557977_607845079245623_596107918_n

সাতঃ

অভিযানে যাচ্ছি আমরা মোট ৬ জন কমান্ডো। কর্ণেল ফারুক অবশ্য আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন যে একটু অপেক্ষা করতে, কারণ তিনি চাচ্ছিলেন একেবারে কাল সকালে অভিযানে যাই। এতে চার্লি কমান্ডের কমান্ডোরাও প্রস্তুত হয়ে এই অভিযানে অংশ নিতে পারবে। আর এখন অভিযানে গেলে রাত হয়ে যাবে। রাতে এই এলাকাতে অভিযান চালানো খুবই দুঃসাধ্য কাজ। এর উপর মড়ার উপর খড়ার ঘা হিসেবে আবার আছে আরাকান আর্মিরা।

কিন্তু এত প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও আমি দেরি করতে রাজি হইনি। আরিশার কথা সত্য হলে এত দেরি করার সময় নেয় আমাদের হাতে। যদি স্মৃতিশ্বর জেনে যায় আমাদের অভিযানের কথা! আর সে যদি ওয়ালিদকে সরিয়ে অন্য জায়গাতে নিয়ে যায়!

আরিশার এই অতিপ্রাকৃতিক ধরণের কথাবার্তা অবশ্য আমার বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই। কিন্তু কিছু মানুষ আছে যাদের কথা অবিশ্বাস চাইলেও করা যায় না। আরিশার সাথে কথা বলে আমার সেরকমই মনে হয়েছে।

এক অদ্ভুত দ্বিধাবোধ নিয়ে অভিযানে যাচ্ছি আমি। জানি না এর পরিণতি কি! তবে এতদিন এই এলাকায় অভিযান চালানোর কথা একজনেরও মনে আসেনি এটা জানার পর থেকেই ভিড়মি খেয়ে গেছে ক্যাম্পের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

অনেকেই বিশ্বাসই করতে পারছে না এধরণের ভুল হতে পারে। যাই হোক, স্থানীয় গাইডের মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে অঞ্চলটা অভিযান থেকে বাদ গেছে ওটার নাম নাকি দেবীপুর। কয়েক বছর আগে পাহাড়িরা বিতাড়িত হয়ে ওই এলাকায় পৌঁছে একটা প্রাচীন দেবীর মূর্তি পেয়েছিল, মূর্তিটা অযত্নে অবহেলায় পড়েছিল। তারা সংস্কার করে বসবাস শুরু করার পর থেকে তাদের উপর আর আপন আসেনি। সেই থেকে তাদের বিশ্বাস ওইখানে তাদের কেউ ক্ষতি করতে পারবে না যতদিন দেবী আছেন।

অবশ্য সেই দেবী কে, কোথা থেকে আসছে এসবের কিছুই সে বলতে পারেনি। দেবীপুর পৌঁছতে পৌঁছতে আমাদের প্রায় ঘণ্টা দেড়েক লাগলো। প্রথমে আমাদের দখলকৃত আরাকান আর্মির ক্যাম্পে গেলাম। বলে রাখা ভালো ওই ক্যাম্পের সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছে সিয়েরা কমান্ড।

সেখান থেকে পশ্চিমে আরো ৮ কি.মি. দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে দেবীপুরে পৌঁছলাম। দেবীপুরে পৌঁছতেই বুঝে গেলাম কেন এরা এতদিন ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে আছে।

দেবীপুরে প্রবেশের রাস্তাটাও একটু অদ্ভুত, দেখে মনে হয় পাহাড়ের মধ্যে একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গ, কিন্তু ভিতরে গিয়ে মাত্র ২০০ মিটার পরেই দেখলে যে কেউ থমকে যাবে। ভিতরে গেলেই এক পাশে পাহাড়ের কোলঘেঁষে থাকা অনন্য সুন্দর মূর্তিটা চোখে পড়ে।

তিনপাশে পাহাড় আর এক পাশে তীব্র খরস্রোতা নদী দিয়ে ঘেরা এক অপূর্ব জায়গা এই দেবীপুর। বাংলাদেশে এমন জায়গা থাকতে পারে কখনো কল্পনাও করতে পারিনি। ভেবেছিলাম এই ধরণের জায়গা কেবল মানুষের কল্পনা বা শিল্পির তুলির আচঁড়ে আঁকা ছবিতেই সম্ভব। উপরন্তু অস্তগামী সূর্যের ম্লান হলদে আলোয় এক অপূর্ব অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে যার বর্ণনা দেওয়া বোধহয় কবি-সাহিত্যিকরাও দিতে পারবেন না। আর আমি তো এক সাধারণ সৈনিক মাত্র!

