মিনি

দিনের খাবার শেষে আমি যখন আয়েশ করে এক কাপ কফি হাতে বেল্‌কোনিতে বসি, নিচে লনের একটি দৃশ্যে দৃষ্টি থেমে থাকে। পাশের বাসার চায়নিজ মেয়েটি তাদের পোষা বিড়ালটিকে আদর করছে। কর্ম ব্যস্ততার মাঝে আসা যাওয়ার পথে ওই পরিবারের সকল সদস্যই ক্ষণিক থেমে বিড়ালটিকে মাথায় হাত বুলিয়ে যায়। যেন তাকে ঘিরেই ওদের প্রতিটি দিন আবর্তিত হয়।

 

বিড়ালে দারুন ভয় আমার। আঁতকে উঠি। বুক ধড়ফড় করে। লাফিয়ে লাফিয়ে দূর দূর দিয়ে হেঁটে পালাই। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হল, এতো কিছুর পরও সে আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করে। ম্যাও ম্যাও করে ধীর গতিতে, করুন স্বরে। ওরা কি নামে ডাকে জানিনা, আমি মিনি বলে ডাকি।

 

সেদিন মিনিকে দেখে কেন যেন ভেতরে একরকম মায়া মায়া বোধ হয়। বুকভরে শ্বাস নিয়ে সাহস সঞ্চয় করে লনের ঘাসের উপর বড় পাথরটিতে বসি। সন্ধ্যা ঘনিয়েছে আগেই। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া হেলিকপ্টারের শব্দ ছাড়া অন্য কোন শব্দ নেই। মিনি আমার পাশে ঘেসে থাকে__ যেমন করে জ্বরের সময়টাতে আমি আমার প্রিয়জনদের পাশে ঘেসে থাকি। চাঁদের আলোয় চোখদুটি জ্বলজ্বল করছে। সুনসান নৈঃশব্দ্যের মাঝে সেই করুণ স্বরে  ম্যাও ম্যাও ডাক। নীরবে চেয়ে থাকি। এই প্রথম মনে হল, আমরা মানুষ কেন ওদের ভাষা বুঝার ক্ষমতা রাখি না ?

 

কয়দিন আর মিনিকে দেখিনা। আসা-যাওয়ার পথে লনের এদিক ওদিক চোখ বুলাই। অজান্তেই নির্বাক দৃষ্টিতে কাউকে খুঁজে বেড়াই। চায়নিজ মেয়েটির মা’কে দেখি প্রতিদিন, কিন্তু ইংরেজি বুঝে না বিধায় জিজ্ঞেস করা হয়না। আজ মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, মিনি বেশ কয়’দিন ধরেই অসুস্থ ছিল। তাছাড়া ব্যস্ততার জন্যে ওরাও সময়মত খাবার দেয়া সহ অন্যান্য কেয়ার নিতে পারছিলো না, তাই শেল্টারে রেখে এসেছে…

 

সময় তার নিজস্ব গতিতে এগোয়। শুধু ভেতরে কিছু মায়া রেখে যায় কেউ কেউ। অনাবশ্যক এই মায়া না জন্মালে কি এমন ক্ষতি হতো ?

মোট পড়েছেনঃ ১,২৪০জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

২৮টি মন্তব্য

  1. নিজের অজান্তেই ভালবাসার স্থান দখল করে নিয়েছে মিনি আপনার মাঝে। ঠিকই বলেছেন আপনি সময়ের স্রোতেই মায়ার এক গভীরতা সৃষ্টি হয়, হোক তা পশু অথবা কোনো দ্বীপদ।
    মানুষের জীবনে ব্যস্ততা এমন ভাবেই প্রভাব ফেলে কখনো কখনো প্রিয় মানুষদের মাঝে দুরত্ব সৃষ্টি করে।
    ভালো লাগলো আপনার অনুভূতি যদিও মিনির অসহায়ত্বের জন্য খারাপ লাগছে।

    ভালো থাকুক সবাই এই কামনা করি।
    ভালো থাকবেন আপু।

  2. আপনার লেখাগুলো সব সময় ভালো লাগে। অসাধারণ কিছু লেখা পাই আপনার কাছ থেকে।

    কিন্তু আপনার লেখার উপরে যে মায়া জন্মে যাচ্ছে আপু। কিভাবে লেখেন এমন লেখা?!

  3. মায়ারও বুঝি ক্যাটাগরি আছে – আবশ্যক কিংবা অনাবশ্যক?
    এমন মায়া জন্মাবে এটাই স্বাভাবিক। নইলে আপনি ভাববেন কি করে, লিখবেন কি করে? আর তা যদি নাই হবে তবে আমরা এ মায়ার রহস্য খুঁজবই বা কি করে?

  4. হৃদয় দাগ লেগে যাওয়া লেখা যে কেমনে লেখে আপনার লেখা পড়লে বোঝা যাই। আমি শব্দ্ব বুনতে পারিনা। খুব মেজাজ খারাপ লাগে।

    সময় তার নিজস্ব গতিতে এগোয়। শুধু ভেতরে কিছু মায়া রেখে যায় কেউ কেউ। অনাবশ্যক এই মায়া না জন্মালে কি এমন ক্ষতি হতো ?

    আমার মায়া টা কম, কিন্তু যা করি দায়িত্ব মনে করি। এই যা।

মন্তব্য করুন