আমার বাড়ি

12077515_720519921386422_1699271977_n
১৯৪৭  এর দেশ বিভাগের পরেও আমি পূর্ব বাংলায়ই থেকে যেতে চেয়েছিলাম। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত আমার জমিদারী, আমার প্রজারা এবং সর্বোপরি আমার নির্মিত বাড়িটির প্রতি আমার ভালোবাসা, মায়া আমাকে ভারতে নিয়ে যেতে পারেনি। প্রজারাও আমাকে যথেষ্ঠ ভালোবাসেন। হিন্দু মুসলমান সবাই কান্না কাটি করে রোজ, আমি যেন তাদেরকে পূর্বের মতই ছায়া দিয়ে রাখি, ভারতে চলে না যাই। অনেক যত্নে আমি নতুন বাড়িটি নির্মাণ করেছিলাম। এর প্রতিটি ইট, দরজা, জানালা, সিড়ি, বারান্দা, কার্নিস যেন আমার হৃদয়ের কথা বোঝে, আমিও বাড়ির সাথে কথা বলি, এর ওয়ালে হাত বুলাই, কান পাতি ওয়ালে, অনুভব করি বাড়ির ভালোবাসা। একটি সখের জমিদার বাড়ি কেমন হয় তা সবাই জানেন বলে এর সৌন্দর্য নিয়ে বেশী কিছু লিখলাম না।
বন্ধুবর রূপনগরের জমিদারের কাছে কোলকাতার তার আরাম আয়েশ, ফুর্তি, সন্মান এর কথা শুনে হঠাৎ করেই প্রলোভনের বসে কোলকাতা চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেই। একদিন প্রজাদের কাউকে বুঝতে না দিয়ে, প্রিয় বাড়ি, মায়ার বাড়ির পিঠে কতক্ষণ হাত বুলিয়ে যাত্রা শুরু করি কোলকাতার উদ্দেশ্যে। বাড়িটি আমার পানে তাকিয়ে ছিল যতক্ষণ দেখা যায় আমাকে।
কোলকাতা গিয়ে গড়ে তুলি আমার আর একটি বাড়ি, জৌলুসে ঠাসা। বাঈজি, মুজরা, গান, নাচ, সরাব সে এক অন্য আনন্দের জগৎ। রাজস্থান, মহারাষ্ট্র ও গুজরাট থেকে সেরা সেরা বাইজিদের মাঝে হারিয়ে  যায় আমার প্রিয় বাড়িটির আবেগ, ভালোবাসা, মায়া। তাদের নৃত্য আর সরাবের স্বপ্নিল নেশা আমাকে পেয়ে বসেছিল। জুয়ার আনন্দ এবং উত্তেজনাও ছিল চরম। মাঝে মাঝে বাড়িকে চিঠি লেখি, সেও চিঠি লেখে, তার চিঠিতে অভিমান, এসব অভিমান দেখার মত সময়ও আমার আসলে ছিলনা।
কেন জানি পূর্ব বাংলা হতে ধীরে ধীরে আমাকে পাঠানো অর্থ কমে আসতে থাকে। নায়েব কাকা মাঝে মাঝে আসেন, প্রজারা ঠিকমত জমির খাজনার টাকা দেননা। এমনি আনন্দের মাঝে চলে গিয়েছে কয়েক যুগ। আমার বাড়ির সাথে আত্মিক যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। বাড়ির চিঠি পেলে, দায়সারা উত্তর দিয়ে তাকে সন্তষ্ট করার চেষ্টা করি। আমার চিঠি পড়ে বাড়ি বুঝে ফেলে যে চিঠিতে তাকে মিথ্যে সান্ত্বনাই দেয়া হয়। অভিমান ভরা ফিরতি চিঠি গুলো অনাদরেই রেখে দেই ড্রয়ারে।
আয় যখন বেশ কমে গিয়েছে, তখন জুয়ার নেশা চরমে উঠলো আমার। অবশেষে পরপর কয়েকদিন বড় ধরনের অংক জুয়ায় হেঁড়ে আমি সর্ব শান্ত হয়ে গেলাম। আমার প্রিয় বাড়িতে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম আবার।

