বৃষ্টি পতনের জলে পদ্ম

নীলাঞ্জনা নীলা ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার, ০৪:২০:৫৬পূর্বাহ্ন গল্প ২৪ মন্তব্য
মেঘের জলের নাচন...
মেঘের জলের নাচন…

অসময়ের বৃষ্টিতে পুরোটা শহর ডুবে গেছে। এর মধ্যেই যতো ধরণের বিপদ এসে ঘাড়ে চাপে। সূচি তিনদিন ধরে আলু সেদ্ধ আর ডাল এই খেয়েই আছে, ভাইটাও খুব ভালো আবদার কম । যা দেয়া যায় তাতেই চুপচাপ গিলে নেয়। প্রস্তর খেয়ে ঠিক দুপুরে একটু শুয়ে নেয়। ও শুতে যাবার পরে উটকো ঝামেলার সৃষ্টি শুরু হলো, বিকেলে দরোজায় কে জানি শব্দ করছে । বাসার সামনের রাস্তা পুরোটা ডোবা এর মধ্যে কে আসবে, স্বগতোক্তি সূচির।
—কে, কে ?
কিন্তু কোনো সাড়া নেই। মনে হয় বস্তির ছেলে-মেয়েগুলো। সূচির মনটা মায়ায় ভরা। ওরা নিজেরাই কি অবস্থায় আছে, আহারে বস্তির বাচ্চাগুলোর অবস্থা কি না কি জানি! ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কিছুই করতে পারেনা এ জন্য আরো মেজাজ বিগড়ে ওঠে। ঈশ্বর যেনো কারুর কষ্ট দেখে কান্নার জল মধ্যবিত্তকেই দিয়ে রেখেছেন। রিক্সাওয়ালা বেচারার পরিশ্রম দেখে মনটা কেমন যে লাগে আবার রাগও ওঠে কিছু কিছু রিক্সাওয়ালাদের জন্য। মায়া তো দূরের কথা এক টাকা ভাড়াও দিতে ইচ্ছে করে না। আবার দরোজায় শব্দ। আসলে ভয়ে দরোজা খোলে না সূচি। সামনে অনেক জল সাপ-ব্যাঙ নাকি ঘোরাঘোরি করছে। করারই কথা। এ শুধু নামেই ঢাকা শহর কিন্তু সূচি থাকে একেবারে বস্তির কাছাকাছি। ভাড়া অনেকটাই কম, কিন্তু তাতেও চালানো দায় হয়ে পড়ে। ভাই প্রস্তর টিউশনি করে কিছু আয় করে আর সূচি একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষিকা। কিন্তু তাতে কই আর চলে! বাবা-মা তো সেই কবেই আলাদা হয়েছে প্রস্তরের জন্মের আগেই। তবু মা, বাবার সাথে দেখা করিয়ে দিতো। কিন্তু কখনোই বাবার প্রতি কোনো টান অনুভব করেনি। বাবা যেদিন মা কে চড় দিয়েছিলো সেই মূহুর্তেই মাকে বলতে শুনেছিলো সূচি, ‘না খেয়ে থাকবো তবু তোমার সংসারে আর একদিনও না।’ বলতে গেলে প্রায় এক কাপড়েই বের হয়েছিলো মা। প্রস্তর তখনও মায়ের পেটে। সূচি তখন মোটে উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রী, এস.এস.সি পরীক্ষা দেবে। মাঝে-মধ্যে সূচি ভাবে, আসলে বাবা-মায়ের যৌন কামনার ভুল সূচি আর প্রস্তর। মায়ের মৃত্যুর পর আর বাবার কাছে একদিনও যায়নি সূচি। আবার দরোজায় শব্দ। প্রস্তর পুরো ঘুমে। যা থাকে কপালে খুলে দেখে বুড়ো মতো একজন মানুষ বুক পর্যন্ত ভেঁজা। শীতে কাঁপছে। সূচির মায়া লেগে গেলো আবার ভয়ও চোর-ডাকাত নয়তো?
