এই কাহিনী নয় মাস পূর্বের,তাই একে রূপকথা বলা যাবে না।রূপকথা হলে শুরুটা হত এমন- এক যে ছিল রাজা আর এক যে ছিল সুন্দরী। নিকট অতীত বলেই শুরুটা ভিন্ন রকম।
12187876_728418557263225_5695057100062571638_nরাজা আর সুন্দরীকে নিয়েই লেখাটা শুরু করি। এরা এলো আমার সংসারে নতুন সদস্য হয়ে।সারাক্ষণ কথা বলা আর ভালোবাসা বাসি করা। কিছুক্ষণ পর পর ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে থাকা।পাখিদের ভালোবাসাবাসি এত কাছ হতে প্রথম দেখা। ভোরে ভোর হত এদের সুমধুর কথায়। ঘুম থেকে জেগেই এদের নিয়ে রাখি বারান্দায়।

12190814_728418563929891_489243956533511389_n মাস দুই এভাবেই চলেছে,দুজন দুজনার হয়ে।হাসি আনন্দে ভালোবাসায়।আগ্রহে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছি এদের নিত্য কথা।রাজা আর সুন্দরীর মাঝে সুন্দরী ভালোবাসা প্রকাশে এগ্রেসিভ খুব।কিছুটা আড়াল এবং ডিম পাড়ার জন্য মাটির একটি আলাদা বাসা করে দিয়েছি। ক্যামেরা দিয়ে ফটো তুলতে গেলেই তাদের জন্য রাখা মাটির পাত্রের মাঝে লুকিয়ে পড়তো সুন্দরী। ছবি গুলো সব গোপনে ধারণ করেছি।

12096500_728418613929886_2753423432301951829_n12189814_728418660596548_3471621627985601287_nসুন্দরী আর রাজা আমাদের বাসাতেই ছিল। পাখির দোকানের সামনে দিয়ে যাবার সময় একটি রঙ্গিন পাখি দেখে ভাল লেগে যায়। নিয়ে আসি তাকেও। সুন্দরী আর রাজার সাথেই রাখি তাকে যার নাম ডন। একলা পাখি ডন প্রথমদিন দূরে বসে একা একা কাটিয়েছে। দ্বিতীয় দিন রাজা আর সুন্দরীর সাথে ভালোই ভাব জমিয়েছে।তৃতীয় দিন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে রাজা আর সুন্দরীর ভালবাসাবাসী,মাঝে মাঝে অন্য দিকে তাকিয়ে থেকেছে রাজা আর সুন্দরীর ভালবাসার মুহূর্তে।

চতুর্থ দিন ভোরে পাখিদের প্রচন্ড চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙ্গে যায়। ডানা ঝাপটানোর শব্দে দ্রুত তাদের কাছে এসে দেখি রাজা আর সুন্দরী ঝগড়া করছে।ভালোবাসার পরিবর্তে দুজনে একে অন্যকে আঘাত করছে। ডন দূরে বসে তাকিয়ে দেখছে দুজনকে।কিছুই বুঝতে পারলাম না আসলে। বারান্দায় রেখে আসার সময় খেয়াল করলাম রাজা তাকিয়ে আছে আমার দিকে।এমনটা হয়না কখনো।কাছে গিয়ে হাত রাখলম খাঁচার গায়ে,রাজা এসে ঠোঁট দিয়ে আমার আঙ্গুলে কয়েকটা ঠোকর দিল। কি বুঝাতে চেয়েছে বুঝিনি আমি।কিভাবে বুঝবো পাখির ভাষা।
ছোট এই তিন জনের সমাজে পরিবর্তন লক্ষ করলাম।রাজা আর সুন্দরীর ভালোবাসাবাসি কমে গিয়েছে।দুজনে একসাথে মাটির ঘরে থাকে সামান্য সময়।রাতে রাজা আর সুন্দরী মাটির ঘরে থাকে। ডন থাকে বাইরে একটি লাঠির উপর। আবার ঝগড়া একদিন প্রচণ্ড রাজা আর সুন্দরীর।কি যে হলো এদের কে জানে! ঐ ঝগড়ার দিনের অবসানে রাতে দেখি তিনজনই মাটির ঘরে।তবে কি ডন কোথায় রাত কাটাবে, এ নিয়ে ঝগড়া, অবশেষে রাজা মেনে নিয়েছে এই রঙ্গিন পাখিকে? যে কারনে একই রুমে রাত্রি যাপন? আগ্রহী হই খুব। পর্যবেক্ষন করতে থাকি যখনই সময় পাই।

12189021_728418627263218_7217746999217683399_nহঠাৎ একদিন দেখি। ডন আর সুন্দরী ভালোবাসাবাসি করছে ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে।  রাজা তখন মাটির ঘরে।মাটির ঘরের দরজা দিয়ে রাজা শুধু মাত্র মাথা বেড় করে দেখছে তা।অনেকক্ষণ ছিল এভাবে।বুঝে গেলাম সব কিছু।রঙ্গিন পাখির প্রেমে পড়ে গিয়েছে সুন্দরী।আর রাজা তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। রাজার হৃদয় টি কেমন ছিল তখন?স্থির অনড় রাজার মনে কি বলছিল ” জান এসব কি দেখছি আমি? আমার ভালোবাসার মুল্য কি এভাবেই দিলি তুই? আমার বুকের মাঝে অসীম শূন্যতা,হাহাকার,বিরান ভূমি, শুষ্ক মরুভূমি” ।কেজানে কি ছিল ওইটুকু রাজার হৃদয়ে। একসময় রাজা ঘড় হতে বেড় হলো। রাজাকে দেখে সুন্দরী আর ডন ছিটকে দুজনে দুদিকে। অভিমানী রাজা আবার চলে যায় একা মাটির ঘড়ে।তার আনন্দ চলে যায়। চিৎকার শুনি তার। একসময় সুন্দরী যায় মাটির ঘরে। একা রাজার কণ্ঠ শুনি …… ‘ জান জান কই তুই? কই কই কই…………আমাকে রেখে একা কোথায় যাও?’

