সে-সময় এ-সময়

নিতাই বাবু ১০ আগস্ট ২০২২, বুধবার, ০৪:২৮:৫৩পূর্বাহ্ন স্মৃতিকথা ৮ মন্তব্য

মার জন্ম ১৯৬৩ সালের জুন মাসে। প্রায় চার বছর বয়সে আমাকে হাতেখড়ি দেয়া হয়। সাড়ে চার বছর বয়সে আমার বড় দাদা আমাকে আমাদের গ্রামেরই একটা প্রাইমারি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেয়।  সে-সময় আমি ভালোমন্দ প্রায় সবকিছুই মোটা-মুটি বুঝতে পারতাম। এখন আমার বয়স ৫৯ বছর অতিক্রম করতে চলছে। আশা করি যদি বেঁচে থাকি ২০২৩ সালের জুন মাসে ৬০ বছরে পা রাখবো। কিন্তু জীবন থেকে এতটি বছর মাইনাস হয়ে গেলেও সে-সময়কার স্মৃতিগুলো কিছুতেই মুছে ফেলতে পারি না। সে-সময়ের স্মৃতিগুলো প্রায় সময়ই মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। মনেও পড়ে সময়-অসময় সকাল আর সন্ধ্যায়। আর যখনই মনে পড়ে, তখনই ভাবতে থাকি, কি ছিল কি হয়েছে। সে-সময়ে কি দেখেছি, আর কি দেখতে হচ্ছে- এ-সময়ে! এগিয়ে যাচ্ছে দেশ, এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ। এতে অনেক তফাত হয়ে যাচ্ছে, সে-সময়ের সাথে এ-সময়। 

সে-সময় যা দেখেছি:

সে-সময়ে এ-সময়ের মতো এতএত লাখোপতি কোটিপতি ছিলো না। সেসময় খুব কম মানুষেরই খেয়ে-দেয়ে হাজার টাকা ক্যাশ থাকতো। যার কাছে হাজার টাকা সবসময় ক্যাশ থাকত, তাকে লোকে বলতো জাহারি। আর এ-সময়ে গ্রাম-শহরের পাড়া-মহল্লায় কোটিপতির অভাব নেই। কিন্তু রাস্তা-ঘাটে ভিখারির সংখ্যা অনেক বেড়েছে বলে মনেহয়।

সে-সময় ভিখারি যে ছিলো না, তা কিন্তু নয়। ছিলো, তাদের বেশভূষা ছিলো ঠিক ভিক্ষুকের মতনই। গায়ে ছেঁড়া জামা। গায়ে থাকা জামা-কাপড়ে কয়েকটা তালী দেয়া থাকতো। ভিক্ষুকদের কাঁধে থাকতো একটা ঝোলা।

গ্রামের ভিক্ষুকদের গৃহস্তরা টাকা-পয়সা দিতো না। ভিক্ষুকদের ঘরে থাকা চাল দিতো। সেই চাল ভিক্ষুকদের ঝুলিতে ভরতো। যদি গৃহস্তরা কিছুই না দিতে পারতো, তাহলে ভিখারি বা ভিখারিনীকে বলত, “আজ তো কিছুই দিতে পারবো না। দুই চুলুম ডাবা (হুক্কা) টেনে যাও”! ভিখারি ভিখারিনী ভিক্ষা না পেয়েও মনের আনন্দে বসে ডাবা বা হুক্কায় চুমো দিয়ে কুড়কুড় করে টানতো।

 

আর এ-সময়ের ভিক্ষুকেরা হলো ডিজিটাল ভিক্ষুক। এরা কারোর কাছ থেকে চাল নেয় না। সে-সময়ের মতো হুক্কাও টানে না। এ-সময়ের ভিক্ষুকরা গোল্ডলিফ, বেনসন সিগারেট টানে। তারা প্রতিদিন নগদ চার থেকে পাঁচশো টাকা ইনকাম করে। এ-সময়ের ভিক্ষুকদের ঘরে হাজার-হাজার টাকা ক্যাশ থাকে। তাই এ-সময়ের ভিক্ষুকদের বেশভূষা দেখে মনেই হয়না যে, সে ভিক্ষুক। কারণ সে ভিক্ষুক হলেও হাজার-হাজার টাকার মালিক।

