সে অনেকদিন আগের কথা।মানুষ তখনও কবিতা লিখতে শেখেনি। গান গাইতে শিখেছে,কিন্তু সুর ছাড়া। ভেবে অবাক হবার কিছুই নেই,এটা খুব স্বাভাবিক ছিল। তখন সময় থমকে যেত মাঝে মাঝে। কাজগুলো অকাজ হয়ে যেতে খুব একটা সময় নিত না। মানুষ খুব কঠোর পরিশ্রম করত।খাবার কিংবা জামাকাপড়ের জন্য নয়। কোন এক অর্থহীন কারণে কাজ করে চলত সে।
কয়েকদিনের মধ্যে মানুষের হাতে কিছু টাকা জমে গেল। কিছু টাকা বলতে বেশ ভালো অঙ্কের টাকা। খুব ভালো একটা দিনক্ষণ দেখে মানুষ রওনা দিল বাজারের উদ্দেশ্যে। কিছু পছন্দমাফিক বাজার সদাই করতে পারলে মন্দ হয় না।
বাজারে পৌঁছে মানুষের চক্ষু চড়কগাছ। শুরুতেই এক দোকানি এক আকাশভরা স্বপ্ন নিয়ে বসে আছে। রঙধনুর নানান রঙে সে স্বপ্নগুলো নিজেদের জানান দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। মানুষ কৌতুহলী হয়ে দাম জানতে চাইল। দোকানি মানুষের দিকে খুব অবজ্ঞাভরে তাকিয়ে দাম বলল। এত আকাশছোঁয়া দাম হবে তা মানুষ ভাবেনি। সারাজীবন পরিশ্রম করলে হয়ত স্বপ্নগুলো কেনার মত টাকা হবে।আবার নাও হতে পারে। খুব গভীর একটা অতৃপ্তি নিয়ে মানুষ বাজারের ভেতরে চলে গেল।
এক জায়গায় রাশি রাশি সুখ বিক্রি হচ্ছে। মানুষ হিসেব করে দেখল বেশ ভালো পরিমাণ সুখ কেনা যাবে। সারা বাজার ঘুরে দেখার পরিকল্পনা নিয়ে মানুষ সামনে এগিয়ে গেল।এক জায়গায় হাসি বিক্রি হচ্ছিল। নানারকম হাসি মানুষকে মুগ্ধ করে দিল। মানুষ খুব ভালো মত বুঝে গেল তার কি কি কেনা উচিত!
খুব হিসেব করে মানুষ কিছু সুখ আর কিছু হাসি কিনে নিল। টাকা একদম শেষ তখন। সুখ আর হাসি নিয়ে মানুষ বেরিয়ে আসছিল বাজার থেকে।তার চোখ পড়ল এক কোণায় এক দোকানি ভালোবাসা বিক্রি করছে। খুব শান্ত,শুভ্র,নির্মল ভালোবাসা।খুব সহজে পাওয়া যায় না বাজারে। কাছে গিয়ে দেখে ভালোবাসা বেশ সস্তা। টাকাটা খরচ না করলে মানুষ খুব সহজে সবটুকু ভালোবাসা কিনে নিতে পারত। সে যাই হোক,কিছু তো অন্তত কেনা গেছে। এই ভেবে মানুষ নিজের বাড়ির পথ ধরল।
বাড়ি পোঁছে মানুষ আবিস্কার করে সুখ আর হাসির সাথে দড়ি দিয়ে কি যেন বাঁধা। ভালো করে দেখার পর বোঝা গেল দড়ির নাম -সমাস। সুখেটুকুর সাথে দুঃখ আর হাসিটুকুর সাথে কান্না বাঁধা আছে খুব ভালো করে। মানুষ খুব চেষ্টা করেও এই দড়ি ছিঁড়তে পারলো না। শেষমেশ রেখে দিল ঘরের এক কোণায়।
সুখ আর হাসি থাকলেও মানুষের দিনগুলো খারাপ হয়ে উঠলো দুঃখ আর কান্নার কারণে। পালাক্রমে তারা আসলেও মানুষ সহ্য করতে পারছিল না এতকিছু।একদিন তাই সব বেঁধে নিয়ে আবার মানুষ রওনা দিল বাজারের পথে। বাজারে সুখ আর হাসি বিক্রি করে দিল মানুষ। সাথে দুঃখ আর কান্নাও। একজন ভিক্ষুক কিনে নিয়ে গেল সুখটুকু আর একজন কৃষক কিনে নিয়ে গেল হাসিটুকু। একজন কবি সস্তা পেয়ে কিনে নিল দুঃখটুকু আর একজন পতিতা কিনে নিল কান্নাটুকু।
