শালিখের বেশে

=আগামী ১০ অক্টোবর জাহিদের মৃত্যু বার্ষিকী। আজিমপুর কবর স্থানে তাকে দাফন করা হয়েছিল।তুমি ১০ অক্টোবর অবশ্যই ঢাকা আসবে,আমার হয়ে ওর কবরে ফুল দিবে।
– কেন তুমিই তো যেতে পারো।
= আমি একবারো যাই নি। প্রথম বছর যাইনি কষ্ট সহ্য করতে পারবো না বলে। এর পর যাইনি মোস্তাকিন এর মন খারাপ হবে বলে
– মোস্তাকিন এর বন্ধুও তো সে ছিল
= তা ছিল,তবে আমি জাহিদকে ভালোবাসি,আমার সমস্ত ভালোবাসা জাহিদের জন্য,এটি কষ্ট দেয় মোস্তাকিনকে
– এত ভালবাসলে তাহলে বিয়ে জাহিদকে কেন করোনি
=আমি জেদী জানো তুমি,জেদকে দমাতে পারিনি বলে
-এখনো মোস্তাকিমকে ভালোবাসো না?
= না
– আমি কবর চিনবো কিভাবে?আর আজিমপুর কবরস্থানে আমি যাইনি কোনোদিন।
=আমি চিনিয়ে দেবো।প্লিজ এসো ওইদিন।তোমার উপরই যা ভরসা করি আমি,যত আবদার করি। আর শোন রজনীগন্ধা আর বেলী ফুল নিবে। আর ৩ প্যাকেট আগরবাতি।
-আগরবাতি ৩ প্যাকেট কেন?
= তুমি,মোস্তাকিম,জাহিদ তিনজন পুরুষ আমার জীবনে তাই
– আমাকে এর মাঝে টানো ক্যান, তোমার নামে এক প্যাকেট নেই?
=না আমার তো ফুল আছে
– আচ্ছা ঠিকাছে
=একটা কথা বলি?
– বলো
= তুমি এত ভালো কেনো?
– হয়েছে আর তেল দিতে হবেনা
=তেল দিচ্ছি না, একটি কথা তোমাকে একদিন বলবো।
-কি কিথা?
= পরে বলবো কোনোদিন।

ডঃ সুলতানা চোধুরীর সাথে পরিচয় বছর খানেক হবে ফেইসবুকে।চমৎকার বন্ধু ভাবাপন্ন।তবে কিছুটা এগ্রেসিভ।কেন আমার মোবাইল ডাইভার্ট করা থাকবে?আমি ইচ্ছে করলেই তাঁকে ফোন দিতে পারবো,কিন্তু তার ইচ্ছে হলে সে কেন ফোন দিতে পারবে না? এটি আবার কেমন মানসিকতা।রোজ অন্তত একটি হলেও মেসেজ দিতে হবে।তা সেটা মোবাইলের টেক্সট,মেইল বা ফেইসবুকে হোক না কেন।বিদেশ ভ্রমন কালিন সময়েও এর অন্যথা হলে চলবেনা। দু একদিন ভুলে যেতাম বা ব্যস্ততায় সময় করে উঠতে না পারলে ‘আমি তো তোমার কাছে বেশী কিছু চাইনি,এই সামান্য মেসেজও তুমি দিতে পারছো না?’ এমন কথা শুনতে হতো। তার এমন আবদার আমি হাসি মুখেই মেনে নিয়ে ছিলাম।

যখন তখন ফোন দিত সে, নিজের কথাই বলে যেত গরগর করে।তবে আমার মনে হতো সে অন্য নারীদের বিশেষ পছন্দ করতো না।অন্য কোন নারী আমার ফেইসবুক ওয়ালে একটু আন্তরিকভাবে কিছু লিখলেই সাথে সাথে ফোন,কে ঐ নারী?অন্য নারীদের সাথে এত আন্তরিকতা ঠিক না,সবাই তো আর তার মত ভালো না…… ইত্যাদি ইত্যাদি।তার এই অধিকার এবং কিঞ্চিত পাগলামী ভালোই লাগতো আমার। এ কারনে প্রশ্রয় দিতাম বেশ।প্রতিদিনের অভ্যাসে একটি মায়াও জমে গিয়েছিল।

