‘মেরের ডায়েরী’ প্রাচীন মিশরের একুশ দশকের সবচেয়ে বড়ো আবিষ্কার 

 

একদল আরকেওলজিস্ট  খুঁজে বেড়াচ্ছিল কুফুর পিরামিডের পাথর কোথা থেকে এবং কিভাবে আনা হয়েছিল তা বের করার ব্যাপারে ।

তিনি হলেন ফ্রান্স এর আরকেওলজিসস্ট  ‘পীএরে ত্যালেল’   (Pierre Tallel) এবং তার দল ।

 

কুফুর পিরামিডের এই বিশাল স্থাপনা,  যার উচ্চতা ১৩৯ মিটার, বেস ২৩০.৩৩ মিটার, ভলিউম ২.৬ মিলিয়ন, যা বানাতে ২.৩ মিলিয়ন স্টোনের দরকার পড়ে যা একেকটা ২.৫ থেকে ১৫ টন ওজনের ।  ৪৫০০ বছরের আগে যখন কিনা কোনো টেকনোলজি ছিলনা এই ভারি পাথর সরানোর তখন কেমন করে তারা এই বিরাট স্থাপনা বানায় যা এখনো মানুষ বুঝে উঠতে পারে না ।

ঠিক সে সময়ে পাওয়া গেলো বিখ্যাত সেই প্যাপাইরি । যাকে বলা হয় ‘ডাইরি অব মেরের’ ।

‘মেরের ডাইরি’  এইজন্যই বলা হয় কারন ‘মেরের’ নামে একজন মিশরীয় সুপারভাইজার অর্থাৎ যার  অধীনে একটা কর্মি দল কাজ পরিচালিত হতো, তার সেই নামটি  লেখা ছিল সেই লগবুকে বা ডাইরিটিতে। তাই  ‘সুপারভাইজার মেরের’  নাম অনুযায়ী   এই ডাইরিটিকে বলা হয় ‘মেরের ডাইরি’ ।

‘মেরের’ ছিলেন সাড়ে চার হাজার বছর আগে  পিরামিডের পাথর বহন এবং যোগান দেয়ার  সুপারভাইজার

তা ছাড়া আরকেওলজিস্ট পিয়েরে  আরও পেলেন

১) পাথর কাটার চিহ্ন ২) পাথরের গুহা থেকে পাথর সরানোর দুটো কাঠের লাইন যার উপর দিয়ে পাথর গড়িয়ে আনা হতো। গড়ানোর সুবিধার জন্য রোলার ৩) পৃথিবীর সবচেয়ে রেড সি এর তীরে পুরানো জেটির ধ্বংসাবসেস  যার বয়স পিরামিডের সমান ৪) শ্রমিক দের রাতে থাকার জন্য আস্তানা ৫) এবং সব চেয়ে বিরাট আবিষ্কার পাথর এবং বালুর নিচে  প্রায় ডাস্টের মতো ছেঁড়া প্যাপাইরি যেখানে লেখা ছিল কুফুর পিরামিডের কাজ পরিচালনার রেকর্ড।৬) যখন সমুদ্রে ভাটা থাকে সেখানে জেগে উঠে দুইশত মিটার জেটি ৭) ২৫ টি অ্যাংকর ৮ ) তুরায়  পাথর কাটার কপারের ব্লেড । ৯) নৌকার পালের পুরানো কাপড় ১০) একটি ৪০ মিটার লম্বা নৌকার অস্তিত্ব

সাড়ে চার হাজার বছরের পুরানো মেরের ডাইরিটি এভাবেই ধুলা বালির মধ্যে পড়ে ছিল।

ডাইরি পাওয়ার স্থানঃ

কাইরো এবং হেল ওয়ানের মাঝামাঝি , ওয়াডি আল -জারফ ( Wadi al-Jarf) নামক স্থানে,  রেড সিএর কাছাকাছি তুরা (Tura Quarries) কোয়ারি তে  বালু এবং পাথরের মাঝে এই প্যাপাইরি টি পাওয়া যায়। যার অনেক অংশ ছোটো ছোটো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। সেখানে লেখা ছিল তুরা কোয়ারি থেকে গিজায় লাইম স্টোন বহন করার প্রাত্যহিক ডাইরি বা লগবুক ।

