অদ্ভুতুড়ে ভালোবাসা

অলিভার ১৫ জুন ২০১৬, বুধবার, ১২:০০:১৭পূর্বাহ্ন গল্প ৯ মন্তব্য

অদ্ভুতুড়ে ভালোবাসা

 

এক পাখির দম্পতিদের একজন ছিল অন্ধ। অন্য পাখিটা নিজের পাশাপাশি অন্ধ পাখিটার দেখাশোনা করত। তার খাবার জোগাড় করা, বাসা তৈরি করা, নষ্ট বাসা পুনরায় ঠিকঠাক করা। এই সবই করত চোখে দেখা পাখিটা। অন্ধ পাখিটা শুধু তার অনুগ্রহেই বেঁচে থাকত। আর অবসরে দুজন মিলে খোলা আকাশে উড়ে বেড়াত। সেখানেও অন্ধ পাখিটাকে তার সাথী পাখিটা সহায়তা করত। গাইড করে তাকে উড়ে যাবার নির্দেশনা দিত। আর সেই নির্দেশনা মতই অন্ধ পাখিটা উড়ে চলত।

অন্ধ পাখিটার এই নিয়ে অনেক আফসোস ছিল। আফসোস ছিল কারণ দম্পতি হয়েও তারা একত্রে কোন কাজই স্বাধীন ভাবে করতে পারে না। একজন তার জন্যে খেটে মরে, আর অন্যজন সেই খাটুনির উপর জীবন নির্বাহ করে। প্রায়ই এই নিয়ে বিলাপ করত অন্ধ পাখিটা। কিন্তু সাথী পাখিটা তার প্রতিটা বিলাপের বিপরীতে তাকে সান্ত্বনা দিতো, সাহস যোগাত। নিজের এত খাটা-খাটনির পরেও অন্ধ পাখিটাকে সে কখনোই ছেড়ে যাবার কথা চিন্তা করত না। বলতে গেলে প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসা দিয়ে তাকে আগলে রাখার চেষ্টায় সর্বদা সচেষ্ট থাকত।

একদিন কোন এক বিকেলে অন্ধ পাখিটা তার সাথী পাখিটাকে জিজ্ঞাস করল-
– মনে কর কোন একদিন কোন কারণে আমি হারিয়ে গেলাম, কিংবা হারালাম ভুবন থেকে। তখন তুমি কি করবে?

জবাবে সাথী পাখিটি বলল-
– যেদিন ঐরকম কোন সময় আসবে সেদিন চিন্তা করব।

অন্ধ পাখিটা আবার জিজ্ঞাস করল-
– যদি দেখো কাল বিকেলে নীড়ে ফিরে দেখো তোমার আশ্রিত এই অন্ধ বিহাগ আর নেই এই নীড়ে। কিংবা জমে আছে শক্ত হয়ে। পিপীলিকারা আনন্দে আত্মহারা! খুঁটে খুঁটে তুলে নিচ্ছে তার অন্ধ চোখের অংশ গুলি। তখন কি করবে?

সাথী পাখিটা এবারে বলল-
– সে সময়ের কথাও সময়ে তোলা থাক। সময় ঠিকই জানে আমি কি করব তখন।

অন্ধ পাখিটা মনে মনে হাসল। কি অদ্ভুতুড়ে ভালোবাসাতেই না ডুবে আছে সে। অথচ বিনিময়ে তাকে কিছুই ফিরিয়ে দিতে পারছে কই! দীর্ঘশ্বাস আপনা-আপনি বের হয়ে আসল অন্তর হতে।

কিছুদিন বাদে এক বিকেলে দুজনে দুয়ে দুয়ে চার পাখা মেলে উড়ছিল মুক্ত আকাশে মনের আনন্দে। অন্ধ পাখিটা তার সাথীর বলে দেয়া পথ অনুসরণ করে উড়ে যাচ্ছিল, আর সাথী পাখিটা উড়ছিল অন্ধ পাখিটার চারপাশে, বৃত্তাকার, উপবৃত্তাকারের নানা ভঙ্গিতে। এভাবে ছুটে চলাতেই তাদের যত আনন্দ।

