চিঠিটি ৩১ অক্টোবর ২০১০ এ পোস্ট করেছিলাম।
এতদিনেও আমার ছোট ভাই চিঠিটি পায়নি।
আজ বুঝলাম ভুল ডাকঘরে পোস্ট করা হয়েছিল। আশাকরি এবার চিঠিটি পাবে ও।
স্নেহের রাসেল,
আমাদেরকে ছেড়ে যাচ্ছ তুই, ২ বছর তোকে দেখব না- যাবার কয়েকদিন আগ হতে এই ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম । আব্বা হঠাৎ মারা যাবার পর, তোকে ত পিতৃস্নেহ দিয়েই লালন করেছি । দেখেছি- কি ভাবে আস্তে আস্তে ছোট হতে বড় হয়ে গেলি তুই। মাঝে মাঝে মনে হত,তুই আমার ছোট ভাই না- আমারই সন্তান।
স্নেহ ও আদর নিস। কেমন আছ তুই ? গরমের দেশের মানুষ হয়ে- বরফের মাঝে ভাল আছতো তুই ? চিন্তায় অস্থির থাকি আমরা, এই বুঝি ঠান্ডা লাগিয়ে ফেললি !
কয়েকদিন আগে কথা বলেছি তোর সাথে। অনেক কথাই জমা হয়ে থাকে। বলা হয় না। সারাদিন বললেও শেষ হবে না।
বাসার ছোট্ট বাগানে ফুল ফুটেছে কিছু।
বাহারি পাতাগুলো দেখতে ভালই লাগে এখন।
কিন্তু খুব ভোরে পূজারী মেয়েরা ফুল চুরি করে নিয়ে যায়,আগের মতই ।
আব্বার লাগান নারকেল গাছ দুটোতে অনেক নারকেল হ্য়।
খেয়ে শেষ করতে পারিনা। সবাইকে দেই , তারপর ও গাছ বোঝাই।
সুপারি গাছে আবার সুপারি হয়েছে।
গাছটা এত বড় হয়েছে যে ,ঐ সুপারি গাছে এখন আর কেউ উঠতে সাহস পায়না।
রাতের বাদুড়ের খাবার এখন ওসব।
আম গাছে এবার অনেক মুকুল হয়েছিল।
কিন্তু প্রচন্ড গরমে সব পুড়ে গিয়েছে । প্রিয় খুবই কষ্ট পেয়েছে ।
এবার নিজেদের গাছের আম খেতে পারেনি বলে ।
তবে কাঁঠাল আর কলা গাছ আমাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে
প্রিয় তো মহা খুশি। কাঁঠাল নাকি ও কাউকে খেতে দিবে না,একা খাবে।
বাসার ক্রিসমাসট্রিটাও বেশ বড় হয়েছে।
এবছর নতুন মাটি দিয়েছি ওটার গোড়ায়। খুব খুশি আমরা ।
সুগন্ধা নদী , তুই যেমন দেখে গিয়েছিলি ,
এখনো তেমনিই আছে। প্রভাতে গায়ের বধূরা গোছল করে ,
সূর্য ডোবে ঠিক তেমনি। যেমনটা তুই দেখতি।
ধানসিঁড়ি নদীও তেমনি- পাগল করা রূপে।
গ্রামের বাড়ি যাবার ছোট্ট নদীটা আরো সুন্দর হয়েছে।
খেয়া পাড়াপাড় চলছে আগের মতই।
কিছুদিন আগে প্রিয় এসে বলল একটা বানরের কথা।
বেবীদের দোকানের সামনে যে- হারমোনিয়ামের দোকান ,
ওখানে এই বানরটা ছিল কয়েকদিন।
এখন আর দেখি না।প্রিয় মহা খুশি এটা দেখে ।
হেলালের বাসায় যাবার পর একদিন খুব বৃষ্টি।
ওর গেটের বাইরে হঠাৎ এটা আসলো।
হেলালের বউ বললো- ছাগল নাকি পানি ভয় পায়।
ছবিটা হেলালের মেয়ের তোলা। ভাল আছে ওরা সবাই।
আমাদের সবগুলো ব্যবসা চলছে ভালই।
নবগ্রামের ছোট্ট অফিসটা গাছের ছায়া ঘেরা থাকে সব সময়।
চারদিকে লাগিয়েছি অনেক গাছ।সবুজে ঘিড়ে ফেলছে আমাদের এলাকা ।
এবার ঈদে সবাই এসেছিল স্বপ্নপুরে।
খুব আনন্দ করেছি।শুধু ছিলিনা তুই।
তোরও মন খারাপ ছিল,দেখেছি ওয়েব ক্যাম এ ।
প্রিয় যথারিতি আইসক্রিম কাউকে দেয় নি ।
এতে অন্য পিচ্চিদের খুব মন খারাপ ছিল।
আমি গোপনে ওদেরকে আইসক্রিম কিনে দিয়েছি পরে।
ঈদের জামায়াতে এবার উপস্থিতি ছিল কম।কারণটা বুঝতে পারিনি।
গতবার তুই যাবার দিন যে ফটো গুলো তুলেছিলাম,
তা দেখি এখনো মাঝে মাঝে। ভাল লাগে দেখতে।
তুই যাবার ৩দিন পর , আমরা সবাই কক্সবাজার,
ইনানী গিয়েছিলাম।খুব আনন্দ করেছি।
হেলালের এই ফটোটা গোপনে তুলেছি।
ফোন করে আবার বলে দিসনা। তাইলে এডিট করে মুছে ফেলতে হবে।