স্থানীয় বসতিদের ঘরগুলোর গঠন খুবই সাধারণ, অন্যান্য পাহাড়িদের মতই। বেশ নীরব এলাকা। কাউকেই চোখে পড়ছে না। সবাই বোধহয় দিনের কাজ শেষে এখন নিজ নিজ ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে।

একটু দূর এগোতেই চোখে পড়লো এক জোড়া নর-নারী বসে আছে নদীর ধারে। দীর্ঘকায় পুরুষকে দেখলেই বুঝা যায় সে পাহাড়ি না। আরেকটু কাছাকাছি হতেই কোনভাবে তারা টের পেয়ে গেলো। ফিরে তাকালো দুইজনেই।

চমকে গেলাম আমি! পুরুষটি মেজর ওয়ালিদ। কিন্তু তাকে দেখে চমকাইনি। চমকিয়েছি নারীটিকে দেখে। অপূর্ব সুন্দরী নারীটির মূর্তিই যে শোভা পাচ্ছিল দেবীপুরের প্রবেশমুখে!

আটঃ

বসে বসে নিজের অবস্থাটা ভাবছিল মেজর ওয়ালিদ। অনেক কিছুই তার কাছে অস্পষ্ট ঠেকছে। ঠিক হিসেব মিলাতে পারছে না কি করে তার ১০ দিন অতিবাহিত হয়ে গেলো। আর স্মৃতির কথাগুলোও যেন কেমন গোলমেলে। একটা কথার সাথে আরেকটা কথার কোন যোগসূত্র পাওয়া যায় না। নিজে কি করে এই জায়গা থেকে মুক্তি পাবে সেটাও জানে না।

আশ্চর্য তো! কেউ তো তাকে এখানে বন্দী করে রাখেনি, তাহলে মুক্তির প্রশ্ন আসছে কেন? সে তো চাইলেই যেতে পারে। এখন বেশ সুস্থ লাগছে তার নিজেকে। নিজেই পাড়ি দিয়ে ক্যাম্পে যেতে পারবে এমন আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে তার মধ্যে। অবশ্য রাস্তা চেনানোর জন্য একজন গাইড দরকার হতে পারে। সেটা স্থানীয় কেউ হবে কি ?

স্মৃতিকে বললে হয়তো ব্যবস্থা করে দিবে। এত কিছু যখন করেছে এতটুকু করে দিবেই। স্থানীয় মানুষেরা তাকে যথেষ্ট সম্মান করে। ভয়ও পায় মনে হয়। মেয়েটা বোধহয় নিজের ভেষজ চিকিৎসাবিদ্যার জ্ঞান দিয়ে তাদের সামনে ক্ষমতাবান হওয়ার ভাব নেয় যে তার অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা আছে।

আচ্ছা, আসলেই কি তাই! কেন জানি তারও মনে হয় মেয়েটার মধ্যে প্রকৃতিপ্রদত্ত কিছু একটা আছে যেটা ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। কিন্তু যুক্তি দিয়ে ঠিক বুঝা যাচ্ছে না ব্যাপারটা।

“ ধুর! কি সব যে ভাবছি! ” নিজেকেই ধমক দিল মেজর ওয়ালিদ। “ স্মৃতি যা হয় হোক, এখন আমার এখান থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা হলেই বাঁচি। ”

ভাবতে ভাবতে বের হয়ে এলো ঘর থেকে। চারপাশটা দেখে একটু অবাক হয়ে গেলো। অপূর্ব জায়গা। তিনপাশে পাহাড়ে ঘেরা একদিকে নদী, ওপাশে ঝরণাও দেখা যাচ্ছে, এমন জায়গা আসলে মানুষের কল্পনাতেই সম্ভব মনে হয়। এমন জায়গায় আসলে যে কেউই বোধহয় জায়গাটার প্রেমে পড়ে যাবে!

“ ওমা! আপনি হাটাঁ চলা শুরু করেছেন? ” – স্মৃতির বিস্মিত কণ্ঠে দেবীপুরের অসাধারণ প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে যাওয়া ওয়ালিদ বাস্তবে ফিরে এলো।
– তাই তো দেখতে পাচ্ছেন।
একটু শ্লেষ মিশ্রিত কণ্ঠে বললো সে। স্মৃতির অতি যত্নে একটু বিরক্তও সে। তাকে কি বাচ্চা ছেলে ভাবে নাকি মেয়েটা!

