বশির আহমদ স্যার – যাঁদের কাছে ঋণী এ জীবন : তৃতীয় ভাগ

জ্ঞানের কান্ডারী শিক্ষক...
জ্ঞানের কান্ডারী শিক্ষক…

আমাদের হেডস্যার ক্লাশে আসতেন যখন, পুরো ক্লাশ তটস্থ থাকতো। আমাদেরকে ইংরেজী পড়াতেন। স্যারের ভয়েও জানা পড়া ভুলে যেতো। তবে আমাদের ক্লাশে রেহানা-মনি-ঊষা-ঝর্ণা-শেফালী এই পাঁচজন প্রতিদিনই মার খেতো, তারপরেও পড়া শিখে আসতো না। আর রেহানার মতো হাসি-খুশী-দুষ্টু-ভালো মেয়ে কম দেখেছি। অভিনয় জানতো না। শুধু পড়ালেখা করতোনা তাই মার খেতো রোজ। স্যার যখন ক্লাশ নিতেন দরোজার বাইরে আমাদের স্কুল দপ্তরী মন্নাফ দাঁড়িয়েই থাকতো হাতে দুটো বেত নিয়ে। একদিন মন্নাফকে স্যার স্কুলের কাজে বাইরে পাঠালেন, রেহানা খুব খুশী। আজ মন্নাফ নেই বেত নিয়ে তো স্যার নিজে আসেন না। কপালের ফের ক্লাশ শেষ হবার পাঁচ মিনিট আগেই মন্নাফ চলে এলো। স্যার ভালো করে পেটালেন, তারপর ঠিক সময়ে গেলেন। এই স্যারের বেতের মার খেয়েছি আমি। জীবনের দ্বিতীয় বেতের মার বলে কথা! আমার থেকে স্যার কখনোই কোনো ভুল পাননি। একদিন স্যার এসে Tense নিয়ে পড়াচ্ছেন। আর মৌখিক পরীক্ষা নিচ্ছিলেন। এমন ঘুরিয়ে প্রশ্ন করছিলেন অনেকেই জেনেও উত্তর দিতে পারছিলো না। আমাদের তারাবতীও পারলোনা। স্যার তো ক্ষেপে শেষ। চরম গালাগাল, “হিদইল-হুকুইন(শুটকী মাছ) খাইয়া আইলে মাথার মধ্যে কুন্তা ঢুকবোনি?” রেহানা চরম শয়তান, বললো “স্যার মন্নাফ তো রোজ আপনার বাড়িত হিদইল-হুকুইন কিনিয়া নেয়। আমরার অতো পয়সা নাই রোজ ইতা খাইবার।” স্যার তো মারাত্মক রেগে গিয়ে সবাইকে মারলেন। ওই কথার জন্য যে তা নয়। পড়া কেউই পারেনি, তার উপর মুখে মুখে কথা। আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, “ওই তোরা হজ্ঞলগু দেখ, এই মাইয়া হিদইল-হুকুইন খায়না, মাথাও ঠিক আছে।” স্যারের মুখে চুনকালি ফেলে কাঁপতে কাঁপতে Is-এর জায়গায় Was বসিয়ে দিলাম। আর যায় কোথায়, মাত্র একটা মার। আধাঘন্টার মধ্যে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর, হাত ফুলে ঢোল। মামনি আমাকে নিয়ে বাসায় গেলো। সন্ধ্যার সময় স্যার বাসায় এলেন। শুধু কপালে হাত দিয়ে জানতে চাইলেন ব্যথা কি বেশী? মামনিকে বললেন, “এম.আর.ডি ম্যাডাম আপনার মেয়েটা ব্যথা লুকাতে জানে। আল্লাহ যেনো এরে কোনো কষ্ট না দেয় আমি দোয়া জানাবো নামাজে বসে।” বাপি আসতেই বললেন স্যার “জীবনে আজ প্রথম একটা অন্যায় করেছি করুণাবাবু। মেয়েটারে মেরে।” বাপি বললো “পড়া পারেনি, মেরেছেন এটাই আপনার দায়িত্ত্ব স্যার।” স্যারের কষ্ট হচ্ছিলো একটা মারে এতো জ্বর, হাত ফুলে গেছে উনার জীবনে এমন দেখেননি। নাহ স্যারের পায়ে ধরে প্রণাম করে আমি ক্ষমা চেয়েছিলাম অনেক বড়ো মুখ নিয়ে বলেছিলেন আমি পারবো। কিন্তু পারিনি। স্যার আমায় অনেক ভালোবাসতেন। আমায় নিয়ে স্যারের খুব গর্ব ছিলো। আমি কি না কি জানি হবো!

