যে কোন একটি মেয়ের গল্প

হিজবিজবিজ ২৩ জুলাই ২০১৫, বৃহস্পতিবার, ১২:০৫:০২অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ১৮ মন্তব্য

বাহিরে এখনও বিকেলের আলো কিন্তু ঘরের ভেতরে অন্ধকার গলে গলে পড়ছে। দমবন্ধ করা অন্ধকার। এমন অন্ধকার দেখলেই আমার ভীষন ভয় করে। আমার ভিতরের দৈত্যগুলো বের হয়ে আসতে চায়। জীবনের বিভিন্ন সময়ে আমি যে দৈত্যগুলোর মুখোমুখি হয়েছি আর সমাজ আর পরিবারের কারনে যাদের মুখোশ খুলতে পারিনি কিন্তু বোতলে ভরে ছিপি দিয়ে রেখেছি নিজের ভিতরের সেই সব দৈত্য।

মনে পড়ছে ছোট বেলার সেই নতুন দাদুর সর্পিল হাত। অন্ধকারের সুযোগে আমার শরীরে ঘুরে বেড়িয়েছে।   বাবার বয়সী কিন্তু সম্পর্কে বাবার  দূর সম্পর্কের চাচা, তাই আমাদের দাদু। বাসায় সবাই জানত আমাকে ভীষন আদর করেন নতুন দাদু, আমাকে বেড়াতে নিয়ে যান। কিন্তু কেউ জানত না বেড়ানটা আমার কাছে কতটা বিভীষিকার ছিল। অন্ধকারে অথবা একলা আমার সামনে নতুন দাদুর শরীর হয়ে যেত কাঁটাওয়ালা গাছ। এমন ভাবে জড়িয়ে ধরেতেন, মনে হত সারা শরীরে আমার কাটা বিঁধছে। ভীষন অসস্তি হত, ভীধন খারাপ লাগা। কাউকে বলে বোঝানো যেত না, এই খারাপ লাগাটা কি। মা’কে বলেছিলাম অই লোকটা এত পচা কেন??বলেছিলাম আর কখনও বেড়াতে যাব না লোকটার সাথে। মা বলেছিলেন “ ছিঃ গুরুজনদের নিয়ে এভাবে বলতে নেই, দেখনা তোমাকে কত্ত আদর করেন”। আচ্ছা মা কেন তার ছোট্ট মেয়েটিকে বুঝতে পারল না!!!

স্কুলের দিনগুলোতে যখন গুচ্ছ গুছ সাদা মেঘের মত, সাদা পোশাক পরে ছেলেরা উদ্দাম হাওয়ার মত স্কুলে যেত, আমি যেতাম ভয়ে জড়সড় হয়ে মাটির দিকে চোখ রেখে। জানিই চোখ তুললেই দেখব রাস্তার মোড়ে দাড়ান, পাড়ার সেই ছেলেটা, বিশ্রী ইঙ্গিত করছে আমার শরীরের দিকে। প্রানপনে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্ঠা করতাম সেই দৃষ্টি, কিন্তু এড়াতে পারিনি শব্দ। নোংরা ভাষায় ধর্ষিত হয়েছি প্রতিদিন। নোংরা, অশ্লীল শব্দগুলো আমার ঝকঝকে কিশোরী আকাশে কি তীব্র কালো রঙ লাগিয়ে দিয়েছিল!! আমার প্রজাপতির ডানা গুলো ভেঙ্গে যাচ্ছিলো ক্রমাগত… প্রতিদিন একটু একটু করে। আমি আবারও বুঝতে পারছিলাম, আমি মেয়ে। প্রতিদিনের জীবনের আনন্দ, প্রজাপতি, মেঘ , প্রতিদিনের রঙ মেখে উচ্ছল দিন কাটানো এই সমাজে মেয়েদের জন্য সম্ভব না। মেয়েদের প্রতি মুহুরতে শিখতে হবে  বেচে থাকার কৌশল, নোংরা চোখ এড়িয়ে, বাজে শব্দ, কামুক হাত এড়িয়ে চলার কৌশল। সেই প্রথম ভীষন অভিমান হয়েছিল, মেয়ে হয়ে জন্মানোর জন্য।