কিন্তু আনন্দটা আর কিছুক্ষন বাদে আনন্দ থাকল না। বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ করেই ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করল। ফিরে যাবার দিক নির্দেশনা দিতে দিতে সাথী পাখিটা প্রাণপণে ছুটোছুটি করতে আরম্ভ করল। আর ওদিকে ঝড়ো হাওয়ার সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল ধুলো। চারিপাশ অন্ধকার করে ঘিরে ধরল ধুলোর এক আস্তরণ। বাতাসের ঝাপটা আর ধুলোর ধাক্কায় বার বার পথ হারাচ্ছিল তারা।

ব্যতিব্যস্ত হয়ে পথের দিশা খুঁজে বের করে জোরে জোরে চিৎকার করে যাচ্ছিল সাথী পাখিটা। ধুলোর সাথে যুদ্ধ করার সময় তার খেয়ালে কিছুটা ভাটা পড়েছিল অন্ধ পাখিটার উপর থেকে। আর সেই সুযোগেই দমকা হাওয়া অন্ধ পাখিটাকে টেনে নিলো আপন দিশায়। এভাবে একটু একটু করে দূরত্ব বাড়ছিল তাদের। আর এভাবেই একটু একটু করে ভিন দিশায় ছুটে বেড়াচ্ছিল পাখি দুটো।

সাথী পাখিটা যখন মোটামুটি বালির চাদর ভেদ করে পথ খুঁজে বের করল তখন পিছনে ফিরে দেখে অন্ধ পাখিটা তার পেছনে নেই। ভয় পেয়ে গেল সে, তেড়ে গেল আবারও ধুলো-ঝড়ের দিকে।
কিন্তু কই! ধুলো ঝড় তো বিদায় হয়েছে। দমকা হাওয়াও তার এমনতর দুষ্টুমিতে লজ্জা পেয়ে কোথায় লুকিয়েছে। এখন কেউ এখানে নেই। তাহলে কোথায় গেল সে!

নিজের সর্বোচ্চ শক্তিকে ব্যয় করে ছুটল সাথী পাখিটা। চিৎকার করে ডাকতে লাগল অন্ধ পাখিটার নাম ধরে।
নেই! সে কোথাও নেই। বালি আর হাওয়া যেন একদম মিশিয়ে নিয়েছে অন্ধপাখিটাকে তাদের মাঝে।

সাথী পাখিটার চিৎকার ততক্ষণে আর্তনাদে রূপ নিয়েছে। ছুটল, কেবলই ছুটে বেড়াল সেই সন্ধ্যা থেকে ভোর অবধি। শেষ পর্যন্ত সূর্যের আলোও যখন তাকে তার অন্ধ সাথীকে খুঁজে দিতে পারল না তখন বাতাস আর বালিদের প্রতি প্রচণ্ড অভিমান করে ফিরতে শুরু করল নীড়ে। অন্ধ পাখিটির পরিণতি ভেবেও বার বার নিজেকেই দোষারোপ করছিল। কেন যে আজ উড়তে বের হয়েছিল, সে নিয়ে আফসোস করতে করতে নোনা জল ঝরাচ্ছিল চোখ থেকে।

ওদিকে অন্ধ পাখিটা ধীরে ধীরে বাতাসের ঝাপটায় ভিন দিশাতে কখন যে ছুটে চলেছিল তা সে নিজেও বুঝতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত যখন বুঝল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। কান পেতেও সাথী পাখিটার কোন কথাই সে শুনতে পারছিল না। তখন সেও পাগলের মত সাথী পাখিটার নাম ধরে চিৎকার জুড়ে দিল। ছুটতে ছুটতে ঝড় পিছু ছাড়ল, বালির আস্তরণ অনেক অনেক পিছনে পড়ে রইল, কিন্তু সাথী পাখিটার কোন খোঁজ সে করতে পারল না। তবুও চিৎকার করতে করতে শক্তি শেষ হবার আগ পর্যন্ত উড়ে বেড়াতে লাগল।

