দিনেদিনে কতোটা বর্বর, অসভ্য আর অমানবিক জাতিতে পরিণত হচ্ছি আমরা!!! ★এক: ঢাকার কল্যাণপুরে পাইকপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব মো. হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে ‘রমজানের পবিত্রতা রক্ষা কমিটি’র লোকজন দিনের বেলা খাবার দোকানপাট বন্ধ করে দিচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, তারা খাবার হোটেলগুলোতে ঢুকে খাবারের মধ্যে বালু মিশিয়ে দিচ্ছে। ডিবিসি নিউজ খতিব হাবিবুর রহমানের কাছে এর ব্যাখ্যা দাবী [বিস্তারিত এ কেমন জাতিতে পরিণত হতে যাচ্ছি আমরা?]
বিকালে হক সাহেব আমাদের নিয়ে বসলেন—কনফারেন্স কি করা হবে সে সম্বন্ধে আলোচনা করতে। একটা যুব প্রতিষ্ঠান গঠন করা দরকার, যাতে তরুণ কর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে না যান। আমি হক সাহেবকে বললাম, “যুব প্রতিষ্ঠান একটা করা যায়, তবে কোন রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিৎ হবে কি না চিন্তা করে দেখেন। আমরা এখনও মুসলিম লীগের সভ্য আছি।” হক [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৭২) ” এই প্রতিষ্ঠানের নাম হবে ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ।” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
বললাম, ঢাকা যেতে হবে, শামসুল হক সাহেব খবর দিয়েছেন। রাজনৈতিক কর্মীদের একটা সভা হবে। পরে আবার একবার এসে দেখা করব।” বললেন, “এস।” নূরুদ্দিন এল না, কারণ সামনেই তার এম এ পরীক্ষা। পরীক্ষার পরি চলে আসবে। নূরুদ্দিনের নানা অসুবিধা, তার স্ত্রী তখন মেডিকেল কলেজে পড়ে। তাকেও আনতে হবে। আমি ভাবতাম, পাকিস্তান কায়েম হয়েছে, আর চিন্তা কি? [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৭১) ” হক সাহেব হেসে দিয়ে বললেন, “এই তো দুনিয়া!” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
তারপর প্যাকেটটা এমনভাবে বাঁধা হল যে, কমপক্ষে দশ মিনিট লাগবে খুলতে। আমরা তাঁকে উপহার দিয়েই ভাগব। এই ফটোর মধ্যে ছিল মুসলমান মেয়েদের স্তন কাটা, ছোট শিশুদের মাথা নাই, শুধু শরীরটা আছে, বস্তি, মসজিদে আগুনে জ্বলছে, রাস্তায় লাশ পড়ে আছে, এমনই আরও অনেক কিছু। মহাত্মাজী দেখুক, কিভাবে তাঁর লোকেরা দাঙ্গাহাঙ্গামা করেছে এবং নিরীহ লোককে হত্যা করেছে। [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৭০) ” বন্ধু ইয়াকুবের এই ফটোগুলি যে মহাত্মা গান্ধীর মনে বিরাট দাগ কেটেছিল তাতে সন্দেহ নাই। ” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
এই সময় শহীদ সাহেবের সাথে কয়েক জায়গায় আমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধীর সাথে শহীদ সাহেব হিন্দু-মুসলমান শান্তি কায়েম করার জন্য কাজ করছিলেন। তখন মুসলমানদের উপর মাঝে মাঝে আক্রমণ হচ্ছিল। সেদিন রবিবার ছিল। আমি সকালবেলা শহীদ সাহেবের বাসায় যাই। তিনি আমাকে বললেন, “চল, ব্যারাকপুর যাই। সেখানে খুব গোলমাল হয়েছে। মহাত্মা গান্ধীও যাবেন।” আমি বললাম, ” [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৬৯) ” সত্যই ভদ্রলোক জাদু জানতেন। লোকে চিৎকার করে উঠল, হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই। ” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
“নারীর কোন সহজাত অযোগ্যতা নেই, তাঁর সমস্ত অযোগ্যতা পরিস্থিতিগত, যা পুরুষের সৃষ্টি বা সুপরিকল্পিত এক রাজনীতির ষড়যন্ত্র।” ———- হুমায়ুন আজাদ। আমাকে অনেকেই নারীবাদী হিসাবে চিহ্নিত করেন। মূলত ‘নারীবাদ’ বলতে কি বুঝায়, স্পষ্টত সে ব্যাখ্যাটাই আমার অজানা। আমি লিখি। যখন যা মনে আসে তাই লিখি। শুধু চেষ্টা করি লিখতে গিয়ে স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করে লিখার। এছাড়া সে [বিস্তারিত নারীর সমস্ত অযোগ্যতা পরিস্থিতিগত!]
