পৃথিবীর পথে পথেঃ নরওয়ে , ট্রমসো বা Tromso,ভ্রমণ কাহিনী , সাল ২০২০, ৩য় পর্ব 

“Discover what lies beneath the northern light”

 

প্লেনে দুই ঘণ্টার দূরত্বে থ্রনডন থেকে ট্রমসো । ইন্টারন্যাল ফ্ল্যাইট ।ছোটো প্লেন অনেক নিচ দিয়ে যাচ্ছিলো । তাই জানালা দিয়ে নিচের সব কিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। মাইলের পর মাইল শুধু সাদা বরফে ঢাকা পাহাড়। বাড়িঘর মানুষ কিছুই নাই।সব খালি ।  সে এক আলাদা পৃথিবী । যেন প্ল্যানেট প্লুটো।

আসতে আসতে প্লেনটি নিচে ল্যান্ড করলো। আমরা এসে পড়লাম ট্রমসো । ট্রমসো নরওয়ের সর্ব উত্তরের একটি শহর। যা কিনা আর্টিক সার্কেলে ৩৫০ কিমি এর মধ্যে পড়ে। আর্টিক সার্কেল তাকেই বলে যা কিনা উত্তর গোলার্ধের মধ্যে পড়ে ।

১০,০০০ বছর আগে এখানে মানুষের বসবাস আরম্ভ হয়েছে। মাত্র ৭৫,০০০ লোকের বাস ।বেশির ভাগ মানুষ মাছ ধরে আর মাছের ব্যাবসা করে ।

ইদানীং টুরিস্ট ব্যাবসা বেশ আরম্ভ হয়েছে। তার সাথে বেশ  কিছু মানুষ জড়িত। শহর থেকে ৯০ মিনিট ড্রাইভ করে গেলেই চোখে পড়বে স্টানিং ভিউ।

টুরিস্ট এখানে এসে আইস ফিশিং, আর্টিক ট্রাক ড্রাইভিং , স্কিং , পোলার মিউজিয়াম, ক্যাবেল কার ( যা কিনা Sdlliveien থেকে mount Storsteinen ৪২১ মিটার উঁচু চূড়ায় মাত্র ৪ মিনিটে চলে যায়। ) ডগ স্কেটিং , রেইন ডিয়ার টানা স্লেজ এবং  ওয়েল সাফারি করে ।

আমরা একদিন ক্যাবেল কারে উঠে নিচের দৃশ্য দেখতে দেখতে উপরে চলে গেলাম । দৃশ্য হল সাদা বরফে ঢাকা পাহাড় আর পাহাড়ের ভ্যালি। যা এক কথায় স্টানিং । এখানে পাইন ফরেস্ট নাই । এতো ঠাণ্ডায় গাছ জন্মানো সম্ভব নয়।

আইস ফিশিং

একদিন গেলাম আইস ফিশিং করতে । সে  আর এক অভিজ্ঞতা । আমাদের কে নিয়ে গেলো একটা ফিওডের মাঝ খানে। যেখানে পানি প্রবাহ নাই তাই পানি জমে শক্ত হয়ে গেছে হাঁটু সমান । যার উপর দিয়ে নির্ভয়ে হাঁটা যায়। আমরাকে যে নিয়ে গেলো সে একজন নরওয়ের মেয়ে। একটা করে চেয়ার  দিলো বসার জন্য আইসের উপর। । তারপরে ইলেকট্রিক ড্রিল দিয়ে আইস গর্ত করে ফুটো করলো। সেখানে বঁড়শি ফেলে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা করলাম। আমরা দলে ছিলাম সাত জন। সবায়  যার যার গর্তে বঁড়শি ফেলে অপেক্ষা করতে থাকলাম।বঁড়শির আগায় ছোটো মাছ গাঁথা ছিল।  ঠিকই একজনের বঁড়শিতে একটা বিরাট স্যালমন মাছ উঠে আসলো। আনন্দের সীমা থাকলো না।

তারপর গাইড মেয়েটা সেই মাছ নিয়ে  তার বাড়িতে  গেলো আমরাকে নিয়ে। এটা সেই মাছ ধরা আর তার বাড়ি যাওয়া টুরের অংশ। সেই ফাঁকে নরওয়ের পরিবার কেমন হয়  তা জানা হল। চমৎকার বাড়িটি  ফিওড সংলগ্ন ।  পেছনে একটা খালি চত্বর। সেখানে কাঠের একটা গোল ঘরে বসে মাছ দিয়ে  বারবাকিউ করলাম আর খেলাম। ভালোই অভিজ্ঞতা হল ।

সাফারি করতে গেলাম একদিন। রেইন ডিয়ার আর মূষ  চরে বেড়াচ্ছে এই প্রথম তাই দেখলাম । ফিওডে ওয়েল আর শুষূ দেখলাম ।

