বাবা

নীরু খুব কষ্ট করে দীর্ঘ একমাইল পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে পৌঁছলো। ক্লাস রুমে বসে সে যখন হাঁপাচ্ছে তখন সহপাঠী বন্ধু রোজি সেজে গুজে হেলে দুলে স্কুলের দিকে এগিয়ে আসছে। জানালার ফাঁক দিয়ে নীরু দেখছে আর ভাবছে তার বাড়িটা ও যদি স্কুলের কাছে পিঠে হতো! ততক্ষণে রোজি এসে তার পাশে বসেছে।

রোজির বাবা একই স্কুলের শিক্ষক। ওদের দুজনের মধ্যে খুব ভাব।ষষ্ঠ শ্রেনীতে এসে ভর্তি হয়েছে দুজনেই ।এখন নবম শ্রেনীতে পড়ে। পড়াশোনায় দুজনেই ভালো। তবে রোজির চেয়ে নীরু বেশি ভালো। ওরা পাল্লা দেয় কে কার চেয়ে ভালো রেজাল্ট করতে পারে। নীরুর গায়ের রঙ শ্যামলা, চেহারা ও ভালো বলা চলেনা। অন্যদিকে রোজি দেখতে খুব সুন্দর।বর্ণভেদ তাদের বন্ধুত্বে কোন ছাপ ফেলতে পারেনি। মেধাবী নীরুর মনটা আকাশের মতো বিশাল,সে সবসময় পড়াশোনার বিষয়ে সহপাঠীদের সাহায্য করে। সে কথা বলে খুব গুঁছিয়ে। যে কেউ তার কথা শুনে সম্মোহিত হতো। সহপাঠীরা নীরুর বন্ধু হওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতো।

যথাসময়ে ক্লাস টিচার এলে সকলে দাঁড়িয়ে সালাম দিল। স্যার সবাইকে বসতে  বলে নিজেও বসে  রোলকল করলেন। নীরুর রোল বলতে বলতে তিনবার বললেন নীরু শুনতেই পেলোনা।
পাশে বসা রোজি বললো __
কিরে নীরু রোলকল শুনতে পাসনি?
নীরু হকচকিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রেজেন্ট স্যার বললো।
সাথে সাথে ক্লাসের সব ছেলে মেয়েরা একসাথে হেসে উঠলো। নীরু ততক্ষণে লজ্জায় কাচুমাচু হয়ে গেলো কারণ সে অন্যের রোল নাম্বারে প্রেজেন্ট বলেছে।

স্যার সবাইকে চুপ করিয়ে বললেন __কি হয়েছে নীরু! অন্যমনস্ক ছিলে কেন? তুমি তো অমনোযোগী ছাত্রী না।
নীরু দাঁড়িয়ে কোনমতে বললো দুঃখিত স্যার। এমনটি আর হবে না।

নীরু ক্লাসে মনোযোগ বসাতে পারলোনা। তার বসে থাকতে ও কষ্ট হচ্ছে। ক্লাসের ফাঁকে রোজি জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে তোর! চোখমুখ শুকনো লাগছে কেন? নীরু অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে জবাব দিলো কই নাতো কিছু হয়নি, এমনি ভালো লাগছে না।

নীরুর চোখ ফেটে কান্না আসছে, সে রোজিকে বলতে পারলোনা গতরাত থেকে তার পেটে কিছু পড়েনি,আম্মার বকুনি হজম করতে না পেরে রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। সকালে ও না খেয়ে এসেছে। তীব্র অভিমানে চাপা কষ্ট সাথে ক্ষিধের জ্বালা, তার শুধু মনে হচ্ছে সে কি এমন করেছে যে আম্মা এমন করে বকলো। বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে ‘মিসির আলী’ পড়ছিলো আম্মা হাতেনাতে ধরে ফেললো। এতো বকা দিলো যে বকা খেয়েই পেট ভরে গেছে। ভাবতে ভাবতে কখন মধ্য বিরতি হয়ে গেছে। রোজির কথায় সমন্বিত ফিরে পেলো।