পরের দিন মিল্লাত প্রেসে গিয়ে হাশিম সাহেবের সাথে দেখা করি। পাশের ঘরে আমার সহকর্মীরা চুপ করে বসে আছে; শুনবে আমাদের কথা। আমি খুব শান্তভাবে তাঁকে বললাম, “প্রেসটা নাকি বিক্রি করবেন?” বললেন, “উপায় কি, প্রত্যেক মাসেই লোকসান যাচ্ছে, কি করি? আর চালাবে কে?” আমি বললাম, খন্দকার নূরুল আলম তো ম্যানেজার হয়ে এতোকাল চালাল। খরচ কমিয়ে ফেলল। [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৬৮) “আমার যদি কোন ভুল হয় বা অন্যায় করে ফেলি, তা স্বীকার করতে আমার কোনোদিন কষ্ট হয় নাই।” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
দৃষ্টি আকর্ষণ করছি… কে এই লুবনা চৌধুরী? ইনি আসলে কি বলতে চান? গুলশানস্থ ‘বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়াল’ স্কুল এর প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল লুবনা চৌধুরীর নামে স্কুল ক্যাম্পাসে নোটিশ ঝুলছে, “যদি কোন ছাত্রছাত্রী বাঙলা ক্লাস ছাড়া স্কুলে বাঙলায় কথা বলে তবে তাকে বহিষ্কার করা হবে।” বাহ! বাহ! বাহ! যে দেশের নাম বাংলাদেশ, যে দেশের মাতৃভাষা বাঙলা, সর্বোপরি যে [বিস্তারিত মাতৃভাষা ‘বাঙলা’ নিয়ে এ কেমন বিধিনিষেধ!]
এই সময় আরও কয়েকটা ঘটনা ঘটে আমাদের কর্মীদের মধ্যে। আমাদের যে মিল্লাত প্রেসটা ছিলো— সেটা হাশিম সাহেব পরিচালনা করতেন। কথা উঠল, প্রেসটা কি করা যায়? হাশিম সাহেব পূর্বেই দেনা হয়ে পড়েছেন বলে একটা রঙিন মেশিন বিক্রি করে দেন, তাতে দায়দেনা শোধ হয়ে যায়। তিনি শামসুল হক সাহেবকে ঢাকা থেকে ডেকে নিয়ে বললেন, ” কলকাতার কর্মীরাও [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৬৭) “আমি বিশ্বাসঘাতকতা বলতাম। ” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
এদিকে লর্ড মাউন্টব্যাটেন চিন্তাযুক্ত হয়ে পড়েছিলেন কলকাতা নিয়ে কি করবেন? ‘মিশন উইথ মাউন্টব্যাটেন’ বইটা পড়লে সেটা দেখা যাবে। ইংরেজ তখনও ঠিক করে নাই কলকাতা পাকিস্তানে আসবে না হিন্দুস্তানে থাকবে। আর যদি কোন উপায় না থাকে তবে একে ‘ফ্রি শহর’ করা যায় কি না? কারণ, কলকাতার হিন্দু-মুসলমান লড়বার জন্য প্রস্তুত। যে কোন সময় দাঙ্গাহাঙ্গামা ভীষন রুপ [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৬৬) ” নেতারা যদি নেতৃত্ব দিতে ভুল করে, জনগণকে তার খেসারত দিতে হয়। যে কলকাতা পূর্ব বাংলার টাকায় গড়ে উঠেছিল সেই কলকাতা আমরা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিলাম। ” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
যেদিন নির্বাচন হবে তার পূর্বের দিন রাত দুইটার সময়—- আমি তখন শহীদ সাহেবের বাড়িতে, শহীদ সাহেব বারান্দায় শুয়ে আছেন। ডা. মালেক এসে বললেন, ” আমাদের অবস্থা ভাল মনে হচ্ছে না, কিছু টাকা খরচ করলে বোধহয় অবস্থা পরিবর্তন করা যেত।” শহীদ সাহেব মালেক সাহেবকে বললেন, “মালেক, পাকিস্তান হয়েছে, এর পাক ভূমিকে নাপাক করতে চাই না। আমার [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৬৫) “সেইদিন থেকে শহীদ সাহেবকে আমি আরও ভালবাসতে শুরু করলাম। ” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