“ তা মেজর সাহেব এত ক্ষুব্ধ কেন? সেবায় কি কোন কমতি হয়েছিল নাকি? ”
– আরে না না, কি যে বলেন আপনি! এতটাই যে করেছেন তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আসলে …
বলতে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছে সে।
“ কথাটা শেষ করুন। ” বললো স্মৃতি।
– আমার এখানে আর ভালো লাগছে না। যতদ্রুত সম্ভব ক্যাম্পে যেতে চাই।
– অসম্ভব!
মারাত্মক তীক্ষ্ম হয়ে উঠলো তার কণ্ঠ। আরেকবার অবাক হয়ে গেলো মেজর ওয়ালিদ। তার চোখে স্পষ্ট ক্রোধের আগুন দেখতে পাচ্ছে সে। ভয়াবহ এক আগুন, যে আগুনে পুড়ে বোধহয় সোনাও নিমিষেই গলে যাবে!

দীর্ঘ কিছু মুহূর্ত নীরবে তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলো। এরপরে আবার স্মৃতিই মুখ খুললো,
“ আপনি বুঝতে চাচ্ছেন না কেন আপনি এখানে নিরাপদ, বাইরে কোথায় বাংলাদেশ আর্মির ক্যাম্প সেটা আমি জানি না কিন্তু এই দেবীপুরের বাইরেই আরাকান আর্মির খুব শক্তিশালী ক্যাম্প রয়েছে। এখান থেকে বের হওয়া মাত্রই আপনি তাদের হাতে ধরা পড়ে যাবেন। আর আপনি স্বীকার করেন আর নাই করেন এই পাহাড়ে আপনাদের আর্মির চেয়ে আরাকান আর্মি অনেক বেশি শক্তিশালী। ”

কথাটা মেজর ওয়ালিদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও কিছু করার নেই। হতে পারে এটাই বাস্তবতা। কিংবা মেয়েটি তার ভালোর জন্যই কিছুটা বাড়িয়ে বলছে।

আবার কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে সে। আশ্চর্য! এত তো খানিক আগেও অনেক ভালো আর সুস্থ ছিল সে। এখন আবার হটাৎ কি হল!

“ আপনি কি আবার অসুস্থ বোধ করছেন? ” – ওয়ালিদকে নিয়ে উদ্বেগটা স্পষ্ট প্রকাশ পায় তার কণ্ঠে।

“ নাহ। ঠিকই আছি আমি। ” – এবার নিজের খারাপ লাগাটা লুকাতে চাইলো সে। “ এই একটু মাথা ঘুরাচ্ছে কেবল। আসলে অনেকদিন ধরে শুয়ে বসে কাটিয়েছি তো। আজ অনেকদিন পর বেরিয়ে একটু এরকম লাগছে। ওটা তেমন কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে। ”
– কি যে ঠিক হবে সে তো দেখতেই পাচ্ছি।
– চলুন না একটু নদীর ধারে যাই। অনেক সুন্দর জায়গা।
– আচ্ছা চলুন। আপনাকে আসলে সারাক্ষণ ঘরে নিয়ে রাখা যাবে না। তাইলেই আপনি অচিন পাখির ন্যায় উড়াল দিতে চাইবেন।
– হাহাহা। শেষ পর্যন্ত আমার সাথে অচিন পাখির তুলনা করে ছাড়লেন!
– খুশি হয়েছেন নাকি বেজার হয়েছেন ?
– ঠিক নিশ্চিত না।
– আপনি পারেনও !
– আপনিও কম না!

আর কোন কথা হলো না তাদের মধ্যে। চুপচাপ বসে রইলো। সুন্দর বিকেলের দারুণ প্রকৃতি বোধহয় নীরবেই উপভোগ করতে হয়!

কতক্ষণ বসে ছিল তারা হিসেব নেই। খুট করে একটা শব্দ হতেই ফিরে তাকালো তারা দুজনে। বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর কমান্ডো পোশাক পরিহিত অস্ত্রধারী লোকটিকে দেখে চমকে গেল দুজনেই।

“ কমান্ডার আব্দুল্লাহ!! ”
সমস্বরে বলে উঠলো দুজনেই।

নয়ঃ

“ মেজর ওয়ালিদ ! আপনি এখানে ? আর ওইদিকে আমরা সবাই খুঁজে হয়রান। ”
– কতদিন ধরে আমার জন্য সার্চ করছেন আপনারা, কমান্ডার ?
– যে দিন থেকে আপনি নিখোঁজ হয়েছেন সেদিন থেকেই আর্মিতা সার্চ শুরু করে দিয়েছিল। আর আমরা এসেছি ৬ দিন পর থেকে। গত দশদিন আমরা একটানা সার্চ চালিয়েই গেছি। এই অঞ্চলের কথা আমরা ভুলেই গেছিলাম। আরিশার কথায় আমাদের টনক নড়ে।

আরিশার নাম আসতেই কেমন জানি ঝিক করে জ্বলে উঠলো স্মৃতিশ্বরের চোখ। সাহসী পুরুষের আত্মাও কেঁপে উঠবে সে চোখ দেখে!

