য, মন্তব্যের জন্য।

  2. আমি বাড়ীর সবার ছোট কি না,
    এখনো তুই/তোকারিতে আছি…..
    আমার বড় সখ কেউ আমাকে আপনি বলুক।
    আপনি আমার গোপন ব্যাথা আবার জাগ্রত করলেন আপু।

    ধন্যবাদ,
    এতো সুন্দর করে বিষয়টা উপস্থাপন করার জন্য।

    1. ব্যাপারগুলো যা বোঝাতে চেয়েছি সেদিকে ক’জন যায় আমার দেখার বিষয় সেটাই! আপনি যে বোঝেন নি, এটা বেশ বুঝতে পেরেছি।
      আসলে আমরা যারা বয়সে কারো কাছে ছোট বা বড় : তারাই কেবল তুই তোকারি সম্বোধন আশা করবো, তা কি ঠিক? সৌজন্যবোধ, ভদ্র আচরন বাচ্চারা বড়দের কাছ থেকেই শিখে শিখে বড় হয়।
      বয়সভিত্তিক আকারে আমাকে তুমি /তুই বলতেই পারে আমার কাছের আত্মজনেরা। কোনো আপত্তি নেই আমার। কিন্তু একই সম্বোধন যখন হঠাৎ করে বাইরের কেউ করতে যাবে, আমি বিরক্ত হবো,আমার প্রচন্ড রাগ হবে। সাথেই থাকুন, মজার মজার আরো কাহিনী সামনে উপস্থাপন করার ইচ্ছা আছে।
      শুভ কামনা ভালবাসা।

  3. আপনার নিজের অনুভূতির লেখনী পড়ে নিজের একটা বিষয় মনে পড়ে গেল। বিষয়টি হলো তুই থেকে আপনি বলা। আমি আমাদের সংসারে সবার ছোট। সবার আদরের। তাই আমি আমার বড় ভাইবোন সবাইকে তুই তুই করেই সম্বোধন করতাম। যা এখনো করে থাকি। একদিন আমার বড়দাদা আমার উপর রেগে গিয়ে আমাকে ধমক দিয়ে বললো, ‘আপনে চুপ থাকেন!’
    আমি সাথে সাথে কেঁদে দিলাম! দাদা আমাকে আপনে বললো কেন? সেই কাঁদা অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম। শেষতক আমার বড়দাদা বুঝতে পেরে তিনি নিজেই স্বীকার করে বলেছিল, ‘আর কোনদিন তোকে আপনে বলে কথা বলবো না, তুই যতবড় অন্যায়ই করিস।’
    আপনার এই লেখনী পড়ে অনেক বছর পর কথাটা মনে পড়ে গেল। ভালো লিখেছেন। ভালো থাকবেন।

    1. বিষয়টা আসলে এমনই।রেগে গেলেই আব্বাও আমাদের সাথে এমন আপনি করে বলতেন।অর্থাৎ ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ আর হেয় করে সম্বোধন করা। আব্বা এমন করে বলতেন! যে আমিও কাঁদতে থাকতাম। আব্বা আরো খেঁকিয়ে উঠতেন।এই এই এই…….. তেনারে কিছুই বলা যাবে না, তাইলেই চোখে গঙ্গা বইতে শুরু করবে”
      আসলে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে রাগ মেজাজের পারদ ওঠানামা করে অনেকক্ষেত্রে এই সম্বোধনের আপনি/তুমি/তুই। আপনার জন্য শুভ কামনা দাদা।

  4. ভালো লিখেছেন দিদি পড়ে ভালো লাগলো খুব, তবে মন্তব্য করার মতো মেধা আমার নাই, শুধু সময় পেলেই আপনাদের কাছে ছুটে আসি
    আপনাদের নতুন নতুন ভুল শুদ্ধ শব্দ গুলো শেখারজন্য বুঝার জন্য,
    ধন্যবাদ দিদি ভালোবাসা নিবেন।

  5. মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য বাংলা সবচেয়ে অগ্রগামী-

    একটাই সম্বোধনের তিনটে রূপ- তুই, তুমি, আপনি
    নিজের বয়সের সাথে / সম্পর্কের গভীরতায় সম্বোধন বদলায়।
    আর যুত্সই সম্বোধন না হলে রাগ এসেই যায়।

    বয়সে ছোট- অপরিচিত কাউকে আপনি বলতে হয়, অনেক ব্যাবধানে ছোট হলে তুমি।
    এবং নিজেদের জন্যও আমরা তেমন সম্বোধন আশা করি।

    তবে ইতালীয়- তু (Tu) আর ইংরেজীতে ইউ (you) আপনি, তুমি, তুই এর সমার্থক একটাই শব্দ।

    বাবা, মা ছেলেকে যা বলছে- ছেলে সে একই সম্বোধন করে যাচ্ছে।

    আপনার পরবর্তি লিখার অপেক্ষায়……..

