‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে গোপালগঞ্জ শহর মুখরিত হয়ে উঠল। নেতারা জনসমাগম দেখে খুবই আনন্দিত হলেন। সভা হবে, কিন্তু প্যান্ডেল গত রাতে ঝড়ে ভেঙে গিয়েছে। নৌকার বাদামগুলি ছিঁড়ে টুকরা টুকরা হয়ে গেছে। সেই ভাঙা প্যান্ডেলে সভা হল। রাতেই সকলে বিদায় নিলেন। আমার অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে গেল। এত টাকা আমি কোথায় পাব? বাদামগুলি ছিঁড়ে গেছে, এখন তো [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-১৬) “আর একটা কথা মনে রেখ, ‘sincerity of purpose and honesty of purpose’ থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না।” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
ক্যাটাগরি এদেশ
কন্যারা, দ্বার রুদ্ধ করে বসে থাকা নয়, এবার প্রস্তুত হয়েই পথে নামো…… নিজেকে লুকিয়ে রেখে কখনো হায়েনার হাত থেকে বাঁচা যায় না। বাঁচতে গেলে যথাসময়ে ছোবল দিতে হবে। পৃথিবীটা মানুষের জন্য। আর নারী-পুরুষ সমন্বয়েই সুন্দর পৃথিবী। মাত্র গুটিকয়েক পুরুষ নারীকে হেনস্থা করতে পথে নামে। তারা চায় নারীকে গৃহবন্দী করে সবকিছু নিজেদের কব্জায় রেখে নিজেদের পশুত্বকে [বিস্তারিত কন্যারা, দ্বার রুদ্ধ করে বসে থাকা নয়, এবার প্রস্তুত হয়েই পথে নামো……]
আমি কলকাতায় রওয়ানা হয়ে গেলাম, নেতৃবৃন্দকে নিমন্ত্রণ করার জন্য। যখন সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে দাওয়াত করতে গেলাম, দেখি খাজা শাহাবুদ্দিন সেখানে উপস্থিত আছেন। শহীদ সাহেব বললেন, “আমি খুবই ব্যস্ত, তুমি বুঝতেই পারো, নিশ্চয়ই চেষ্টা করব যেতে। শাহাবুদ্দিন সাহেবকে নিমন্ত্রণ কর উনিও যাবেন।” অনিচ্ছা সত্ত্বেও শাহাবুদ্দিন সাহেবকে বলতে হল, তিনিও রাজি হলেন। মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ এবং হবীবুল্লাহ [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (পর্ব-১৫) আমি কোন কাজেই ’না’ বলতাম না। ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলাদেশ দখল করে মীর জাফরের বিশ্বাস ঘাতকতায়, তখন বাংলার এত সম্পদ ছিল যে, একজন মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ী গোটা বিলাত শহর কিনতে পারত। সেই বাংলাদেশের এই দুরাবস্থা চোখে দেখেছি যে, মা মরে পড়ে আছে, ছোট বাচ্চা সেই মরা মার দুধ চাটছে। কুকুর ও মানুষ একসাথে ডাস্টবিন থেকে কিছু খাবার কাড়াকাড়ি করছে। ছেলেমেয়েদের রাস্তায় [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (পর্ব-১৪) তখন বাংলার এত সম্পদ ছিল যে, একজন মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ী গোটা বিলাত শহর কিনতে পারত। ——শেখ মুজিবুর রহমান]
১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আরম্ভ হয়েছে। লক্ষ লক্ষ লোক মারা যাচ্ছে। এই সময় আমি প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য হই। জনাব আবুল হাশিম সাহেব মুসলিম লীগের সম্পাদক হন। তিনি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মনোনীত ছিলেন। আর খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেবের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন খুলনার আবুল কাশেম সাহেব। হাশিম সাহেব তাঁকে পরাজিত করে সাধারণ সম্পাদক হন। এর পূর্বে সোহরাওয়ার্দী [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (পর্ব-১৩) যুদ্ধ করে ইংরেজ, আর না খেয়ে মরে বাঙালি; যে বাঙালির কোন কিছুরই অভাব ছিল না। ——শেখ মুজিবুর রহমান]
একদিন আমরা পাড়ার কয়েকজন ছেলেমেয়ে একটা নতুন কিছু করার ইচ্ছা থেকেই সিদ্ধান্ত নিলাম পাড়ায় এবং এর আশপাশের এলাকায় যে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আছে তাদের সম্বর্ধনা দেব। পাড়ার উঠতি বয়সি কিছু ছেলেমেয়েদের এটা একটা উদ্যোগ। শুরু করেছিলাম আমরা । কিন্তু আমাদের এই কাজকে বড়রা সবাই যে ভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছিল, সাহস দিয়েছে মনেই হয় নি যে আমরা ইন্টারমিডিয়েট [বিস্তারিত আমি কি কিছু বলব ?]