আমার একটা ফটো, দেখ কেমন ঝাপসা।
এত বললাম- পরিষ্কার ছবি তোল। তোর ভাবি তা তুললই না।
এটা নাকি আর্টিস্টিক ছবি ।
তোর ভাবি আবার আর্টিস্টিক ছবিও বোঝা শুরু করছে ।
জুন মাসে কানাডা গিয়েছিলাম।
দেখলাম স্বপ্নের নায়াগ্রাকে। বিমোহিত আমি।
কাছেই ছিল একটা ফুলের বাগান। ওটাও দেখলাম।
এই ফুলের ঘড়িটা কোন সিনেমায় যেন দেখেছিলাম।
টরেন্টোতে একটা মজার স্টাচু আছে।
চার্চিলের । মূর্তিটার মাথায় পাখিতে হাগু করে ।
আমাদের দেশটা শোষন কারীদের একজনের মাথা এখন পাখির টয়লেট-
ভাবতেই আনন্দ।
কানাডার বাচ্চারা আমাদের দেশের মতই দুষ্ট।
এই বাচ্চাটা আমাকে ৩ টা ঘুসি দিয়েছিল।
আমি অবশ্য খুব ব্যাথা পাইনি।বাচ্চার মার কাছ থেকে ৩টা সিগারেট ,
জরিমানা আদায় করেছি ।
আম্মা প্রায়ই খাবার সময় তোর কথা বলেন।
কখনো রান্নাঘরে ঢোকোনি তুই।
আর এখন নিজে বাজার করে, নিজের রান্না নিজেই কর।
আম্মার চোখে পানি এসে যায়। আমাদেরও খারাপ হয় মন তখন ।
আম্মাকে তখন বলি- এই দেখেন রাসেল ভাল আছে।
আপনি একটুও চিন্তা করবেন না। কিন্তু নিজের কষ্টটাকে লুকাতে পাড়ি না ।
তোর কম্পিউটার এখন প্রিয় ব্যবহার করে।
আমাকে ধরতেও দেয়না। আমি নাকি নষ্ট করে ফেলব।
ছবি এডিট করে নিজে নিজেই। সিসি ক্লিনার দিয়ে ক্লিন করে পিসি।
এরপর সাটডাউন। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। সারাদিন দুষ্টামি।
স্কুলেও যাচ্ছে নিয়মিত।
কিছুদিন আগে- নিজের এই ছবিটা আকলো কম্পিউটারে ।
পৃথু কয়েকদিন আগে একটা প্রগ্রামে হাছন রাজার গান গেয়েছে।
লিংক পৃথুর গান দিলাম দেখিস।
তোর ভাবি আমার উপ্রে খুব খবারদারী করছে। ৩ ছেলেকে তার পক্ষে নিয়েছে।রাত ১১টার পর নেট ইউজ করলে নাকি- ল্যাপটপ ফেলে দেয়া হবে। সিগারেট খাওয়া চলবেনা।বেশি টেনশন নেওয়া যাবেনা।আরো অনেক কিছু। এত খবরদারি আমার ভাল লাগেনা । ফোনে বলে দিস তুই।
আমরা সবাই ভাল আছি। তুই ভাল থাকিস।সময়মত খাওয়া দাওয়া করিস।ঠান্ডায় খুব বেশি গরম কাপড় পরবি।শরীরের দিকে খেয়াল রাখিস।
ইতি।
তোর দাদা।
অক:রাসেল এই অংশটা পড়বি না। শেষ পত্র লিখেছি বিয়ের আগে বউরে।অনেক আগে।তাই লেখা একটু আউলা জাউলা লাগতে পারে। অনেক বড় হওয়ায় সরি ……।
১২টি মন্তব্য
জবরুল আলম সুমন
দাদু, হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে দুইবার পড়ে যেতে যেতে বাঁচলাম… 😛
জিসান শা ইকরাম
শুধু হাসিটা দেখলে ?
ভিতরের আবেগ টা দেখেছ ? 🙂
শুভকামনা ………।
ছাইরাছ হেলাল
একটু বেশিই আবেগ প্রবণ হলেও উজ্জ্বল প্রকাশ্য অনুভূতির অনুভব ভালই লাগল ।
জিসান শা ইকরাম
হুম , তা একটু বেশী ।
নীহারিকা
মুগ্ধ হয়ে পড়লাম … অসাধারণ একটি চিঠি।
জিসান শা ইকরাম
রাসেল দেশে এসেছে এই মাসে।
শিশির কনা
হৃদয় ছোঁয়া , সহজ্ সরল ।
লীলাবতী
অসাধারন এক চিঠি।
তৌহিদ
ছবি দেখতে পারিনি, লেখা পড়েই আপ্লুত হলাম ভাই। আপনার একটা শিশুসুলভ মন আছে তা ভালোভাবেই অনুভব করছি।
ভালো থাকবেন ভাই।
জিসান শা ইকরাম
তখন ছবির সাইজের কোনো লিমিট ছিল না, ১০০ কেবি লিমিট করায় ছবি গুলো হাইড হয়ে গিয়েছে।
ধন্যবাদ ভাই, এত আগের লেখা পড়ার জন্য।
তৌহিদ
বসে বসে পুরাতন লেখাগুলি পড়ছি ভাই।
সুরাইয়া পারভীন
এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম চিঠিটি। তেমন আবেগে ঠাসা তেমনি মজা ও ভরপুর।
স্নেহের ছোট ভাইকে লেখা চমৎকার চিঠি