আগামী একঘন্টার মধ্যে বিমান উড়াল দেবে। পরিচিত বন্ধুবান্ধদের কাছে ফোন করেই যাচ্ছি। দোয়া চাচ্ছি প্রতিবার যেমন চাই। দুপুর ১ঃ২০ এ বিমান টেকঅফ করার কথা। ডিপারচার লাউঞ্জে বসে আছি, আর নন ষ্টপ কল করে যাচ্ছি। দেশ হতে বাইরে যাবার সময় আপন মানুষদের কথা মনে হয়, আপন মানুষের সংখ্যা এত তা বিদেশ যাত্রার প্রাক্কালে বিমান বন্দরে এসে উপলব্ধি করি। চেনা জানা, ব্যবসায়ীক ফোন সমাপ্ত হবার পরে, বিমানে উঠে বাসায় কথা বলি, শেষ ফোনটা বাসায়ই করা হয়।
টিভি স্কীনে দেখছি বিমান ডিলে। পরবর্তী টাইম দিল ১ঃ৫৫ মিনিট। ১ঃ৪৫ মিনিটে আবার ডিলে দেখালো। পরবর্তী টাইম ২ঃ৩০। মেজাজ কিঞ্চিত খারাপ। হঠাৎ এয়ারলাইন্স এর লোক এসে ডাক দিল সবাইকে লাঞ্চের জন্য। বিমান বন্দর এর ২য় তলায় যে পর্যটন কর্পোরেশন পরিচালিত [ বলাকা ] এত ভাল একটি হোটেল আছে জানতাম না। ডিপারচার লাউঞ্জ থেকে যেতে হয় বলে বাইরের লোকদের এই হোটেলে প্রবেশাধিকার নেই। বিমানের প্রায় ৩০০ যাত্রী একবারেই খেতে বসলাম। খাবার দেখেই মস্তিস্কে চিন্তার ঢেউ, বিমানের বিলম্ব হবে অনেক, নইলে এখানে এমন লাঞ্চ করাত না। বিমানের মাঝেই তো লাঞ্চ দেয়ার কথা। যাই হোক সবার সাথে খেলাম বিরিয়ানি। প্লেট একদম খালি করেই খেলাম 🙂
13428511_835225513249195_7829310211104196850_n

সময় বয়ে যায়, প্লেনের খোঁজ নেই কোনো, একটি সময় ডিসপ্লেতে আর ডিলেও দেখায় না। শুধু ফ্লাইট নাম্বার, কখন ছাড়বে তার উল্লেখ নেই। কি যে করি, ভাল লাগছে না। ক্যামেরা বের করলাম ছবি তুলবো। প্রথমেই আমার সামনের সীটে বসা এই সাদা মাথাকে টার্গেট করলাম। অনেক খুঁজেও একটি কালো চুল পেলাম না। ব্যাড লাক আমার 🙁
IMG_20160524_154710

দেখলাম পর্যটনের ডিউটি ফ্রি শপ, কোত্থেকে এক গায়েবী আওয়াজ মাথার মধ্যে, রয়েল স্যাল্যুট পাওয়া গেলে আনতে হবে কোরিয়া থেকে। রয়েল স্যাল্যুটের ভাই- বোনদের কাছে গিয়ে খুঁজলাম, পেলাম না। ব্যাড লাক যে কার বুঝতে পারলাম না। কিসের ফটো তুলবো? সবই তো কমন সাবজেক্ট। অপেক্ষমাণ যাত্রীদের ফটো তুলি। কত বিভিন্ন চিন্তা ভাবনা আশা নিয়ে যাচ্ছেন এক একজন দেশ হতে। শরীরে আশার নাচন কি বুঝা যায়?
IMG_20160525_102924

