আমার বাবা অলরাউন্ডার

‘আমার বাবা অলরাউন্ডার’- কথাটা কেনো লিখছি তা বলি। পড়ালেখা ব্যতিত এমন কোনো কাজ নেই যা আমার বাবা পারেন না। (পড়ালেখা করার সুযোগ হয়নি কারণ পাঁচটা সন্তান রেখে যখন দাদা মারা গিয়েছিলেন তখন বাবা ছিলেন ১ বছরের) থাক সে সব কথা। এখন বাবার কথা বলি।

 

গেরস্ত/মধ্যবিত্ত সংসার হওয়ায় চতুর্মুখী কাজে অভ্যস্ত বাবা। নিজেদের জমির কাজ বাবা নিজেই করেন। ধান লাগা থেকে শুরু করে ধান মাড়াই, ঘরে তোলা সব গুলো হয় বাবার তত্ত্বাবধায়ণে। এছাড়াও সংসারের যাবতীয় কাজ সহ বাইরেও অনেক কাজ করতে পারেন। যেমন মাটির ঘর থেকে শুরু করে ইটের ঘর তৈরি, ঘর কার্নিশ করা লেপপোছ করা। আমার বাবা খুব সুন্দর আর সুস্বাদু রান্না করতে পারেন। বিয়ে বাড়ি কিংবা মজলিস বাড়িতে রান্না করেন। একটা মুহূর্ত বাবা বসে থাকেন না। ঘুমটুকু ছাড়া বিশ্রামের কথা তিঁনি ভাবতেও পারেন না। আমার জীবনে এতো পরিশ্রমী মানুষ খুব কম দেখেছি।

 

বাবার দৈনন্দিন জীবন- বাবা ভোরে উঠেন ঘুম থেকে। প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়ে জমিতে যান। বাবা জমি গুলোর খুব যত্ন করেন। যেমন যত্ন করে সন্তান লালন পালন করতে হয় বাবা ঠিক তেমন করেই ফসল ফলান। কোন জমিতে কোন সার, ওষুধ কতোটুকু লাগবে তা বাবা খুব ভালো করেই জানেন। জমির কাজ শেষ করে এসে সকালের খাবার খেয়ে মেজ ভাইয়ার স্টলে যান। সেখানে গিয়ে টিউবয়েল চেপে সারাদিনের জন্য পানি তুলে এবং আর যা কাজ থাকে করে দেন। তারপর বাসায় এসে সংসারের টুকটাক কাজ যা থাকে করে দেন। বৌমাদের প্রয়োজনী হাটবাজার বাবাই করে দেন। দুপুরের নামাজ পড়ে খেয়ে চলে যান জমিতে। আসরের নামাজ মাঠেই পড়েন। সন্ধ্যায় বাসায় এসে মাগরিবের নামাজ পড়ে খেয়ে এশার নামাজ শেষ করেই ঘুমিয়ে যান।

 

বাবা কবর খুঁড়েন। আত্মীয়-স্বজন সহ আশেপাশের সমস্ত প্রতিবেশীদের কবর বাবাই রেডি করে দেন। ১০০ উপরে কবর খুঁড়েছেন।

 

স্বভাবে-  বাবা ভীষণ রাগী কিন্তু অত্যন্ত নির্ভীক, সৎ ও ভদ্র মানুষ। আগ বাড়িয়ে কারো সাথে ঝামেলাতে জড়ান না। কেউ পায়ে পা লাগিয়ে ঝামেলা করতে এলে কিন্তু একদম ছাড় দেন না। আশেপাশের মানুষ খুব শ্রদ্ধা সন্মান এবং ভালোবাসেন বাবার সুন্দর ব্যবহারের জন্য। মায়ের ভাষ্যমতে আমি বাবার কার্বন কপি। স্বভাবে, আচার আচরণে, চালচলনে এমনকি দেখতেও একদম বাবার মতো। বাবা অনেক রাগী হলেও অনেক নরম মনের মানুষ। কাজের সূত্রে বড় ভাইয়া সিলেটে থাকেন পরিবার সহ। তো যখনই ভাইয়ার সাথে কথা বলেন তিনি কান্না করে ছোট বাবুদের মতো। আমরা সবাই কাছেই থাকি তবুও বড় সন্তানকে কাছে না পাওয়ায় কষ্ট পান ভীষণ। বাবা সব সন্তানকেই খুব ভালোবাসেন। তবে আমাকে বেশি ভালোবাসেন ভাইয়ারা বলেন (কথা কিন্তু সত্যি)। আবার মা বলেন আমি নাকি বাবাকে বেশি ভালোবাসি (এটাও কিন্তু নিদারুণ সত্য) মা বাবার মধ্যে রাগারাগী, চিৎকার চেঁচামেচি হলে আমরা সব ভাই বোন বাবার পক্ষ নিই। 

 

নিজের বাবা বলে নয়, সত্যিই বলছি এমন কোনো কাজ নেই যা বাবা পারেন না। আমার বাবা অলরাউন্ডার। আমি/আমরা সবাই গর্বিত এমন একজন বাবার সন্তান হয়ে। মহান রাব্বুল আলামীন আমার সহ পৃথিবীর সমস্ত বাবাদের ভালো রাখুন সুস্থ রাখুন। আমীন