অরোরা লাইট ,  “আলোর নাচন” 

ট্রমসো ‘লাইঞ্জেন ফিওড’ ( Lyngen Fjord) এর ধারে অবস্থিত । সেপ্টেম্বর থেকে এপ্রিল এর মধ্যে গেলে ‘অরোরা লাইট’ ভালো ভাবে দেখা যাবে ।  সেই সময় রাত তাড়া তাড়ি হয় আর আকাশ গারো অন্ধকার থাকে। সেখানে মাঝরাতে অরোরা লাইট স্পষ্ট দেখা যায়।

আমরা চললাম  অভিজ্ঞ একজন ট্র্যাভেল এজেন্সির গাইডের সাথে অরোরা লাইট দেখার জন্য। সে এতোই অভিজ্ঞ যে সে তার স্পেশাল মোবাইল আর অন্য কিছু টেকনোলজি ব্যাবহার করে বলতে পারে কোন সময়ে,  কোথায় গেলে ‘অরোরা লাইট’ দেখা যাবে। তার ডিক নির্ণয় এতোই সঠিক যে তার সাথে গেলে গ্যারান্টি ‘অরোরা লাইট ‘ টুরিস্ট দেখতে পাবে। এই বিস্ময়ে তার পড়াশুনা করতে হয়েছে।

তার গাড়ি এসে আমরাকে পিক আপ করে নিয়ে চললো সন্ধ্যার পর । শহর ছেড়ে তার জীপ গাড়ি আমরাকে নিয়ে চলল ট্রমসর  রিমোট এলাকাতে। সেখানে বাড়িঘর বা জনবসতির কোন চিহ্ন নাই। নাই কোন পলিউসান। যেতে যেতে শুধু চোখে পড়ছে মাঝারি ধরনের পাহাড় কিন্তু তা পুরোটায় সাদা ধবধবে। পাহাড় দেখেছি অনেক দেশে  স্নো সহ । স্নো থাকে  কেবল পাহাড়ের চূড়ায় । ব্যাতিক্রম এই পাহাড় গুলোর দৃশ্য। এগুলো ‘টপ টু বটম’ অর্থাৎ সমস্ত পাহাড় সাদা ধবধোবে । তাও আবার একটু নয় পুরু স্নো দিয়ে মোড়া ।

যাইহোক এখানে এসে অপেক্ষার পালা । গাইড তার মেশিনারি আর ক্যামেরা নিয়ে অপেক্ষা করছে। এবং মাঝ রাতে হটাৎ আরম্ভ হতে শুরু করলো সবুজ আলোর ঝলকানি । শুধু আলোই নয় যা সারা আকাশ ভরে গেলো সবুজ আলো দিয়ে মনে হচ্ছে বিরাট সবুজ চাদর  উড়ছে আকাশে । সে এক অভূত পূর্ব দৃশ্য।

‘অরোরা’ দেখতে এখন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে। বেশির ভাগ টুরিস্ট আসে জার্মান, অস্ট্রিয়া, ব্রিটেন, এবং এশিয়ার চীন ,মালায়েসিয়া আর ভারত থেকে।

‘Joanna Lumley’ বিখ্যাত ব্রিটিশ অ্যাকট্রেস যার কারনে নরওয়ের ট্রমসো তে টুরিস্ট বিজিনেস এখন বুমিংঃ 

নরওয়ে টুরিস্ট ব্যাবসা বর্তমানে বুমিং পেছনে কারন  Joanna Lumley এই অরোরা নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি করেন। সেই ডকুমেন্টারি সারা পৃথিবীতে সাড়া ফেলে দায়। আর এই অরোরা দেখতে ভিড় জমায় নরওয়েতে ।

কেন এই অরোরা?

সোলার ঝড়ে থাকে লোহার কণিকা । আর পৃথিবীর অ্যাটমসফেয়ারে থাকে অক্সিজেন আর নাইট্রোজেন। সোলার উইন্ডের লোহার কণিকা এই অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেনের সাথে ঘর্ষণের ফলে আলোর সৃষ্টি করে ।

তাছাড়া ফিওড, প্রাকিতিক সৌন্দর্জ , স্কি, শ্বেত ভল্লুক আর ভাইকিং লিজেন্ডস এসব তো আছেই ।

“শীতের হাওয়ায় লাগলো নাচন আমলকীর ঐ ডালে ডালে ,উড়িয়ে দেবার মাতন এসে কাঙ্গাল তারে করলো শেষে”

রবীন্দ্র নাথের গানটির লাইন দুইটি মনে আসলো  অরোরার এই নাচন দেখতে দেখতে ।

লেখকঃ হুসনুন নাহার নার্গিস ,লন্ডন

 

 

১৩৭জন ১৩৭জন
0 Shares

একটি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

মাসের সেরা ব্লগার

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