মজা হলো মাষ্টার্স পরীক্ষার পর বাসায় এলাম। স্যার বাসায় এসে বললেন, “এভাবে বসে থাকলে চলবে? স্কুলে তোমার মতো মেয়েদের দরকার।” পরেরদিন থেকে স্কুলে যাওয়া শুরু করলাম। সেই পরিচিত টিচাররা অনেকেই আছেন। তাঁদের সামনে চেয়ারে বসা কঠিন হয়ে পড়েছিলো। আমাদের স্কুলের আয়া সবাই ডাকতো উনাকে কামালের মা। আমি কিছুই ডাকতাম না। কারণ কামালের মা মামনিকে ডাকতেন বৌদি বলে, আমার সহপাঠীরা কেউ ডাকতো আপা আর কেউ কামালের মা। উনার সামনে গিয়ে বললাম কোনো টুল কি আছে বসার? স্কুলের স্যার-ম্যাডাম বললেন, “নীলাঞ্জনা তুমি এখন আমাদের কলিগ।” তারপরেও সেখানে চেয়ারে বসতে পারিনি। ছয় মাস ছিলাম ওখানে, তারপরেই কলেজে চাকরী পেয়ে যাই। যখন চলে আসি ছাত্রীরা যতোটুকু মন খারাপ করেছিলো, ঠিক স্যার-ম্যাডামরাও।

এই স্কুল অনেক স্মৃতি। স্যার-দিদিমনিদের আদর-স্নেহ সব একেক করে আসবে। প্রধান শিক্ষক বশির আহমদ স্যারের একটি কথা দিয়ে আজকের পর্বের ইতি টানছি। “আল্লাহ সবাইরে সবকিছু দেয়না। যেটুকু দেয়, বুঝিয়া-শুনিয়াই দেয়। তোমারে একটা কথা কই, জীবনে পাশে কে থাকলো, কে না থাকলো সেইটা দেখতে যাইও না। আল্লাহ চোখ দিছে, আর দিলও দিছে। নিজের উপর বিশ্বাস রাখলে খোদা-ভগবানেরও সাধ্য নাই ওই বিশ্বাস ভাঙ্গার।” সেদিন শুনেছি স্যার সুস্থভাবে আছেন। ভালো লাগলো। জানিনা কবে দেখা হবে। কিন্তু বিশ্বাস রাখি দেখা হবে, স্যারের সাথে একটা ছবি তুলে রাখতে চাই শুধু নিজের জন্য।

ক্রমশ

হ্যামিল্টন, কানাডা
১০ জুলাই, ২০১৬ ইং।

যাঁদের কাছে ঋণী এ জীবন (দ্বিতীয় ভাগ)

মোট পড়েছেনঃ ৮৩৯জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

৩০টি মন্তব্য

  1. “আল্লাহ সবাইরে সবকিছু দেয়না। যেটুকু দেয়, বুঝিয়া-শুনিয়াই দেয়। তোমারে একটা কথা কই, জীবনে পাশে কে থাকলো, কে না থাকলো সেইটা দেখতে যাইও না। আল্লাহ চোখ দিছে, আর দিলও দিছে।

    সহমত।

    1. মজিবর ভাই এতো সুন্দর সুন্দর কিছু উদ্ধৃতি পেয়েছি জীবনে, হাজার বই পড়েও এসব পাওয়া যাবেনা।
      স্যারদের কাছে কি কম ঋণী, বলুন?

      ভালো থাকুন।

    1. তাই নাকি? এখানে তো যা কিছু শিক্ষকদের থেকেই পাওয়া।
      উনাদের উদ্ধৃতি কতোকিছু শিখিয়েছে আমায়।

      আপনাকেও ধন্যবাদ। ভালো থাকুন।

  2. আপনাদের ছিল বেত আর আমাদের ছিল চামড়ার তৈরি এক ধরণের বেল্ট, এক ফুট লম্বা আর এর মাইর আমি যেমন খেয়েছি তেমনি অনেককে কানে ধরে এনে খাওয়াইছি কারণ আমি ছিলাম একে তো ক্লাস কেপ্টেইন (সব ক্লাসেই) আবার ছিলাম স্কুল প্রিফেক্ট (মনিটর যাকে বলে), এই বিষয়ে লিখব এক সময়।

