12358255_10206565349385079_563514308_n

১৪ই ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বাঙালি জাতির জীবনে অত্যন্ত শোকাবহ একটি দিন। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারানোর দিন। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। এই দিনটিতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাঙালি জাগরণের অগ্রদূত এদেশের সূর্য -সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিলো। আর এ কাজে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিলো তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী।

পাক হানাদার বাহিনী যখন বুঝতে পেরেছিল, তাদের পরাজয় অনিবার্য তখনই পরিকল্পিতভাবে তারা জাতিকে মেধাশূন্য করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। নবগঠিত এই দেশটি যাতে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে দূর্বল থাকে, কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সেজন্য তারা জাতির সূর্য -সন্তান বুদ্ধিজীবীদের নিধন করার এক কুৎসিত এবং লোমহর্ষক পরিকল্পনা করে। তাদের পরিকল্পনার মুল সহযোগী আল-বদর বাহিনী, যাদের সহযোগীতা ছাড়া পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না। এরাই ১১ ডিসেম্বর থেকে ব্যাপকভাবে বুদ্ধিজীবী নিধন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু করে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৪ ডিসেম্বর রাতে পাকিস্তানী বাহিনী তাদের দেশীয় দোসরদের সঙ্গে নিয়ে দেশের বরেণ্য সকল শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকদের চোখ বেঁধে নিজ নিজ বাড়ি থেকে তুলে আনে এবং পৈশাচিক নির্যাতনের পর হত্যা করে। পরিকল্পিত এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞটিই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত।

প্রতিটি বাঙালি ১৪ ডিসেম্বরকে পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে স্মরণ করে। পাশাপাশি কোটি কোটি দেশপ্রেমিক বাঙালি ইতিহাসের এই বর্বোরচিত হত্যাকাণ্ডের কুলাঙ্গারদের প্রতি ঘৃণা জানায়।
১৪ ডিসেম্বর হত্যাযজ্ঞের পর ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজার সহ বিভিন্ন স্থানে বুদ্ধিজীবীদের লাশ ফেলে যায়। ১৬ ডিসেম্বর চুড়ান্ত বিজয় অর্জনের পর শহীদের নিকট আত্মীয়রা মিরপুর ও রাজারবাগ বধ্যভূমিতে স্বজনের লাশ খুঁজে পায়।

এই সূর্য -সন্তানরাই জাতির যে কোন বিপর্যয়ে অগ্রনী ভূমিকা পালন করে জাতিকে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন। বাঙালীর ভাষা-আন্দোলনে, স্বাধীনতা ও স্বাধীকারের আন্দোলনে নেতৃত্বে দিয়েছিলেন। তাঁদের নেতৃত্বেই বাঙালীরা জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের দাবি ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে থাকে। এজন্য যুদ্ধের শুরু থেকেই মেধাবী ধীমান ব্যক্তিবর্গের প্রতি পাক বাহিনীর ছিলো সীমাহীন ক্ষোভ।

২৫ শে মার্চের কালোরাত্রি থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধের পুরো নয় মাসই সুপরিকল্পিতভাবে বাছাই করে করে একের পর এক বুদ্ধিজীবী হত্যা চলতে থাকে। পরবর্তীতে স্বাধীনতার ঊষালগ্নে শেষ পর্যন্ত পরাজয় নিশ্চিত জেনে সকল বুদ্ধিজীবীদের নিধনকে পাক হানাদার বাহিনী তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসাবে স্থির করে। আল-বদর বাহিনীর সহযোগিতায় তারা তালিকা তৈরি করে এবং নীলনকশা অনুযায়ী ১৪ ডিসেম্বর রাতে তা বাস্তাবায়ন করে। পাকিস্তানী ঘাতকদের আত্মসমর্পনের ঠিক দুই দিন আগে ১৪ ডিসেম্বরে রাতে বীভৎস- নারকীয়-পাশবিকভাবে একসাথে এত বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনা ঘটে, যা ইতিহাসে এক জঘন্য বর্বর ঘটনা হিসাবে প্রকাশ পায়। পৃথিবীতে এর আগে একসাথে এতো বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনা আর ঘটেনি। হত্যার আগে প্রায় প্রতিটি সূর্য -সন্তানকেই চরম পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছিলো।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিবরণ এভাবেই ফুটে ওঠে। “আর একটু এগিয়ে যেতেই বাঁ হাতের যে মাটির ঢিপিটি ছিল তারই পাদদেশে একটি মেয়ের লাশ। মেয়েটির চোখ বাঁধা। গামছা দুটো আজও এখানে পড়ে আছে। পরনে কালো ঢাকাই শাড়ী ছিল। এক পায়ে মোজা ছিল। মুখ ও নাকের কোন আকৃতি নেই। কে যেন অস্ত্র দিয়ে তা কেটে খামচিয়ে তুলে নিয়েছে। যেন চেনা যায় না। মেয়েটি ফর্সা এবং স্বাস্থ্যবতী। স্তনের একটা অংশ কাটা। লাশটা চিৎ হয়ে পড়ে আছে। বীভৎস চেহারার দৃশ্য বেশীক্ষণ দেখা যায়না। তাকে চেনার উপায় ছিল না। পরে অবশ্য সনাক্ত হয়েছে যে, মেয়েটি সেলিনা পারভীন। ’শিলালিপি’র এডিটর। তার আত্মীয়রা বিকেলে খবর পেয়ে লাশটি তুলে নিয়ে গেছে।”

বিজয় অর্জনের কিছুদিন পরই “বুদ্ধিজীবী তদন্ত কমিটি” গঠিত হয়। এই কমিটির প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাও ফরমান আলী এদেশের ২০,০০০ বুদ্ধিজীবীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এই পরিকল্পনামতো হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারেনি। ফরমান আলীর টার্গেট ছিল শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের কে গভর্নর হাউজে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলা। বুদ্ধিজীবী তদন্ত কমিটির প্রধান জহির রায়হান বলেছিলেন, এরা নির্ভুলভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনা বুদ্ধিজীবীদের কে বাছাই করে আঘাত হেনেছে। উল্লেখ্য,ওই কমিশনের আহ্বায়ক ছিলেন চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান যিনি নিখোঁজ হন ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারী।

index(5)

আজ সেই ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারানোর স্মৃতিঘেরা শোকাবহ দিন। ইতিহাসের পাতায় বেদনা বিধুর কালোদিবস। প্রতি বছর জাতি শ্রদ্ধার সাথে এ দিনটি স্মরণ করে।

স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরে হলেও শহীদদের স্বজনসহ গোটা জাতি আশায় বেঁধেছে, বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী ঘৃণ্য নরপশু সহ সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে, সে সব ঘৃণ্য হত্যাকারীদের বিচার শুরু হয়েছে এবং বিচারের রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে জাতি কলঙ্কের হাত থেকে ধীরে ধীরে মুক্তি পাচ্ছে। দীর্ঘ ৪৪ বছর পর যুদ্ধাপরাধী কসাই কাদের মোল্লা, বদর নেতা কামারুজ্জামান, নৃশংস যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তানি বাহিনীর এদেশীয় প্রধান দোসর আলবদর কমান্ডার মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে জাতি কলঙ্কমোচনের পথে এক ধাপ এগিয়েছে। এর ফলে শান্তি পাবে শহীদদের আত্মা।

১৪ ডিসেম্বর শহীদ হওয়া জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি রইলো অপরিসীম শ্রদ্ধা।

৪৯০৮জন ৪৯১৫জন
0 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