রোজি বললো টিফিন খাবিনা! আমি বাড়ি গিয়ে খাবো। বলে সে বেরিয়ে গেলো। এদিকে নীরুর পেট জ্বলছে আর মোচড়াচ্ছে ক্ষুধায়। অলস পায়ে দুর্বল শরীর টেনে সে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো __

স্কুলের গেইটে চোখ পড়তেই নীরুর দুচোখ বিস্ফারিত! সে কি সত্যি দেখছে? টিফিন বক্স হাতে বাবা দাঁড়িয়ে! কাঠফাটা রোদ মাথায় করে একমাইল পথ পায়ে হেঁটে বাবা টিফিন নিয়ে এসেছেন!কদম কদম এগিয়ে আসছেন নীরুর দিকে। নীরুর চোখ দিয়ে টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ছে আনন্দাশ্রু! বাবা খপ করে নীরুর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন কমন রুমে। হাতে তুলে খাইয়ে দিলেন। প্রিন্সিপ্যাল স্যারকে বলে ছুটি করিয়ে বাড়ি নিয়ে গেলেন। রাগী বাবার অমন কোমল রুপ নীরু এর আগে দেখেনি। সে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করলো আজ থেকে মন দিয়ে পড়াশোনা করবে ;কোন ভাবে বাবা মাকে কষ্ট দেবেনা।

মোট পড়েছেনঃ ১,৩৮৩জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

৩৮টি মন্তব্য

  1. চমৎকার আপু। চোখে জল‌ এসে গেল। বাবার ভালোবাসা এমন করেই কাঁদায় উপরে কঠিন আবরণ ভিতরে নরম টলটলে জলের মতো। অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ আপনাকে। শুভ কামনা রইলো অহর্নিশি

    1. বাবারা এমনই হয়। আমার সাথে বাবার এরকমই একটি স্মৃতি নিয়েই লিখেছি। জানিনা কতোটুকু কি পেরেছি। আপনার চোখে জল এসেছে আমার ও লেখার সময় চোখে জল এসেছে।
      ভালো থাকুক সকলের বাবা মা।
      অনেক ধন্যবাদ দিদি ভাই।
      ফোনটা বড় জ্বালাচ্ছে হঠাৎ হ্যাঙ করায় জবাব দুবার লিখতে হলো।

  2. ভীষণ ভালো লেগেছে নীরু এবং রোজির বন্ধুত্ব আপু, সেই সাথে এক বাবার ভালোবাসা তার কন্যার প্রতি অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছ।
    খুব সুন্দ।

    1. অনুপ্রেরণা পেলাম বোন। স্কুল জীবনের বন্ধুত্ব বড়ৃ মধুর হয়ে থাকে। আর বাবা মানেই ভালোবাসার বিশাল ক্ষনি।
      অনেক ভালোবাসা এবং শুভেচ্ছা রইলো।

  3. লেখকর গঠন ভালো লেগেছে। আবেগের জায়গায় আমি মন্তব্য করতে পারছিনা।বাবা নিয়ে মন্তব্য করার মত ভাষাও আমার খাটো। শুধু বলি, বাবার অভাব পূরণ হবার নয়।বাবার প্রতি শ্রদ্ধা। আপনার জন্য শুভ কামনা।

    1. আপু আপনার মন্তব্য আমার জন্য বিশেষ অনুপ্রেরণা। আমার জীবন থেকে নেওয়া টুকরো স্মৃতি নিয়েই লিখেছি ।
      ভালো থাকুক সব বাবা মা।
      অশেষ কৃতজ্ঞতা এবং অনেক ভালোবাসা রইলো প্রিয় আপু

    1. প্রথমবার গল্প লিখলাম। আপনার মন্তব্যেে খুব উৎসাহ পেলাম।
      ভালো থাকুন সবসময়। আন্তরিক শুভেচ্ছা অবিরাম।