    1. বলেন কি চামড়ার বেল্ট? এ জীবনে দুটোই বেতের মার খেয়েছি। শাস্তি কখনোই পাইনি। সত্যি বলতে কি আমি স্কুল জীবনে খুব বেশী শান্ত ছিলাম। আর কলেজ জীবনে দুষ্টুমীটাও স্যারেরা কখনো কিছু বলেননি। আজও বুঝে পাইনা কেন কঠিন শাস্তি পাইনি? 😀

      অবশ্যই লিখুন।

      1. চামড়ার বেল্ট দিয়ে হাতে মারতো যে কারণে হাত লাল হলেও শারীরিক কোনো ক্ষতি হতোনা আর আমাদের স্কুল ছিল ক্রিস্টিয়ান মিশনারিস যে কারণে ওদের ছাত্রদের কোনো ক্ষতি হোক তা তারা চাইতোনা।

  3. মাত্র একটা বেতের বারি খেয়েই হাত ফোলা আর জ্বর! এই পাতলেংগা শরীর নিয়ে এখন দৌড়াও কিভাবে?
    হেড স্যারের সাশন, স্নেহে সিক্ত হয়েছি আমরা সবাই।
    আজকাল আর সেই শাসন, শ্নেহ কোনটাই নাই।
    স্কুল জীবনের স্মৃতির এত ভাল উপস্থাপনা এই প্রথম পড়ছি এই কটি সিরিজে।

    1. নানা আসলেই বুঝিনা কেন এমন হয়েছিলো! জীবনে দুটো বেতের মার শুধু।
      শোনো আমি কিন্তু বেডমিন্টন খুব ভালো খেলতাম। দৌঁড়াতে ভালোই পারি। আর এখানে কাজে যে দৌঁড়, বয়স কমে গেছে বলে। :p

      নানা আমাদের জীবনে এমন শিক্ষকেরা এসেছিলো বলেই আমরা এখনও সম্মান করতে পারি গুরুজনদের।
      ভালো থেকো নানা। -{@

  4. হেলাল ভাই এর কথায় সহমত, নায়ক নায়ক স্যারের গল্পও শুনতে চাই।

    দু্ষ্টমী করেছি অনেক, মাইর খুব একটা খাইনি, পড়াশোনা তেমন না পাড়লেও কোন একটা অজ্ঞাত কারণে সব স্যারের স্নেহভাজন ছিলাম বলেই হয়ত।

    1. আনিছ ভাই আমি স্কুল জীবনে একটুকুও দুষ্টুমী করিনি। যা মজা কলেজেই করেছি।

      নায়ক নায়ক স্যার খুঁজে দেখি পাই কিনা!
      তবে একটা কথা দুই ধরণের সম্পর্ককে আমি একেবারেই পছন্দ করিনা। মেনে নিতে তো পারি-ই না।
      ১) সহপাঠী প্রেম
      ২) শিক্ষকের সাথে প্রেমের সম্পর্ক।

      তাই হয়তো নায়ক নায়ক চেহারা নয়, একজন শিক্ষকের গুণী স্বভাবের খবরই নিতাম। 🙂

  5. আমাদের এক স্যার ছিল ডবল বেত নিয়ে আসত। শুক্লা দিদিমনে বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে দিত।
    আদর করত অনেক বেশি। ইশশশ, সেই সব দিন আমাদের !
    দারুন স্মৃতি হাতড়াচ্ছ।

    1. মাগো বেত শব্দটাই ভয় করে এখনও।
      চোখের শাসনের মতো শাসন হয়না। এখন তো শাসনও নেই, স্নেহও নেই। কেমন জানি কৃত্রিম সম্পর্ক শিক্ষক-ছাত্রের।

      হুম আপু খুব মনে পড়ছে স্যার-ম্যাডামদের মুখ।

  6. ও আল্লাহ্‌ তুমি তাইলে মাষ্টারনি ছিলা? এইজন্যেই তো সেই নন্দীনির চিকন বেতের গল্প আইছিল, আইতো বুঝতামই পারিনাই :p
    টিচাররা ভাবতো তুমি কি না কি হইবা, আর হইছো কিনা পাজি, নচ্ছার, লেডিকবি, হাসপাতালের ডাক্তারদের মাথা নষ্টকারী, এইডা কিছু হইলো?
    শিক্ষকদের ঋণ এর ভার যতটা তুমি বুঝতে পারবে, তুমি ততোটাই পরিপূর্ন মানুষ। নন্দিনী আপুকে লিখেছিলাম, টিচারদের জন্য একটা জায়গা থাকে সে জায়গা কখনো কখনো বাবা-মা কেও ছাড়িয়ে যায়।
    গ্রেট সিরিজ এটা তোমার। (y)