মানুষের বেশ ভালো লাভ হল। প্রায় দ্বিগুণ টাকা হয়ে গেল তার কাছে। খুঁজে খুঁজে সে ভালোবাসা বের করল। সবটুকু ভালোবাসা কিনে নিল সে। খুব খুশি হয়ে এবার সে বাড়ি ফিরে গেল।
মানুষের দিনগুলো রঙিন হয়ে উঠল ভালোবাসার জন্য। খুব শান্তিতে মানুষ দিন কাটাতে শুরু করল। কিন্তু মানুষের কপাল খারাপ। ভালোবাসা খুব যত্ন করে রাখতে হয়। মানুষ অর্থ উপার্জনের অর্থহীন কাজে লিপ্ত তখন। কেবল ভালোবাসা পড়ে রইলো ঘরের এক কোণে। কিছুই করার নেই তখন।
অবহেলায় অবহেলায় ভালোবাসা মলিন হতে শুরু করলো। জমতে শুরু করলো নানান রঙের ধুলো। এক সময় ভালোবাসা আর ভালোবাসা রইলো না।মানুষ তখন খুব বিরক্ত ভালোবাসার উপর। আগের মত তার কাছে আর ভালোবাসা ভালো লাগে না। কি করবে ভেবে পায় না মানুষ! এক সময় আবার সে বাজারের পথে রওনা দিল। এবার একটা হেস্তনেস্ত করেই ছারবে সে। দরকার হলে কিছুই কিনবে না সে। দরকার কি এসবের? ক্লান্তিহীন দীর্ঘ সময় কেটে যাওয়া কি ভালো নয় অনুভূতিহীন হয়ে?
বেশ তবে তাই হোক। বাজারে গিয়ে ভালোবাসা বিক্রি করে দিল মানুষ। দোকানি বিরাস বদনে বের করে দিল টাকা। মানুষ ভাবল সুখ আর হাসিই কিনে নেওয়া যাক। দুঃখ আর কান্না আসলে না হয় একটু সহ্য করে নেওয়া যাবে। অন্তত পচে যাওয়া-গলে যাওয়া ভালোবাসা থেকে সুখ-দুঃখ,হাসি-কান্না অনেক ভালো।
কিন্তু সারা বাজার ঘুরেও মানুষ সুখ আর আনন্দ খুঁজে পেল না। এদিকে বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে ভালোবাসাময় মুহূর্তগুলোর কথা। অনেক মায়া আর আবেগ চলে এসেছিল ভালোবাসার খোঁজে। তারা আর যায়নি,থেকে গিয়েছিল মানুষের কাছে। এসব স্মৃতি মানুষের পিছু পিছু আসছিল। স্মৃতির মলিন মুখ দেখে মানুষের নিজের কাছেও খুব খারাপ লাগছিল।
সারা বাজার ঘুরেও যখন সুখ আর আনন্দ খুঁজে পাওয়া গেল না,তখন মানুষ খুব ক্লান্ত।খুব বেশি ক্লান্ত। সে বসে পড়ে একটা চা’য়ের দোকানে। চা খাওয়া শেষে চা’য়ের বিল দিতে দিতে সে মনস্থির করে ফেলে সে ভালোবাসাই কিনে নিয়ে যাবে আবার। এছাড়া কোন উপায় নাই।
ভালোবাসার দোকানে যেয়ে দেখে ভালোবাসা নেই। দোকানি ভালোবাসা নিয়ে চলে গেছে অন্যকোন বাজারে। এই বাজারে নাকি ভালোবাসার কদর নেই।যেই কিনে নিয়ে যায় সেই ভালোবাসা আবার ফেরত দিয়ে যায়। মাঝখান থেকে ভালোবাসা নষ্ট করে দিয়ে যায়। পড়ে সেই নষ্ট ভালোবাসা আর কেউ কিনতে চায় না।দোকানিকে আবার কষ্ট করে সেই ভালোবাসা ঠিক করতে হয়।
মানুষ তখন পুরোপুরি হতাশ। চারিদিকে অনেক পণ্য। কল্পনা,ইচ্ছে,আবেগ;কোনকিছুই মানুষকে আর আকৃষ্ট করে না।মানুষ আক্রান্ত হয় গভীর অপরাধবোধে। অনেকদিন আগে মানুষের জন্মের সময় এই বোধটুকু মানুষকে দিয়ে দিয়েছিল কেউ একজন।
রাস্তা দিয়ে আর হেঁটে বাড়ি ফেরার মত মানুষের অবস্থা নেই। পথের ধারে সে বসে পড়ে। টাকাগুলো কখন হারিয়ে গেছে তাও টের পায়নি মানুষ। এতটাই অসহায় মানুষ?