সে-সময় যাদের হাজার-হাজার টাকা থাকতো, তাদের লোকে বলতো হাজারী। তাদের সন্তানেরাই লেখাপড়া শিখে শিক্ষিত হতো, উচ্চশিক্ষিত হতো, ডাক্তার হতো, ইঞ্জিনিয়ার হতো, বড়সড় ব্যবসায়ী হতো। কিন্তু তা-ও ছিলো হাতেগোণা। সে-সময়ে গ্রামের কোনও যুবক-যুবতী যদি মেট্রিক পাস করতো, তাহলে পাশের গ্রামের লকেরা তাকে একনজর দেখতে আসতো। আর যদি কেউ ডাক্তার অথবা ওকালতি পাশ করতো, তাহলে তো আর খুশির সীমা-ই ছিলো না! সেই খুশি ছড়িয়ে পড়তো আরও দশটা গ্রামে। 

এ-সময়ে ঘরে-ঘরে শিক্ষিত, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার শিক্ষক-শিক্ষিকা, বড়-বড় ব্যবসায়ী, বিমানের পাইলট, বিজ্ঞানী। অথচ সে-সময়কার মতো এতো খুশি আর আনন্দ নেই। এ-সময়ে পাশের বাড়ির কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পিএইচডি ডিগ্রি, বিমানের পাইলট হলেও, কেউ তাকে দেখতে যায় না। 

সে-সময়ে যারা লেখা-পড়া শিখে উচ্চশিক্ষিত হতো, তাদের পরনেই থাকতো কোট-টাই, হাতে থাকতো হাতঘড়ি। আর এ-সময়ে অশিক্ষিত, ধনী-গরিব, চোর-ডাকাত, গুন্ডা-মাস্তান, রাস্তার টোকাইদের পরনে থাকে কোট-টাই, হাতে হাতঘড়ি। 

সে-সময়ে খুব কম মানুষের হাতে থাকতো হাতঘড়ি। কেউ যদি কারোর হাতে হাতঘড়ি দেখতো, তাহলে সেই ঘড়ির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতো। এ-সময়ে ছোট-ছোট শিশুরাও হাতঘড়ি ব্যবহার করে। তাই এ-সময়ে কেউ আর কারোর হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে না। 

সে-সময় শিক্ষিত মানুষের হাতে হাতঘড়ি দেখে অভাবী সংসারের অনেক ছেলে-মেয়েরা হাতঘড়ির পরার স্বপ্ন দেখতো। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতো, নারিকেল গাছের পাতা দিয়ে হাতঘড়ি বানিয়ে। এ-সময়ে হাতঘড়ি আর স্বপ্ন নয়। যারা পথে-ঘাটে ভিক্ষা করে বেড়ায়, তাদের হাতেও হাতঘড়ি দেখা যায়।

সে-সময়ে যাদের টাকা-পয়সা ছিলো, তারাই ভালো-ভালো জামা-কাপড়, ভালো চামড়ার জুতা, চোখে চশমা ব্যবহার করতে পারতো। আর যাদের তেমন টাকা-পয়সা ছিলো না, তাদের পরনে থাকতো ছেঁড়া জামা-কাপড়, আর ছেঁড়া জুতা। যারা টাকার অভাবে ঠিকমতো কাপড়-চোপড় কিনতে পারতো না, তাদের নিত্যদিনের বেশভূষা ছিলো, অন্যরকম।

সেসব অভাবী মানুষরা ইজ্জত ঢেকে রাখার জন্য লেংটি পরে থাকতো। একজোড়া স্যান্ডেলের চাহিদা মেটাতো সুপারি গাছের খোল দিয়ে জুতা বানিয়ে। আর এ-সময়ে ধনী-গরিব সকলেই ভালো-ভালো জামা-কাপড়, বেশি দামের বিদেশি জুতা ব্যবহার করে। 

সে-সময়ে চোখের চশমা তো ছিলো অনেক ব্যয়বহুল ব্যাপার-স্যাপার। সবাই চশমা ব্যবহার করতে পারতো না। অনেকের ভাগ্যে ব্যয়বহুল চশমা জুটতো না। সে-সময় গরিব ছেলে-মেয়েরা চোখের চশমার স্বাদ নারিকেল পাতা দিয়ে বানিয়ে চোখে লাগিয়ে মনের স্বাদ মেটাতো। 

