ছোটবেলা থেকেই কুকুর, বিড়াল, গরু-ছাগল ভালোবেসে আসছি। এই ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত নয়, ঘরের জায়-জিনিস নষ্ট করে ফেলা ইঁদুরও। সময় সময় দুপুরে আর রাতে ভাত খেতে বসলে নিজে খাবার মুখে দেয়ার আগে ঘরের ইঁদুরের জন্য একমুঠো ভাত এক কোণে রেখে দিই। রাতে সবাই ঘুমিয়ে থাকলে ওই একমুঠো ভাত ঘরে উত্তাপ করা ইঁদুরগুলো মিলেমিশে সাবাড় করে ফেলে। আবার রাস্তার একটা কুকুর সামনে আসলে ওকে কিছু খাবার কিনে দিই, কুকুরটা মনের আনন্দে লেজ নেড়ে খায়। একটা বিড়াল সামনে আসলে ওকেও খাওয়াতে মন চায়। কারোর গরু-ছাগল দেখলে সামনে গিয়ে আদর করি, মাথায় হাত বুলিয়ে দিই। কিন্তু দুঃখের কথা হলো মনের ভেতরে এসব পশু-পাখির বিস্তর ভালোবাসা থাকলেও নিজের বাড়ি-ঘর না থাকার কারণে মনের শখ মনে ভেতর রেখেই চলতে হয়। তারপরও মাঝেমাঝে শত ঝামেলা উপেক্ষা করে ভাড়া বাসায় কুকুর-বিড়াল পুষতে থাকি।

এইতো কয়েক বছর আগে ২০১৬ সালে শখের বশে একটা কুকুর ছানা বাসায় নিয়ে গিয়েছিলাম, ওটাকে পুষবো বলে। কুকুর ছানাটির নামও রেখেছিলাম “ধলু”। কিন্তু নিজের ধর্ম হিন্দু বলে কথা। কুকুর ছানাটি বাসায় নেয়ার পর নিজের সহধর্মিণীর সাথে লেগে গেলো কথা কাটাকাটি, আর হট্টগোল! ছিছিছি, রামরাম, হায় ভগবান হায় ভগবান! তারপরও দমে যাইনি। শেষমেশ ভাড়া বাড়ির আরও আরও ভাড়াটিয়াদের নানা কথা সহ্য করতে না পেরে ধলুকে আর নিজের কাছে রাখতে পারিনি। শেষাবধি ৭দিন পর ধলুকে ধলুর মায়ের কাছেই পৌঁছে দিতে হয়েছিল। তারপর ধলু একসময় অনেক বড় হয়ে গেলেও ওর প্রতি আমার ৭ দিনের ভালোবাসা কিছুতেই ধলু ভুলতে পারেনি। দিনরাত ধলুর ডিউটি ছিলো আমার দেখাশোনা। এভাবে কেটে গেলো প্রায় চারবছর।

একদিন আমি আমার এক আত্মীয়ের বাড়ি সপরিবারে বেড়াতে গেলে সেখানে থাকতে হয় ১৫ দিন। এই দিনেক ১৫ দিনই ধলু আমাকে না দেখে খাওয়া-পিনা বাদ দিয়ে শুধু আমার আশায় রাস্তার দিকে চেয়ে থাকতো। এই ১৫ দিন ধলুকে অনেক মানুষে অনেক খাবার কিনে দিয়েছিল। কিন্তু ধলু কারোর কিছুই মুখে দেয়নি। অবশেষে ধলু না খেয়ে থাকতে থাকতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তারপর চিত্তরঞ্জন গুদারা ঘাটের কিছু মাঝি মিলেমিশে ধলুকে শীতলক্ষ্যার মাঝ নদীতে ফেলে দেয়। আমি আত্মীয়ের বাড়ি থেকে এসে ধলুকে দেখতে গুদারা ঘাট গেলে ধলুর মৃত্যুর খবর শুনে রীতিমতো কেঁদেই ফেললাম। তারপর দুচোখের জল ফেলতে ফেলতে বাসায় ফিরে যাই। সেই শোকে আর কখনো কুকুর বিড়াল পুষবো না বলে মনস্থির করি। কিন্তু না পারলাম না। ইদানীং আমাকে একটা বিড়াল ছানার প্রেমে পড়তেই হয়েছে।