“ আরিশা! কে এই আরিশা ? ” – অবাক হয়ে গেছে মেজর ওয়ালিদ।
– কি বলছেন আপনি? আরিশা না আপনার প্রেমিকা?
– কিহ? কবে থেকে? আমার তো কিছুই মনে পড়ছে না।

মেজর ওয়ালিদকে দেখে অবস্থা সুবিধার মনে হলো না আমার। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন।

“ সেসব কথা পরে হবে, মেজর। এখন চলুন আপনাকে নিয়ে যাই। আপনার অবস্থা খুব একটা সুবিধার না। ”

বলেই কি মনে পড়তে আশাপাশে চাইতেই অবাক হয়ে গেলাম। আমার সাথে একজন কমান্ডোও নেই!

“ চাইলেই আপনি তাকে নিতে পারবেন না এখান থেকে, কমান্ডার! ” – দীর্ঘক্ষণ পরে মুখ খুললো স্মৃতি। ভয়াবহ ক্রোধের আগুনে জ্বলছে চোখ। সাক্ষাৎ দেবীই মনে হচ্ছে এখন তাকে। “ ওয়ালিদ আমার, কেউ তাকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। ”

হাতের রাইফেলটা শক্ত করে ধরলাম আমি। স্নায়ু শক্ত করেই জবাব দিলাম,
“ কোন অধিকারে তাকে আটকে রাখবেন আপনি? ”
– আমি তাকে ভালোবাসি। আর ভালোবাসার অধিকার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অধিকার।
– হ্যাঁ। কিন্তু এই অধিকার দিয়ে আপনি তাকে জোড় করে আটকে রাখতে পারেন না। আর যদি সেটা করতে চান প্রয়োজনে আমার রাইফেলের মুখোমুখি হতে হবে আপনাকে।
– হাসালেন আমাকে কমান্ডার। অনূসুয়া, ওহ আপনি তো আবার আরিশা ছাড়া চিনবেন না, যাই হোক, আরিশা যখন ওয়ালিদ কোথায় আছে এটা বলতে পেরেছে তারমানে এটাও নিশ্চয়ই বলেছে যে আমি কে! আশা করি বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই। ভালো হয় আপনি দ্রুত এখান থেকে বিদায় নিন। আর দ্বিতীয়বার যাতে না আসতে পারেন সেজন্য অবশ্য আমাকেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

“ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একজন কমান্ডো আমি! এত সহজেই হার মানব নাকি? পারলে দেখান আপনার ক্ষমতা! ”

কথা শেষ করার আগেই মাথার মধ্যে প্রচণ্ড যন্ত্রণা অনুভব করলাম। মেয়েটা স্মৃতির দেবী হলে মাথা কি করে নিয়ন্ত্রণে আনে সেটা আমার বোধগম্য হলো না।

“ চলো ওয়ালিদ। আমরা যাই এখান থেকে। ” – বলেই সে ওয়ালিদের হাত ধরে চলে যেতে লাগলো।

এতক্ষণ ঘোরের মধ্যে থাকা ওয়ালিদ এবার যেন একটু ঝাড়া দিয়ে উঠলো। সম্ভবত আরিশার কথা মনে পড়েছে তার। নাকি অন্যকিছু ! কে জানে

“ আমাকে কমান্ডারের সাথে যেতে হবে, আমাকে আরিশার কাছে যাতে হবে। কতদিন ধরে না জানি আমার অপেক্ষা করছে সে! ” – কেমন যেন যান্ত্রিক শোনাল মেজর ওয়ালিদের কথা।

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে স্মৃতির চেহারা।
“ অসম্ভব! এ হতে পারে না। কিছুতেই না। আমি হতে দিতে পারি না! ” – ভয়ানক কণ্ঠে বিড়বিড় করে চলেছে সে।

“ আরিশার ভালোবাসার শক্তির কাছে আপনি হেরে গেছেন, স্মৃতি, হেরে গেছেন। ” – বললাম আমি।

“ কক্ষণো না। ”
– জোর করে ভালোবাসা আদায় করা যায় না।
– আমি করেই ছাড়ব।

বলার সাথে সাথেই প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলো মেজর ওয়ালিদ। আমার মাথার যন্ত্রণাটাও বাড়ছে। হটাতই ভীষণ গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেলাম।