ডাইরি থেকে যা জানা যায়ঃ

১) উত্তর তুরা এবং দক্ষিণ তুরা থেকে  কুফুর পিরামিডে লাইম স্টোন পরিবহন করার প্রতিমাসের  ডাইরি ২) প্রতি ১০ দিনে দুই থেকে  তিনটি করে ট্রিপ জাওয়া আসা করা ৩) একেকটি ২ থেকে ৩ টন ওজনের ৪) একেটা বোটে ৩০ টি ব্লক থাকতো ৫) প্রতিমাসে ২০০ শত ব্লক পরিবহন করা হতো । ৬) মেরের আন্ডারে ৪০ জন বোট ম্যান কাজ করতো । ৭) সময় টি ছিল জুলাই থেকে নভেম্বর ৮) হেডিং এ  থাকে  মাসের  নাম এবং সিজন ৯) হেলিওপলিস ,মিশরের একটি স্থান এবং সেখান থেকে শ্রমিকদের খাবার সরবরাহের রেকর্ড ১০) উত্তর তুরা থেকে মেরের তার  শ্রমিক দলের সাথে পাথর টানায় ব্যাস্ত থাকা  ১১) রাত কাটাতো দক্ষিণ তুরায় ১২) অনেক টিমের সমন্বয়ে কাজ চলতো এবং একেক টিমে ৬০ জন লেবার থাকতো ।

এসব থেকে বোঝা যায় এই বিশাল কর্মযজ্ঞ ঠিকঠাক মতো করার জন্য যে অরগানাইজেসান এবং  ম্যানেজমেন্ট স্কিল থাকা দরকার তা তাদের ছিল । পরিবহনের সুবিধার জন্য তারা পানি এবং বাতাসের ব্যাবহার জানতো । শ্রমিকের দেখভাল সুচারো ভাবেই সমাপন হয়েছিলো ।

এর আগে ১৯৯০ সালে কাইরো তে পাওয়া পিরামিডের কাছে ওয়ার্ক ম্যান ভিলেজে ,  ৯ফিট গভীরে এক কবর থেকে এক ডজন পিরামিড শ্রমিকের কঙ্কাল পাওয়া যায় । তাদের দেয়াল চিত্র থেকে জানা যায় তারা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে নিজ ইচ্ছায় কাজে যোগ দিয়ে ছিলেন দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য। পিরামিড স্লেভ দ্বারা করা হয়নাই। ১০ হাজার লেবারের জন্য গরু এবং ভেড়া সরবরাহ হতো খাবার যোগানোর জন্য । জাহি হাওয়াস বলেন তারা ফ্রি ছিল এবং  জোর পূর্বক কাজ করান হতোনা।

ডাইরিতে পাওয়া নামঃ

কুফুর সৎভাই আংখ্যাফ (Ankhhaf) এর নাম যিনি কিনা একজন প্রিন্স এবং ভাইজার হিসাবে কুফু এবং কাফ্রার আন্ডারে কাজ করতেন।

ওয়াডিআল-জারফ এর ফ্যারনিক হারবারটি খুঁজে পাওয়া যায় ২০১১ সালে । খনন কার্জ চালনা এবং আন্যালাইসিস করা হয় ২০১১ সাল থেকে । ২০১৩ সালে প্যাপাইরি টি লেখা হয়েছিলো 2600BCতে যা কিনা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন লগবুক । যেখানে রেকর্ড করা আছে শ্রমিক দলের সুপারভাইজারের নাম  যিনি ‘মেরের’ এবং পণ্য পরিবহনের নিবন্ধন ।

যারা  লেখা উদ্ধার করলেনঃ

প্যারিসের শরবনে ইউনিভারসিটির একটি ফ্রেঞ্চ মিশন এবং গ্রেগরি মারোউরাড (Gregory Marouard)এর  তত্ত্বাবধান ও  নির্দেশনায় সময়টা ২০১৩ সাল। মিশরের মিউজিয়ামে ঐতিহাসিক দলিল দস্তাবেজের রেকর্ড রুমে টুরিস্ট দের  দেখানোর জন্য বিশেষজ্ঞের নিয়োগ দেয়া হয়েছে । প্রত্যেকটি ছেঁড়া এবং ছোটো ছোটো টুকরো কে একত্র করে তা পুনরায় পড়ার মতো করা হচ্ছে ।

যা দেখানো হবে মিশরের নুতুন  ‘গ্র্যান্ড ইজিপ্টসিয়ান মিউজিয়ামে’।

আরকেওলজিস্ট এবং ইজিপ্টলজিস্ট   যাহী হাওয়াস বলেন, ‘মেরের  লগবুক ‘  21st সেন্চুরির  সবচেয়ে বড়ো আবিষ্কার। প্রাচীন মিশর নিয়ে আগ্রহী যে কোনো মানুষের জন্য এটা একটা বিরাট খবর।

লেখক ও  গবেষকঃ হুসনুন নাহার নার্গিস ,লন্ডন

 

 

 

৩৪০জন ৩৩৯জন
0 Shares

একটি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