    1. ইংরেজীতে আসলেই সহজ সুবিধা।আপনি/তুমি/তুই’র ঝক্কি নেই কোনো। আমাদের বাঙালী সমাজের প্রেক্ষাপটে এই সম্বোধনই দেখাযায় কোনো কোনো সম্পর্কের বন্ধন নির্ধারন করে থাকে।
      আপনার বিবেচ্য মন্তব্যে লেখাটা সন্মানিত হলো।
      শুভ কামনা।

  6. পরের পর্বের আগেই তুই তুমি আপনি পর্বটা পড়তে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। কারন এ রকম বিষয় নিয়ে কেউ কোথাও আমি লিখতে দেখিনি কিন্তু বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং সচারচর।
    আমিও মনে করি নিদেন পক্ষে কাঊকেই তুই শব্দটা প্রয়োগ করা ঠিক নয়।কারন তুই শব্দটিই আমার কাছে একটা থার্ডক্লাশ শব্দ মনে হয়।তবে অনেকে তুই শব্দ খুব আপণদেরও বলে থাকে তবে অবশ্যই বয়সের অনেক ব্যাবধান থাকে।
    তুমি ইজ দা বেষ্ট মিষ্টি শব্দ শুনলেই মনটা আনন্দে ভরে যায়।
    তবে সাময়িক পরিচয় কিংবা অচেনাদের সাথে আপনি শব্দটি ইউজ করাই সবচেয়ে ভাল হয়। আপনার লেখা পড়ে ভাবলাম আপনি তুই তুমি আপনি শব্দ বিড়ন্বনায় বেশ ভুগেছেন।
    অপেক্ষায়…

    1. তুই কিন্তু ভাইদের বলি, বোনদের বলি, ওদের যদি হঠাৎ করে তুমি বলতে শুরু করি, ওরাই তখন বলবে ” বড় আপু, কি ব্যাপার তুমি হঠাৎ তুমি তুমি শুরু করলা ক্যান?” তো ব্যাপারটা এরকম নয়,যে তুই বা তুমি সম্বোধন কেউ কাউকে করাটাই থার্ডক্লাশ টাইপ। তা নয় ভাই, একবার ভাবুন তো! আপনার বয়সের চেয়ে অনেক ছোটো অথচ আচমকা আপনাকে ঠাস্ করে দোস্তালীর সুরে “তুমি” “তুমি”করে বলা শুরু করলো….. তখন আপনার ঠাঁটাইয়া কানের নিচে বাজাইতে মন চাইবেনা? আমার কিন্তু মন চায় ভাইজান😄

      পরের পর্ব পড়েন, তাইলেই বুঝবেন আমার মনের অবস্থা কেমন হয় বা হয়েছিলো?

  7. খাইছে তো, আমি তো অনেককেই তুই বলে ফেলি আজকাল,
    অনলাইনে পরিচয়, আমার চেয়ে বেশ ছোট, সম্মোধন করি তুই বলে,
    রাগ করে কিনা কে জানে?
    আজ থেকে এমন তুই ডাকি সবাইকে জিজ্ঞেস করা লাগবে 🙂

    লেখায় মজা পাইছি।
    শুভ কামনা।

    1. হা হা হা হা…… আপনি যাদের তুই করে বলে ফেলেন! তারাও চায় আপনি তাঁদের তুই বলেই সম্বোধন করেন। এই তুই সম্বোধনের মধ্যেই তাঁরাও জড়িয়ে আছে অলিখিত হৃদ্যতার আত্মীয়তায়।
      তুই,তুমি,আপনি যথাজায়গায় যথাযথ ভাবে সম্বোধিত হলে কোনোই আপত্তি থাকার কথা না।

মন্তব্য করুন