গত কয়েক মাস আগে বিড়াল ছানাটি আমার বাসায় ঢোকে। তখন রাত নয়টা। আমিও কর্ম ডিউটি শেষ করে বাসায় ফিরি। বাসায় ফিরে দেখি বাসার সামনে আমার সহধর্মিণী-সহ ভাড়া থাকা বাড়ির আরও আরও মহিলারা জড়ো হয়ে আছে। তা দেখে আমি একটু তাড়াতাড়ি করেই বাসার সামনে গেলাম। বাসার সামনে গিয়ে আমার গিন্নীকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঘটনা কী?’ বললো, “দেহ না বিলাইর বাচ্চাটা খালি আমগো বাসায় ঢুকে। এডারে খেদাইয়া দিলেও যায় না, আবার মে মে কইরা বাসায় ঢুকে। এডারে ধইরা বাড়ির বাইরে দিয়া আহ।” 

আমি আমার সহধর্মিণী বা গিন্নীর কথায় কান না দিয়ে বিড়াল ছানাটিকে কোলে তুলে নিয়ে বাইর থেকে ঘরের ভেতর চলে গেলাম। তা দেখে আমার গিন্নী তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে বললো, “হায় ভগবান, কারে কি কইলাম? হেরে কইলাম বাইরে নিয়া ছাইড়া দিতে, আর হে কোলে তুইলা ঘরে আনছে।” 

আমি গিন্নীর কথার উত্তর না দিয়ে বিড়াল ছানাটিকে বললাম, ‘আমিতো তোমাকেই খুঁজতেছিলাম। গত রাতে আমি তোমারে স্বপ্নে দেখছি।’

আমার এই কথা শুনে আমার ধার্মিক গিন্নী সামনে এসে বললো, “হাচাই কইছ? হাচাই স্বপ্নে দেখছ?” 

বললাম, ‘মিথ্যা কিছু বলিনাই। যা সত্য তা-ই বলছি। ও আজ থেকে আমার ঘরেই থাকবে। যার যার ভাগ্যে যা আছে তা-ই হয়। আমি খাইলে, ও-ও খাবে।’

এসব বলার পর আমার গিন্নী আর কোনকিছু না বলে শুধু বললো, “হাগলে মুতলে আমি ছাপ করতে পারুম না। ওইসব তোমারই করন লাগবো। বুইঝা নিয়েন।” 

বললাম, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। ওর যা যার করা লাগে, আমি নিজেই করবো। এটার জন্য তোমার কিছু ভাবতে হবে না। তুমি নিশ্চিন্তায় থাকতে পার।’

তারপর দিন বিড়াল ছানাটির কি নাম  রাখা যায়, তা নিয়ে গিন্নীর সাথে বৈঠক করলাম। আমি নাম রাখতে চেয়েছিলাম কুকুর ধলুর নামের সাথে মিলিয়ে ‘ধলি’। আমার গিন্নী ভেটো দিয়ে সেই নাম ক্যান্সেল করে গিন্নী  আর আমার বড় নাতিন দুইজনে মিলে নাম রাখলো, ‘পুসি’।

বৈঠকে সেই নামই পাস হলো। সেই থেকে বিড়াল ছানাটি ভাড়া বাড়ির সবার কাছে এখন পুসি নামে বেশ পরিচিত। এর চারদিন পর একদিন আচমকা ‘পুসি’ বিছানায় পায়খানা করে ফেলে। এই পায়খানা নিয়ে ঘটে গেলো তেলেসমাতি কারবার। পায়খানা পরিস্কার করা নিয়ে কথা কাটাকাটি, রাগারাগি, লাফালাফি-সহ আরও অনেককিছু। শেষাবধি আমার ধার্মিকের সহধর্মিণী নিজেই ‘পুসি’র পায়খানা পরিস্কার করে বিছানার চাঁদর ধুয়ে দেয়। কিন্তু গিন্নির মনের ভেতরে থেকে যায় ভীষণ ক্ষোভ। সেই ক্ষোভ কাজে লাগায় পরদিন রাতে। 