ধুলোর মাঝে মানুষ শুয়ে আছে। সারা শরীরে ধুলো। কেউ একজন মানুষের কপালে হাত রাখে। মানুষ চোখ মেলে তাকায়। হাজারটা বলিরেখায় আর দুধসাদা চুলে একজন বৃদ্ধের অবয়ব। মানুষ খুব ক্ষীণ স্বরে জানতে চায়,
-কে তুমি?
-আমি অতীত।
-কি চাও আমার কাছে?আমার কিচ্ছু নেই যে!
-আমি কিছু চাই না,আমি তোমার সাথে থাকবো!
মানুষ একটু ভরসা পায়।প্রশ্ন করে আবার,
-স্মৃতি কোথায়?
-আমি এতকাল তোমার কাছে স্মৃতি হয়ে ছিলাম। আজ আমি আমার নিজের রূপ নিলাম।
মানুষ বুঝে উঠতে পারে না স্মৃতি আর অতীতের মাঝে তফাৎটা কি?
-তুমি আমার সাথে থাকবে অতীত?
অতীত উত্তর দেয়,
-হ্যাঁ,থাকবো!
অতীতের হাত মানুষের কপালে খেলা করে। মানুষ নিশ্চিন্তে চোখে বুজে ভাবতে থাকে অর্থহীন কোনকিছু। একহাতে অতীতের জীর্ণ একহাত চেপে ধরে মানুষ।বড্ড বেশি আশা নিয়ে। এই আশাগুলো মানুষের বাবার দেওয়া। ছোটবেলায় মানুষের কান্না থামানোর জন্য মানুষের বাবা এগুলো মানুষকে দিয়েছিল।
কিন্তু সেই থেকে ভালোবাসা হারিয়ে ফেলা মানুষগুলো অতীত আঁকড়ে বসবাস করছে।
৬টি মন্তব্য
ছাইরাছ হেলাল
সত্যিই জীবন একগুচ্ছ অতীতের সমাহার বৈকি ।
অভিনন্দন এখানে প্রথম লেখার জন্য ।
ক্লান্ত তীর্থ
ধন্যবাদ
দেখি কতদিন টিকতে পারি…
জিসান শা ইকরাম
সোনেলায় স্বাগতম ।
জীবনকে ভালোই উপলব্দি করতে পারেন আপনি
দেখার চোখ্টিও আলাদ
ভিন্ন কিছুটা।
ভালো একটি টপিকস নিয়ে পোষ্ট দিলেন।
লিখুন এখানে নিয়মিত
অন্যের লেখা পড়ে অন্যকে উৎসাহিত করুন।
শুভ কামনা।
ক্লান্ত তীর্থ
ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য,আমার কোথাও বেশিদিন মন টেকে না।দেখি এখানে থাকতে পারি কিনা।
ভালো থাকবেন।
শুন্য শুন্যালয়
চমৎকার একটি লেখা। সুযোগ থাকলে নিশ্চয়ই ট্যাগ করতাম।
স্মৃতি এখন অতীত, বাহ। পুরো লেখাটির জন্যই বিশেষ ধন্যবাদ।
আর সোনেলায় স্বাগতম জানাচ্ছি অবশ্যই। -{@
ক্লান্ত তীর্থ
ধন্যবাদ আপনাকেও…