জঞ্জাল শব্দের অর্থ আবর্জনা, ময়লা ইত্যাদি। শুধুমাত্র ডাস্টবিনেই জঞ্জালের খোঁজ মিলবে, এমন কোন কথা নেই। আমাদের শরীরে, আমাদের মনে, আমাদের সংসারেও জঞ্জাল জমা হয়। জমে থাকা জঞ্জাল পরিস্কার করতে দেরী হলে আবর্জনা তো পরিস্কার হবে। কিন্তু ততদিনে ভেতরে হয়ত ঢুকে যাবে জীবানু। সেই জীবানু থেকে মুক্তি পেতে দীর্ঘ ঝঞ্ঝাটের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। এদিকে জঞ্জালের প্রতিশব্দও কিন্তু ঝঞ্ঝাট। অর্থাৎ আপনি যে জঞ্জালে আটকে গেছেন, তা থেকে মুক্তি পেতেও আপনাকে জঞ্জালের ভেতর দিয়েই যেতে হবে। কিন্তু মুক্তি কি মিলবে!
মায়ার জঞ্জাল সিনেমাটিতে কোন নাচ-গান নেই। সে হিসেবে এটাকে আবার আর্টফিল্মও বলার উপায় নেই। এটাকে বলা যেতে পারে স্মার্ট ফিল্ম। যেমনটা আলমগীর কবীর বা আমজাদ খান নির্মাণ করতেন। মাসালা সব উপাদান থাকার পরও তা মাসালা নয়। আবার আর্টও নয়। আমি এর নাম দিয়েছি স্মার্ট ফিল্ম।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি ছোটগল্প অবলম্বনে ‘মায়ার জঞ্জাল’ সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে। বড় চ্যালেঞ্জ ছিল গল্প দুটোকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসা নিয়ে। অনেক বছর পর অপি করিমের সিনেমা, সোহেল মণ্ডল, ঋত্বিক চক্রবর্তী, চান্দ্রেয়ী ঘোষ, পরান বন্দোপাধ্যায়, কমলিকা ব্যানার্জি এবং ব্রাত্য বসু’র মতো শক্তিশালী পাত্র-পাত্রীর সঠিক ব্যবহারটা করা যাবে কিনা, সেটাও কম চ্যালেঞ্জ নয়।
অভিনয় দুই রকম। প্রথমত অভিনয় না করা, যাতে দর্শকের মনে হয় যে সে চোখের সামনে চলমান কোন ঘটনা দেখছে। আর দ্বিতীয়ত অভিনয় করা। যেটা সু এবং কু যে কোনটাই হতে পারে। বাংলাদেশের অভিনয় ইন্ডাষ্ট্রির সর্বশেষ ‘নারী সুপারস্টার উইথ ক্লাস’, অপি করিম প্রথম ধারার অভিনয়টাই করেছে। যে ধারার অভিনয়টা এই দেশে বিরল। অনেকে চেষ্টা করেছে কিন্তু পারে নি। বরং হাই বা লো তে ওভার এক্টিং করে বসেছে।
ছোট্ট ছোট্ট সময়ের উপস্থিতিতে শাঁওলি চট্টোপাধ্যায় আলাদাভাবেই নজর কেড়েছে। সোহেল মণ্ডল এই সময়ের ভরসার নাম। সে নামের সুবিচার করেছে। কমলিকার চরিত্রটির মাঝে বোঝাপড়ার যে ব্যপারটা আছে, তা চমৎকার। পরাণ বন্দোপাধ্যায় কিভাবে যেন স্ক্রীন দখলে রাখেন সব সময়। ঋত্বিকের চরিত্রটি নিয়ে আরেকটু খেলা গেলে ভাল হতো। সিনেমার দৈর্ঘ্য তাতে আরো ৫/৬ মিনিট বাড়লে সিনেমাটার কোন ক্ষতি হতো না।
আলাদাভাবে দুজনের কথা বলতে হবে। প্রথমত অন্যতম প্রধান চরিত্রে চান্দ্রেয়ী ঘোষ যে ব্যাক্তিত্ব এবং ধার, পর্দায় দেখিয়েছেন তা দূর্দান্ত ছিল। কিন্তু সব ছাপিয়ে ব্রাত্য বসুর চরিত্রের যে দর্শন, সংলাপ এবং কথোপকথনে উঠে এসেছে তা ভুলে যাবার সুযোগ সহজে হবে না। অতিথি চরিত্রে হলেও, মূল চরিত্রগুলোকে ভুলিয়ে দিয়েছেন ভাবনার সরলতা দিয়ে।
সর্বশেষ এক পাগল চরিত্র, একটা দৃশ্য এবং দুটো সংলাপের কথা বলবো।
সিনেমাতে একটা পাগল চরিত্রে আছে যে ঘুরে ঘুরে প্লাস্টিকের বোতল সহ এ জাতীয় আবর্জনা কুড়ায়। বলা যেতে পারে, শহরের জঞ্জাল পরিস্কার করে। একদিন সে চা খাচ্ছে। ব্রাত্য বসু তাকে টাকার নোট এগিয়ে দিয়ে নিতে বলে। সে শুধু তাকিয়ে থাকে কিন্তু নেয় না। কেন নেয় না! পর্দায় আমরা ব্রাত্য বসুর যে চরিত্রটা দেখলাম সেটা তো খুবই ভাল এবং সভ্য জন। তাহলে পাগল কেন মানা করলো! মানুষ, মানুষকে চিনতে না পারলেও পাগলরা তো চেনে! রহস্য রয়ে গেল। অন্যদিকে দামী পার্লারে একজন গণিকা আর একজন কর্পোরেট লেডি পাশাপাশি চেয়ারে বসে সৌন্দর্য বৃদ্ধির সেবা নিচ্ছে। দৃশ্যটা অনেক বার্তা বহন করে।