প্রায় ৪০ বছর পরে নিজের আত্মা প্রিয় বাড়িতে ফিরে হোঁচট খেলাম। ঝক্‌ঝকে তকতকে বাড়ির একি হাল? দরজা জানালা বিহীন এক কংকাল যেন। বাড়িটি এখন আর একা নেই। ওয়ালে জন্মেছে ছোট বড় অসংখ্য গাছ। বারান্দা গুলো একটিও নেই। ছাদের সিঁড়ি রুমের উপরে যেখানটায় আমার সখের কবুতর থাকতো, সেখানে কাকের বাস। সমস্ত ছাদ এবং ছাদের চওড়া কার্নিস এ পাখিদের বিষ্ঠায় সাদা হয়ে রয়েছে। আমার শয়ন কক্ষে অন্য মানুষের বসবাস। দোতলা বাড়িতে প্রায় ৭ টি পরিবারের বাসস্থান। আমার বাড়িতে আমিই আগন্তক।

একদিন শেষ রাতের ভোরে বিষণ্ন মনে চুপিচুপি আমার মায়ার বাড়িতে গিয়ে ওয়ালে হাত দিয়ে বলি ‘আমি তো ফিরে এসেছি তোমার কাছে, কিভাবে পাই বলো তোমাকে।’
ওয়ালে কান পেতে শুনি বাড়ির উত্তর ‘অবহেলায় আমি তো প্রায় মরেই গিয়েছি, ফিরেই যদি এসে থাকো, আমাকে জাগিয়ে তোলো,দখল মুক্ত করো আমাকে।’

সব পাখি ঘরে ফেরে
ফেরার সময়টি যেন দীর্ঘ না হয়।
===================
আমি আমি না, আমি সে ও না-পর্ব ৩

মোট পড়েছেনঃ ১,২৩৯জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

৬২টি মন্তব্য

  1. রাজা টংকনাথের জমিদার বাড়ি রাণীশংকৈল, ঠাকুরগাঁও। ২০০৩ সালের দিকে গিয়েছিলাম এই রাজবাড়িতে।

    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধায় এর লেখার কথা মনে পড়ছিল যখন পড়া শুরু করেছিলাম।

    অবহেলায় আমি তো প্রায় মরেই গিয়েছি,ফিরেই যদি এসে থাকো,আমাকে জাগিয়ে তোলো,দখল মুক্ত করো আমাকে।’

    কতৃপক্ষের কাছে এই আবেদনটি কর্ণগোচর হোক এটাই আশা করি।

    1. হ্যাঁ এটি রাজা টংকনাথের জমিদার বাড়ি
      কতৃপক্ষের কর্ণগোচর হবেনা কোনদিন
      অথচ এসবই হতে পারতো এক একটি বিশাল সম্পদ।

      ধন্যবাদ আপনাকে।

  2. সময় মত গৃহত্যাগী পথিক বা নীড়ত্যাগী পাখি আপন ঠিকানায় না ফিরলে তার অতি প্রিয় অতি আদরের আশ্রয় অযত্ন অবহেলায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যায় নয়ত পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। একসময় হয়ত সেটা হারাতেও হয়। নিজের আপন নীড় নিজেই আগলে না রাখলে তা হয় অন্যের দখলে চলে যায়, নয়ত পোকামাকড় বাসা বাঁধে,,,,,

    1. আপনার মন্তব্য তো লেখাটিকে অন্য দিকে নিয়ে গেলো
      আপনার মন্তব্যের মতোও ভাবা যায় লেখাটিকে
      ধন্যবাদ এমন মন্তব্যের জন্য।

      1. প্রথমত বাড়িটি আপনার নিজের নয়। কিন্তু এত কিছু লেখার মাঝে। আমি তাই ধরে নিতেই পারি আড়ালের গল্প আড়াল করে আমাদের মাঝে একটুখানি তুলে ধরেছেন।
        ফাঁকিবাজি খেলা আমি কিন্তু একটু বেশি ই বুঝি 🙂

  3. ফিরে এলেই হয়,
    সময় দীর্ঘ বা নাতি দীর্ঘ বা রৌশন কিনা সেটা বিষয় নয়।
    তবে তাড়াতাড়ি এলে আমাদের আর লবেজান হতে হয় না।
    শান্তি, শান্তি।

  4. এরকম বেশ অনেক বাড়িই অনাদরে অবহেলায় মিইয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষ খেয়াল করলে এসব দিয়েই আমরা আমাদের পর্যটন খাতকে অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতাম।
    নিজের সুসময়ে মায়ার জিনিস ত্যাগ করে ভুলে থেকে দুঃসময়ে ফিরলে এমনই দেখতে হয়। গৃহত্যাগীজনের নেপথ্যের কাহিনীচিত্র আরো অনেক করুণ হয়।