মোট পড়েছেনঃ ১,৩৭৪জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

৩০টি মন্তব্য

    1. আমার মায়ের মতো শান্ত ধীরস্থির ভাইয়ারা। আমিই শুধু বাবার মতো তাই মা আক্ষেপ করে
      বলেন মেয়েটাকেই বাবার মতো হতে হলো? মা আজও সেটাই বললেন আমাদের বাবা মেয়ের ছবি দেখে। পুরাই বাপকা বেটি😀😀

      কৃতজ্ঞতা সহ আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি ভাইয়া
      ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন সবসময়

  1. গ্রাম্য সংসারী মানুষ এরকই হয়। তারমধ্যে অনেকে অনেক পরিশ্রমী হয়। সেটা আপনার বাবাই।
    একটু শেয়ার করি। আমি তখন কারমাইকেলে পড়ি আমার এক ফ্রেন্ড তাঁর বাবার কৃষিকাজের জন্য পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করতেন। আমি এমন ভাবে বললাম সে তখন গর্ব করায় শুরু করল।
    আমি বললাম,” চাকুরীজিবী বাবার মত তোমার বাবা ঘুষখোর, বা দুর্নীতিবাজ না এটা মনে রেখ। তোমার বাবা একজন খেটে খাওয়া গায়ের ঘাম ফেলে তোমাকে পড়াচ্ছে।”
    জানি অনেকে রাগ করবেন কিন্তু গ্রামে খেটে খাওয়া ব্যাক্তিদের এই অর্থে অন্তরের অন্তস্থল থেকে শ্রদ্ধা জানায়। তাঁরাই মহান তাঁরাই গর্বিত।

    1. এখানে রাগ করার কিছু নেই। আমার বাবা একজন সৎ পরিশ্রমী খেটে খাওয়া মানুষ। আমার ভাইয়ারা সবাই ইস্টেবলিস্ট, বাবা কোনো কাজ করার দরকার নেই। তবুও তিনি এক মুহূর্ত চুপচাপ বসে থাকে না, থাকতে পারেন না। আমার বাবা একজন সন্মানীয় মানুষ। আমরা ভাই-বোনরা গর্ববোধ করি বাবাকে নিয়ে।
      আন্তরিক ধন্যবাদ জানবেন
      ভালো থাকবেন সবসময়

  2. আপনার কর্মঠ বাবার কথা শুনে খুব ভালো লাগলো। স্যালুট জানাই আন্তরিক ভাবে। আমিও আমার বাবার কার্বন কপি। মেয়েরা বাবাদেরকেই বেশি ভালোবাসে। ভালো থাকুক সব বাবারা। শুভ কামনা রইলো আপনার জন্য

  3. আপনার মতো মাল্টিট্যালেন্টেড মেয়ে যার আছে তিনি অবশ্যই অলরাউন্ডার।
    বাবার মতো আর কেউ হয়না। বাবার বুকের মতো প্রকাণ্ড জমিদারি ও আর কোথাও নেই। শুধু মাত্র বাবার কাছে পুরো সামনে পুরো পৃথিবীটা সংকীর্ণ হয়ে উঠে।
    বাবার সুস্বাস্থের জন্য অনেক শুভকামনা রইল।

    1. আমি লেখা পোস্ট করে যাঁদের মন্তব্যের জন্য অপেক্ষা করি, বার বার নেট ওপেন করে ব্লগে আসি তাঁদের মধ্যে আপনি যোগ হয়েছেন। এখন আপনার মন্তব্যের জন্যও অপেক্ষা করি আমি।
      আপনার মন্তব্য পেলেও মনে হয় লেখাটা লেখা হয়েছে।
      কেউ কেউ কখন আপনজন/আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠে বুঝতেই পারি না
      চমৎকার মন্তব্যের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আপু।
      ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন সবসময়
      লাভ ইউ সো মাচ আপু💜💜

      1. আপ্লূত হলাম আপু। আমার ও আপনাকে একদিনেই একান্ত আপন লাগছে। লেখাতেই আমরা পরস্পরকে দেখতে পাই। ভালোলাগা জন্মায়।
        অনেক ভালোবাসা রইলো প্রিয়।
        আমি ও আপনার মতো বাবা মা অন্তপ্রাণ মেয়ে।

  4. নিজের বাবার সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারনা না থাকলে এরকম করে লেখা সহজ কথা নয়।শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাই বাবাকে।

    জগতের সকল বাবা সুখে থাক এটাই প্রার্থনা। বালো থাকুন আপু।

    1. বুদ্ধি হবার পর থেকেই প্রতিনিয়ত দেখছি বাবা এমন রকম পরিশ্রম করতে। আরো আগে কেনো লিখতে পারলাম না বাবাকে নিয়ে ভেবে প্রচণ্ড আক্ষেপ হচ্ছে।
      কৃতজ্ঞতা সহ আন্তরিক ধন্যবাদ জানবেন
      ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন সবসময়

  5. আপনার পরিশ্রমী, কর্মঠ, সহজ সরল জীবনে অভ্যস্থ বাবার জন্য অনেক অনেক শ্রদ্ধা।
    দোয়া করি আপনার বাবার সুস্থতা এবং দীর্ঘ জীবনের।

    আপনার জন্যও শুভ কামনা।

মন্তব্য করুন