সুন্দরী হয়ত বলেছে, ‘এই তো জান, এসেছি আমি,তোমারই কাছে।’ ‘ চোখ আমার খোলা, দেখিনা তো তোমাকে,আমার মাঝে নেই তুমি,খুজে পাইনা আমার রিদয়ে,এখানে শুধুই শূন্যতা’ – রাজা কি এমনটা বলেছিল?

সাতটি দিন এমনই ছিল। রাজার চোখের আড়ালে চলেছে চলেছে সুন্দরী আর ডনের প্রেম। রাজার কোন আবেদন,কান্না,হতাশা,অভিমান সুন্দরীকে ফেরাতে পারেনি। কেমন নিস্তব্দ হয়ে ছিল পাখিদের বাসা। তিন জন যখন বাইরে থাকে। কোন কথা নেই,কোন ভালোবাসা নেই।রাজা বসে থাকে একাকী নিঃসঙ্গ হয়ে। সব কিছু আছে তার কিন্তু কিছুই নেই তার। তিনজনের মাঝে একা সে,সুন্দরী রাতে মাটির ঘরে যায়।একসাথে রাত কাটায়। আমি নিশ্চিত যে দুজনের মাঝে পাহাড়ের বাঁধা, যোজন যোজন দূরত্ব।

10599727_728418720596542_3870791059224070253_n11226070_728418843929863_932389674004020447_o [320x200]কেমন অপরাধী মনে হচ্ছিল নিজকে। রঙ্গিন পাখিটিকে এনেই সর্বনাশ করে দিলেম।সুন্দরের দিকে আকৃষ্ট হয়েছে সুন্দরী।রাজা কিছু করতে পারছে না। ফেরাতে পারছেনা সুন্দরীকে। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম, আলাদা করে দেবো। একদিন রাজা আর সুন্দরীকে আমার খামারে পাঠিয়ে দিলাম আর ডন এর জন্য নিয়ে এলাম রূপবানকে। কিন্তু ডন? তার স্মৃতিতে যে সুন্দরী।প্রথম দুইদিন একা বসে কাটায় উদাস হয়ে। রূপবানের দিকে ফিরেও তাকায় না। পাশাপাশি বসে থাকে দুজনে দুদিকে তাকিয়ে। কয়েকদিন তারা একে অপরকে দেখেছে।

 অতঃপর প্রনয় ডন আর রূপবান এর

অতঃপর প্রনয় ডন আর রূপবান এর

রাজা আর সুন্দরী?
নতুন স্থানে যাবার সাথে সাথেই তারা ফিরে গিয়েছে পূর্বের ভালোবাসার জীবনে। কলকাকলী, ভালোবাসায় পুর্ন জীবনের আবার শুরু।দুই মাসের মধ্যে সুন্দরী ডিম পেরেছে।তবে সে ডিম থেকে বাচ্চা আসেনি কোন অজানা কারনে।রাজাকে দেখতাম আমাকে দেখলেই আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো।সুন্দরী আমাকে দেখে ভয় পেলেও রাজা পেতো না।রাজা কি অভিশাপ দিত আমায়? নাকি দুঃখের কথা বলতো যা আমি বুঝিনি কখনো।
এভাবেই দিন কাটলে ভালো ছিল……… কিন্তু একদিন হঠাৎরাজা চলে গেলো এ জগৎ থেকে? কেন মরে গেলো রাজা? পাখিদের কি স্ট্রোক করে? রাজা কি হৃদয়ের গহীনে থাকা চিনচিনে ব্যাথা নিয়ে চলে গেলো? তার কি ভিতরটা শুষ্ক হয়ে গিয়েছিলো যা আর জলে পরিপুর্ন হয়নি?
রাজারা এভাবেই মরে যায়,বা বেঁচে থেকেও মরে থাকে।

12063897_728418857263195_2115643831180835324_n
একলা সুন্দরীর একাকীত্ব কাটাতে এবার কিনে দেই একটি রঙ্গিন সাথী, খেয়ালের বসেই,যার নাম সবুজ।এমন রঙ দেখেই তো সুন্দরী আকৃষ্ট হয়েছিলো।সবুজকে পেয়ে মুহুর্তের মাঝেই ভাব করে ফেলে সুন্দরী। সুন্দরীর ক্ষণে ক্ষণে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতায় অবাক হই আমি।

#রাজা,সুন্দরী,ডন আর সবুজ নামগুলো দিয়েছে স্নেহাস্পদ মেহেরী তাজ।লেখার জন্য এত সুন্দর নাম আমি দিতে পারতাম না।ধন্যবাদ তাজ  -{@

 

১১৬৩জন ১১৬৭জন
0 Shares

৫২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