—আমারে একটু বইতে দিবেন গো মা?
আবার থেমে বুড়ো লোকটি আবার বললো, ‘একটু পানি দিবেন?’
বুড়ো লোকটির কাতর কন্ঠ নিজের দাদুকে মনে করিয়ে দিলো সূচিকে। একটা মোড়া এগিয়ে দিয়ে বললো, ‘বসেন এইখানে। আমি পানি নিয়ে আসছি।’
প্রস্তরকে ডাক দিলো, ‘এই ভাই উঠ তো দেখ কে এসেছে!’ আদুরে ভঙ্গীতে চোখটা খুলেই আবার অন্যপাশে ঘুরে ঘুম। ভাইটা খুব আহ্লাদী। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ‘দিদি রে আজ কলেজ যাবোনা থাকি বাসায়?’ মায়ের আদর পায়নি একটুকুও । ওকে জন্ম দেবার পর মায়ের শরীর এতোটাই খারাপ ছিলো যে মা স্কুলে যেতো খুবই কষ্ট করে। প্রস্তর যখন দশ বছরের তখনই মা চলে গেলো। সেই কষ্ট আগলে রাখে দিদি সূচি। কখনো রাগ উঠলেও ভাইকে চোখটুকু পর্যন্ত রাঙ্গায়নি। সন্তানকেও তো মানুষ একটু হলেও বকুনী দেয় সূচি তাও করেনা। মনে হয় ও তো কিছুই পায়নি, না বাবার আদর না মায়ের।
জলের গ্লাস হাতে নিয়ে গিয়ে দেখে বুড়ো লোকটি মাটিতে শুয়ে আছে সেই ভিঁজে কাপড় নিয়েই। দেখেই এমন একটা মায়া আহ! হঠাৎ মনে হলো অসুস্থ নাকি? এবার আর না পেরে ‘এই ভাই ওঠ না এখুনি।’ প্রস্তরকে টেনে পাশের ঘরে নিয়ে এলো।
—এ কে? দরোজা কেন খুলেছিলি? এই মায়াই তোকে যে কোথায় নেবে কে জানে! আর পারিনা তোকে নিয়ে রে দিদি।
প্রস্তরের এমন কথা শুনে চমকে উঠে তাকালো সূচি। কত্ত বড়োদের মতো কথা বলছে। ‘বল আমি কি করবো?  দরোজায় কতোক্ষণ থেকে ধাক্কা দিয়েই যাচ্ছিলো তোকে ডাকলাম তুই উঠলি না। আমার কাছে জল চাইলো এনেই দেখি নীচে পড়ে আছে। এখন কি হবে? যদি কিছু হয়ে যায়? ভাই যা না পাশের ওই ফার্মেসীতে কাউকে যদি পাওয়া যায়।’
—দিদিভাই রে তোর কি মনে হয় এই জলের মধ্যে ফার্মেসী খুলে রাখবে? কি যে করিস কতোবার বলি এই মায়া কমিয়ে ফেল। নাহ দিন কে দিন তোর এই অসুখটা বেড়েই চলছে।
হঠাৎ মনে হলো বেশী বলে ফেলছে নাকি প্রস্তর? সাথে সাথেই সূচিকে জড়িয়ে ধরে বললো , ‘আচ্ছা চিন্তা করিস না দেখি কি করা যায়! আগে তো দেখি আছে কিনা বেঁচে!’  সূচি বললো , ‘এ কেমন কথা বলছিস ভাই? এমন করে বলতে হয়না।’
—দিদিভাই বেঁচে আছে, দেখি তো চয়ন কে পাওয়া যায় কিনা!— বলেই বেড়িয়ে গেলো প্রস্তর । সূচি হাত জোড় করে প্রার্থনা করতে লাগলো ‘ঈশ্বর বাঁচিয়ে রেখো।’

