ভয়

বাবুল সাহেব এই এলাকায় এসেছেন প্রায় এক বছর হতে চলেছে। বেশ দাম দিয়ে মোটামুটি অভিজাত দেখতে একটা এপার্টমেন্টের দুটো ফ্লাট কিনে ফ্যামিলি সহ বসবাস করেন। পেশায় ব্যবসায়ী। তিনি শিক্ষিত লোক, তার আচার-ব্যবহার ভালো। দেখতে ভালো, দামী কাপড়চোপড় পড়েন। সুন্দর করে কথা বলেন। তার এক্সট্রা গুণ হলো তিনি গরীব মানুষদের টাকা ধার দেন, এবং বেশিরভাগ সময়েই ফেরত নেন না। এলাকার যেকোনো প্রয়োজনে দান করেন মুক্তহস্তে। উঠতি ছেলেপুলেদের নানা বায়নাও মিটিয়ে দেন বন্ধুর মতো। এমন সব বহুবিধ কারণে দেখতে-দেখতে  তিনি পাড়ার সবার কাছেই মোটামুটি পরিচিত একজন হয়ে উঠে ছিলেন।

সব্জী বিক্রেতা মামুনের বাপের কাছে বাবুল সাহেব দেবতাতুল্য মানুষ। তার কাছ থেকে সব্জী কেনার সময় বাবুল সাহেব কখনো দাম জিজ্ঞেস করেননা, উল্টো ভাঙতি টাকাও ফেরত নেয় না মাঝেমধ্যে। আবার মামুনের বাপের যখন মাঝে-সাজে কখনো চালানের অভাবে ব্যবসা বন্ধ হওয়ার দশা হয়, তখন তিনি নিজে এগিয়ে এসে টাকা ধার দেন। মামুনের বাপের কাছে বাবুল সাহেব দ্বিতীয় খোদার মতোই সম্মানিত হয়ে গেছেন। তিনি যখনই আওয়াজ দেন, মামুনের বাপ সাড়া দিতে ভুল করে না।

মামুন তেরো/চৌদ্দ বছরের ছেলে। এলাকার থেকে বেশকিছু দূরে একটা আধা সরকারি স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে। বড়ো দুই ভাই বিয়ে করে আলাদা থাকে, তারা রিক্সা চালায়। বাপ-মায়ের খোঁজ খবর তারা রাখে না। মামুন দিনের অর্ধেক সময় স্কুলে, বাকি সময় বাপের কাজে সাহায্য করে। খুব ভোরে উঠে তাদের একমাত্র ভ্যানগাড়িটা নিয়ে বাপের সাথে আড়তে যায়। পাইকারী দরে অনেক রকম সব্জী নিয়ে ফিরে আসে। তারপর  ভ্যানে  সব্জী গুলো সাজিয়ে দিয়ে স্কুলে চলে যায়। মামুনের বাপ দুপুর পর্যন্ত পাড়ার অলিতে/গলিতে সেগুলো বিক্রি করে। বিকেলে সব্জীর ভ্যান নিয়ে এলাকার মোড়ে দাঁড়িয়ে বিক্রি করে। তখন মামুনও থাকে বাপের সাথে। যাদের অনেক সব্জী কিনে একা-একা বাড়ি ফিরতে কষ্ট হয়, বা যাদের  কাছে নগদ টাকা কম পড়ে যায়, তাদের সাথে বাড়ি গিয়ে জিনিস দিয়ে টাকা নিয়ে আসে সে। এই কাজটা সে খুব আগ্রহ নিয়েই করে। যাদের হেল্প করতে যায়, তারা টাকার সাথে অনেক সময় বখশিশও দেয়।

লকডাউনের সময়টাতে অসহায়-গরীব-ঘাওড়া মানুষেরা প্রয়োজনে/অপ্রয়োজনীয় কাজে ঘরের বাইরে গেলেও, অবস্থাসম্পন্নরা/স্বাস্থ্য সচেতন মানুষেরা একদমই  বাইরে বের হয় না। তাদের যা কিছু দরকার সব বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করে নেন । এই লোকটিও ব্যতিক্রমী ছিলেন না। তার নিত্তনৈমিত্তিক কিছু প্রয়োজন হলেই সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আওয়াজ দিতেন, আর সবাই চাহিদা অনুযায়ী জিনিস তাকে পৌঁছে দিয়ে ধন্য হতো।

