মা

উঠোনে পেয়ারা গাছের তলায় মা তার মেয়েটিকে কোলে নিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে, আর মেয়েটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই যাচ্ছে। দৃশ্যটাকে এখানে পস্ করে আমরা একটু পেছন থেকে ঘুরে আসি, কেন মেয়েটি কাঁদে। আমাদের গৃহশিক্ষক ছিলেন ময়েজ স্যার। ইয়া লম্বা আর চিকন ছিল তার নাক। ততোধিক চিকন একটা বেত থাকতো সারাক্ষন তার হাতে। আমি সৌভাগ্যবান কিংবা দূর্ভাগ্যবান ছিলাম বলে বেতের মার কমই খেয়েছি, যাবতীয় বেত আদর আমার বোনের উপর দিয়েই যেত। দূর্ভাগ্যবান এজন্য মনে হয় মাঝে মাঝে, মাইরের নাম বাবাজি শুনেছি, তাই সেকালেই সোজা হয়ে যাবার চান্স থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি। সেদিন ধর্ম পড়াটা মুখস্থ করতে পারিনি আমি, তাই আগাম মারের ভয়েই কান্না শুরু করেছি। আমার মা তখন আমাকে কোলে করে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন আর স্বান্তনা দিচ্ছিলেন যে স্যার আজ মারবে না। কোলে ওঠার বয়সটা হয়তো আগেই পেরিয়ে গিয়েছিলাম, তাই একটু লজ্জা লজ্জা লাগছিল, তবে ভয়ের কাছে লজ্জা সবসময়ই পরাস্ত। মায়ের আশ্বাসে খুব একটা ভরসা পাচ্ছিলাম না, তাই কেঁদেই চলছিলাম ফুঁপিয়ে। আমার স্যার সেদিন আর পড়াতে আসেনি। যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেই দৃশ্যটাতে আবার ফিরে আসি, কারন এই দৃশ্যটাতে হ্যাং হয়ে গেছে আমার চলমান ভিডিওটি। আমার মা-কে নিয়ে এ আমার সবচেয়ে মধুর স্মৃতি। আমি আজও দেখি পেয়ারা গাছের নিচে আমাকে কোলে নিয়ে মা ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আমি কেঁদে যাচ্ছি।

দু মেয়েকে বাইরে পড়তে পাঠিয়ে মা খুব একা একা থাকতো। কোন একবার কলেজ ছুটিতে বাড়ি গিয়েছি। মা আমার সাথে রাতে ঘুমাতে এলেন। বারবার আমার একটা পা নিয়ে তার গায়ের উপর উঠিয়ে দিচ্ছিলেন, আর আমি বিরক্ত হয়ে নামিয়ে নিচ্ছিলাম। কএকবার এমন করার পর হালকা বকুনি দিলাম, আপনি জানেন না আমি এভাবে গায়ে পা উঠিয়ে ঘুমাই না? অগত্যা মা হয়তো একটু মন খারাপ করেই ঘুমিয়ে পরলেন।
কতো কতো বছর পর ঘুরে ফিরে আমি সেই জায়গাটিতে। সময়ের সাথে কতো অভ্যাস পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমার ছেলে এখন আমার গায়ের উপর হাত-পা উঠিয়ে দিয়ে গুটিশুটি মেরে ঘুমায়, আমিও তাই। সেদিন মা খুব একা একা ছিল, আর আমি এখন, সেইসব দিনগুলো ভেবে যাই। আমার মা এখন খুব ব্যস্ত। কথা হয় খুব কম, যখনই ফোন করি দেখি ছাড়বার ব্যস্ততা। ফোন কানেই শুনতে পাই দুই নাতী-নাত্নীকে নিয়ে ছুটছে। কেমন এক অভিমান হুড়মুড় করে নেমে আসে। সেদিন সে কস্ট পেয়েছিল কিনা হয়তো এখন তার মনেই নেই, কিন্তু তার কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সেই মেয়ে এখনো তা ভেবে কস্ট পায়, মা কি তা জানে?