    1. বেশ কিছু দেশ আমি ঘুরেছি। আমাদের মত এত সম্পদ খুব কম দেশেই আছে।
      অথচ আমাদের দেশ পর্যটনে সবচেয়ে পিছিয়ে
      এটি যে আয়ের সবচেয়ে সহজ পথ,এটি আমাদের দেশের নীতি নির্ধারকরা বুঝেন না।

      ঠিক বলেছেন আপনি
      ফিরে আসার সময়ের একটি সীমা থাকে
      সে সীমা অতিক্রম করে ফিরে আসলে লাভ হয়না কোন।
      শুভ কামনা।

    1. লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছিলো বাড়িটা আসলেই আমার।
      ইহাকে ভালো লেখা কহে?
      তোমার লেখা টেলিপ্যাথির মাধ্যমে সংগ্রহ করে নিয়ে আসছি।

  5. নেশা, মোহ, ঘোর এগুলো জীবনের ই অংশ, যেমন ভুল একটি অংশ, এগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণের অতীত। যারা পারে তারা জয়ী। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষ শেখে, নিজের জীবন থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা দিয়ে শেখে। এগুলোর মূল্য আছে বৈকি।
    বাড়ির প্রাণ ফিরে এসেছে। কমার পেশেন্টে শ্বাসপ্রশ্বাস আর হৃদস্পন্দন ফিরে এসেছে। চুনকাম, ঝোপঝাড় শ্যাওলা এগুলো দূর হওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার। বাড়িটা এখন যে আরো অনেক অনেক বেশি প্রিয়।
    জিসান ভাই, ভালো আছেন তো? নাকি কিছু ভর করেছে? নিশ্চয়ই করেছে নইলে এতো ভালো লিখছেন কি করে?

    1. হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, নিয়ন্ত্রণের বাইরের গুন গুলোরও মূল্য আছে, এসব জীবনেরই অংশ
      না হলে এসবের সৃষ্টিই হতো না
      বাড়ি এবং বাড়ির মালিক ভালো থাকুক।

      ভালো লেখকেরা যখন প্রশংসা করেন,তখন ভালোই লাগে 🙂

      1. গুন না, বেগুন বলতে পারেন। তবে ভুল আছে বলেই আমি আপনি সঠিক চিনতে পারি।
        ভালো লেখকরা যখন ভালো লেখক বলে তখন আমারো ভালোই লাগে।
        লেখাটির জন্য আপনার প্রশংসা কম করেছি, এমন মনে হয়েছে। লেখাটি অসাধারন হয়েছে।

  6. মাঝে মাঝে গোধূলী পার হয়ে যায় এই ভেবে যে ব্লগে আপনারা যা লিখেন সেইসব ফেসবুকে কেন আসে না! সেখানে গেলে কেন সবাই অন্যরকম হয়ে যায়!

    ছোট্ট কিন্তু অনেক গভীরের। শেখড়ের টান, শেখড়কে অস্বীকার করে অবহেলা, শেখড়ের টানে ফিরে আসা নিঃস্ব হয়ে, সময়ে শেখড় থাকে ঠিকই কিন্তু পরগাছায় আর নিজের শেখর থাকে না…

    ধন্যবাদ জিসান ভাইয়া। (3 -{@

    1. লেখাটা ফেইসবুকে আমার ওয়ালে শেয়ার দিছিলাম।
      ” শেখড়ের টান, শেখড়কে অস্বীকার করে অবহেলা, শেখড়ের টানে ফিরে আসা নিঃস্ব হয়ে, সময়ে শেখড় থাকে ঠিকই কিন্তু পরগাছায় আর নিজের শেখর থাকে না…”’ (y) (y) চমৎকার

      ধন্যবাদ -{@

      1. আমি তো ফেবুতে নেই তাই জানি না :p

        কিন্তু এখানে না এলে কিছুতেই বুঝতাম না অনেকেই কত্তো ভালো লিখেন, শব্দ নিয়ে খেলেন 😀

        -{@ -{@

        1. এইজন্যেই তো অবাক হই বেশী… আপনি ভ্রমণ নিয়ে লিখেন তা পড়েছি ফেবুতেই কিন্তু ইতিহাসকে উপজীব্য করে যে এতো সুন্দর করে লিখেন তা সত্যিই জানতাম না এখানে না থাকলে 😀

মন্তব্য করুন