তার স্বামীও একজন ডাক্তার।ঢাকা মেডিকেলে একই সাথে পড়তো।বিয়েটা করে ফেলেছে হঠাৎ জেদ করে।প্রেম ছিল তার জাহিদ নামে একই সাথে পড়ুয়া এক ছেলের সাথে।সবাই জানতো জাহিদের সাথেই বিয়ে হবে তার।সুলতানা,তার স্বামী মোস্তাকিন এবং জাহিদ তিন জনই ছিল বন্ধুত্বের উদাহরন।হঠাৎ কি হলো কে জানে,মোস্তাকিনকে’ আমাকে তোর আজকে বিয়ে করতে হবে,নইলে আগামী কাল ভোরে আমার মুখ আর দেখবি না,আমার লাশের মুখ দেখবি।সুলতানার এই জেদকে জানতো সবাই।অগত্যা বিয়ে কাজির অফিসে আর এই জেদের কারনেই জাহিদ হয় বিয়ের স্বাক্ষী। বিয়ের এক বছরের মধ্যে আনমনে রাস্তা ক্রস করতে গিয়ে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে জাহিদ মারা যায়।এরপর থেকে কেমন এলোমেলো হয়ে যায় সুলতানার বিবাহিত জীবনও।

আমি মফস্বলে থাকি।প্রায়ই কাজের জন্য ঢাকা যেতে হয়।সুলতানা ঢাকা থাকলেও আমাদের দুজনের দেখা হবার বিষয়ে আমরা কখনো কিছু আলাপ করিনি। সুলতানার চাওয়া তাই ১০ অক্টোবর ভোরে ঢাকায় ফুল আগরবাতি নিয়ে আজিমপুর কররস্থানে।কিছুটা কৌতূহল ছিল,আসলেই জাহিদ নামে কেউ ছিল কিনা?নাকি সব সুলতানার কল্পনা?
– আমি এসেছি আজিমপুর
= ঠিক ১০ টা ১০ মিনিটে ঢুকবে, একটু আগে পিছু হলে চলবে না।কাটায় কাটায় ১০ টা ১০
-কেন ১০ টা ১০ মিনিটের আগে ঢুকি। এখন ১০ টা ৪ বাজে.৬ মিনিট দাঁড়িয়ে কি করবো?
=দেখো মেজাজ গরম করো না, যা বলেছি তাই করবে,১০ঃ১০ এর এক সেকেন্ড আগে পরে করা চলবে না।
– এর কোন মানে হয়? আচ্ছা ঠিক আছে।
কেমন খুব বিষণ্ন এক গলা। জাহিদের জন্য মন খারাপ তাই হয়ত।যে ইমোশনাল মেয়ে,সকাল থেকে কতবার কেঁদেছে কে জানে।

