না বলা কথাঃ মায়ের জন্য প্রার্থনা

ভোরের শিশির ২২ অক্টোবর ২০১৫, বৃহস্পতিবার, ০২:৪২:৩৭পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৭৫ মন্তব্য

গীতিকবিতাঃ মা

গানের কথাঃ নীতেশ বড়ুয়া ও মিশু খান শহরতলী

গল্পকথাঃ জিল্লুর রহমান শহরতলী

সুরঃ মিশু খান শহরতলী

অ্যালবামঃ অপর পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য

ব্যান্ডঃ শহরতলী

——————

 আজ হঠাৎ করে মনে পরছে তোমায় মা

স্মৃতির চাদরে জড়িয়ে আজ আমায়

ভাসালে চোখের নোনায়

অথৈ সাগরে একলা আমি ভেলায়।

ওমা, দেখ তোমার ছেলে কত বড় হয়েছে

তুমি একটু দেখ না, দেখ না…

ওমা আজ অবুঝ ছেলে কত বুঝের হয়েছে

তুমি একটু আস নাচ; আস না…

তোমার আঁচলে, শীতল ছায়ায়

আমায় ঢেকে দাওনা।

একলা ঘরে ছিলাম যখন

আমি কাছে থেকেও দূরে তখন

 চার দেয়ালে নিঃস্ব আমি

তোমার ছায়া ছুঁয়ে স্পর্শ খুঁজি।

বেঁচে থাকাই এখন বড় দায়,

অপরাধবোধে ভেতরটা কুঁকড়ে খায়।

ওমা ছুটেছি তোমার খোঁজে

আজ জীবন পথে তুমি বুকে টানো না, নাও না…

ও মা, আজ অবুঝ ছেলে কত বুঝের হয়েছে

তুমি একটু আস না, আস না…

মাঝ রাতে কতবার ফিরেছি বাসায়,

পথ চেয়ে থাকা তোমার- আমার আশায়;

শত অনুযোগ নিয়ে চোখের কোণে,

বুক ফেটে যেত বোবা কান্নায়।

ওমা তোমার সব স্বপ্ন দেখো

আমার হাতে তুমি একটু থাকো না পাশে থাকো না

ওমা তোমার বুকে জড়িয়ে একটু গল্প শোনাওনা

আসো না মা আস না, আসোনা মা ফিরে আস না…

 

আমার মা ততোদিনে প্রবাস জীবনে। আমার মা’কে কোনদিন বলা হয়নি এইসব কথা, আজও নয়। মা নিয়ে কিছু লিখতে বললেই আমি দশ হাত তুলে বলি সম্ভব নয় আমার পক্ষে ‘মা’কে শব্দে বেঁধে দেওয়া। কিন্তু শহরতলী ব্যান্ডের মিশু শুরু দু’লাইন নিজে থেকে আমাকে গুনগুন করে শুনিয়ে বলে ‘এই দুই লাইন তুই পুরো কর তোর মতো, আমি সাহায্য করছি। কিন্তু লিখ তুই, পারবি’। টানা সাতদিন ৪-৫ ঘণ্টা ধরে চায়ের দোকানে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কাটাকুটি করতে করতে এইটুক করতে পেরেছিলাম। গানের গল্প কথা তখনো কি হবে জানি না। লিখে ফেলা গানের কথার গল্প শুধু আমি আর মিশু জানি। এই লাইনগুলোকে মিশু দিয়ে দেয় ব্যান্ডের পারফর্মিং ভোকালিস্ট সোহাগকে আর দিয়ে বলে পড়ো। ক’দিন পরে সোহাগ আর মিশু যখন আমার কাছে গানের লাইনের উপর ভিত্তি করে গল্প কথা শোনায় তখন নিজেই আবেগ ধরে রাখতে কষ্ট হয়েছিল। এরপর বাকিটুকু শহরতলী করে, সুরের কিছু জানি তাই কিছুই করার ছিলো না আমার আর তবে ওরা জায়গা দিয়েছিলো ভাল লাগা না লাগা জানাতে। এই গানের প্রতিটি ধাপে মতামত নিয়েছে আমার। এরপর… https://soundcloud.com/bandshohortoli/maa-by-shohortoli-band

 

এতোগুলো কথা বললাম ব্যান্ড বা অন্য কিছুর জন্য বরং ‘মা’ নিয়ে উপলব্দিকে প্রকাশ করতে। আজও আমি প্রবাস থেকে মায়ের ফোন এলে মতের সাথে না মিললে রেগে যাই অনেক সময়, আবার প্রায় সময় চুপ করে শুনি। বরাবরের মতো বাবা মায়ের সামনে কম কথা বলার ছেলে আমি। তাই মাকে নিয়ে ভালবাসার কিছুই কোনদিন প্রকাশ করিনি মুখের শব্দ দিয়ে, তবে একদিন মা বলেছিলেন ‘আমার এই ছেলেটা যখন খুব খুশী হয় তখন শুধু নিঃশব্দে হাসে’-সেদিন আমি অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলাম কি করে! কি করে বুঝলো আমার অনুভূতি প্রকাশের এই গোপন প্রয়াসটি! মা’বলেই বুঝেছেন! আমার সঞ্চয় না করার প্রবণতা মা জানেন, জানেন আমি কেন সঞ্চয়ে আগ্রহী নই। বাবা বকলেও মা সময় নিয়ে বুঝান বারেবারে বিশেষ করে যখন বিপদে পড়্‌ তখন শান্ত হয়েই বুঝিয়ে দেন।

