বীরাঙ্গনা (২য় পর্ব)

মনির হোসেন মমি ৪ অক্টোবর ২০১৪, শনিবার, ১০:৫৪:২১অপরাহ্ন গল্প, মুক্তিযুদ্ধ ১২ মন্তব্য
লজ্জায় মুখ ঢেকে আছেন একজন বীরাঙ্গনা।এ লজ্জা যেন ধর্ষিত বাংলাদেশের স্বাধীনত্তোর প্রজন্মের । ছবিঃ নাইব উদ্দীন আহমেদ।

পাকিস্হানী কুলাঙ্গার ফুলীর চতুর দিকে ঘুড়ে ঘুড়ে দেখতে লাগল।মুখে রাখা চুরুটের সিগারেটের ধোয়া মেয়েটির নাকে স্পর্শ করতে  রাগ যেন প্রসমিত করতে পারলেন না।

-বদমাশ কোথাকার তোর কি মা বোন নেই।

-কিয়া বাতায়ে,উর্ধুমে বাতাও হাম ভাঙ্গা নেহি জানতে….

-ভাঙ্গা নয় বাংলা ভাষা যে ভাষা প্রতিষ্টিত হয়েছিল বহু রক্তের বিনিময়ে সে ভাষাকে সম্মান জানা।

পাকি উচ্চ স্বরে হাসতে লাগলো সাথে সহযোগি পাকিরাও।পরিস্হিতি খারাপ দেখে দল নেতা কর জোরে ক্ষমা চেয়ে ফুলীকে নিয়ে স্হান ত্যাগে প্রস্তুতে এক পাকি ফুলীর হাত চেপে ধরল দল নেতা সহ বাকিদের ধৈর্য্যের বাধ যেন ভেঙ্গে গেল গায়কী পোষাকের আড়ালে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র যেন হঠাৎ কথা বলে উঠে।নিমিশেই পাচ পাকি ফিনিস।গ্রাম বাসী সাথে সাথে রক্তের দাগ মুছতে ব্যাস্ত আর কয়েক জন লাশ গুলোকে পাশের ডোবায় ফেলে দিলো মাছের আহার করে।

এ ভাবেই কাটে তার যুদ্ধের ভয়ংকর দিনগুলো।ফুলীরা কখনও পাড়ায় পাড়ায় গান গেয়ে কখনও গানের মজমা জমিয়ে মুক্তি যোদ্ধাদের দর্শক বানিয়ে যুদ্ধের ম্যাসেজ আদান প্রদান করেন।

সে দিন আকাশ ছিল মেঘলা ঝির ঝির বৃষ্টি ঝড়ছিল মাঝ রাতে হঠাৎ ফুলীর স্বামী সহ আরো চার পাচ জন যোদ্ধা আহত হয়ে দরজায় কড়া নাড়েন।ঘরের ভিতর থেকে শব্দ আসে।

-কে,কে ওখানে।

ফিস ফিস শব্দ বেড়িয়ে আসেন ফুলীর স্বামীর মুখ দিয়ে।দরজার করিডোরে আহত সাবাই হেলে পড়েন।দরজা খুলে ফুলী বৃদ্ধ মা বাবা ছোট ভাইটি সহ আহতদের ধরা ধরি করে ভিতরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন।ফুলীর স্বামীর বুকের লাঞ্চ বরাবর পাকিদের গুলিতে জখম হন বাকীরা মোটামোটি কারো পায়ে কারো বা হাতে গুলি লাগে।তৎক্ষনাত ফুলী প্রাথমিক চিকিৎসার বক্সটি খুলে স্বামীর সেবা ব্রতে ব্যাস্ত, জখমে রক্ত ক্ষরনে ফুলীর কুলে মাথা রেখে পৃথিবী থেকে চির বিদায় নেন, স্বার্থক জনম তার যুদ্ধে প্রায় কয়েক ডজন পাকিদের হত্যা করতে পেরেছিল।

দেশীয় রাজাকার যোগ সাজসে মাঝ রাতে পাকিরা ফুলীদের বাড়ী আক্রমন করেন।অপ্রস্তুত ফুলী বাহিরে বুটের শব্দ পেয়ে আহতদের ঘরের পিছনের দরজা দিয়ে একটি বাশ বাগানে লুকিয়ে মা বাবাকে নিয়ে ঘর হতে বের হতেই এক পাকির গুলিতে বৃদ্ধ মা বাবার মৃত্যু হয়।ছোট ভাইটিকে হাত পা বেধে পাশের একটি ছোট্র ডোবায় গুলি করে ফেলে দেয়।এক মাত্র ফুলী যুবতীর কামার্তু লোভী পাকিদের চোখঁ পড়ে, কাধে তুলে নেন এক স্ব-দেশী রাজাকার।

মুক্ত মনা একটি ব্লগ হতে জানা যায় ধর্ষিত বাঙ্গালী রমণীদের পিছনের কারন সেখানে যা বলা হয়েছে তাতে চোখ বুলাতে গা সিম সিম করে শরীরের সমস্ত পশম দাড়িয়ে যায় মনের আবেগ যেন আন কট্রল হয়ে পড়ে….

