রিনিঝিনি চুড়ি

“যদি চুড়ি পরিয়ে দাও দুই হাতে সত্যি বলছি, সারাজীবন থাকবো তোমার সাথে। ” চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ শুনলেই মনে হয় ; হাতে রংধনুর মেলা বসেছে। কানে ছোট দুল, কপালে ছোট টিপ, পাশাপাশি একগুচ্ছ চুড়ি,  অতুলনীয়।

সাজ পোশাকের অনুষঙ্গ হিসেবে চুড়ির আবেদন সবসময়ই। চুড়ি পরার কোন বাধা ধরা নিয়ম নেই। পোশাকের সঙ্গে রং মিলিয়ে য়েমন পরা যায়, তেমনি কন্ট্রাস্ট করেও পরা যায়। চুড়ি থাকলে সাজটাই যেনো অন্যরকম সুন্দর হয়ে ওঠে। চুড়ি হাতের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়। সাজগোছে আনে নান্দনিকতা।

বাংলা নববর্ষ,  পূজা, পার্বণসহ জাতীয় দিবসগুলোতে নারীর হাতে রিনিঝিনি চুড়ি কখনোই বাদ পরে না। যে কোন উৎসবে কাচের চুড়ির জনপ্রিয়তা বেশি। এর পাশাপাশি প্লাস্টিক, কাঠ, মাটি, পুঁতি ও সূতার তৈরি চুড়িও বেশ জনপ্রিয়।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতা থেকেই নারীর সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে কাচের চুড়ির প্রচলন ঘটে। তখনকার চুড়ির ফর্ম ও শৈলী ছিলো প্লেইন। কিন্তু মধ্যযুগে তা পরিবর্তিত হয়ে খাঁজকাটা হয়েছে। ওজনে ভারী হয়েছে, রং এ এসেছে ভিন্নতা। পাকিস্তানে ( যিশু খ্রীস্টের জন্মেরও ২৬ শ বছর আগে) পাওয়া এক মূর্তিতে দেখা যায় নৃত্যরত এক বালিকার বাম হাতে চুড়ি। তখনকার দিনে, বিয়েতে নারীদের দুই বাহুতে শোভা পেতো রঙ বেরঙের চুড়ি।

ছোটবেলায় জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতাম কখন চুড়িওয়ালা হাঁক দিবে। ” চুড়ি নেবে  গো — রঙ বেরঙের চুড়ি —-! ” যদিও সেই দৃশ্য এখন আর চোখে পরেনা। ফেরিওয়ালার চুড়ি পরানোর কায়দা ছিলো চমৎকার। হাতে ব্যথাও লাগতো না। আবার চুড়িও ভাঙ্গতো না।

এই যে হরেক রকমের চুড়ি, তার পিছনেও আছে কিছু কারণ। প্রতিটা রঙই কিছু না কিছুর প্রতীক।  যেমন :

লাল —– ভালোবাসা

নীল ——-জ্ঞান

বেগুনি —–স্বাধীনতা

সবুজ ——বিবাহিত

হলুদ——-সুখি

কমলা ——সাফল্য

সাদা ——–নতুন করে শুরু করা

কালো —— শক্তি

রূপালি ——-তেজ

সোনালি ——সৌভাগ্যের প্রতীক।

বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ দেশে চুড়ির প্রচলন আছে। চেকে naramek, ডাচে enkelring, ফিনিশে rannerengas, জার্মানে armreif, হাঙ্গেরিয়ানে karperec, ইন্দোনেশিয়ায় gelang, ইতালিয়ানে braccialette, মালয়ে gelang, স্পেনিশে brazlete,  তুর্কিতে halhal, তামিলে ভালায়ন, নেপালিতে চুরা নামে পরিচিত।

এবার চোখ বন্ধ করে কল্পনা করি, তাঁতের শাড়ি, খোঁপায় ফুল, আর দুহাত ভর্তি রেশমি চুড়ি পরিহিতা এক বঙ্গ ললনাকে!  যার প্রতিটি পদক্ষেপের চঞ্চলতায় প্রকাশিত হবে রিনিঝিনি শব্দের মধ্য দিয়ে। সেই আওয়াজ ছন্দময় হয়ে উঠবে তার সারা বাড়ি। ফিরে ফিরে তাকে দেখার জন্য আকুলি বিকুলি করবে প্রাণ। বোঝাই যাচ্ছে, চুড়ি ভালোবাসায় মাতাল হওয়ার উপাদান।