    1. “ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি ” গল্প লিখতে গিয়ে আমার হলো এই অবস্থা। দু’চার লাইন অকবিতা লেখা যতোটা সহজ গদ্য লেখা তারচেয়ে ঢের কঠিন। জানিনা কি জগাখিচুড়ি হবে শেষ পর্যন্ত।
      নাইন টেনে পড়ুয়ার জন্য মিসির আলী নিষিদ্ধ ব্ল্যাকহোল আমি নই বাবা মা মনে করতেন।
      অগত্যা কি আর করা।
      তবে বাবা মা দোয়ায় হয়তো আজও ভালো আছি।
      অনেক ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা জানবেন ভাইয়া।

  4. আমি আমার বাবাকে অনুধাবন করি তার চেহারায়, তার কথা কর্ম হৃসয় নাড়া দেয়।

    এখন আমিও বাবা। ঢাকায় আসার সময় দুইহাত দিয়া আমার পা ধরে কেদেছে আব্বু তুমি যাবানা। আমি নিরুপায় হয়ে ফেলে এসেছি। পরে ওর মাকে বলেছে তুমি আমাকে ধরলে কেন? আমি আব্বু কে যেতে দিতাম্না। পুনচ! আমার সন্তানের বয়স প্রায় ৬ বছর।

    1. কতো আত্মবিশ্বাস সোনা মামনির ও চাইলেই বাবাকে রেখে দিতে পারে। সত্যি মেয়ের বাবা হওয়া কষ্টের চাইলেও বাবা মেয়ে সারা জীবন একসাথে থাকতে পারেনা।
      অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া। পুচকু মামানির জন্য দোয়া রইলো।

  5. একমাত্র বাবাদের সদাচরন ও ভালোবাসা সঠিক ভাবে সন্তানদের কাছে উপস্থাপন করতে পারলে সন্তানদের মাঝে অনুশোচনা আসে। নীরুর বাবার অভিভাবকত্ব প্রদর্শিত হওয়ায় নীরুর অনুশোচনা আসে বলেই সে প্রতিজ্ঞা করেছে ভাল করে মন দিয়ে লেখাপড়া করবে।
    খুব সুন্দর লেখা।

    1. ভাইয়া একদম ঠিক বলেছেন। আমাদের সময় শাসনের মাত্রাটা একটু বেশিই ছিলো। আমরা আমাদের বাচ্চাদের সাথে অনেক সহজ সাবলীল সম্পর্ক গড়ার নিরন্তর চেষ্টা করি।
      আপনার সুন্দর মন্তব্যেে উৎসাহ পেলাম ভাইয়া।
      আন্তরিক ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা জানবেন।

  6. বাবাতো বাবাই।
    বাবার মন সন্তানেরা বুঝতে পারে না
    বলেই যত অনিস্টের মূল।
    পৃথিবীর সকল বাবারাই শান্তিতে থাকুক।
    ভালোই লিখলেন শুভ কামনা।

    1. আসলেই তাই দাদা আমরা শাসনটাই দেখতাম ভালোবাসা দেখতামনা।
      যখন বুঝতে পেরেছি তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
      ভালো থাকুক সব বাবা মা।
      ধন্যবাদ দাদা মন্তব্য পেয়ে অনুপ্রাণিত হলাম।
      আন্তরিক শুভেচ্ছা জানবেন

  7. এই প্রথম আপনার লেখা গল্প পড়লাম। আগে যদি লিখতেন তাহলে আমরা আপনার কাছ থেকে আরও অনেক অনেক গল্প পেতাম। আপনি কবিতায় বেশি ভালো নাকি গল্পে বেশি ভালো ভেবে কনফিউজড হয়ে গেছি।
    বাবা মা আমাদের ভালোবাসেন। আমরা তা জন্মের পর থেকেই জানতে পারি। কিন্তু উপলব্ধি করি বিশেষ মুহুর্তে, এমনই ঘটনা / দুর্ঘটনায় সৃষ্টিকর্তা আমাদের হৃদ-চক্ষু খুলে দেন। ভালো থাকুন আমাদের বাবা মায়েরা। আপনিও ভালো থাকুন।
    শুভ কামনা 🌹🌹