একটা ঘটনার দিন-তারিখ আমার মনে নাই, ১৯৪১ সালের মধ্যেই হবে, ফরিদপুর ছাত্রলীগের জেলা কনফারেন্স, শিক্ষাবিদদের আমন্ত্রণ জানান হয়েছে। তাঁরা হলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির, ইব্রাহীম খাঁ সাহেব। সে সভা আমাদের করতে দিল না, ১৪৪ ধারা জারি করল। কনফারেন্স করলাম হুমায়ুন কবির সাহেবের বাড়িতে। কাজী নজরুল সাহেব গান শুনালেন। আমরা বললাম, এই কনফারেন্সে রাজনীতি [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (পর্ব-১২) আমি ছাত্রনেতাদের নিয়ে আলোচনা করে যাদের ঠিক করে দিতাম তারাই নমিনেশন দাখিল করত, আর কেউ করত না। ————শেখ মুজিবুর রহমান।]
১৯৪১ সালে আমি মেট্রিক পরীক্ষা দেব। পরীক্ষায় পাস আমি নিশ্চয় করব, সন্দেহ ছিল না। রসরঞ্জন বাবু ইংরেজির শিক্ষক, আমাকে ইংরেজি পড়াতেন। আর মনোরঞ্জন বাবু অঙ্কের শিক্ষক, আমাকে অঙ্ক করাতেন। অঙ্ককে আমার ভয় ছিল। কারণ ভুল করে ফেলতাম। অঙ্কের জন্যই বোধহয় প্রথম বিভাগ পাব না। পরীক্ষার একদিন পূর্বে আমার ভীষণ জ্বর হল এবং মামস হয়ে গলা [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (পর্ব-১১) মুসলীম লীগ বললেই গোপালগঞ্জে আমাকে বোঝাত। ——শেখ মুজিবুর রহমান]
১৯৩৯ সালে কলকাতা যাই বেড়াতে। শহীদ সাহেবের সাথে দেখা করি। আবদুল ওয়াসেক আমাদের ছাত্রদের নেতা ছিলেন। তাঁর সাথেও আলাপ করে তাঁকে গোপালগঞ্জ আসতে অনুরোধ করি। শহীদ সাহেবকে বললাম, গোপালগঞ্জে মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করব এবং মুসলিম লীগও গঠন করব। খন্দকার শামসুদ্দীন সাহেব এমএলএ তখন মুসলিম লীগে যোগদান করেছেন। তিনি সভাপতি হলেন ছাত্রলীগের। আমি হলাম সম্পাদক। মুসলিম [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (পর্ব-১০) তিনি সভাপতি হলেন ছাত্রলীগের। আমি হলাম সম্পাদক। মুসলিম লীগ গঠন হল। ——শেখ মুজিবুর রহমান]
এই সময় আব্বা বাড়ি থেকে ফিরে এসেছেন। দারোগা সাহেবও তাঁর পিছে পিছে বাড়িতে ঢুকে পড়েছেন। আব্বার কাছে বসে আস্তে আস্তে সকল কথা বললেন। আমার গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখালেন। আব্বা বললেন, ”নিয়ে যান।” দারোগা বাবু বললেন, “ও খেয়েদেয়ে আসুক, আমি একজন সিপাহি রেখে যেতেছি, এগারটার মধ্যে যেন থানায় পৌঁছে যায়। কারণ, দেরি হলে জামিন পেতে অসুবিধা হবে।” [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (পর্ব-০৯) এই আমার জীবনের প্রথম জেল। ——শেখ মুজিবুর রহমান]
হয়তো বা একদিন কাকতাড়ুয়ার সাজে সেজে যাবো; আমায় দেখে চিনবে না তুমি… চুপিচুপি তুমি কাকতাড়ুয়ার সাথে কথা বলবে, আমি শুনে যাবো… কাকতাড়ুয়া আমি তোমার কথায় ডুবে যাবো, তোমার বিপরীত এ কথা বলার সাধ্য হবে না আমার; শুধু তুমিই বলে যাবে আর হাসবে… তোমার হাসি তে আমি ডুবে যাবো… তুমি আমার গায়ে হাত রাখবে, সাথে [বিস্তারিত আমি কাকতাড়ুয়া]