ঘটনাটা ঠিক রোজা শুরু হবার দুইমাস আগে। এই দিনগত রাত তখন প্রায় তিনটা। আমি তখন ঘুমে বিভোর। আমি পরম শান্তিতে যখন নাক টেনে ঘুমাচ্ছিলাম, আমার গিন্নী তখন ‘পুসি’কে ঘরের বাইর করতে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ‘পুসি’ তখন আমার পাশেই আমার মতো ঘুমে বিভোর। আমার গিন্নী মায়াদয়া ধূলিসাৎ করে ‘পুসি’কে টেনে নিয়ে ঘরের বাইরে ছেড়ে দিয়ে, ঘরের দরজা বন্ধ করে, বিছানায় এসে নিজের জায়গায় শুয়ে পড়ে। এর কিছুক্ষণ পর ঘরের দরজায় মানুষের দেয়া টোকা। দরজায় টোকা কে-না-কে দিয়ে মা মা বলে ডাকছে। আমার গিন্নী দরজায় টোকার শব্দ আর মা মা ডাক শুনতে পেয়ে হতভম্ব হয়ে ঘরের ভেতর থেকে বলছে, “এই তুমি কে? কিল্লাইগা মা মা কইয়া ডাকতাছ?”

ঘরের বাইর থেকে উত্তর এলো, ‘মা আমি তপন (মানে আমার মৃত ছেলে তপন)। বিড়ালডা কানতাছে। ওরে ঘরে লইয়া যাও।’ আমার গিন্নী নিজের মৃত ছেলের কণ্ঠস্বর শুনে আবারও জিজ্ঞেস করলো, “কেডা তুমি?” আবার উত্তর এলো, ‘মা আমি তপন। বিলাইর বাচ্চাডা ঘরে নিয়া যাও। ও খুব কানতাছে।’

আমার গিন্নী তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে ঘরের দরজা খুলে কাউকে দেখতে পেলো না। দেখল পুসি দরজার সামনে বসে বসে মে মে করছে। পুসি মে মে করতে করতে এক লাপে ঘরে ঢুকে গেলে আমার গিন্নী ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর গিন্নী কাঁপতে কাঁপতে আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। আমি ঘুম থেকে জেগে দেখি আমার গিন্নী থরথর করে কাঁপছে! জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি হয়েছে? কাঁপছো কেন?’

আমার গিন্নী কাঁপতে কাঁপতেই ঘটনার বিবরণ খুলে বললো। আমি শুনে বললাম, ‘তাহলে তুমি পুসি’কে ঘরের বাইরে এতো রাতে ছাড়লে কেন?’ প্রশ্নের উত্তর আর মিললো না। এরপর থেকে আমার গিন্নী অন্তত পুসি’কে নিয়ে আর কোনপ্রকার অভিযোগ করেনি। বরং সকাল-সন্ধ্যা পুসি’কে নিজের কোলে-কাঁখেই রাখে। সময়মতো খাওয়ায়, ঘুম পাড়ায়, আদরযত্নও ঠিকঠাকমত করতে থাকে। 

এ-র মাঝে একদিন আমার বড় নাতিন পুসি’কে নিয়ে খেলতে থাকে। হঠাৎ মনেহয় পুসি’র অজান্তেই পুসি’র পায়ের নখের আঁচড় নাতিনের হাতে লাগে। সাথে সাথে নাতিনের হাত থেকে আঁচড়ের স্থান থেকে রক্ত বের হতে থাকে। আমি তখন আমার কর্ম ডিউটিতে ব্যস্ত! বাসায় এসে দেখি নাতিনের হাতের অবস্থা। গিন্নীও রেগে-মেগে অস্থির হয়ে বলতে লাগলো, “আমার নাতিনের যদি কিছু হয়, তাহলে বুঝে নিয়েন। তাড়াতাড়ি নাতিনকে নিয়ে হাসপাতালে যাও।  জলাতঙ্ক ইনজেকশন দিয়া নিয়া আসো”। গিন্নীর রাগারাগি আমার আর সহ্য হলো না। সাথে সাথে ডাক্তারের পরামর্শ নিলাম। ডাক্তার বললো, ‘কিছুই হবে না ঠিক, কিন্তু মন থেকে তো আর ভয় দূর হবে না, দাদা। তাই হাসপাতাল থেকে জলাতঙ্ক রোগের ইনজেকশন দিয়ে আনেন।