চান্দ্রেয়ী ঘোষের ‘মুখ দেখার’ সংলাপটা শুনে আপনারও মনে হবে, মানুষের মুখ দেখি। সেখানে সব লেখা থাকে কিংবা ব্রাত্য বসুর ছোটবেলার গল্পের সাথে দীর্ঘশ্বাসের সাথে বেরিয়ে আসা “সেই মা-ও আর নেই, সেই শিং মাছও নেই, সেই জ্বরও আর হয় না”, শোনার সাথে সাথে আপনারও মন চাইতে পারে ছোটবেলার মতো আবার জ্বর আসুক। ৩দিন জ্বরের পর সেই ফোড়নের মসলা দিয়ে কাঁচকলা দিয়ে শিং মাছের ঝোল দিয়ে মায়ের হাতে ভাত খাই। ব্রাত্য বসু সরলভাবে আপনাকে সেখানে নিয়ে যাবে দৃশ্যটিতে।
সিনেমাটার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল ফ্রেমিং। প্রতিটি ফ্রেম কথা বলেছে। সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশের সহযোগীতা নিয়ে ফ্রেম রচনা না করে, নিজস্বতা দিয়ে যে অসাধারণ ফ্রেমিং দিয়ে সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে, তার জন্য সাধুবাদ জানাতেই হবে।
সিনেমাতে সংসার আছে, সংসারের গল্প আছে, সংসার গড়ার স্বপ্নের গল্প আছে। ভাবনা বদলে যাওয়া, ভাগ্যের সরল পথ থমকে যাবার আশংকা আছে। অনেকগুলো অমিংমাসিত সত্য আছে। দর্শক হিসেবে আপনি মাথায় কিছু প্রশ্ন নিয়ে হল থেকে বের হবেন। হিসাব মেলানোর চেষ্টা করবেন চরিত্রগুলো সংযোগ স্থাপন এবং বিচ্ছিন্নতা নিয়ে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে সিনেমাটিতে যে মানবতার গল্প উঠে এসেছে, তিনটি স্থানের চরিত্রগুলো যে মানবিক দিক উঠে এসেছে সেটাই এই ওটিটি আর ধর-মার-কাট যুগের কাহিনীচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। প্রযোজক এবং নির্মাতা স্রোতে গা ভাসালে তাদের কোন ক্ষতি হতো না। কিন্তু আমরা দর্শকরা বঞ্চিত হতাম। অন্য কেউ হয়ত এই গল্পের চরিত্রগুলোর মানবিক দিকটা পাল্টে দিয়ে সস্তা তালির আয়োজন করতো। কিন্তু প্রযোজক-নির্মাতা এখানে সত্য নিয়ে দাঁড়িয়েছেন, যা প্রশংসার দাবী রাখে।

এবার ভিন্ন কিন্তু সম্পৃক্ত কিছু কথা:

মিডিয়াতে দুই শ্রেণীর মানুষ আছে। একদল মূলত টাকার বিনিময়ে মনোরঞ্জনকর্মী। যারা কোন পেশাগত কোন দায়/দায়িত্ব পালন করে না। কিন্তু তথাকথিত সেলিব্রেটি তারা। তারা নিজেরা তো স্রোতে ভাসবেই, পাশাপাশি কেউ স্রোতের বাইরে গিয়ে নিজস্বতা দেখাতে চাইলে সেটাকে আড়াল করতে সিন্ডিকেট করে সক্রিয় হয়। মায়ার জঞ্জাল সিনেমাটি মিডিয়ার সেই মনোরঞ্জনকর্মীদের কু-নজরে পড়েছে। সিনেমাটি যেখানে বিনোদন জগতের সক্রিয় ব্যাক্তিদের আলোচনায় থাকার কথা, সেখানে সবাই নিরবতা পালন করছে। অর্থাৎ চুপ থেকে যদি ক্ষতি করা যায় আর কি! আরেকদল দায় মেটাতে নানা রকম ঝুঁকি নেয়। কখনো মত প্রকাশের মাধ্যমে, কখনো সৃষ্টিশীল নির্মাণ করে। প্রযোজক জসিম উদ্দিনের ‘মায়ার জঞ্জাল’ আর্ট, ক্লাস এবং দায়িত্ব পালনের মতো একটি চলচ্চিত্র। শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র না হলেও উত্তম চলচ্চিত্র।
যারা সিনেমা দেখতে ভালবাসেন, যারা নন মাসালা সিনেমা ভালবাসেন, যারা এই দেশের তথাকথিত আর্টফিল্মের ঘুমপাড়ানী ম্যাড়ম্যাড়ে গল্পের বাইরে আধুনিক সিনেমার দেখতে চান তারা নির্দ্বিধায় সিনেমাটি দেখতে পারেন।
জয় হোক বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের
৩০০জন ২০১জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