গতদিন দুপুরে মামুন বাবুল সাহেবের বাসায় সব্জী দিতে গিয়েছিলো। ফিরেছিলো খুব শুকনো মুখে। বাপের হাতে সব্জীর টাকা সহ আরও একমুঠো টাকা দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো। মামুনের বাপ ছেলের হাতে বাড়তি টাকা দেখে খুব খুশি হলো কিন্তু ছেলের শুকনো মুখ দেখে কিছুই বুঝলো না,। মিনিট খানেক পর সে তার বাপকে শরীর খারাপের কথা বলে বাড়িতে চলে গিয়েছিলো। রাতে জ্বর খুব এসেছিলো, একটু পর পর ঘুমের ঘোরে ভয়ার্ত চিৎকার দিয়ে জেগে উঠেছিলো। জড়িয়ে ধরছিলো তার মাকে।

পরদিন সকালে মামুন আরও অসুস্থ হয়ে পড়লো। জ্বর নেই, কিন্তু কি এক অজানা আতঙ্ক তাকে পেয়ে বসেছে। সারাদিন সে ঘরের এককোনে চুপচাপ শুয়ে থাকলো। মামুনের বাপ-মায়ের এতকিছু খেয়াল রাখার সময় ছিলো না। কিছু শ্রেনীর মানুষেরা ছেলেমেয়েদের সামান্য অসুখ-বিসুখ বা মন খারাপ নিয়ে কেউ এত ভাবে না। মামুনের পরিবারও তেমন।

বিকেলের দিকে মামুন কিছুটা সুস্থির হলো। সে হাটতে হাটতে রাস্তার মোড়ে তার বাপের ভাসমান দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। অন্যান্য সময়ে তার বয়সি কিছু বন্ধুরাও সেখানের এক চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়। গিয়ে দেখলো তার বাপ চিন্তিত মুখে নিজের ভ্যান রেখে, চায়ের দোকানে বসে আছে, চায়ের দোকানের কাদির চাচা নেই, তার ছেলে করিমও নেই।

মামুন জিজ্ঞেস করলো- কি হইছে বাবা? আপনে কাদির চাচার দোকানে বইস্যা আছেন ক্যান?

মামুনের বাপ চিন্তায় অস্থির হয়ে জবাব দিলো- কাদির ভাই ভাত খাইতে বাড়িত গেছে, এখনো আসে নাই। করিমরে তরকারি দিয়া বাবুল সাবের বাড়িত পাঠাইছি, এখনো পোলাডা আইলো না। ওর বাপে আইয়া দোকানে না পাইলে আমারে কটু কথা শুনাইবো। কিযে করি!

– বাবা, আপনি তাড়াতাড়ি আমার লগে চলেন, আর যারা যারা এইখানে আছে তাগোও লইয়া লন। এক্ষণেই সবার বাবুলের বাসায় যাওন লাগবো।

— ক্যান?

মামুনের  মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ আসতে চাচ্ছে না, গলা বুজে আসছে ভয়ে-কান্নায়। তবুও সে চেষ্টা করলো…
— বাবা, বাবুল একটা জানোয়ার। অয় কাইল আমার সাথে অনেক খারাপ কাজ করছে। আমি নিজেরে বাচাইতে পারি নাই। অনেক ব্যাথা, তবুও শরমে কাউরে কইতে পারিনাই। তাড়াতাড়ি চলেন, আমরা দেরি করলে করিমের লগেও হ্যায় ঐ কাজ করবো। আমার আর ভয় নাই, করিমের লগে যদি কিছু করে তাইলে আজকে ঐ জানোয়ারের একদিন কি আমার একদিন।

মামুন, মামুনের বাপ এলাকার কিছু লোকজন সাথে নিয়ে গিয়ে করিমকে উদ্ধার করে নিয়ে এলো। বাবুল সাহেব কুকর্ম করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। তাকে ধরে এলাকার  সমাজকল্যাণ অফিসে নিয়ে যাওয়া হলো।

অফিসের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করা।

বাইরে উৎসুক মানুষের ভীর জমেছে। তারা অনেকেই সম্পূর্ণ ঘটনা জানতে পারেনি। এর-ওর মুখে-মনে ঘুরছে-ফিরছে কিছু জিজ্ঞাসা..