তারপর একটু বড়, পাড়ার স্কুল ছেড়ে দুরের কলেজ। আবার সেই যাত্রাপথে নানারকম ইশারা, ইঙ্গিত, হাত, শব্দকে এড়িয়ে যাবার কৌশল। মনে পড়ছে কলেজ থেকে ফেরার পথে বাসে গায়ে পুরুষাংগ ঠেকিয়ে বিকৃত মজা পাওয়া সেই দৈত্যটার কথা। তখন আমি একটু প্রতিবাদী। একটু একটু বুঝতে পারছি মেয়ে জন্ম নয়, অভিশপ্ত এই সমাজ। প্রয়োজন প্রতিবাদের, প্র্যোজন মুখ খোলার। তাই প্রতিবাদ করেছিলাম, স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলাম আপনার পুরুষাংগটা গায়ে লাগছে, একটু সরে দাড়ান। পুরো বাস জুড়ে আমার বিরুদ্ধে ছিছিক্কার উঠে গেল। এমন ভাষায় কথা বলতে আছে !! যেন লোকটি কোন অপরাধ করেনি, কিন্তু আমার স্পষ্ট উচ্চারনটি ভীষন অপরাধের। পিছনে ফিরে দেখছি সেই লোকটি বিকৃত মজায় হাসছে। এই দেশে এই সমাজে যৌন হয়রানি বৈধ, গ্রহণযোগ্য কিন্তু মুখে আনা পাপ। এর বিরুদ্ধে মুখ খুললে মেয়েটি অভদ্র কিংবা উচ্ছনে যাওয়া বখা মেয়ে।

যখনি উচ্ছল আনন্দে মেতে উঠতে চেয়েছি, যেকোন জাতীয় উৎসবে বা জাতীয় প্রাপ্তিতে যখনি নেচে উঠেছে মন, সার্বজনীন আনন্দে আংশ নিতে চেয়েছি তখনি আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে “তুমি মেয়ে”। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে বসন্ত উৎসব, পহেলা বৈশাখ কিংবা খেলায় জিতে যাওয়ার পর আনন্দ মিছিল, সব খানেই সাম্লাতে হয়েছে সুযোগ সন্ধানী হাত কিংবা বাজে মন্তব্য। ভীশন কষ্ট হত, এইসব আনন্দে সমান অংশীদার হওয়ার অধিকার যেন আমার নেই।

কত কত জনের কথা বলব আমি।কত কত দানব চারপাশে কিলবিল করছে। কত জনকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারব আমি!!! কাকে বলব আমি অফিসের সেই পুরুষ সহকমীর কথা। কথায়, চিন্তায়, আচরনে যিনি   দারুন প্রগতীশীল। নারী অধিকার কিংবা মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠায় যার কন্ঠ অফিসে খুব সোচ্চার। সেই তিনিই ফিল্ড ট্যুরে একলা মহিলা সহকর্মীকে পেয়ে দারুন কামুক। পাশের মহিলা সহকর্মী তখন তার কাছে শুধুই একজন নারী কিংবা যৌন বস্তু, সমযোগ্যতার সহকর্মী নন। আর প্রতিবাদ মানেই মহিলা সহকর্মীর নামে অপবাদ কিংবা কর্মস্থলে হেনস্তা করা।

বিশ্রী ইঙ্গিত, ভীরের মধ্যে সুযোগ সন্ধানী হাত, কিংবা উৎসবের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়া হায়েনার দল। কত জনের বুরুদ্ধে মুখ বুঝে থাকব?!! এভাবে কত কত দিন আমি মরে যাচ্ছি নিজের ভিতরে, মরে যচ্ছি প্রতিদিন। প্রতিদিনের অসস্মান, গ্লানি গিলে ফেলে বেচে থাকার চেষ্টা করছি আর মরে যাচ্ছি প্রতিদিন। কবে, কোথায়, কখন আমার দিনগুলি নিরাপদ হবে? কোন বয়সে পৌছুলে এই সমাজ আমাকে বলতে পারবে “না, মেয়ে তুমি এবার নিরাপদ, নির্বিঘ্নে উড়াতে পার তোমার ডানা, পাখা মেলুক তোমার স্বপ্নরা”

 

 

 

 

 

১৯১৯জন ১৯২৯জন
0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