মাই হিরোস নং ২

ইমন ৮ জুলাই ২০১৫, বুধবার, ১০:৪২:৫৪পূর্বাহ্ন বিবিধ ২২ মন্তব্য

ঘটনাটা পাচ টাকার মাত্র।
কিন্তু এর ব্যাপ্তি, সততা, নিষ্ঠা, ম্যান কাইন্ড অতুলনিয়ো।
২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসের কনকনে শীতের সন্ধ্যা।
আবুল অফিসের কাজে গুলিস্তান মোরে দাঁড়িয়ে আছে। রাম্পুরা যাবে। পকেটে ফুটা পয়সা নেই। পকেটে ষোল টাকা ছিলো তা মধ্যবিত্ত ফুটা দিয়ে কখন পরে গেছে খেয়েল করেনি। সামনের মাসে স্যালারী পেয়েই একটা মানিব্যাগ কিনবে সে।
কি করবে সে এখন! এতো দূর হেটে যাবে! সাড়াদিনের ক্লান্তি পকেটের ফুটা দিয়ে শেষ সম্বল হারানো সব মিলিয়ে সে বিদ্ধস্থ। ভাবতে ভাবতে ‘ভিক্টর পরিবহন ‘ নামক একটা বাসে চড়ে বসেছে।
ভরষা মুচকি একটা হাসি দিয়ে কন্ডাক্টার মামাকে বলবে, ” মামা টাকা নাই, আজকে ভাড়া দিতে পারবোনা। রাম্পুরা ব্রিজে যাবো।। প্লিয মামা! ”
বাসটা পল্টন মোরে এসে জ্যামে পরে। বাসের কন্ডাক্টার ভাড়া কাটতেছে। কেও তাকে ১ টাকা ২ টাকা কম দিচ্ছে।
কেও হিসেব করে দেখতেছে সে ১ টাকা ২ টাকা বেশি নিচ্ছে।
কন্ডাক্টার এক সময় আবুলের সামনের প্যাসেঞ্জারের কাছ থেকে ভাড়া নিচ্ছে।
প্যাসেঞ্জার ভাড়া কম দিচ্ছে, কন্ডাক্টার বলতেছে রাম্পুরা ব্রিজ ৮ টাকা ভাড়া, প্যাসেঞ্জার বলতেছে ৫ টাকা।
যথারীতি সব প্যাসেঞ্জার আরেক দফা তাকে গাইলালো, তার ফরটিন জেনারেশন কে তুলোধুনো করলো।

আবুলের বুক ঢিপঢিপ করতেছে। এই অবস্থায় সে যদি কন্ডাক্টারকে বলে ভাড়া নাই, তবে মামা ছিলে ফেলবে। সে এম্নিতেই বহু গালি, অপমান সয়ে হয়রান।
ফিংগার ক্রসড।
-মামা কই যাইবেন, ভাড়া দেন।
– মামা আমার কাছে টাকা নাই, রাম্পুরা যাবো। টাকা হারাই ফেলেছি মামা।
কন্ডাক্টার বিরক্ত হলনা, রাগ করলোনা, বিলাপ করলোনা!
বরং সুন্দর করে হাসি দিয়ে বললো, ” নাই তাতে কি হইছে মামা। আরেকদিন দিবেন “। 🙂
আসেপাশের প্যাসেঞ্জাররা এবার বাস্টাকে নিজেদের বাপ-দাদার সম্পত্তি মনে করে বলতে থাকলো, ” কতো টাকা আমরা বেশি দেই! ২ টাকার ভাড়া ১০ টাকা নেয়! দিয়েন দিয়েন আরেকদিন! এই উনারে ব্রিজে নামিয়ে দিও “.

তারপর কেটে গেছে দুই বছর। আবুল ভিক্টর পরিবহন দেখলেই কন্ডাক্টারের দিকে ভালো করে খেয়াল করে। খুজে সে সেই মামাকে।
নাহ! মামার দেখা আর সে পায় না।
আবুল আজকে বেতন, বোনাস পেয়ে ফুরফুরে মেজাজে আছে। ইফতারীর রকমারি খাবার কিনে বনানী থেকে রবরব পরিবহনে উঠেছে রাম্পুরা যাবে।
বাসটা গুলাশান -১ আসলে একটি ভিখারী উঠে বাসে সাহায্য চাচ্ছে সবার কাছে। পা নাই বলে বলে। ছেলে মেয়েদের জন্য জামা কিনবে বলে খুব মিনতি করতেছে।
আবুল পিছনে বসে ঘুম ঘুম চুখে সব শুনছে।
লোকটা আবুলের কাছে চলে আসে এক সময়।
হাত পাতে আবুলের সামনে।

আবুল রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে চুখ খুলে দেখে ‘ সেই কন্ডাক্টার মামা! একটা পা নেই মুখে খুচা খুচা দাড়ি!
আবুল চিৎকার করে সীট থেকে দাঁড়িয়ে উঠে। কন্ডাক্টার মামাকে জড়িয়ে ধরে
” আরে মামা তুমি! তোমাকে আমি কতো খুজেছি!
মামা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। ” মামা আমারে খুজেতেছেন! আমি কি করছি মামা! ”
– মামা তুমি ভিক্টর পরিবহনে কন্ডাক্টরি করতানা!
– হ, মামা!
– মনে আছে মামা দুই বছর আগে, গুলিস্তান থেকে তোমার বাসে উঠছিলাম, আমার কাছে ভাড়া ছিলোনা। তুমি আমারে ফ্রী আনছিলা!?
– না মামা। কতো মানুষই তো বাসে উঠতো।
– তোমার পা কি হইছে মামা!?
– যাত্রি নিতে গিয়া গেট থেকে পরে গেছিলাম। পিছন থেকে আরেক বাস এসে মাইরা দিছে।
লিংক রোড এসে গেছে বাস ইতোমধ্যে। আবুল কন্ডাক্টারকে নিয়ে বাস থেকে নামলো। হোসেন মার্কেটে নিয়ে গিয়ে তাকে লুংগি, পাঞ্জাবী, তার ছেলের জন্য লাল টুপি, জিন্সের প্যান্ট, টি-শার্ট, বউয়ের জন্য একটা শাড়ি কিনে দিলো।
আর ছেলেকে সেমাই খাওয়ানর জন্য কিছু টাকা দিলো।
এক সাথে বসে কিছুক্ষন গল্প করলো। আবুল তাকে মোবাইল নাম্বার দিলো। তার ঠিকানা নিলো।
ইফতারীর পরে কন্ডাক্টার আবুল কে দোকান থেকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলো সে ঠিক মতো বাসায় যেতে পারছে কিনা।

[[ মোরাল: আমাদের মামাদের আত্যসম্মান এতো ঠুনকো না। আবুল খুব সহজেই তাকে জামা-কাপড় কিনে দিতে পারেনি। অনেক অনুরোধের পরে পেরেছে।
ফোন নাম্বার অনেকেই নেয় কিন্তু কজনইবা ফোন দিয়ে বলে ” মামা বাসায় গেছেন ঠিক মতো?
I love you man <3 ]]

৪৯৩জন ৪৯৩জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