– এই ব্যাটার  বউ বাচ্চা নাই!
– ঐ সময়ে তার ফ্যামিলি কই ছিলো!
– নিজের ঘরের ভিত্রে কেউ এসব করে!
– এরপর সে মানুষের সামনে মুখ দেখাবে ক্যাম্নে!
– তার ঘরের মানুষেরাও আটকালো না!
– ওও আল্লাহ ব্যাটায় কি পাগল!
– কলেজে পড়া ছেলেমেয়ে / তার ওয়াইফের সম্মানের কথাও ভাবলো না! সেতো শিক্ষিত লোক!
– লোকটার মনে হয় মানসিক সমস্যা আছে।

ঘন্টা খানেক পর মামুন, করিম, তাদের বাপ গম্ভীরমুখে সমাজ কল্যাণের অফিস ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বিচার শোনার অপেক্ষায় যারা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো, তারা নানা ধরনের প্রশ্ন করতে আরম্ভ করলো। যারা বাবুল সাহেবের নাম শুনেছে/ শোনেনি তারাও এসেছিলো।

কিন্তু সমাজ চলে নিজের রথে। ঠুনকো সমাজের ধারকরা বাবুল সাহেবকে নিরাপদে তার ফ্লাটে পৌঁছে দিয়ে এলেন। সমাজ -সভাপতির বক্তব্য ছিলো,

— মানুষ মাত্রই ভূল করে। ভালো মানুষেরা আসলে ভূল করতে চায় না। এই ভূল গুলো শয়তান করায়। বাবুল সাহেব যেটা করেছেন, তাও শয়তানের প্ররোচনায়। তিনি তার কৃতকর্মের জন্য  লজ্জিত। তাই তার সম্মানের কথা ভেবে, তার ছেলে-মেয়েদের মান-সম্মানের কথা ভেবে এই ব্যাপারটা এখানেই ফুলস্টপ করে দেয়া হলো।

 

* ছবি- নেট থেকে নেয়া।

মোট পড়েছেনঃ ২,১৭১জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

২২টি মন্তব্য

  1. বাইরে থেকে সহজে বুঝা যায় না মানুষকে,
    মুখোশের আড়ালে থাকে অনেকেই।
    আর সমাজ এদের রক্ষা করে, সমাজপতিরাই যে একেকজন বাবুল।

    ভালো গল্প,
    শুভ কামনা।

    1. সত্যিই তাই। সমাজের সমাজ ব্যবস্থা গুলো নির্ভর করে ব্যক্তির অবস্থানের উপর। কিসের কল্যাণ কিসের কি, এরা নিজেদের স্বার্থে সামাজিকতার রীতিনীতি বদলায়/ভেঙে দেয়।

      ধন্যবাদ। ভালো থাকুন, সুস্থ নিরাপদে থাকুন।
      শুভ কামনা 🌹🌹

  2. শক্তের ভক্ত নরমের যম, সমাজ অধিপতিরা এমনই এক সমাজ সৃষ্টি করে রেখেছে যেখানে মালদার পার্টিদের সাত খুন মাফ, কিন্তু বাবুল সাহেবের জায়গায় যদি ঐ সবজিওয়ালা হতো, তাহলে তার আর নিস্তার ছিলোনা।
    এখন এইসবে অবাক হইনা আপু, এগুলো হরহামেশাই ঘটছে।
    সমসাময়িক বিষয়টি নিয়ে লেখার জন্য অশেষ ধন্যবাদ আপু।

    1. আপনি একদম সঠিক স্থানটাই চিহ্নিত করেছেন ভাইজান। ঘটনা উল্টো ঘটলে এই গল্পটি আর লেখা হতো না। সমাজপতিরা নিজেদের আখের গোছানোর কাজ খুব নৈপুণ্যের সাথে করতে পারে। আর তাদেরকেই সমাজে প্রতিনিধিত্ব দেয়া হয়।

      শুভ কামনা রইলো ভাইজান 🌹🌹

  3. মুখোশের আড়ালে এমন মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের চারপাশে ঠাটবাটের সাথেই । কিছু লাভের আশায়, বাড়তি কিছু পাবার জন্য এসব নিম্নবিত্ত রা এদের দেবতুল্য ভাবে। আর ধারকরাও গা বাঁচাতে এদের একই কারনে মান্য করে চলে। ফলাফল বিচারের নামে প্রহসন । শুভ কামনা রইলো 🌹🌹

    1. প্রয়োজন আর অসহায়ত্ব মানুষকে নিজের প্রকৃতিগত ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। নিজেদের সাহস-শক্তি গুলো নিজের অজান্তেই বিক্রি করে দিয়ে হয়ে পড়ে আরও নিঃস্ব। এদের মাথা নিচু করে চলা ছাড়া উপায় থাকে না। হোক দেবতা বা অসুর। কারো কাছেই ন্যায়বিচার পায় না।

