*গুণ টানা মাঝি*

রিতু জাহান ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬, শনিবার, ১১:৫১:০১পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৩৯ মন্তব্য

আমি যখন ছোট তখন, আমার নানাদের ও দাদুদের বড় বড় কাঠের নৌকা ছিল। এই নৌকাগুলো আসলে কাজে লাগত, দূরের জমির ধান বয়ে আনার জন্য। আমার দাদু ও নানা বাড়ি সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায়। ঐ দিকের বেশীর ভাগ এলাকাই নিচু। তবে সেসব জায়গাতে মানুষের তখন বসতি ছিল না। মানুষ জঙ্গল কেটে আবাদ শুরু করেছিল অনেক আগে থেকেই। এই বড় কাঠের নৌকা বর্তমানে ছোট খাট বার্জ এর সমান। এই নৌকাতে চার পাঁচজন মানুষের থাকার ব্যবস্থাও থাকত। থাকত রান্নার ব্যবস্থা। এই নৌকা শুধু বৌঠার সাহায্যেই চলত না। নৌকার দুইজন মাঝি থাকত। একজন বৈঠা ধরে নৌকার দিক ঠিক রাখত, অন্যজন নৌকার মাথায় বাঁধা বড় মোটা পাটের দড়ি ধরে টেনে টেনে হাঁটত। এই পাটের দড়ি বানাতেও দেখেছি আমি। কয়েকজন মিলে পাট পাকিয়ে এই মজবুত দড়ি বানাত। এই নৌকা টানার মাঝিদের গুণ টানা মাঝি বলে। আমার নানাদের দুইটা নৌকা ছিল এমন। একজন ছিল *কিয়াম মামা* আর একজন ছিল *ভাইটে*। যাই হোক এই নৌকা টেনে নেওয়া কম কষ্টের নয়। একদিন আলাদা করে কিয়াম মামার গল্প লিখব। আমার অত্যন্ত প্রিয় মামা। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নানা বাড়িতে থেকেছে। আমার সেই ছোটবেলায় ছুটে বেড়ানোর একমাত্র সহযোগী এই মামা। অনেক বড় হয়েও তাঁর ঘাড়ে চড়ছি। মামা আমার চলে গেছে অনেক দূরে। আমার ছোটবেলায় সব ভুল দুষ্টমি গুলো নানির ভয়ে সে তাঁর দিকেই নিত। আমাকে বাঁচাত। কখনো কোনো খেলায় হারতে দিত না। গাছের প্রথম কাটার টাটকা খেজুর গাছের রস, পরিষ্কার ঠিলেতে করে আনত। ও হ্যাঁ, ঠিলে মানে, মাটির যে পাতিলটা গাছে বাঁধা হয়। আমি দেখেছি মামার ঘাড়ে ঐ কালসিটে দাগ।

একবার আমার মামাত বোনের বিয়েতে নানা বাড়িতে ডাকাত পড়েছিল। এটা ১৯৯৬ এর কথা। আমি তখন ক্লাস টেনে। তো বাড়ি ভর্তি মেহমান। এটা রামপাল থানা এলাকায় চাঁনপুর গ্রাম। আমার মায়ের এই একটাই ভাই। তো তার একমাত্র মেয়ের বিয়েতে বাড়ি ভর্তি অনেক আত্নীয় স্বজন। আমার বড় আপা তখন সাত মাস বাবু পেটে। আর বড় আপা নানির বংশে প্রথম মেয়ে। ওর আল্লাদও বেশী সবার কাছে। আর ও খুব লক্ষ্মী পক্ষি টাইপ। আর আমি গেছো ভুত, যতো নালিশ সবার আমার বিরুদ্ধে।

যাইহোক, রাতের বেলা কেন জানি মামি সবার গয়নাগাটি খুলে নিয়ে একটা মাটির মটকিতে রেখে দিল। আমরা আবার সব ভাইবোনেরা নানি বাড়িতে বড় একটা ঘরো লাইন দিয়ে শুই। এই ভিড়েও তার ব্যতিক্রম হল না। তো কিছু রাত পর গুঞ্জন শুরু হয়েছে কি যেন। একজন এসে খবর দিল, আমার মামার অতি সুন্দরী মেয়েকে পাশের সরকার বাড়ির ছেলে খুলনা থেকে লোক এনে তুলে নিবে। আমার মা ছিল খুব সাহসিনী, তিনি ঐ রাতেই আমার দাদা বাড়ি খবর দিলেন। বলে রাখি, আমার দাদার বাড়ির লোকেরা আবার খুব শান্ত না, রাগ তাদের মুখের থেকে হাতে থাকে।