– ১০ঃ১০ ঢুকলাম। কোনদিকে যাবো ?
= একদম সোজা চলে আসবে।ডান হাতের ৯ টা সরু রাস্তা পরে ১০ম রাস্তার ডান দিকে যাবে
– এরপর
= ডান দিকে ঘুরে সোজা যেতে থাকবে,হাতের বাম পাশের ২৭ নাম্বার কবর
– আচ্ছা কবরের পাশে পৌছে তোমাকে কল দিচ্ছি।
সারি সারি কবর। বাঁধানো কবরে বিভিন্ন এপিটাফ। সমস্ত কবর গুলোতেই যত্নের ছাপ। কবরের বাসিন্দাদের জীবিত আত্মীয় সজনে রা হয়ত নজর দেন এদিকে। কবরস্থানে কাজ করা কিছু মানুষ প্রায় সারাদিনই ব্যস্ত কবরের পরিচর্যায়।
সাধারন কবরগুলোও বেশ পরিপাটি।সিটি কর্পোরেশন থেকে পরিচর্যা করা হয়। দুপাশে শত শত কবর মাঝ দিয়ে হেটে যাচ্ছি ,আশে পাশে কেউ নেই।
– আমি এসেছি,কোনটা বলতো? এই রোতে তো ২৭ নম্বার কবরই নেই।
= তুমি ৯ নাম্বার রোতে ঢুকেছ
– আরে না,গুনলাম তো ঠিক ভাবেই
= তোমার কাউন্টিং এ ভুল হয়েছে,কবরের যত্নের বিষয় চিন্তা করছিলে, পিছনে তাকাও।
– আচ্ছা তাকালাম,কোনটা বলতো
= সামনের দিকে সাদা আর পিংক টাইলস করা দুটো বাধানো কবরের পাশেই দেখো।
– ওখানে তো কিছুটা জঙ্গলের মত। কিছুট বড় বড় ঘাস,কবরের মত তো বুঝা যাচ্ছে না কিছু
= হুম,কবর যারা পরিচর্যা করেন,আগামি দু একদিনের মধ্যে ওখানে গিয়ে সব ঝক ঝকে করে দিবেন।
– কিন্তু কোন কবরে ফুল,আগরবাতি দিবে?
= তুমি এদিকে আসতে থাকো,এখুনি একটি শালিক বসবে জাহিদের কবরের উপর।ওটায় দিবে।
– আচ্ছা যাচ্ছি

খুব দ্রুতই গেলাম ওখানে,একটি শালিখ বসে আছে আমার দিকে স্থির তাকিয়ে,কেমন এক বিষন্ন চোখ। আমি কাছে এলে অনিচ্ছা সত্বে যে একটু দূরে গিয়ে আবার আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
কবরে ফুলের তোরা দিলাম, আগরবাতি জ্বালিয়ে সুরা ফাতিহা তিন বার এবং সুরা ইখলাস তিনবার পড়ে অনেকক্ষণ যাবত মোনাজাত করলাম,জাহিদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে।

ফিরে আসছি,কল দিলাম সুলতানাকে।মোবাইল অফ।হঠাৎ  মনে পড়লো আরে সুলতানা জানলো কিভাবে এখানে এখন একটি শালিখ বসবে জাহিদের কবরের উপরে?কেমন একটা ভয়ের শ্রোত বয়ে যাচ্ছে মনে,বুক ধুক ধুক।দ্রুত পায়ে চলে এলাম কবরস্থানের বাইরে। ফোন দিয়ে যাচ্ছি,ফোন অফ। তিনদিন ঢাকা ছিলাম। কতবার যে ফোন দিয়েছি হিসেব নেই। অফ ফোন। সেও আর দেয়নি।

তৃতীয় দিন অনেকটা ঘোরের মধ্যে  গেলাম শাহবাগের বঙ্গবন্ধু হাসপাতালের গাইনী ওয়ার্ডে। এখানেই সুলতানা জব করে।
জানলামঃ ডাক্তার সুলতানা চৌধুরী গাড়ি দুর্ঘটনায় নিয়ত হয়েছিলেন ৩ বছর আগে ১০ অক্টোবর।

 

মোট পড়েছেনঃ ৮০৯জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

৩৮টি মন্তব্য

  1. খুবই মন দিয়ে পড়লাম, মনটা কেমন যেন কষ্টে ভরে উঠলো — সুন্দর এই পৃথিবীতে মানুষ আসে,বড় হয়, জানে বোঝে আর ভালবাসে —- এত সুন্দর নান্দনিকতা রেখে একদিন চলে যায় ——-চলে যেতেই হয় ——

  2. মৃত্যুর পরে শালিখের বেশে ডাঃ সুলতানা এসে হাজির হয়েছে? বাপরে ভয় পাইছি ভাইয়া। ভালোবাসার হ্যাপাও তো কম না দেখছি, মরে গেলেও ভূত হয়ে আসবে। আপনি তো ভালোই ভূতের গল্প লিখতে পারেন ভাইয়া, এতদিন ঘাপটি মেরে ছিলেন কেন?