      সুন্দর মন্তব্যের জন্যে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
      ভালো থাকুন, শুভ কামনা ❤❤

  4. মানুষের মুখোশের আড়ালে অনেককিছু লুকিয়ে থাকে যা এ গল্পে প্রতিফলিত হয়েছে।
    আর নিম্নবিত্তরা লাভের আশায় উচ্চবিত্ত টাকাওয়ালাকে দেবতাভাবে। যা বুঝতে পারেনা।
    .
    যথার্থ তুলে ধরলেন দিদি।

    1. যখন বুঝতে পারে তখন আর কিছু করার থাকে না। এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মরা জিম্মি হয়ে থাকে বিত্তবান আর সমাজপতিদের হাতের মুঠোয়।

      তোমার কমেন্টাকেই কোট করে আমার ওয়ালে দিয়েছি। সুন্দর মতামতের জন্যে অনেকগুলো থ্যাংকস 🙂

      ভালো থেকো,
      শুভ কামনা 🌹🌹

    1. আসলেই তাই। তবে কেন জানি, ভালো মুখোসের আড়ালে থাকা কুৎসিত মুখ গুলোর প্রতি দুঃখ/ করুণা কিছুই আসে না ভাই। এরা মানুষ হয়েও মানুষ জাতিকে প্রতিনিয়ত লজ্জিত করে রাখে।

      সুন্দর মন্তব্যের জন্যে অনেক অনেক আপনাকে।
      ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।
      শুভ কামনা 🌹🌹

  5. “ভালো মানুষেরা আসলে ভূল করতে চায় না। এই ভূল গুলো শয়তান করায়। বাবুল সাহেব যেটা করেছেন, তাও শয়তানের প্ররোচনায়।”
    এই শয়তানের প্ররোচনায় করায় বলে এভাবেই বিক্রী হয় যায় বিবেক,সমাজ আর আইন
    তাই মানুষ বলে গরীবের জন্যই আইন বড়লোকের জন্য শয়তানেরা মাফ করার জন্য বসে থাকে শয়তানের বংশধরদের।
    বাস্তবতা তুলে আনলেন। শুভ কামনা।

    1. এভাবেই শয়তানের দোহাই দিয়ে শত-সহস্র পাপ করে পাপাচারীরা বেঁচে যায়, মুক্তি পায় অহরহ।ভালো মানুষের যেখানে কেউ থাকেনা,সেখানে শয়তানকে সাহায্য করার লোকের অভাব নেই। দুঃখজনক হলেই এটাই সত্যি, শয়তানের দোসর দিয়ে ভরে যাচ্ছে চারপাশ। সমাজ চালানোর দায়িত্বে থাকে তার সাঙ্গপাঙ্গরা।

      বিস্তারিত মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ দাদা।
      নতুন লেখা দিন।
      ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন,
      শুভ কামনা 🌹🌹

  6. সমাজে এরকম অনেক বাবুল আছে যারা নিজেরাই শয়তানের থেকেও বড় শয়তান। মানুষের উপরের স্বরুপ দেখে মনের খবর জানা যায়না। পশুর চেয়েও নরকিট তারা।

    গল্পে সমাজের অসম জীবনের খারাপ দিকটিকে ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন আপু। ভালো লাগলো পড়ে।

    শুভকামনা জানবেন।

    1. আমরা আমাদের চারপাশে এমন বাবুল-ভদ্রলোকের দেখা পাই। অসম সামাজিক ব্যবস্থার মাঝে নিজেরাই বসবাস করতে থাকি। দেখতেই নিজেদের আবেগ অনুভূতি গুলো পরপারে পাড়ি দেই। কিন্তু এইসব বাবুল আর তাদের রক্ষাকারীরা মরে না। তারা ফিরে-ফিরে আসে নতুন নতুন রুপ ধরে।

      সব সময় বিস্তারিত বিশ্লেষণে চমৎকার মন্তব্য করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই তৌহিদ ভাই। ভালো থাকুন সারাক্ষণ।
      শুভ কামনা 🌹🌹

    1. কেউ কারো কথা ভাবে না নিজের স্বার্থ ছাড়া।
      এখন স্বার্থপর সমাজের জয়জয়কার সব জায়গায়।

      সুন্দর মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ নজরুল ভাই।
      ভালো থাকুন, শুভ কামনা 🌹🌹

মন্তব্য করুন