আমার মন যা বলছিলো তাই হল অবশেষে। ফ্লাইট ক্যান্সেল, এয়ারলাইন্সের লোকজন এসে ক্ষমা চাইল। জীবনে এই অভিজ্ঞতা প্রথম। একই দিনে ঢাকা বিমানবন্দর হতে ডিপারচার, আবার এরাইভেল। লাইন দিয়ে প্রায় তিনশত যাত্রী বের হতে কম সময় লাগলো না। বাস, মাইক্রো, প্রাইভেট কারে হুলুস্থুল মানে কার আগে কে উঠবে এমন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে বাসে স্থান করে নিলাম 🙂 হালকা কনুইয়ের গুতো টুতো দিতে হয়েছে আর কি। প্রথম বাসে উঠতে পারিনি গুতো খেয়েছি বলে, বুঝলাম গুতো দিয়েই উঠতে হবে এবং সাফল্যের সাথে এই কর্মটি সম্পাদন করলাম।  গন্তব্য রিজেন্সি হোটেল। বিমান কর্তৃপক্ষ রাখবেন ওখানে, আগামীকাল কখন ফ্লাইট জানা নেই।

অনিশ্চয়তার মাঝেই আসলে পরে গেলাম। শিউল অবস্থানের মেয়াদ একদিন কমে গেলো। সবকিছুই একদিন পিছিয়ে গেলো। ক্যানসেল হওয়া বিমানের যাত্রী হওয়া অনেক হ্যাপা। রেগুলার বিমানে এত যাত্রী কিভাবে নেবে? আমাদের দুজনার ট্রানজিট কুনমিং, এরপর শিউল। অনেকেরই কুনমিং এরপর টোকিও বা বেজিং। শিউল হোটেলে ফোন করে জানালাম আমাদের ফ্লাইট বিলম্ব হচ্ছে, একদিন পরে পৌছাবো শিউল। মন খারাপ হয়েছে আসলে। নির্দিষ্ট গন্তব্যে না পৌছে আমরা এখনও ঢাকাতে। কাউকে আর জানাইনি যে আমি এখনো ঢাকা। বিদায় নিয়েছি যে। কেবল বাসায় জানিয়েছি।
হোটেলের ব্যবস্থাপনা বেশ ভালো। রুমের সাইজ, সুযোগ সুবিধা ভালই বলা যায়। রাতে বুফে ডিনার করলাম। ঘুম আসছিল না টেনশনে। রাত ১২ টার পরে হোটেলের ছাদে গেলাম, আগেই জেনেছি যে হোটেলের ছাদে মনোরম একটি পরিবেশ আছে। ছাদে প্রবেশের বাম দিকেই সুইমিং পুল। আলো আধারের এক স্বপ্নীল পরিবেশ। সুইমিং পুল হতে উঠে এলো এক মৎসকন্যা। এত ভাল লাগছিল সব কিছু নিয়ে যে মোবাইল বের করেছি ফটো তোলার জন্য। মৎস কন্যা সম্ভবত চাচ্ছিলেন তার সামনা সামনি ফটো তুলি। ফটো তেমন ভাল আসতো না বলে ক্লিক করিনি, অবশ্য জটিলতাও ছিল কিঞ্চিৎ। দূরে হেঁটে যাওয়া মৎস কন্যার ছবি তুলবো, এবং তা তুলেছি 🙂
IMG_20160524_203408

সুইমিং পুলের উল্টো দিকে বাগানের মত, চেয়ার টেবিল পাতা আছে। সফরসঙ্গী এবং দোস্ত নাসিরকে নিয়ে বসলাম একটি টেবিলে। পরিবেশটা অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। দূরে গোল হয়ে হুক্কা খাচ্ছে কয়েকজন। ভালই লাগছিল সব কিছু মিলিয়ে।
IMG_20160524_203817

সব কিছুরই আসলে এক সময় সমাপ্তি আছে। রাত একটার দিকে রুমে ফিরলাম। নিয়তি একটি অদ্ভুত বিষয়। আমরা কেউই জানিনা কিছুক্ষণ পরে কি হবে। সবকিছু প্রগ্রামের মাঝে ফেললেও অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটে যেতে পারে, ঘটে যায়। সবার কাছ হতে বিদায় নিয়েছি, আসলে বিদায় তো হল না। এ রাত থাকার কথা চীনের কুনমিং এর এক হোটেলে। থাকছি দেশেরই এক হোটেলে। কি চাই আমরা, কি হয় পরিশেষে।

ভ্রমণ কাহিনী লেখার ইচ্ছে ছিল অনেকদিন যাবত। একে কি ভ্রমন কাহিনী বলে?

৭৬৯জন ৭৬৮জন
0 Shares

৩১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