মা জানে না, কিচ্ছু জানেনা। আমি কস্ট পেলে কাঁদি আর ভাবি, কেনো সে আমার কস্টগুলো দেখতে পায়না। আমার সব রাগ যে তার উপর…

২১ শে ফেব্রুয়ারী নিয়ে কিছু লেখা হলোনা। আজ সারাদিন মা-ই আমার একুশ ছিলো।

মোট পড়েছেনঃ ৮৭৩জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

৪৭টি মন্তব্য

  1. এমন ভাবে লিখলেন যেন দৃশ্য গুলো দেখছি চোখের সামনে
    চলমান ভিডিও আমরাও দেখছি।

    মা…… জগতের সবচেয়ে নির্ভরতার স্থান
    চিন্তার,আস্থার আশ্রয়স্থল
    ভালো লিখেছেন।
    মা ভালো থাকুক……মা কে নিয়ে আপনিও ভালো থাকুন।

  2. সব মায়েরাই বুঝি এমন–আর সত্যি বলতে মায়েরা এমন না হলে ভালোও লাগে না–আমাদের নিয়ে তাদের ব্যস্ততা আমরা বুঝতেই চাই না, মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে যাই, হয়তো মা কাছে আছে বলেই এমনটা হয়–
    আমার এক বান্ধবীর মা নেই, আর সে যখন আমাদের বাসায় আসে আম্মু তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, আর সেও আম্মুর হাতে এটা খাবে ওটা খাবে, ‌আম্মুও দেখি তার আবদার মেটানোতে ব্যস্ত– আম্মুর সাথে এক হয়ে এই খাওয়া নিয়ে আমাকেও কম বিরক্ত করে না—মায়ের হাতে বিষ খেলে সেটাও অনেক মধুর হবে, এমন কথাও তার মুখে কয়েকবার শুনেছি, কিন্তু গভীরভাবে হয়তো অনুভব করতে পারিনি, এমন কথাগুলোর মাঝে যে কতো কষ্ট লুকানো থাকে…

    মা ছাড়া একটা দিনও ভাবতে পারি না–আপনার আম্মু ভালো থাকুক সবসময়…
    আজ সারাদিন মা-ই আমার একুশ ছিলো (y)

    দূর্ভাগ্যবান ছিলাম বলে বেতের মার কমই খেয়েছি—-আসলেই আপনার ভাগ্যটা দেখি অনেক খারাপ, তা না হলে এতোদিনে তো সোজা হয়ে যেতেন :p

    1. মায়ের অভাব বোধটা বোধ হয় দূর থেকেই বেশি বুঝতে পারা যায়। আর যার মা নেই সেই জানে তার কি নেই। মায়ের হাতের রান্না! কতদিন খাইনা। 🙁
      তোমার আম্মুর জন্য অনেক শ্রদ্ধা আর ভালবাসা রইলো।
      হুম আমার তো তাই মনে হয় 🙂

  3. মাইরের নাম বাবাজি শুনেছি 🙂 একারণে আপনি সোজা হতে পারেননি?আপনি তাহলে কি বাঁকা এখন?আমাদের ভাগ্য ভালো যে আপনি সোজা হননি।তাহলে হয়ত আপনাকে আমরা পেতাম না।

    ‘মা’ কত মধুর এক ডাক,কত মধুর স্মৃতি।যখনই কিছুটা মন খারাপ থাকে ছুটে যাই এখনো মা এর কাছে।কত মধুর স্মৃতি জমা হয়ে আছে।শুন্যালয় আপু মা এর কোলে কাঁদছে কল্পনা করছি আর হাসছি দৃশ্য দেখে 🙂 মা এর ঠিকানা দেন,জানিয়ে দেই মা কে,দেখুন আপনার অভিমানি মেয়ে এখনো তেমনি ছোটটিই আছে -{@ ভালো থাকুন আপু।