তা-ই হলো। প্রায় ৬০০ টাকার মতো খরচ হলো। তারপর আর যাতে কেউ পুসি’র আঁচড় কামড়ের শিকার হয়ে জলাতঙ্ক আর ধনুষ্টংকার রোগ নিয়ে চিন্তিত না করে, তারজন্য পুসি’কে উপজেলা পশু হাসপাতাল থেকে জলাতঙ্ক, ধনুষ্টংকার প্রতিরোধক ইনজেকশন দিয়ে আনি। 

এখন পুসি আগের চেয়ে অনেক বড় হয়েছে। পুসি এখন ঘরে মলমূত্রও ত্যাগ করে না। কোথায় করে তা-ও কেউ দেখে না। আমি দু-এক দিন ওর মলমূত্র ত্যাগ করার দৃশ্য দেখেছিলাম। এখন আর আমি নিজেও দেখি না। কিন্তু ওর মলমূত্র ত্যাগ করার সময় হলে ঘরের সবাই টের পেয়ে থাকি। ঘর বন্ধ থাকলে পুসি ঘরের বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে মে মে করতে থাকে। দরজা খুলে দিলেই দে দৌড়। কাজ সেরে আবার নিজে নিজেই ঘরে ফিরে আসে।

আমি দুপুরের বাসায় গিয়ে যদি দেখি যে, পুসি ঘরে নেই। তারপর আমি পুসি পুসি বলে ডাকলেই পুসি যেখানেই থাকুক-না-কেন, আমার সামনে এসে হাজির হয়। রাতে পুসি আমার সাথেই ঘুমিয়ে থাকে। আমাকে ছাড়া অন্যকোনো জায়গায় পুসি রাতে ঘুমায় না। পুসি আমাদের মতো দিনে তিন-চার বেলা খায়। ওর খাবার হলো, মুরগির আঁতুড়ি-ভুঁজড়ি। পুসি’র জন্য এগুলো আমাকেই সংগ্রহ করে রাখতে হয়। আমি ডিউটি থেকে বাসায় আসতে পরিচিত মুরগির দোকান থেকে কেজি খানেক আঁতুড়ি নিয়ে আসি। এরপর ওই আঁতুড়িগুলো কেচি দিয়ে  কুচিকুচি করে কেটে ফেলি। তারপর ঐগুলা ভালো করে ধুয়ে হালকা পানি আর অল্প লবণ দিয়ে সিদ্ধ করি। সিদ্ধ হয়ে গেলে পানি ছেঁকে কাটা আঁতুড়িগুলো ঠাণ্ডা করে পুসিকেও কিছু খেতে দিই, বাদবাকি সিদ্ধ আঁতুড়িগুলো ফ্রিজে রেখে দিই। তারপর থেকে পুসি’কে দিনে তিন-চারবার ওই আঁতুড়ি-ভুঁজড়িগোলো খেতে দিলে পুসি মনের আনন্দে লেজ নেড়ে পেটভরে খায়। তাছাড়াও ঘরে রান্না করা মাছ মাংস তো মাঝেমধ্যে থাকেই।

বর্তমানে এভাবেই চলছে পুসি’র দৈনন্দিন জীবন। পুসি’র বিরুদ্ধে এখন আর ঘরে বাইরে কারোর কোনও অভিযোগ নেই। পুসি এখন আমাদের ভাড়া বাড়ি-সহ আশেপাশে আরও বাড়ির সব ছেলে-বুড়োদের আদরের পুসি। যে-না-কেউ এখন পুসি’কে দেখলে কোলে নিতে চায়। আর বাড়ির ছোটছোট ছেলে-মেয়েদের তো খেলার বস্তু হয়ে উঠেছে, আমাদের আদরের পুসি। পুসি এখন মাঝেমধ্যে দু’একটা শিকারও করে দেখাচ্ছে।