” কিনে দে,  কিনে দে রে তুই রেশমি চুড়ি

নইলে করবো তোর সাথে আড়ি। ”

শিল্পী কণার গাওয়া গানটা একটা ভালো উদাহরণ চুড়ির কাব্যিকতা আর সৌন্দর্যতা বুঝাতে।

চুড়ি ছাড়া সাজ অসম্পুর্ণ। পোশাকে বাঙালিয়ানা ফুটিয়ে তুলতে চুড়ির কোন বিকল্প নেই।

মোট পড়েছেনঃ ১০,৫৭৫জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

৪০টি মন্তব্য

  1. ” কিনে দে, কিনে দে রে তুই রেশমি চুড়ি
    নইলে করবো তোর সাথে আড়ি। ”
    কিনে দি রেশমি চুড়ি, নইলে যাব বাপের বাড়ি- দিয়েছিলেন নাকি এমন হুমকি? বাবা রে বাবা, সোনেলায় কত টিপস্ যে পাওয়া যাচ্ছে।
    কেউ চুড়ি হুমকি কমিটির লিডার, কেউ বোতাম হন্তারক কমিটির লিডার। একটা একটা করে সবাই ট্রাই করতে থাকলে সামনে ঘরে ঘরে সমুহ বিপদ! হা হা হা হা।
    ভালো লাগলো বিশদ জেনে। সব সাজুনি গুজুনি সুন্দরীরা চুড়ি পরে রিনিঝিনি করুক প্রাচীন নারীদের মত এই কামনা।
    শুভ কামনা।

    1. ওয়াও। দারুণ কমেন্ট। বিয়ের সময় আব্বাকে বলেছিলাম। কিছু না দিলেও চুড়ি / চুড় দিতে হবে।
      চুড়ি একহাতে অন্য হাতে ঘড়ি। দারুণ মানিয়ে যায়।
      শুভকামনা

  2. ভালো লাগলো চুড়ি নিয়ে পোস্টটা। সত্যিই তাই চুড়ি ছাড়া নারীরা অসম্পূর্ণা। শাড়ি, সালোয়ার কামিজ এমনকি ওয়েস্টান ড্রেসেও চুড়ি বেশ মানানসই

    1. বাপরে আপু আপনার এতো ধৈর্য্য, সময় হয় কেমনে এতোসব ডাটা কালেক্ট করার? কতো সুন্দর করে গুছিয়ে লিখতে ও পারেন। অসংখ্য ধন্যবাদ আপু। চুড়ি নিয়ে এসব কিছুই জানা ছিলো না। লেখাটি প্রিয়তে নিলাম। শারদীয় দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা ও শুভকামনা রইলো

      1. আমি টার্গেট করেই রেখেছি, পূজো উপলক্ষে এই লেখাটা দিবো। কারণ ছোটবেলার মেলার ঘুরে ঘুরে চুড়ি কেনার কথা মনে হয়।
        প্রিয়তি দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।
        পূজো ভালো কাটুক।
        শুভকামনা

  3. রং যে এগুলো রিপ্রেজেন্ট করে এই প্রথম জানলাম। চুড়ির কাহিনী এই -ই জানলাম।
    বিস্তর গবেষণা করেছেন বুঝতে পারছি, নিজের পছন্দের কথা তো কিছু কৈলেন-না ,
    আর আর্য রমণীরা কেমনে কী করত কে জানে।

  4. সেই কিশোরী বেলা থেকে চুড়ি আমার প্রথম প্রেম। ঈদের সালামী পেয়েই আগে দৌড়ে যেতাম রেশমী চুড়ি কিনতে। এখনো চুড়ি আমার প্রথম পছন্দ সাজপোশাকে। দ্বিতীয় পছন্দ কাজল।চুড়ি আর কাজল ছাড়া বঙ্গললনা মানায় নাকি। উপরি বোনাস খোঁপায় জড়ানো গোলাপ অথবা বেলীফুলের মালা, দুই ভ্রুর মাঝে ছোট্ট একটা টিপ….আহা, আর কি লাগে। চুড়ি নিয়ে গবেষণা ভালোই করেছেন। বিবাহিত -অবিবাহিত চুড়ির রং বিশ্লেষন এই প্রথম বলবো না, অল্পবিস্তর জানতাম, সাতরঙা চুরির বিশ্লেষণ আজ জানলাম।