    1. হ্যাঁ আপু আপনাদের উৎসাহে জীবনের টুকরো স্মুতি নিয়ে গল্প লিখে ফেললাম। আপনার ভালো লেগেছে জেনে আরও অনুপ্রাণিত হলাম। চেষ্টা করবো আরও লিখতে।
      অনেক ধন্যবাদ এবং ভালোবাসা রইলো আপু।

  8. মিছা কথা কইলে পাপ হয়।কি সুন্দর করে বললেন আপনার গল্পে লেখা হয় না।এটা কে লিখল আপনার প্রেতাত্মা?
    মন ছুঁয়ে গেল।আর বাবাকে ভীষন মনে করিয়ে দিলেন।এখন লিখছি আমার গায়ে অনেক জ্বর,বাবা থাকলে কপালে হাত দিত।কি যে শান্তির ছোঁয়া।
    ভালোলাগা বড্ড ছোঁয়াচে আপনার গল্প লেখা দেখে বলতে ইচ্ছে হল। শুভ কামনা আপু।

    1. এতো ভালোবাসা কোথায় রাখি রুকু আপু! পাতি বাঙালির এই অবস্থা। সাহসের বড় অভাব। নিজের বাবার ছোট্ট এক টুকরো স্মৃতি গল্প আকারে লিখেছি। আপনাদের উৎসাহ পেয়ে চেষ্টা করবো আবারও লিখতে।
      অনেক ভালোবাসা এবং শুভেচ্ছা রইল আপু।

  9. গল্পটা অনু না হয়ে ছোট গল্প হতো মনে হচ্ছে। সে যা হোক দারুণ লিখেছেন। উঠতি বয়সের সন্তানকে যেমন শাষণ করতে হয় তেমনি আদর করে আগলেও রাখতে হয়। গল্পে সেটাই পেলাম। বাবাদের ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়।

    পাঠ্যবই ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন বই পড়ার ঝোঁক বুঝি এইট/নাইনেই আসে।

    1. হ্যাঁ আপু একদম ঠিক বলেছেন। সেই বয়সের ঝোঁক কি শুধু ঝোঁক! রীতিমতো পাগলামি। বাবা ভীষণ ভালোবাসতেন কিন্তু প্রকাশ করতেন না। যখন প্রকাশ করলেন তখন উপরওয়ালা তুলে নিলেন।
      আপু প্রথমবার গল্প লিখেছি। তাই বুঝতে পারিনি ছোট গল্প বিভাগে দিবো না অনুগল্প বিভাগে দিবো।
      সুন্দর পরামর্শ পেয়ে উপকৃত হলাম আপু।
      অনেক ধন্যবাদ এবং শুভকামনা নিরন্তর।

  10. বাবাদের ভালোবাসা নির্মল। সন্তানের জন্য বাবাদের ত্যাগের প্রতিদ্বন্দ্বী জগতে আর কেউ নেই।

    চমৎকার গল্প পড়লাম আপু। নিয়মিত আপনার গল্প চাই কিন্তু। শুভকামনা রইলো।

    1. ভাইয়া আপনি একদম ঠিক বলেছেন। মেয়েরা বিয়ের পর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খায় বাবাকে হারিয়ে। বাবার মতো করে আর কেউ বুঝতে পারে না, না বলা প্রয়োজন।
      আপনাদের উৎসাহ পেয়ে সাহস করে লিখে ফেললাম।
      ইনশাআল্লাহ আবারও হাজির হবো অন্য কিছু নিয়ে।
      সবসময় অনুপ্রাণিত করার জন্যে অসংখ্য ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা জানবেন।

মন্তব্য করুন