পাকিস্তান আর্মি যে পরিকল্পিতভাবে বাঙালি মহিলা এবং মেয়েদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০০২ সালের মার্চ মাসের বাইশ তারিখে ডন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি আর্টিকেল থেকে। যেখানে গণধর্ষণের বিষয়ে ইয়াহিয়া খানের মন্তব্যকে কোট করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট হিসাবে ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালে সরাসরি বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য পাকিস্তান আর্মিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। যশোরে ছোট্ট একদল সাংবাদিকের সাথে কথা বলার সময় তিনি এয়ারপোর্টের কাছে জড়ো হওয়া একদল বাঙালির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলেন যে, ‘আগে এদেরকে মুসলমান বানাও’। এই উক্তির তাৎপর্য সীমাহীন। এর অর্থ হচ্ছে যে, উচ্চ পর্যায়ের সামরিক অফিসারদের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধ মূল ছিল যে বাঙালিরা খাঁটি মুসলমান নয়। এই ধারণার সাথে আরো দুটো স্টেরিওটাইপ ধারণাও যুক্ত ছিল। বাঙালিরা দেশপ্রেমিক পাকিস্তানী নয় এবং তারা হিন্দু ভারতের সাথে অনেক বেশি ঘনিষ্ট।

ইয়াহিয়া খানের এই উক্তিতে উৎসাহিত হয়ে পাকিস্তান আর্মি বাঙালিদেরকে মুসলমান বানানোর সুযোগ লুফে নেয়। আর এর জন্য সহজ রাস্তা ছিল বাঙালি মেয়েদেরকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে তাদেরকে দিয়ে সাচ্চা মুসলমান বাচ্চা পয়দা করানো। পাকিস্তানী সৈন্য এবং তার এদেশীয় দোসররা শুধু যত্র তত্র ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি। জোর করে মেয়েদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ধর্ষণ ক্যাম্পে। দিনের পর দিন আটকে রেখে হররোজ ধর্ষণ করা হয়েছে তাদের। পালাতে যাতে না পারে সেজন্য শাড়ী খুলে নগ্ন করে রাখা হতো তাদেরকে। সিলিং এ ঝুলে আত্মহত্যা যাতে করতে না পারে তার জন্য চুল কেটে রাখা হতো তাদের।

ফুলীকে বদ্ধ একটি অন্ধকার ঘরে রাখা হয়, অচেতন ফুলী যেন জীবন্ত লাশ।এরই মাঝে সে কত বার যে কুলাঙ্গার পাকি অফিসারদের কামনার লালসা মিটাতে হয়েছিল তা তার অজানা।ফুলীর দীঘল কালো কেশ বাঙ্গালী রমণীদের পরিচয় বহন করা তা যেন পশ্চিমা ধাচের ভব কাটিং।এমন নিষ্ঠুরতার ইতিহাস যেন আরশ কেপে উঠে বীরাঙ্গনা রমণীদের অসহ্য যন্ত্রনার আত্ত্বচিৎকারে।

কেটে যায় সাত আট মাস অন্ধাকার জীবন অন্তকার সেলে বসবাসে পরিচয় হয় আরো আটকে পড়া বীরাঙ্গনাদের সাথে।এরা হলেন……

নাজমা বেগম:

গ্রাম মানিক কান্দি, মুকশেদপুর, জেলা গোপালগঞ্জ,সাইবার বীরাঙ্গনা এবং মুক্তিযোদ্ধা।নাজমা এবং মোশারফ বেশ কয়েক বছর পূর্বে মিরপুর চিড়িয়াখানা সংলগ্ন বস্তিতে বাস করত।সে স্থানীয় একটি বিক্রয়িক এবং তিনি দৈনিক ত্রিশ টাকা আয় জন্য একটি বস্ত্র কারখানায় কাজ করে।তারা তিন পুত্র ও এক মেয়ে আছে.

হালিমা বেগম:

গ্রাম ইন্দ্র, বাঘ হাড়,জেলা যশোর।

স্বাধীনচেতা জঙ্গী হালিমা এপ্রিলে রাজাকার দ্বারা আটক হয়ে প্রায় ছয় মাস পাকিদের নির্যাতিত ক্যাম্পে অতিবাহিত করেন।সে যুদ্ধের প্রশিক্ষন প্রাপ্ত এবং পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে মুক্তিযোদ্ধা কোটা হিসাবে স্থানীয় হাসপাতালে একটি আয়া হিসাবে কাজ পেয়েছিলেন।

ফাতেমা খাতুন:

গ্রাম ইন্দ্র,জেলা যশোর

ধর্ষিতা ফাতেমা পাক ক্যাম্পেই সন্তান প্রসবন করেন।

জুলেখা খাতুন:

গ্রাম কামালাগর, জেলা সাতক্ষীরা

জুলেখা এবং তার স্বামী আব্দুল কাদের তাদের নয় বছরের শিশু সহ একটি ছোট কুটির মধ্যে বসবাস করতেন।আব্দুল কাদের যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায়।তার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর আন্দোলন সম্পর্কে গেরিলা যোদ্ধাদের জ্ঞাপক এবং বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

নাম না মনে আসা আরো অনেকে ছিল।বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে গণ ধর্ষণের শিকার হয়েছে বাঙালি রমণীরা। ঠিক কতজন যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। বীণা ডি’কস্টা তার “Bangladesh’s erase past’ প্রবন্ধে জানাচ্ছেন যে, সরকারী হিসাব অনুযায়ী একাত্তরে ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিল দুই লক্ষ নারীকে। একটি ইটালিয়ান মেডিক্যাল সার্ভেতে ধর্ষণের শিকার নারীর সংখ্যা বলা হয়েছে চল্লিশ হাজার। লন্ডন ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল প্যারেন্ট হোল ফেডারেসনস(IPPF) এই সংখ্যাকে বলেছে দুই লাখ। অন্যদিকে যুদ্ধ শিশুদের ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সমাজকর্মী ডঃ জিওফ্রে ডেভিসের মতে এই সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি। সুজান ব্রাউনমিলারও ধর্ষিতার সংখ্যা চার লাখ বলে উল্লেখ করেছেন।

বীরাঙ্গনা ১ম পর্ব

সহযোগিতায়:অন লাইন

৪৮২জন ৪৮৪জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