    1. এইসব কি? গালি দিতাছো কিল্লাই? তোমার কি এমন ক্ষতি করছি গো খালি গালি দিতাছো? ;( ;(

      হ মাষ্টারনী ছিলাম। তয় কেউ কইতে পারবো না একটারেও গালাগালি করছি। মজা শোনো প্রথম যেদিন আমায় ক্লাশ সেভেনের ক্লাশ নিতে পাঠানো হয়, লীলা ম্যাডাম আমায় বললেন, “নীলাঞ্জনা বেত নিয়ে যাও। প্রচন্ড বদের দল।” আমার সাথে লীলা ম্যাডাম গেলেন, বললেন ওদের, একটুও যেনো আমায় জ্বালাতন না করে। নইলে বেতের মার খাবে। ছয়মাস ওই স্কুলে বলতে গেলে আমি ভলান্টিয়ারি করেছি। বেত কিংবা বকাঝকা কিছুই দিতে হয়নি। মামনি আমায় বলেছিলো, “শিক্ষকতার প্রথম শিক্ষা কি জানিস? নিজেকে শেখানো। তুই কাউকে শেখাতে যাচ্ছিস এটা কখনো ভাবিস না। আর চোখের শাসনে স্নেহ রাখিস। একজন প্রকৃত শিক্ষক তাকেই বলে।” আমার মামনি ওই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন আপু। কিন্তু কখনো শিক্ষকের মেয়ে হিসেবে কোনো সুবিধা পাইনি।

      চেষ্টা করবো প্রিয় শিক্ষকদের সব গুণ তুলে ধরতে।

      পাশে থেকো আপু। ভালো রেখো। -{@

  7. হায় হায়! উনি দেখি হাছা হাছা মাষ্টর ! মাডাম ভুল চুক মাফ কইরা দিয়েন। এহন তন খুবই সাবধানি হইলাম।
    আল্লাহ সবাইরে সবকিছু দেয়না। আর এই কারনেই আপনাগো লাহান লেখতাম পারিনা।।।

  8. দিদি, টিচাররা একসময় আপনার কলিগ হল, এরপর তাঁদের সামনে বসতে সংকোচ হওয়ায় আপনি টুল চাইলেন, আপনাকে বুঝতে এই অংশটুকুই যথেষ্ঠ। ভাল লাগছে সিরিজ লেখা।

    ছোট হয়ে একটি পরামর্শঃ শীর্ষ লেখায় দেখুন আপনার একই শিরোনামে ৩ টি লেখা। অথচ লেখা গুলো ভিন্ন ভিন্ন। পাঠকরা বিভ্রান্ত হতে পারে।
    এক কাজ করলে কেমন হয় দিদি? যে পোস্টে যে শিক্ষকের কথা প্রধান্য পাবে তার নাম প্রথমে দিয়ে এরপর “যাঁদের কাছে ঋণী এ জীবন (…… ভাগ)” এমন লিখলে কেমন হয়? যেমন এই লেখাটির শিরোনাম ‘ আমাদের হেডস্যার, যাঁদের কাছে ঋণী এ জীবন (তৃতীয় ভাগ)’ এমন হলে ? 🙂 ব্লগে পরামর্শ দেয়া খুবই রিস্কি, টং করে লেখক রাগ করে ফেলেন 🙁 আপনি করবেন না জানি, কারণ আপনি তো আমার দিদি -{@

    1. ভাভু ভাইয়া সেই স্কুল, সেই একই শিক্ষক। চেয়ারে বসার কথা এখনও তো ভাবতে পারিনা।

      এই সাজেশনটা আগে দিলেন না কেন? ইস এখন থেকে এভাবেই লিখবো। ভাভু ভাইয়া আমি ভুল ঠিক করার জন্যই ব্লগে লেখা দেই। লিখছি কেন, শেখার জন্য। আপনাদের সাজেশন সবসময় চাই। সত্যি ভালো লাগছে এই যে বললেন।

      আরে আমার রাগ। প্রচন্ড রকম আছে, কিন্তু পাবার মধ্যে তিনজন আছে। 😀

  9. আমি আপনার মত ব্রিলিয়েন্ট কখনই ছিলাম না! তবে পড়া না পাররেলও কিন্তু কেমন করে কেমন করে যেনো মাইর থেকে ঠিক বেঁচেই যেতাম! 😀

    1. পিচ্চি আপু এটা কি বললেন!!! 😮 আমি ব্রিলিয়্যান্ট? 😮 😮
      খুবই সাধারণ।
      জীবনে দুটো বেতের মার। নাহ বকাঝকা-মার আর পাইনি। 😀

মন্তব্য করুন