    1. আপনাকে ঠিকানা দেব লীলাবতী দি। ঘুরে এসেন একদিন। আমি আরো একজন মা পেয়েছি, এখন আমার যাবতীয় রাগ তার উপর। মায়ের মতোই স্নেহময়ী সে, মায়ের মতোই আদুরে। আমার সব রাগ সহ্য করে।
      বাঁকা শুন্যই যদি পছন্দ তবে আর আফসোস করি ক্যান? আর করবো না 🙂
      ভালো থাকুন ভত্তাবতী, আর এমন সুইট করে মন্তব্য লিখুন।

  4. মা হয়েই সহজেই মায়ের কথা ভাবলেন,মুগ্ধ বিরহের আবেশ ছড়িয়ে,খুব সুন্দর।
    কিন্তু সাধারণেরা মা না হয়ে কী করে এভাবে বা আরও কম সুন্দর করে ভাবতে পারবে কে জানে।

    আপনার একুশ ই মাকে শ্রদ্ধা।

    1. ক্লাস নাইনের পর থেকে মায়ের কাছ থেকে দূরেই থাকতাম। সত্যি বলতে অনুভূতি টা মা হবার পরই বেশি অনুভব করেছি। সবাই তো আমার মতো পঁচা নয়, তারা নিশ্চয়ই মাকে সবসময়ই এর চাইতে অনেক বেশি সুন্দর করে ভাবে।
      খুব সুন্দর বললে খুশি তো হবোই। ধন্যবাদ দিচ্ছি ভাইয়া। সব মায়ের জন্য অনেক শ্রদ্ধা।

  5. “মা” কে নিয়ে লিখে ফেললেন অবশেষে আপু, আপনার এই লেখা সুনিশ্চিত করে বলতে পারি ছুয়ে গেছে সবাইকে যারা যারা পড়েছে।

    পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি জানাই শ্রদ্ধা। -{@ (3 -{@

    সেই কবেকার ঘটনা কিন্তু আজও যেন ঠিক সজীব হয়ে আছে স্মৃতিতে, হয়তো অনুশোচনার জন্য, আপনিও একজন মা হয়ে হয়তো বুঝতে পারছেন সন্তানদের প্রতি কেমন ভালবাসা থাকে তাদের! মা কখনো রাগ করে থাকতে পারে না সন্তানদের প্রতি, আপনার মা-ও হয়তো নেই। সব মা-ই যে সন্তানদের ভালবাসে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি।

    মা তোমাকে সত্যি অনেক অনেক ভালবাসি। মাকে নিয়ে এখনো কিছু লেখার সাহস হয়নি, আপনি অনেক ভালো লিখেছেন, এমন লেখা আরো চাই আপু।

    1. মাকে নিয়ে আমার আগের একটি লেখা। নিজের লেখার মধ্যে সবচেয়ে পছন্দের বললে আমি এটাই বলবো ..https://sonelablog.com/archives/7632
      মা সন্তানের উপর কখনো রাগ করে থাকতে পারেনা, সত্যি বলেছেন। দোয়া করবেন, আমিও যেন এমন মা হতে পারি।
      পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা।
      মা কে নিয়ে একবার লিখেছিলেন ‘মা” দিবসে। স্টিকি হয়েছিল সেটা স্টিকি করবার মতো বলেই। ভুলিনি 🙂

  6. মা সমস্ত নির্ভরতার প্রতীক।আপনার মা এর সাথে কথা বলেছি মনে মনে,তিনি আপনার উপরে অভিমান করে আছেন, তাকে দেশে রেখে আপনি দেশের বাইরে চলে গিয়েছেন কেন?আপনার সন্তানও একদিন আপনার কথা লিখবে,এমন করে অভিমান করবে।কিছুই জানতাম না আপনার ছোট বেলার কথা।কিছুটা তো জানা হল 🙂

    1. দুজনেরই অভিমান, কেউ কাউকে কিছু বলিনা 🙂 আমার মা এর সাথে মনে মনে আর কি কি কথা হয়েছে আপনার, বলতে হবে কিন্তু।
      ছোটবেলার কথাগুলো আমারো জানতে ইচ্ছে করে, সবার ছোটবেলার মধ্যেই নিজেদের খুঁজে পাওয়া যায়।