সূচি অদ্ভুত একটা মেয়ে যার কাছে আপন আর পর এ শব্দ দুটো কোনো কাজে আসেনা। বরং আপনের থেকে পর ভালো এই নীতিতে বিশ্বাসী সে। আপনরা তাই এখন অনেক দূরের হয়ে গেছে। তখনই বুঝেছে যারা সত্যি আপন তারা ঠিকই কোনো কিছু আশা করে না। আগলে রাখে সে যদি কাছে নাও আসে। এই যে মানুষটা আজ এলো প্রথমে তো বিরক্ত হয়েছিলো এখন তার জন্যে প্রার্থনাও করছে। আসলেই মানুষ কতো অদ্ভুত! ভেতরের মায়া-ভালোবাসাও মাঝে-মধ্যে বুঝতে পারে না। তাই তো ম্রীয়ন চলে গেলো না-ফেরার দেশে খুব কেঁদেছিলো সূচি। আর এখন খুব একা হলে মনে পড়ে। জীবন-যুদ্ধ এমন যে খুব প্রিয়তর মানুষের কথা ভাবতে হলে সময় তৈরী করে নিতে হয়। অনেকদিন পর আজ ম্রীয়নের কথা মনে হলো হয়তো এই বৃদ্ধকে দেখেই। এমন করেই চোখের সামনে পড়েছিলো ম্রীয়ন হাসপাতালে। মরে যাবে ভাবতেও পারেনি। শ্বাস থেকে মুক্তি নেবার দশ মিনিট আগেও দুষ্টুমী করে বলেছিলো, ‘সূচি ইচ্ছে করছে ঠোঁটে একটু ঠোঁট ছোঁয়াতে।’ তারপর এদিক-ওদিক চেয়ে আবার বললো, ‘সব হিসেব কড়ায়-গন্ডায় মিটিয়ে দিতে হবে কিন্তু, যখন এই বিছানা থেকে ছাড়া পাবো।’ সূচি লজ্জ্বায় চোখ নামিয়ে নিয়েছিলো। তারপর একটু আড় চোখে চেয়ে দেখে নিষ্প্রাণ দূটো চোখ সূচির দিকেই চেয়ে আছে। এক ফোঁটা জল তখন ঝরেনি অভিমানে। যখন চোখের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিলো একান্ত আপন মানুষটার শরীর, সূচির চিৎকারে হাসপাতাল কেঁপে উঠেছিলো। কে জানি বললো, লাশ এখুনি সরিয়ে নিতে হবে। এতো দুষ্প্রাপ্য, দূর্লভ, সুন্দর নামটা লাশ নামে পরিচিত হয়ে গেলো!