একবার জিপ গাড়ীর তলায় পায়ের পাতা চলে আসাতে পায়ের পাতা ফুলে যায়, ব্যাথায় হাঁটতেও পারছিলাম না ঠিক করে। ব্যাথা পাওয়ার প্রায় ৫ ঘন্টা পরে সেই ফোলা পায়ের পাতা নিয়ে বাসায় ঢুকতেই মায়ের সামনে যতটুকু সম্ভব ঠিক হয়ে চলা শুরু করি যাতে মা বুঝতে না পারেন কিন্তু মা ধরে ফেলেন এবং ডাক্তারের কাছে যাওয়া! পরে এক্সে করে জানতে পারলাম যদি আরো দেরি করে ডাক্তারের কাছে যেতাম তবে পায়ের হাড় জীপের চাকায় যতটুকু বেঁকেছে তা পুরোটুকুই ভাঙতো। আজো সেই পায়ের পাতায় বেঁকে থাকা হাড় ধরে অনুভব করি আমার মা এখানেই নিজের হাত রেখেছিলেন ব্যাথা কমেছে কিনা দেখতে। মনে আছে। স্কুলে দুষ্টুমি করতে যেয়ে হাঁটিতে চোট পেয়ে হাঁটু ফুলিয়ে ফেলেছিলাম মারাত্মক রকমের। এক মাসের বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়েছিলো। চোখে ভাসে আজো যে সেই হাঁটুতে কি যত্ন নিচ্ছিলেন! আমার মা।

আজও প্রায় সময় হঠাৎ হঠাৎ শুনতে পাই মা আমায় ডাকছেন অথচ উনি অনেক দূরে প্রবাসে। মাথায় তখন আর কিচ্ছুটি বুঝতে চায় না, শুধু মনে মনে ডাকি ‘মা’! আর মা মনে হয় বুঝতে পারেন আমি তাঁকে ডাকছ্‌ তাই সেদিনই তিনি আমাকে মুঠোফোনে কল করে ফেলেন, মা’বলেই তো!

আমার খুব প্রিয় একটি গান ‘মা’ নিয়েঃ

মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙ্গেই এই গানের কথাগুলো আমার মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে।

 

মা বুড়ো হচ্ছেন, বাবাও। আর কিছুদিন পরে মা নিশ্চিত বার্ধক্যজনিত শারীরীক অসুবিধেয় পড়বেন। আমি কি পারবো আমার মা’কে ঠিক সেভাবেই সেবা যত্ন দিতে যেভাবে তিনি আমায় দিতেন সব সময়, বিপদে-আপদে, সুখে-অসুখে! হ্যাঁ আমি পারবো ঠিক সেভাবে যেভাবে উনি আছেন আমার সাথে।

আমার শেষ আশ্রয় স্থল হচ্ছেন মা। যা কিছুই হোক ভুলের জন্য বাকি সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলেও একমাত্র মা’ই আমার সাথে আমার ভুল শুদ্ধ ধরিয়ে দিয়ে আছেন শেষ ভরসা হয়ে।

আমি মনে মনে খুবই গর্বিত যে আমার ব্যক্তিত্বের যা তার অধিকাংশটুকু আমার বাবার আর আমার অনুভূতির প্রায় সবটুকুই আমার মায়ের। সবাই বলে আমি দেখতে বাবার মতোন কিন্তু স্বভাবে মা  (3

আমার মা, আমাদের মা।
আমার মা, আমাদের মা।

 

মা!

আমি তোমায় খুব ভালবাসি। সন্তান হয়ে তোমাতেই আমার শুরু আর সন্তান হয়েই তোমার শেষটুকু যেন আমার কাছেই হয় হাসিমুখে।

মা, জানি তুমি কষ্ট পাচ্ছো, জানি নিজের কষ্টের মাঝেও তুমি আমায় নিয়ে চিন্তিত, আমার মঙ্গল কামনায় তুমি আজও নিবেদিত। মা আমি তোমার জন্যে, তোমাদের জন্য এভাবেই নিবেদিত প্রান হয়ে থাকতে চাই।

আমার মায়েদের আমি ভালবাসি। প্রতি মুহুর্তে বলি আমার মা’কে সুস্থ রাখো হে! শারীরীক ও মানসিক কষ্ট হতে দ্রুত মুক্তি দাও, আমার যা কিছু পুণ্য আছে তার সবটুকু দিয়ে হলেও আমার মাকে তুমি সুখে রাখো, সুস্থ রেখো, আনন্দে রাখো।

আমি আর কিছুই চাই না, চাই শুধু আমার মায়ের হাসিমুখে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার মুহুর্তগুলো যেনো আমৃত্যু থাকে আমার সাথে।

হে সৃষ্টিকর্তা, তুমি আমার মায়ের জন্য, সকল মায়ের জন্য সন্তানের হয়ে আমার এই প্রার্থনা মঞ্জুর করে মা’কে সুস্থ স্বভাবিক আনন্দে ও খুশীতে রাখো। আর কিছুই চাই না আমার।

১১৪৮৬জন ১১০৮২জন
0 Shares

৭৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