    1. আমারও চুড়ি খুব পছন্দের। আর আপনার বর্ণনায় বঙ্গ ললনাকে লাগবে অতুলনীয়।
      ফুপি পোস্টটি আপনার পছন্দ হয়েছে বলে আমি খুশি।
      শুভকামনা

  5. চুড়ি সম্পর্কে অনেক কিছুই জানলাম। এত আগে থেকে চুড়ির প্রচলন!
    বাঙালীর সাঁজ সজ্জা চুড়ি ছাড়া অসম্পূর্ন থাকে।
    রঙ এর অর্থ তো জানাই ছিলো না।

    ভালো পোষ্ট।
    শুভ কামনা।

  6. আয়না বসা,কাঁচের চুড়ি,রোদের ছোঁয়া, ঝিকিমিকি ❤️❤️❤️লেখাটি শুরু করার সাথে সাথে কি যেন আমাকে খুব করে টানছিল,,,আপনার আঁকা সেই বঙ্গনারী নিজেকেই মনে হয়েছে। চোখটা বন্ধ করলাম আর নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছি কপালে ছোট টিপ,কানে ছোট দুল,পরনে তাঁতের শাড়ী আর হাতে ম্যাচিং কাঁচের চুড়ি।আমার কাঁচের চুড়ি কালেকশন ও এক ধরনের শখ আপু।আর বিভিন্ন দেশে চুড়ির বিভিন্ন নাম জানলাম এই লেখায়,এছাড়া রং এর প্রতীকগুলো ও জেনে ভাল লাগল।শুভকামনা আপু।

  7. চুড়ি মানেই রিনিঝিনি সুর মনের ভেতর কি বাহির!
    চুড়ির প্রতি ভালোবাসা বঙ্গ ললনার জন্মগত।
    পরতে ও ভালো লাগে কালেকশনে রাখতে ও ভালো লাগে।
    চুড়ি সম্পর্কে কতকি জানলাম।
    খুব ভালো বিষয় নিয়ে লিখেছেন আপু।
    অনেক ভালোবাসা রইলো

  8. ইমিটিশনের ভীড়ে আজ কাঁচের চূড়ি হারিয়ে যেতে বসেছে। পহেলা বৈশাখ বা গ্রামীন কোন মেলায় এখনও কাঁচের চূড়ির কদর আছে। আমার মা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাঁচের চূুড়ি পড়েছেন। তার একটা চূড়ি ভেঙ্গে গেল দেখেছি ‍উনি মন খারাপ করে বসে থাকতেন। আজকাল আমাদের বউ ঝিরা কাচের চূড়ি থেকে বেশ দূরে।
    আপনার রঙের প্রতীক জেনে ভাল লাগলো।
    দারুন একটা পোষ্ট দিলেন।

    1. আপনার মায়ের কথাটা আমাকে আপ্লুত করলো।
      তবুও চুড়ির কদর কমেনি। ম্যাচিং করে পরতে গিয়েই তো বিভিন্ন ডিজাইনের চুড়ি লাগে।
      ধন্যবাদ আপনাকে পড়ার জন্য। আর শুভকামনা।

  9. চুড়ি নিয়ে এতো কিছু কখনোই ভাবিনি’। তবে রেশমি চুড়ি আমার খুব পছন্দের। আপনার লেখা পড়েয চুড়ি কেনার প্রতি আমার লোভ আরো বেড়ে গেল।

    ভালো থাকুন আপু।

  10. “যদি চুড়ি পরিয়ে দাও দুই হাতে সত্যি বলছি,
    সারাজীবন থাকবো তোমার সাথে। ”
    তাইতো বলি চুড়ি ওয়ালার কেন এতো ভাগ্যবান হয়
    টিফিন ছুটির ফাঁকে ললনারা তাকে ঘিরে রয়।
    ভারি মজা পেলাম। শুভ কামনা।