কিন্তু এভাবেই বা কতক্ষণ! দিশা হারিয়ে কত সময়ই বা আর উড়ে চলা যায়। শক্তি ফুরিয়ে আসলে ক্লান্ত হয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসল ভূমির দিকে। নিয়তি আজ তার নিশ্চিন্ত গাছের ডালে যে বিশ্বাসের আশ্রয় ছিল, তাও কেড়ে নিলো। নিজের দুঃখ নিয়ে বিলাপ করবারও আগে দুশ্চিন্তায় ঘিরে ধরল তাকে। সে তো ভুল দিশায় হলেও অবশেষে নিস্তার পেয়েছে ঐ নিষ্ঠুর বালি-ঝড় হতে। কিন্তু তার সাথী পাখি? সে কি বের হতে পেরেছিল ঐ ঝড় থেকে?

মনে এমন দুশ্চিন্তা নিয়েই কাটাতে লাগল সময়। হঠাৎ হঠাৎ যখন দূর থেকে কোন শব্দ ভেসে আসে তখনই চিৎকার করে সাথী পাখিটার নাম ধরে ডেকে উঠে। তারপর আবারও অপেক্ষাতে থাকে, এই বুঝি সাথী পাখিটা উড়ে এসে বলবে- “এভাবে পথ হারালে কেন! জানো না কতটা দুশ্চিন্তায় দৌড়ে বেড়িয়েছি আমি।”

সেই আশা আর পূরণ হয় না। ধীরে ধীরে ভোর হতে শুরু করে। চারিদিকের ব্যস্ততার শব্দ ঠিকই ভেসে আসে তার কানে। মাঝে মাঝে দূর আকাশে পাখিদের আলাপ করতে করতে উড়ে যাওয়া বুঝতে পারলে চিৎকার দেয় সাথী পাখিটার নাম ধরে। নিজে উড়ে যায় না। যদি উড়তে গিয়ে ভিন দিশাতে আরও দূরে কোথাও হারিয়ে যায়, সেই ভয়ে।

হঠাৎ একদল পাখি তার পাশে এসে নামল। অন্ধ পাখিটা মনে করল হয়তো তার সাথী পাখিটাই এসেছে। আনন্দে চিৎকার করে উঠে সে সাথী পাখিটার নাম ধরে। কিন্তু তার সাথী তো সেখানে নেই। পাখির দলটা অন্ধ পাখিটার কাছ থেকে তার ঘটনাটা শোনে। তারপর মোটামুটি একটা ধারণা নিয়ে তাকে তাদের সাথে উড়িয়ে নিয়ে চলে অন্ধ পাখিটার নীড়ের খোঁজে।

অনেক ঘুরতে ঘুরতে শেষ পর্যন্ত নিজের নীড়ের ঠিকানা খুঁজে পায় অন্ধ পাখিটি। আনন্দে আত্মহারা হয়ে চিৎকার জুড়ে দেয় সাথী পাখিটার নাম জুড়ে। কিন্তু সেই চিৎকারের বিপরীতে কোন সাড়া নেই। পাখির দল ভাবে হয়তো অন্ধ পাখিটার খোঁজে সাথী পাখিটা বের হয়েছে। সেজন্যেই কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তারা অন্ধ পাখিটাকে নীড়ে পৌঁছে দিয়ে উড়ে যেতে থাকে আপন ঠিকানায়।

অন্ধ পাখিটা আপন নীড়ে প্রবেশ করে। সেও ভেবে নিয়েছে, সাথী পাখিটা হয়তো তার খোঁজেই ঘুরে ফিরছে। এখনই হয়তো যে কোন সময়ে হুট করে ফিরে আসবে সে। তারপর তাকে এখানে আবিষ্কার করে আনন্দে চিৎকার জুড়ে দিবে। হয়তো কেঁদে কেটে একটা হুলস্থুল কাণ্ডও ঘটিয়ে বসতে পারে।

এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আপন মনে নীড় জুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎই থমকে যেতে হল। থমকাল সাথী পাখিটার গায়ের গন্ধ পেয়ে। তার সাথী তো এখানেই আছে, এই নীড়েই রয়েছে সে। তবুও কেন তাকে দেখছে না? নাকি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে সাথীটি তার? মনে এমন প্রশ্ন নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যেতে থাকল সাথী পাখিটার ঘ্রাণ বরাবর। হাটতে হাটতেই আবার হোঁচট খেল। সাথী পাখিটার গায়ের সাথেই হোঁচট খেয়েছে সে। মুখটা নামিয়ে সাথী পাখিটার গায়ে আদুরে ভঙ্গিতে ঘসতে লাগল অন্ধ পাখিটা। মাঝে মাঝে এমন করে সে। সাথী পাখিটা এমন করলে মনে মনে বেশ আনন্দিত হয়। যদিও মুখে বলে ভিন্ন কথা। এমন করলে বার বার বলতে থাকে- “কেন যে এমন ছেলেমানুষি কর”। অথচ তার কণ্ঠই বলে সেও মনে মনে এমন আদর বেশ উপভোগ করছে।

কিন্তু আজ তেমন কিছুই হল না। নিশ্চুপই পড়ে রইল সাথী পাখিটা। অন্ধ পাখিটা মনে করল কাল ঐভাবে তার কথা খেয়াল না করে পথ হারানোতে মান করেছে তার সাথী। তাই সে বলতে শুরু করল-
আমি কি ইচ্ছে করে এমনটা করেছি নাকি?
বাতাসের ধাক্কায় দিক হারিয়ে ফেলেছিলাম যে! নয়তো কি আর এমন হয় নাকি?

কিন্তু তাতেও কোন পরিবর্তন নেই সাথী পাখির। ওভাবেই গো ধরে পড়ে আছে সে।
এবারে অন্ধ পাখিটি ঘুরে সাথী পাখিটার সামনে চলে এলো। কিন্তু মেঝেতে এমন কি ফেলেছে তার সাথী। কেমন চিটচিটে হয়ে আছে মেঝে। পায়ে ঐসব চিটচিটে জিনিষ লেগে একাকার অবস্থা। তারপরও এগিয়ে এসে বার কয়েক ধাক্কা দিল সাথী পাখিটার গায়ে। কিন্তু না, কোন নড়াচড়াই নেই তার।

হঠাৎই অন্ধ পাখিটা বুঝতে পারল কেন সাথী পাখিটা আর নড়ছে না, কেন অভিযোগ করছে না তার পথ হারানো নিয়ে। চিটচিটে বস্তুটাই বা কি তাও বুঝতে আর কোন সমস্যা হল না তার।

ভোরে সাথী পাখিটা তার ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফিরে এসেছিল নীড়ে। নীড়টা তৈরির সময় ঘরের এক কোণে সে লুকিয়ে রেখেছিল ভাঙ্গা একটি সুঁই। সন্তর্পণে সেই সুঁই বের করে নিয়ে আসে সে। এরপর সেই সুঁইটাকেই নিজের চোখ বরাবর গেঁথে দেয়। রক্তের ধারার সাথে সকল গ্লানি আর অপরাধ-বোধ বের হয়ে আসে তাতে ভেতর থেকে। ধীরে ধীরে নিথর হয়ে আসে তার শরীর।

অন্ধ পাখিটা এবারে আর কোন চিৎকার করে না, বিলাপ করে না আর। সে তার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছে। সময়ের কাছে তার যে প্রশ্নের উত্তর সাথী পাখিটি লুকিয়ে রেখেছিল, আজ ঐ উত্তর সে জেনে গেছে। জেনে গেছে নিয়তি তাকে পথ হারা করে কী ছিনিয়ে নিয়েছে তার আপন খেয়ালে…

 

 

 

 

৬২২জন ৬২২জন
0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