শহীদ সাহেব তো কোনোদিন দুই গ্রুপ চিন্তা করেন নাই, তাই নাজিমুদ্দিন সাহেবের সমর্থকদেরও নমিনেশন দিয়েছিলেন, মন্ত্রী করেছিলেন পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি, চিফ হুইপ, স্পিকার অনেক পদই দিয়েছিলেন। এরা সকলেই তলে তলে শহীদ সাহেবের বিরুদ্ধাচরণ করছিলেন। অন্যদিকে, পশ্চিম বাংলার মুসলিম লীগ এমএলএরা ভোট দিতে পারবেন না, কারণ তারা হিন্দুস্তানে পড়ে গিয়েছেন। তাঁর নিজের দল হাশিম সাহেবের নেতৃত্বে ঘরে [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৬৪) ” হাশিম সাহেব কোন কর্মীকে নির্দেশ দিলেন না। অনেককেই নিষেধ করে দিলেন এবং তলে তলে বলে দিলেন, শহীদ সাহেবকে সমর্থন না করতে।” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
শহীদ সাহেব শাসন চালাবেন, মুসলমানদের রক্ষা করবেন, না ইলেকশন নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন! সিলেটের গণভোটেও শহীদ সাহেবকে যেতে হল। আমাদের মত হাজার হাজার কর্মীকে সিলেটে পাঠালেন। টাকা বন্দোবস্ত করতে হয়েছিল তাঁকেই বেশি। এস. এম. ইস্পাহানী সাহেব বেঙ্গল মুসলিম লীগের কোষাধ্যক্ষ হিসাবে বহু টাকা দিয়েছিলেন, আমার জানা আছে। কারণ, শহীদ সাহেব তাঁর সাথে যখন আলোচনা করেন ৪০ [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৬৩) ” শহীদ সাহেবের বিরোধীদের প্রপাগান্ডা হল তিনি পশ্চিম বাংলার লোক; তিনি কেন পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী হবেন? ” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
এই সময় বড়লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেন তলে তলে কংগ্রেসকে সাহায্য করছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল তিনি ভারত ও পাকিস্তানের গভর্নর জেলারেল একসাথেই থাকবেন। জিন্নাহ রাজি হলেন না, নিজেই পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হয়ে বসলেন। মাউন্টব্যাটেন সম্বন্ধে বোধহয় তাঁর ধারণা ভাল ছিল না। মাউন্টব্যাটেন ক্ষেপে গিয়ে পাকিস্তানের সর্বনাশ করার চেষ্টা করলেন। যদিও র্যাডক্লিফকে ভার দেওয়া হল সীমানা নির্ধারণ করতে, [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৬২) ” পাকিস্তান হওয়ার সাথে সাথেই ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়েছিল।” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
এই সময় শহীদ সাহেব ও হাশিম সাহেব মুসলিম লীগের তরফ থেকে এবং শরৎ বসু ও কিরণশংকর রায় কংগ্রেসের তরফ থেকে এক আলোচনা সভা করেন। তাঁদের আলোচনায় এই সিদ্ধান্ত হয় যে, বাংলাদেশ ভাগ না করে অন্য কোন পন্থা অবলম্বন করা যায় কি না? শহীদ সাহেব দিল্লিতে জিন্নাহর সাথে সাক্ষাত করে এবং তাঁর অনুমতি নিয়ে আলোচনা শুরু [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৬১) ” যখন বাংলা ও আসাম দুইটা প্রদেশই পাকিস্তানে যোগদান করুক, এর জন্যই আমাদের আন্দোলন ছিল, তখন সমস্ত বাংলা পাকিস্তানে আসলে ক্ষতি কি হত তা আজও বুঝতে কষ্ট হয়! ” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]