  11. এত এত চুড়ি দেখেতো আমার মন এখনই অস্থির হয়ে গেছে! রেশমি চুড়ি আমার ভীষণ পছন্দের। একমাত্র চুড়ির বেলায় আমি রঙ পছন্দ করার সময় কনফিউজড হয়ে যাই। মনে হয় সব রঙের চুড়ি একসাথে পরি।
    খুব সুন্দর পোস্ট দিলেন।
    ভালো থাকুন সারাক্ষন। শুভ কামনা 🌹🌹

    1. আপনাদের দারুণ দারুণ কমেন্ট আমার ভালো লাগে তাই না! লেখার গতিও বাড়ায়।
      আমি মাঝে মাঝে এক একটা রং একসাথে অর্থাৎ রংধনু করে পরি।
      চুড়ি ছাড়া সাজ পরিপূর্ণ হয় না।
      ভালো থাকবেন সবসময়।

  12. চুড়ি আমারও ভালো লাগে। এখন থেকে চুড়ি কিনে জমানো লাগবো। কাঁচের নীল চুড়ি বেশি পছন্দ।

    চুড়ি সম্পর্কে ইতিহাস জানলাম, জানা থাকা ভালো।

    1. সেজন্য জানালাম।
      এখন থেকে জমা শুরু করেন। নীল চুড়ি, নীল টিপ।
      তারপর সেইদিন দাওয়াত পাইলে এক ডালা গিফট দিবো
      শুভকামনা ছোট

  13. চুড়ি কিনে কিনে জমা করা একসময় নেশার মতো ছিল। এই নেশার শুরু সেই ছোট্টবেলাতেই, যখন থাকতাম পল্লীকবির মধুমতী নদীর কাছাকাছি। বেদের বহর থেকে কেউ কেউ সাপের ঝাঁপি আবার কেউ ঝাঁকাভর্তি চুড়ি নিয়ে লোকালয়ে এসে হাঁক পাড়তো। কিনতে কিনতে এত চুড়ি জমা হয়েছিল যে, আম্মা বাধ্য হয়ে সেগুলো রাখার জন্য একটা আলনা কিনে দিয়েছিলেন। আহা, কোথায় হারিয়ে গেছে সেসব দিন! আপনার লেখা পড়ে আবার নেশাটা জেগে উঠছে মনে হচ্ছে।

    চুড়ি কিনেছি, পড়েছি কিন্তু এত তথ্য জানা ছিল না। আপনার সুন্দর পোস্টে জানলাম চুড়ির অজানা চমৎকার তথ্য।

    1. আপি আমি ধন্য হলাম। সবার ভালোবাসায় আমি সিক্ত। আর কলম চলবে। দোয়া করবেন।
      চুড়ি ছাড়া সাজ অসম্পূর্ণ।
      আপনার জন্য 🌹 শুভেচ্ছা

  14. সাজুগুজু করতে এতো লাগে। বুঝিনিতো আগে।
    চুড়ির চুড়ায় রঙ্গে রাঙ্গায়
    মন চুরি চুড়িতে বাহুময়
    রঙ্গে রঙ্গে টেউ তুলে
    চঞ্চল মন রাংগিয়ে
    চলনা যায় মন ভুলিয়ে, মন পুরিতে।

  15. এক সময় রেশমি চুড়ি কেনার খুব নেশা ছিল। প্রতিটি শাড়ীর সাথে এই চুড়ি কিনতেই হবে। দুই হাত ভরে চুড়ি পরে থাকতাম।ভীষণ রাগ হলে চুড়ি ভেঙেও ফেলতাম। আজ পুরানো দিনে ফিরে গেলাম চুড়ির ছবি দেখে।সুন্দর পোষ্ট।
    রঙের ক্ষেত্রে যে বিবরণ পেলাম,তাতে ফুলের রঙের সাথে মিল নেই। এটাও জানা হলো।সেজন্য অফুরন্ত ভালোবাসা রইলো।
    খুব ভাল থাকুন সামিয়া। শুভ কামনা সব সময়।

মন্তব্য করুন