  3. গল্পটা পড়ে আমার একটা কথা মনে পড়ে গেছেঃ যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়।
    গল্পটায় আমার একটু মন খারাপ করা ভাললাগা এবং হঠাৎ চমকে উঠার একটা ব্যাপার আছে, আমার বেশ ভালো লেগেছে।

    শুভকামনা নিরন্তর জানিবেন মামা।

  4. সোনেলা একজন ভুতো গল্পকার পেয়েছে দেখে ভালই লাগল।
    নিয়মিত লিখলে হয়ত জ্যান্ত ভুতের ভয় পেয়ে যেতে পারি।
    বেশ থ্রিলিং হবে ব্যাপারটিও।

  5. বাপরে! শালিক দেখি মনের কথাও পড়তে পারে।
    জাহিদের সাথে প্রেমের সম্পর্ক থাকার পরেও কোন সে জিদের মাথায় সুলতানা মোস্তাকিনকে বিয়ে করলো তা জানতে ইচ্ছে করছে। ;?
    জাহিদের মৃত্যু ১০ অক্টোবর গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে। ওদিকে সুলতানার মৃত্যুও গাড়ি দুর্ঘটনাজনিত কারণে। তবে কী এই দুয়ের মাঝে কোনো সংযোগ আছে?

    1. গল্পটি কয়েকভাবে ভাবা যেতে পারে
      সুলতানা মারা গিয়েছিলো ৩ বছর আগে।
      লেখকের উপর ভর করে সে লেখককে দিয়ে জাহিদের কবরে ফুলের তোরা, আগরবাতি দিয়েছে।
      জীবিত থাকা অবস্থায় যা সে দিতে পারেনি।

      আসলে সুলতানার মৃত্যুর অংশটুকু বাদে ঘটনাটি সত্যি
      আমার এক পরিচিত পাগলাটে মানুষ একজনের কথায় এক কবরে এমনি করে ফুল দিয়েছে।
      এই সত্যি ঘটনার সাথে কেবল শেষ লাইন যোগ করেছি।

  6. ভালোই লেগেছে।
    কিছু দুর্বল দিক আছে লেখায়।যেখানে সমস্ত কবরগুলো পরিপাটি করা যেখানে একজন ডাক্তারের কবরের ওখানে কিছু আগাছা থাকা অস্বাভাবিক।এটিকে কয়েকটি প্রায় একই রকম দেখতে বাঁধানো কবর বলা যেতে পারে।
    লেখা চালু থাকুক।

  7. জিসান যে একটা ভূতের পাল্লায় পরছে তা আমি আগেই বুঝতে পারছিলাম, কিন্তু ফোনের তালে সে কিছুই খেয়াল করেনাই। কবরের যত্নের বিষয়ে চিন্তা করছিলে, ক্যাম্নে বুঝলো?
    ভালো হইছে গল্প। আপনাকে দিয়েই হবে গুরু।

    1. ভুতে সব বুঝে যায়, তাই বলতে পেরেছিল।
      কিছুটা সত্য এই এই গল্পটা………
      তবে এর চেয়েও ভয়ংকর একটি অভিজ্ঞতা আছে।
      ধন্যবাদ আপনাকে।

  8. ওরে বাবা রে ডর খাইলাম। নানা তুমি ভূতের লেখা লিখো! ;( ডরের চোটে কেমন কান্না ঝরছে দেখো। এজন্যই আজ এখানে চরম বৃষ্টি হয়েছে দিনে। :p

    এইবার আসি ছিরিয়াছ(সিরিয়াস) প্রসঙ্গে। কাহিনী অন্যরকম এবং সুপার্ব। তবে আমিও একমত লীলাবতী দিদির সাথে কবরের ব্যাপারটা নিয়ে।

    লেখো। থামিও না। (y) -{@

মন্তব্য করুন