  7. মায়ের মতো আপন কেহ নাই -{@ ২১ শে ফেব্রুয়ারীর বীররাতো এরকম মায়েদের সন্তান।মায়ের আদেশ পালন করতেইতো ওরা জীবন দিয়েছিল আমরা যদি সেই সমস্থ জীবিত মায়েদের সেবা দিতে পারি তবে ২১শে ফেব্রুয়ারীর স্বার্থকতা ভাবতে পারি নতুবা সবই বিফলে। -{@

    1. খুব সুন্দর বলেছেন তো ভাইয়া। সারাক্ষন নেটে নেটে দেশপ্রেম দেখিয়ে লাভ নেই, যদিনা পরিবারকে, মা কে সময় না দেয়া যায়। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

  8. “আমার সব রাগ যে তার উপর… ” – ???
    লেখাটিকে ভালো বলে তেমন কিছু হবে না। ইচ্ছে করছে আপনাকে বলি আরেকটি লেখা লিখুন “আমার সব রাগ যে তার উপর… ” এই শিরোনামে।
    ভাল থাকুন।

    1. মন্তব্য পড়ে এটাই মনে হয়েছে, আপনারও বলবার কিছু আছে। মা-কে নিয়ে আপনিই একদিন কিছু লিখে ফেলুন।
      ভালো থাকুন আপনিও।

    1. হ্যাঁ মা-ই সবচাইতে আপন। তবু ব্যস্ততায় যেন মাকে যেন দূরে ঠেলেই দিই আমরা।
      অনেক ধন্যবাদ আপনাকে পড়বার জন্য।

  9. সমস্ত নির্ভরতার প্রতীক হচ্ছেন ‘মা’। মা’য়ের ঋন কখনোই শোধ হবে না।
    আসুন, আমাদের যাদেরই মা-বাবা বেঁচে আছেন, সময় থাকতে আমরা তাঁদের সাধ্যমতো সেবা দিয়ে কিছুটা হলেও ঋন শোধ করি।
    পৃথিবীর সকল মা ভালো থাকুক।

    ধন্যবাদ, মন ছুঁয়ে যাওয়া একটি লিখা।

    1. অনেক ধন্যবাদ আপনাকে আপু। হ্যাঁ, সময় থাকতেই আমাদের সাধ্যমতো সেবা দেয়া উচিত বাবা-মাকে।
      ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল বাবা-মা।

    1. আসলেই গ্রেট আইডিয়া। দিয়ে ফেলুন পোস্ট। এইরে, এখনই তো খোঁজা শুরু করেছি “মা” দিয়ে কি কি গান হয়। সবার আগে এটা মনে পরেছে, মায়ের চেয়ে আপন কেহ নাই। দ্রুত দিন পোস্ট, নইলে জ্ঞানীদের আবার তালের ঠিক থাকেনা।

  10. মা এর জন্য হৃদয়ের হাহাকারকে ভালো ভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন।কত স্মৃতি মা কে নিয়ে।বিদেশে এই কান্নাটা লেগেই থাকে সারাক্ষণ।শুন্য আপনি ভালো থাকুন।

    1. হ্যাঁ আপু, এ কান্না লেগেই থাকে। আপনিও এমনি করে বুঝতে পারেন নিশ্চয়ই। আপনিও অনেক ভালো থাকুন সবসময় আপু। -{@

  11. আপু আপনার লেখা পড়ে আমারো ছোটবেলার কত শত স্মৃতি চলে আসলো চোখের সামনে।কত সুন্দর করে মায়ের প্রতি টান,অভিমান লিখে ফেললেন।দুই মা(আপনার,আপনার মা)এর প্রতিই শ্রদ্ধা -{@

    1. দেশে এলে অবশ্যই একসাথে যাব দুই মাকে দেখতে। আমিও যে চাই ৫০০ ভোল্টেজের মা কে দেখতে। অনেকদিন দেখিনা তোমাকে সেভাবে। ভালো থেকো তাজ।

মন্তব্য করুন