-কি রে এত রাতে ফোন দিসছ কে? -আজ ইউনিভার্সিটিতে কি হলো দেখলি? শুভ্রকে মারতে মারতে হল থেকে বের করে দিল, অথচ কেউ কিচ্ছু বললো না। -আরে বেটা মানুষের জানের ভয় আছেনা। প্রতিবাদ কইরা খালি খালি হলের সিটটা হারাইবো আরকি? যা রাইত হইছে ঘুমা। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। মা, এখন মাঝ রাত! আমি জানি তুমি [বিস্তারিত সুখ বা শোক দিবস দুটোই এখন বাণিজ্যিক হায়নার খাদ্য। ১৬ই ডিসেম্বর বা একুশে ফেব্রুয়ারি সবই ফুরফুরে হলিডে। হায়-৫২।]
এই সময় একটা ঘটনা হয়ে গেল। হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে একটু আড়াআড়ি চলছিল। গোপালগঞ্জ শহরের আশেপাশেও হিন্দু গ্রাম ছিল। দু’একজন মুসলমানের উপর অত্যাচারও হল। আবদুল মালেক নামে আমার এক সহপাঠী ছিল। সে খন্দকার শাসসুদ্দীন সাহেবের আত্মীয় হত। একদিন সন্ধ্যায়, আমার মনে হয় মার্চ বা এপ্রিল মাস হবে, আমি ফুটবল মাঠ থেকে খেলে বাড়িতে এসেছি: আমাকে খন্দকার [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (পর্ব-০৮) বললাম, “যাব না, আমি পালাব না। লোকে বলবে, আমি ভয় পেয়েছি।” ——শেখ মুজিবুর রহমান]
১৯৩৮ সালের ঘটনা। শেরে বাংলা তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং সোহরাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী। তাঁরা গোপালগঞ্জ আসবেন। বিরাট সভার আয়োজন করা হয়েছে। এগজিবিশন হবে ঠিক হয়েছে। বাংলার এই দুই নেতা একসাথে গোপালগঞ্জ আসবেন। মুসলমানদের মধ্যে বিরাট আলোড়নের সৃষ্টি হল। স্কুলের ছাত্র আমরা তখন। আগেই বলেছি আমার বয়স একটু বেশি, তাই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করার ভার পড়ল আমার উপর। আমি [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (পর্ব-০৭) তিনি আর কিছুই বললেন না, শুধু নোটবুক বের করে আমার নাম ও ঠিকানা লিখে নিলেন। ——শেখ মুজিবুর রহমান]
চোখের চিকিৎসার পর মাদারীপুর ফিরে এলাম, কোন কাজ নেই। লেখাপড়া নেই, খেলাধুলা নেই, শুধু একটা মাত্র কাজ, বিকালে সভায় যাওয়া। তখন স্বদেশী আন্দোলনের যুগ। মাদারীপুরের পূর্ণ দাস তখন ইংরেজের আতঙ্ক। স্বদেশী আন্দোলন তখন মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জের ঘরে ঘরে। আমার মনে হত, মাদারীপুরে সুভাষ বোসের দলই শক্তিশালী ছিল। পনের-ষোল বছরের ছেলেদের স্বদেশীরা দলে ভেড়াত। আমাকে রোজ [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (পর্ব-০৬) ছোটকাল থেকে আমি সকল কাগজই পড়তাম। ——শেখ মুজিবুর রহমান]