—আহ কেন আজ এখন মনে হলো ম্রীয়ন তোমাকে? কেন আবার এলে? কেন এই বুড়ো লোকটি আমার দরোজারই কড়া নাড়লো? এই মানুষটিও বাঁচবে না, সেও লাশ হবে। আবার মায়ার যন্ত্রণায় ক্ষণিকের জন্য নুয়ে পড়বে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রস্তরের সাথে অনিক, শুভ্র আর শুদ্ধ এলো। এসেই লোকটির পালস আবার চেক করে তিনজন মিলে উঠালো। ‘কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস’ সূচির প্রশ্নের উত্তরে প্রস্তর বললো, ‘আর কোথায়?তোমার মায়ার ফল ভোগ করতে যাচ্ছি।’ এ কথা বলেই সূচির মুখের দিকে চেয়ে প্রস্তর বুঝে গেলো খুব কষ্ট পেয়েছে এই কথায়। সঙ্গে সঙ্গেই বললো, ‘দিদিভাই একটু দুষ্টুমীও করতে পারবো না বুঝি?’ প্রস্তর ভালো করেই জানে দিদিভাই ডাকটা খুব প্রিয় সূচির কাছে।
—শোন উনাকে নিয়ে যাচ্ছি ঢাকা মেডিক্যালে দেখা যাক কি হয়। চিন্তা করিস না আমি খবর জানাবো। তবে মোবাইলটাকে একটু আদর করে কোলের কাছে রাখিস।
সূচির মনেই থাকে না মোবাইল কোথায় রেখেছে। মাঝে – মধ্যে চার্জ ফুরিয়ে গেলে আর খুঁজেই পাওয়া যায়না। প্রস্তর না থাকলে মোবাইল বোধ হয় কখনোই খুঁজে পাওয়া যেতোনা। ‘সাবধানে যাস ভাই।’ প্রস্তর ওরা  চলে যাবার পর শূণ্য ঘরে আবার একা। আবার ম্রীয়নকে মনে করা। এমন বৃষ্টিতে একদিন ভিঁজে এসে বললো, ‘চলো বাইরে চা খাবো।’ সূচি বললো, ‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? আমি চা নিয়ে আসছি।’ শিশুদের মতো জেদ করে বললো,  ‘না গেলে আমি কিন্তু আরো ভিঁজবো, ঠান্ডা বাঁধাবো, জ্বর আসবে তখন।’ সূচি জানে ম্রীয়ন খুব জেদী, আর যা বলছে তা করবেই। সেই বাসার শাড়ী পড়েই বেড়ুতে হলো। প্রস্তর ওসব দেখে বেশ মজা পেতো আর সূচি লজ্জ্বা পেতো ভাইয়ের কাছে। সেদিন ঠিকই চা খেতে হলো ভিঁজে ভিঁজে। এতো পাগলামী ছিলো ম্রীয়নের, সূচি কিন্তু মনে মনে খুশীই হতো। অথচ বাইরে এমন ভাব দেখাতো যেনো ওসব খুবই অপছন্দ। তবে ম্রীয়ন ওকে এতোটাই বুঝতে পারতো যে সূচি যা পছন্দ করে তা-ই করতো। ভালোবাসা এমন কেন, যার সাথে যাকে মানায় তার সঙ্গে সেই মানুষটি আর থাকেনা? সে মৃত্যু কিংবা জীবন যা-ই হোক না কেন! ম্রীয়ন চলে যাবার পর আর কেউ যেনো মনকে নাড়িয়ে দিতে পারেনি আসলে সূচি নিজেই চায়নি। ম্রীয়নের ছোঁয়াকে অন্য কারো স্পর্শের কাছে মুঁছে দিতে পারেনি। তা নইলে কতোজনই তো এলো আর গেলো। হাতের মুঠোয় ফোন রেখে গিয়েছিলো প্রস্তর, বেজে উঠলো হঠাৎ করে। কানে নিয়ে ‘হ্যালো’ বলার পরেই সূচির নীরব ঠোঁটে হাসিটুকু ছলকে উঠলো। একটা প্রশান্তির শ্বাস বেড়িয়ে গেলো আর সেই বৃষ্টির মধ্যে অনেক বছর পরে এক হাঁটু জলে নেমে ভিঁজতে লাগলো সূচি ।

ইতারব্যাক , ব্রাশেলস , বেলজিয়াম
১১ অক্টোবর , ২০১০ ইং।

(3  অনেক বছর আগের গল্পটাই দিলাম। আজ পহেলা আষাঢ়, আর “এমনদিনে তারে বলা যায়”, কারণ “বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল” যে তাকে দিতে হবে। তাইতো এই পোষ্ট। সবাইকে পহেলা আষাঢ়ের শুভেচ্ছা এবং ভালোবাসা। ওহ আরেকটি কথা না বললেই নয়, “পুরানো জানিয়া চেয়ো না আমারে আধেক আঁখির কোণে অলস অন্যমনে।” ভালো থাকুন সোনেলা নীড়ের সকল সদস্য।  -{@

বৃষ্টি আমার জানালায়...
বৃষ্টি আমার জানালায়…
৬০৬জন ৬০৬জন
0 Shares

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