সে-সময়ে সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থা তেমন একটা ভালো ছিলো না। “পিচঢালা এই পথটাকে” শুধু গানের সুরেই শোনা যেতো। মূলত গ্রামের রাস্তা ঘাটগুলো ছিলো মাটির রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে গরুর আর ভাঙাচুরা রিকশা গাড়ি চলতো। সেসব গরুর গাড়ি আর রিকশায় চড়ে কোনও মুসলিম পরিবারের মহিলারা কোথাও যাবার সময় পুরো গরুর গাড়ি আর রিকশাটা কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে দেয়া হতো। তা দেখে বোঝা যেতো যে, কোনও পর্দানশিন মহিলা কোথাও যাচ্ছে। 

সে-সময়ে কোনও কোনও গ্রামে তো রাস্তাই ছিলো না। দূরে কোথাও যেতে হলে নৌকার প্রয়োজন হতো। ওইসব নৌকায়ও ছিলো গরুর গাড়ি আর রিকশার মতো ব্যবস্থা। গ্রাম থেকে কোনও শহরে যেতে হলে রেলগাড়ী অথবা লঞ্চ স্টিমার ছাড়া আর উপায় ছিলো না। আর এ-সময়ে ৬৮ হাজার গ্রামের রাস্তা-ঘাটগুলোই প্রায় পিচঢালা রাস্তা। এসব রাস্তা দিয়ে অটোরিকশা-সহ নামি-দামি যানবাহনও চলাচল করে। বলতে গেলে সে-সময়ের চেয়ে এ-সময়ে অনেক সহজ হয়েছে,সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা। 

সে-সময়ে দূরে থাকা প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগ করতে হলে পোস্ট অফিসের দ্বারস্থ হতে হতো। জরুরি সংবাদ পৌঁছানোর জন্য ছুটে যেতে হতো, নিকটে অথবা দূরে থাকা পোস্ট অফিসে। পোস্ট অফিসে গিয়ে টেলিগ্রাফ করতে হতো। আর এ-সময়ে ঘরে বসেই হাতে থাকা ছোট্ট একটা যন্ত্রের সাহায্যে মুহূর্তেই খবরা-খবর জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। ভিডিও কলে কথা হচ্ছে, সামনা-সামনি বসে। এ-সময়ের এই ছোট্ট যন্ত্রটা হুবহু আধুনিক যুগের একটা কম্পিউটারের মতো।

সে-সময়ে কম্পিউটার অনেকেই চোখে দেখেনি। এর নামও শুনেছে খুব কম মানুষেই। আর এ-সময়ে ঘরে-বাইরে, রাস্তার পাশে, আনাচে-কানাচেতে কম্পিউটারের অভাব নেই। এ-সময়ের এই কম্পিউটার যন্ত্রটা একরকম যাদুকরী যন্ত্র! এ-সময়ের এই যাদুকরী যন্ত্রটাও দেখতে হুবহু সে-সময়ের সাদা-কালো টেলিভিশনের মতো।

সে-সময় সাদাকালো টেলিভিশন ছিলো দশ গ্রামের মধ্যে দুই একটা বাড়িতে। শহরেও খুবই কমসংখ্যক ছিলো। এই টেলিভিশন দেখতে গিয়ে স্থানীয় মাস্তানদের হাতে অনেক মার খেয়েছি। তবুও স্বাদের টেলিভিশন দেখা বাদ দেইনি। অনেকেই টেলিভিশন সামনে বসে দেখার জন্য দুপুরের পরই জায়গা দখলে রাখতো। আর এ-সময়ে ঘরে-ঘরে টেলিভিশন।

তা-ও আবার এলসিডি কালার মনিটর। এ-সময়ে শুধু ঘরে-ঘরেই নয়, রাস্তার পাশে ফুটপাতে থাকা দোকানগুলোতেও এলসিডি অ্যান্ড্রয়েড সিস্টেম বিশাল মনিটরের কালার টেলিভিশন চোখে পড়ে। এ-সময়ে কে কতবড় মনিটরের টেলিভিশন কিনবে, তা নিয়ে চলে একরকম প্রতিযোগিতা। কিন্তু কেউ আর সে-সময়ের মতো রেডিও কিনতে দোকানে যায় না। রেডিও নাকি এখন মার্কেটেও পাওয়া যায় না। 