ইদানীং পরপর দুটো ইঁদুরের বাচ্চা শিকার করে ফেলেছে। পুসি’র এই শিকার নিয়ে ঘরের গিন্নীর মাঝে একরকম তৎপরতাও দেখা দিয়েছে। এর কারণ হলো, পুসি’র আগমনের আগে ঘরে বাস করা ইঁদুরগুলোকে সকাল-বিকাল খাবার দিয়ে রাখতো। এর ফলস্বরূপ: ঘরে উৎপাত করা ইঁদুরগুলো ঘরের কোনও কাপড়চোপড় কেটে বিনাশ করতো না। এখন পুসি ঘরে থাকার কারণে ঘরের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা ইঁদুরগুলো কোথায় যেন গা-ঢাকা দিয়েছে। তা নিয়ে গিন্নী অনেক সময় আক্ষেপ করে বলে, “আগে সবসময় ইন্দুর দেখা যাইত। অহনে পুসি আহনে ইন্দুর আর চোখে পড়ে না। এতগুলা ইন্দুর কই গেলোগা?” আবার মাঝেমধ্যে পুসি’কে কোলে নিয়ে গিন্নী বলে, “পুসি ইন্দুরগুলা মারিস না। এগুলা ঘরের ক্ষতি করে না।”

গিন্নীর কথায় পুসি কি বুঝল আর কি না বুঝল জানিনা। তবে এপর্যন্ত আর ঘরের ইঁদুর পুসি’কে মারতে ধরতে দেখিনি। এমনিতেই পুসি অনেক কথাই বুঝে। যেমন কারোর ঘরে যেতে বারণ করলে পুসি আর সে ঘরে যায় না। আবার ধমক দিলে চুপ করে বসে থাকে। চোখ বড় করে ধমক দিলে দৌড়ে ঘরের খাটের নিচে গিয়ে পালায়। সময়-সময় পুসি আহ্লাদ করে গিন্নীর হাতে কামড় দিতে চাইলে, গিন্নী আস্তে করে থাপ্পড় মারলে দ্বিতীয়বার কামড়াতে চায় না। বাড়ির কাউকেও আঁচড় কামড় দেয় না। তবে ঘরে বাইরে দৌড়াদৌড়ি নাচানাচি একটু বেশি করে। সময়-সময় ঘরের তাকে থাকা ডিব্বা-ডাব্বি ফেলে দিয়ে খেলতে থাকে। তা দেখে গিন্নী পুসি’কে ধমক দেয়, মারতেও চায়। কিন্তু পুসি যত দুষ্টুমিই করে থাকুক-না-কেন পুসি-কে মারা যাবে না। এটা আমার বারণ আছে। এর কারণ হলো, পুসি হলো বিড়াল। আর বিড়াল হলো মা ষষ্ঠী দেবীর বাহন, তাই।

পুসি ঘরে আসার পর গিন্নীর ছিছিছি, রাম রাম, হায় ভগবান হায় ভগবান শব্দ শুনে আমি রীতিমতো একটু বিরক্ত হয়েছিলাম। তারপর নেট ঘেঁটে বিড়াল বিষয়ে একরকম তথ্য জোগাড় করলাম। তথ্য সংগ্রহ করে আমার গিন্নীর ছিছিছি, রাম রাম, হায় ভগবান হায় ভগবান বন্ধ করার জন্য মা ষষ্ঠী দেবী ও ষষ্ঠী দেবীর বাহন বিড়াল নিয়ে একটা কাহিনী আমার গিন্নীকে শোনালাম।

ষষ্ঠীদেবী ও ষষ্ঠী দেবীর বিড়াল কাহিনী নিম্নরূপ:                                                       

 ❝হিন্দু ঘরের মায়েদের বড়ো প্রিয় দেবী হলো,  মা ষষ্ঠীদেবী। তিনি সারা বছর ঘরের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের ভালো রাখেন। আর সেজন্য মায়েদের কাছে মা ষষ্ঠীর এতো কদর। শিশু জন্মানোর ষষ্ঠ দিনে মা ষষ্ঠীর পুজোর আয়োজন করা হয় গৃহস্থ বাড়িতে। পুজোর উপচারের মধ্যে আবশ্যিকভাবে থাকে দোয়াত-কলম। দিনের বেলায় পুরোহিত ষষ্ঠীপুজো করে চলে যান। আর এদিন স্বয়ং বিধাতা পুরুষ নাকি রাতের বেলায় অলক্ষ্যে এসে শিশুর কপালে লিখে দিয়ে যান তার ভূত-ভবিষ্যৎ। এই মা ষষ্ঠীর বাহন হলো বিড়াল। ঘর থেকে বিড়াল যতই মাছ চুরি করে খেয়ে যাক, বিড়াল মারা যাবে না। কারণ, মা ষষ্ঠীর কোপ পড়বে। এতএব বিড়াল পাতের মাছ খেয়ে যাক্, অসুবিধে নেই।❞

