রাতের চেয়েও অন্ধকার

রিমি রুম্মান ১৪ নভেম্বর ২০১৫, শনিবার, ১২:৩৪:২৯অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২০ মন্তব্য

নাহার আমার এদেশে পরিচয় হওয়া বন্ধু। যে কোন উপলক্ষকে অজুহাত করে দামী গহনা কিংবা শাড়ি কেনে সে। আমাকে দেখায় খুব উৎসাহ আর উচ্ছ্বাস নিয়েই। আমি আগ্রহ পাই না। দাম দিয়ে কেনা পোশাক কিংবা গহনা কেন যেন আমায় টানে না। মনে মনে হিসাব করি। ডলারকে টাকায় রূপান্তর করি ! কেউ কেউ ছোটলোক ভাবে। কিন্তু আমি ভাবি, এই টাকা দেশে ময়নার মা’কে দিলে ডাক্তার দেখাতে পারবে, ওষুধ কিনতে পারবে। গতবার বলেছিল, কাশতে কাশতে নাকি বুক ব্যথা হয়ে যায়। ঘুমাতে পারেনা। কখনো মনে হয় রহমতের বাপকে দিলে সে হয়তো হাঁপানি নিয়ে আর রিক্সা চালাতে হবে না। একটা রিক্সা কিনে ভাড়া দিয়েও সংসার চালাতে পারবে। আবার কখনো পাড়ার সেই চাচার কথা মনে হয়। বাবার কাছে শুনেছিলাম স্ট্রোক করে মারা যাবার দুইদিন আগে খুব বিষণ্ণ ছিল, মেয়ের এস এস সি পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে পারেনি বলে।

একদিন বলেই ফেলি, “এভাবে অপচয় করো না, নাহার”। চোখে মুখে ক্ষোভ ফুটে উঠলো। বলল, দেশে তাঁর শ্বশুরবাড়ির সবাই সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও স্বামী লুকিয়ে টাকা পাঠায়। সে টাকায় স্বামী’র অন্য ভাইয়ের স্ত্রী’রা, পরিবারের মানুষজনরা দামী পোশাক, এটা সেটা কিনে। আনন্দ ফুর্তি করে। তবে আমি কেন বঞ্চিত হবো ? জিজ্ঞাসু দৃষ্টি তাঁর। আমি বুঝি, এটা জেদ। কখনো কখনো জেদের কাছে হার মানে নাহারের স্বামী। আবার কখনো হার মানতে চায় না। এতে নাহারের জেদ আরও বাড়ে। স্বামীর কাছে টাকা চাইতে যেন না হয়, তাই চাকুরী নেয়। সকাল সন্ধ্যা জব করে। এদিকে বাধ্য হয়ে স্বামী রাতভর কাজ শেষে বাচ্চাদের স্কুলে আনা নেয়া করে। মাঝে একটু ঘুমিয়ে নেয়। বিকেলে আবার কাজে যায়। সন্ধ্যায় নাহারকে ফোন করলে বাচ্চাদের সাথে চেঁচামেচির শব্দ শুনি। কথা হয়না আর আগের মত……

ব্যস্ততার মাঝে বেশ ক’বছর আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। একদিন ছেলেকে নিয়ে কোচিং এ গেলে নাহারের সাথে দেখা। ভীষণ দিশেহারা। বাচ্চা দুটি স্কুলে খুব খারাপ করছে। কোচিং এ দিয়েও কাজ হচ্ছে না। কিছুই নাকি বুঝে না। কোচিং সেন্টারগুলো তো আর একেবারে হাতে ধরে শেখায় না। এক কোচিং থেকে অন্য কোচিং সেন্টার বদল করেও কাজ হচ্ছে না। আমি স্পষ্টই বুঝতে পারি, যে সময়ে যা শেখার কথা ছিল বাচ্চা দুটি তা শিখেনি। মাঝে অনেক গ্যাপ পড়ে গেছে, বিধায় এতোটা সময় পেরিয়ে তা আর কভার করতে পারছে না। যতটুকু ক্ষতি হবার হয়ে গেছে।

জানিনা, বাবা-মা’য়ের বেহিসাবি জেদাজেদি’র স্বীকার বাচ্চা দু’টির ভবিষ্যত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। তাঁদের জন্যে শুভকামনা।

আরেকজন রেহানা ভাবী বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়েছেন জেনে অবাক হলাম। কেননা এই সময়ে নিউইয়র্কের স্কুলগুলোতে পুরো দমে ক্লাস চলছে। তিনি তো অসময়ে দেশে যাবার কথা নয়। অজানা আশংকা ভেতরে। ফোন নাম্বার জোগাড় করে ফোন করি দেশে। ফোনের ওই প্রান্তে কাঁদছেন রেহানা ভাবী। তাঁদের একমাত্র ছেলেটি ড্রাগ এডিক্টেড জানার পর উদ্ভ্রান্তের মত ছুটে গেছেন দেশে। তাঁদের ধারনা, বন্ধুদের সঙ্গ থেকে কিছুদিন দূরে রাখা গেলে হয়তো ছেলেটি ভাল হয়ে উঠবে। বাবা-মা’য়ের ডলারের পিছনে নিরন্তর ছুটে চলার সময়টুকুতে একাকি ছেলেটি একটু একটু করে ভুল পথে গিয়েছে, ভুল বন্ধুদের সাথে মিশেছে।

সময় থাকতে আমাদের সন্তানদের দিকে মনোযোগী হওয়া উচিত নয় কি ?

একজন ঐশী আমাদের সকলের জন্যে সতর্কবার্তা।

৪০৭জন ৪০৭জন
0 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