আমার কিয়াম মামা, আমাকে ও আমার আর এক বোনকে ঐ রাতে আর নানা বাড়িতে রাখার সাহস রাখলেন না। তিনি আমাদের দুজনকে বাড়ির পিছন দিক থেকে, যেখানে পারিবারিক কবরস্থান, ঐদিক থেকে নিয়ে যেতে লাগলেন। আমি ব্যপার গুলো হঠাৎ বুঝে উঠতে পারছিলাম না, ঘুমের মধ্যে থেকে উঠেই কি কেউ হাঁটতে পারে ! ব্যস ধপাস করে একটা ভাঙ্গা কবরে পড়ে গেলাম। আমি তো কবরে পড়ে মুখের ভাষাই ভুলে গেছি। আ আ আ করে চিল্লাব, সেই শব্দও গলা থেকে বের হচ্ছিল না। মামা হঠাৎ পিছন ফিরে দেখে আমি নেই। মামা  ফিরে এসে খুঁজে দেখে কবরের মধ্যে আমি। তাড়া তাড়ি দোয়া পড়তে লাগল, কোলে তুলে নিল এই মটু টাকে। মামার তখন বয়স হইছে, মামা ভেবেছে সেই ছোটই আছি আমি,হাঁপাতে লাগল। তারপর তিনজনে দৌড়াতে লাগলাম। ঐ রাতে মামির বাপের বাড়ির পাশে এক বাড়িতে ছিলাম। মামা আমাদের রেখেই আবার ছুটল। এসে দেখে ডাকাত দল ইতিমধ্যে ঢুকে পড়েছে বাড়িতে। মামা খুঁজছিল বড় আপা কোথায়। ডাকাতরা মেরে মামার চোখের নিচে ফাটিয়ে দিয়েছিল। সেলাই দিতে হয়েছিল পরে। কিন্তু ততক্ষনে রক্ত পড়েছিল অনেক। ওরা বড় আপার সাত মাসের পেটের উপর বড় একটা দা রেখে, মামাতো বোনকে চাচ্ছিল। আমার সাহসিনী মা বললেন,” আমি জানি তোমরা কারা, আদাঘাট খবর দেওয়া হইছে, কেউ বাঁচবানা নে। ছেড়ে দাও ঐ বাড়ির মেয়েকে”। ওরা আমার বড় আপাকে ছেড়ে দিছিল ঠিকই, কিন্তু বড় আপা ভয় পেয়ে দশ দিনের মাথায় মিম্মিকে উপহার দিল।

যাই হোক, ঐ রাতে ওরা কিয়াম মামা ও আমার নানাকে ধরে নিয়ে গেল। নানা আমার সেই যে অসুস্থ হল আর সুস্থ হল না। চলে গেল। কিয়াম মামা তারও অনেক পরে গেল।

কিয়াম মামাকে নিয়ে অনেক গল্প। অল্পতে শেষ হবে না। ঝিনুক দিয়ে চুন বানাত মামা, নানির সাথে। আমি মামার সাথে পানির ভিতর থেকে ঝিনুক শামুক আনতাম। না আর লিখব না।

এই গুণ টানা নিয়ে কিছু শব্দ সাজাব,,,,,,, জানি শব্দ আমার অসাড়, বসে না ঠিকমতো, তবু মামা তোমার জন্য,।

*গুণ টানা মাঝি, নৌকার দিশা দিতে টেনে গেছে তার নাও।
মাঝির ঘাড়ের ঐ যে কালসিটে কালো দাগ, আজও ইতিহাসের স্বাক্ষী।
নির্বাক যন্ত্রের মতো এগিয়ে গেছে সে,
খাড়া ঐ বিস্তৃত নদীর কিনার দিয়ে।
ঝড় আসে, বৃষ্টি আসে, মেঘ গর্জায় জোরেশোরে,
তবু তাঁর এ হাঁটা থামে না।
ভরা পূর্ণিমার চাঁদের সাথে হাঁটে সে,
নিশীথ রাতে চাঁদ বিহীন ঘোর অন্ধকারে,
নদীর পানির ছলাৎ শব্দ ও তাকে বলে দেয় এই পথে চলতে।

আকাশের ঐ তারার দল ও পিছু নেয় তাঁর
হিসেব রাখে মাঝির শরীর থেকে খসে পড়া, হাজার ফোটা পানির
তারার দল কাৎরায় তাকে দেখে
সূর্যের ঐ তপ্ত, আগুন ঝরা রোদে ও হেঁটে  চলে সে
এ নৌকা ভিড়াতে হবে তরীর ঘাটে।

,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

মামা তুমি যেখানেই থাক ভাল থাকো। আজ তোমার এই দুষ্টু বুড়ি দেখ বড় হয়েছে, মা হয়েছে।

২৯৫৭জন ২৯৫৩জন
0 Shares

৩৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