অট্টহাসি দিয়ে উঠলো সে।
“ এবার আপনাকে কে বাঁচাবে, কমান্ডার? আরাকান আর্মি এসে পড়েছে তাদের পুরো ফোর্স নিয়ে। আপনার জন্য একটা তথ্য দেই, আপনারা যেদিক দিয়ে এসেছেন তার বিপরীত দিক থেকে আরেকটা পথ আছে এই দেবীনগরে প্রবেশ করার। সেই পথের বাইরেই তাদের মেইন হেডকোয়ার্টার। আপনার সোয়াডসের পুরো এক প্লাটুনের ক্ষমতাও নেই তাদের থেকে এই ঘাঁটি দখল করবে! আর আপনি এসেছেন মাত্র ৫ জন কমান্ডোকে সাথে নিয়ে। ”

স্মৃতির কণ্ঠের ব্যঙ্গটা স্পষ্ট। সত্যিই কি তবে আমার দিন ঘনিয়ে আসছে!

“ যাই হোক, বিদায়। যদি বেঁচে ফিরতে পারেন তবে জানিয়ে রাখি আমাকে স্মৃতির দূর্গে পাবেন। চললাম আমি। সেই দূর্গ কেবল আমার, আর ওয়ালিদও কেবল আমার। বিদায় কমান্ডার, বিদায়! ”

বাঁধা দিতে চাইলাম কিন্তু পারলাম না। ওদিকে গোলাগুলির চোটে কাভার নিতে বাধ্য হলাম। স্মৃতি ভুল বলেনি। পুরো ফোর্স নিয়ে আক্রমণ করেছে তারা। আচ্ছা আমার সাথের কমান্ডোরা গেল কোথায়!

যেন আমারই প্রশ্নের জবাবে পাল্টা গুলি চালালো ১০ মিটার দূর থেকে। ওই তো তারা কিন্তু এতক্ষণ কোথায় ছিল!

অবশ্য এখন কিছু ভাবার সময় নেই। কি করবো আমি! আরাকান আর্মির হাতেই কি তাহলে আমার মৃত্যু লেখা ছিল!

হটাৎ মনে পড়লো রেডিওর কথা। হায়রে আমি তো ভুলেই গেছিলাম!
“ সিয়েরা কমান্ড! দিস ইজ ডেল্টা কমান্ড, কাম ইন! উই আর আন্ডার অ্যাটাক। আরাকান আর্মির হিউজ ফোর্স আমাদের অ্যাটাক করেছে। উই নিড ইমিডিয়েট সাপোর্ট। ”

এক মুহুর্ত পরেই জবাব আসলো।
“ ডেল্টা কমান্ড! দিস ইজ সিয়েরা কমান্ড। হোয়াটস ইউর পজিশন? ”
– দেবীপুর। উই আর ইন দেবীপুর।
– পজিশন লকড। ডেল্টা কমান্ড হোল্ড ইউর পজিশন অ্যাস মাচ অ্যাস পসিবল। উই হ্যাভ সেন্ট আ স্পেশাল টিম, অ্যান্ড নাউ সেন্ডিং অ্যানাদার টিম। প্লিজ হোল্ড ইউর পজিশন। ডোন্ট লুজ হোপ। রি-ইনফরসমেন্টস আর কামিং।
– ওকে, ওভার।
– অল দা বেস্ট, ওভার অ্যান্ড আউট।

তারমানে এখন যেভাবেই হোক টিকে থাকতে হবে। কিন্তু ওরা যে বললো আগে থেকেই একটা টিম পাঠিয়েছে! কেন ? কে পাঠাতে বলেছে? কেনই বা বলেছে ?

অবশ্য এত কিছু ভাবার অবকাশ নেই আমার এখন। চারপাশে গুলির বৃষ্টি হচ্ছে যেন। আমার সঙ্গীদের কি অবস্থা কে জানে! অবশ্য তাদের অবস্থান থেকে অনবরত গুলি চলছে। সেজন্যই আরাকান আর্মিদের এগিয়ে আসতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে এগিয়ে তো আসছে।

মন শক্ত করলাম আমি। মারা গেলে যাব। কিন্তু বীরের মত লড়াই করব। দেশ রক্ষার জন্য শপথ নিয়েছি আমি, দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করে মারা গেলে কোন দুঃখ থাকবে না আমার। বরং আমি গর্ববোধ করব।

(চলবে)

অনূসুয়া- অ্যান আনসলভড মিস্ট্রি (২)

অনূসুয়া- অ্যান আনসলভড মিস্ট্রি (১)

৬৩৩জন ৬৩৩জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