বিড়াল নিয়ে আরেকটি বিধিনিষেধ আছে। বিড়াল রাস্তা পার হলে আর যাওয়া যাবে না, যতক্ষণ না কেউ এসে সে রাস্তা পেরোচ্ছে। কাজেই ট্র‍্যাফিক পুলিশ কোনো গাড়িকে থামাতে না পারলেও বিড়াল কিন্তু থামিয়ে দেয়।

এসবের জন্যই বিড়াল হয়ে গেছে মা ষষ্ঠীর বাহন‌। তাই হিন্দুদের বিশ্বাস বিড়াল গৃহস্থের বাড়ি বা ঘরে যতই উৎপাত করুক-না-কেন, বিড়ালকে আঘাত করা যাবে না। আর কোনও হিন্দু গৃহস্থের বাড়ি পালিত বিড়াল যদি মারা যায়, তাহলে সেই মৃত বিড়াল সাধু-বৈষ্ণব মারা গেলে যেভাবে সমাধিস্থ করা হয়, সেইভাবেই বিড়ালকে সমাধিস্থ বা কবরস্থ করতে হবে। এটা মা ষষ্ঠী দেবীর বাহন বিড়াল, তাই।

হিন্দু ধর্মে জামাই ষষ্ঠী প্রসঙ্গ:                         

❝জামাই ষষ্ঠী প্রসঙ্গে একটি কাহিনিও প্রচলিত আছে, হিন্দু সমাজে। কথিত রয়েছে, এক গৃহবধূ স্বামী গৃহে নিজে মাছ চুরি করে খেয়ে বার বার দোষ দিতেন এক কালো বিড়ালের ওপর। এর প্রতিশোধ নিতে ছোট বউয়ের বাচ্চা হলেই ওই কালো বিড়ালটি তার সন্তান তুলে লুকিয়ে মা ষষ্ঠীর কাছে দিয়ে আসে। গৃহবধূ তা জানতে পেরে ষষ্ঠী দেবীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেন, সে আর কখনো বিড়ালকে মিথ্যা অপবাদ দিবেন না। গৃহবধূর সেই প্রার্থনা মা ষষ্ঠীদেবী শুনলেন। প্রার্থনা শুনে মা ষষ্ঠীদেবী দুই শর্তে তাকে ক্ষমা করবেন বলে আশ্বাস দেন।

প্রথম শর্ত হলো, “শুক্ল ষষ্ঠীর দিনে তার পুজো করার আদেশ দেন তিনি।”

দ্বিতীয় শর্ত হলো, “বিড়ালকে তার বাহন হিসেবে সম্মান জানানোর কথা বলেন।” 

তারপর ষষ্ঠী দেবীর আরাধনা শুরু করেন ওই গৃহবধূ৷ দেবী তুষ্ট হলে গহীন বনেই সে নিজের সন্তানকে ফিরে পায়। এই জন্যই ষষ্ঠী দেবীর অপর নাম হলো, “অরণ্যষষ্ঠী।”

অন্য দিকে মাছ চুরি করে খাওয়ার জন্য শ্বশুর-শাশুড়ি ওই গৃহবধূর পিতৃগৃহে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। তখন মেয়েকে দেখার জন্য ব্যাকুল মা-বাবা ষষ্ঠীপুজোর দিনে জামাইকে নিমন্ত্রণ জানান। ষষ্ঠী পুজোর দিনে স্বামীর সঙ্গে নিজের বাপের বাড়ি যান ওই মেয়েটি। তার পর থেকেই ষষ্ঠীপুজো পরিণত হয় জামাই ষষ্ঠীতে❞।

 

৫২২জন ৪২৯জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