সে-সময় একটা রেডিওর পেছনে পেছনে অনেকেই সারাদিন পার করে দিয়েছে। স্কুল পড়ুয়া ছেলেরা স্কুল ফাঁকি দিয়ে একটা ওয়ান ব্যান্ড রেডিওর পেছনে ঘুরে বেড়াতো। যার রেডিও থাকতো, সে থাকতো সবার পছন্দের পাত্র। রেডিও ওয়ালার অনেক কদর ছিলো, সমাদর ছিলো। আর এ-সময়ে সেসব রেডিও একটা পুরাতন বাক্স। কারণ এ-সময়ে হাতে-হাতে মোবাইল নামের যন্ত্রটাই একটা রেডিও, একটা টেলিভিশন, একটা সংবাদমাধ্যম, একটা যোগাযোগমাধ্যম, একটা ছবি তোলার ক্যামেরা।

সে-সময়ে ক্যামেরার নাম শুনেছিলাম ঠিকই। কিন্তু খুব কাছে থেকে তা দেখিনি। কেউ কোনও চাকরির আবেদন করলে পাসপোর্ট সাইজের ছবির প্রয়োজন হতো। আবার হাইস্কুলে, কলেজে ভর্তির সময় ছবির প্রয়োজন হতো। সেইসব ছবি থাকতো সাদা-কালো ছবি। ছবি তোলার জন্য যেতে হতো শহরে। যেমন আমাদের নারায়ণগঞ্জ শহরে ছবি ওঠানোর ফটোস্টুডিও ছিলো হাতেগোনা দু’একটা বা তিন-চারটা। 

সে-সময়ে যাদের ছবির প্রয়োজন হতো, তারা নামি-দামি ফটোস্টুডিওতে না গিয়ে চলে যেতো নিমতলা ইমার্জেন্সি ফটোস্টুডিওতে। সেখানে গিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছবি ওটাতো। সেসব ক্যামেরাগুলো ছিলো দেখার মতো। পুরো ক্যামেরাটা কালো কাপড়ে মোড়ানো থাকতো। কিন্তু ক্যামেরার সামনের অংশটা খোলা থাকতো। যাতে ছবি ক্যাচ করা যায়। ক্যামেরার সামনে কাস্টমার দাঁড়িয়ে থাকার পর ক্যামেরাম্যান লম্বা কালো কাপড়ের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বলতো, “রেডি”! ব্যস, হয়ে গেলো। এর কিছুক্ষণ পরই কাস্টমারের হাতে পছন্দের ছবি বুঝিয়ে দেয়া হতো। 

আর এ-সময়ে কেউ ছবি তোলার জন্য বাড়ির সামনে থাকা ফটো স্টুডিওতেও যায় না। একেবারেই যে যায় না, তা-ও কিন্তু নয়। যায়, তা অতি প্রয়োজন মনে করে। যেমন- নিজের মোবাইল থেকে তোলা ছবি প্রিন্ট করে বের করার জন্যই অনেকে ফটোস্টুডিওতে ধর্না দিয়ে থাকে। অনেকে তা-ও যায় না। নিজের ঘরেই প্রিন্টার মেশিন থাকে। সেই প্রিন্টার মেশিন থেকে নিজেদের তোলা ছবি নিজেরাই পছন্দমতো প্রিন্ট করে বের করে নেয়। এতে করে এ-সময়ে ফটোস্টুডিওর কদর কমে গেলো। কদর বা চাহিদা বেড়ে গেলো এ-সময়ের টাচ্ স্ক্রিন অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনের। 

এ-সময়ে এই মোবাইল ফোন যন্ত্রটা আসার পর, সে-সময়ের মতো কেউ আর ছবি ওঠাতে ফটোস্টুডিওতে যায় না। টেলিগ্রাফ করতে পোস্ট অফিসে যায় না। টেলিফোন করতে টেলিফোন অফিসে যায় না। বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল, সরকারি ট্যাক্স পরিশোধ করতে ব্যাংকে যায় না। এ-সময়ে ঘরে বসেই হাতে থাকা ছোট্ট একটা যন্ত্রের সাহায্যে মুহূর্তেই সবকিছুর সমস্যা সমাধান করতে পারছে। কিন্তু আমি এ-সময়েও সে-সময়টাকে কিছুতেই ভুলতে পারছি না। মনে মনে শুধু সে-সময় আর এ-সময় নিয়েই ভেবে মরছি!

ছবি সংগ্রহ নেট থেকে।

৫১৪জন ৪৩১জন
0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