সবাই জানে, ইসলাম ধর্মে চার বিয়ের অনুমতি আছে ও স্ত্রী প্রহারের অনুমতিও আছে – এই অনুমতি অনেক পুরুষদের লালসা মেটানোর হাতিয়ার হিসাবে যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু কোন শান্তির ধর্মে এরুপ অশান্তির অনুমতি দেয়া কতখানি যৌক্তিক??? শান্তির ধর্ম দাবি করলে দাবিদারের দায়িত্ব তা প্রমান করে দেখানো। চার বিয়ে ও স্ত্রী প্রহার শান্তির হতে পারে এমন দাবি পুরুষ নয়, নারীর করতে হবে। কিন্তু কোন নারী আদৌ কি পুরুষের এই আচরণ পছন্দ করে?

 

এবার আসি বিস্তারিত আলোচনায়- যেকোন মত, নীতি জনপ্রিয় হলে কিছু সুযোগ সন্ধানী মানুষ সেই মত ও পথের পথিক সেজে জনপ্রিয়তা কে পুজি করে কিছু সুবিধা নেয়। আর চার বিয়ের আইন সেই সব সুযোগ সন্ধানীদের দ্বারা রচিত আইন। নবীর জীবন ঘাঁটলে আমরা দেখি তিনি তার ১ম স্ত্রী নিয়েই সুখী ছিলেন আর তার ২য় স্ত্রী ও বয়স্কা ছিল কিন্তু যুদ্ধের কারনে অস্থিতিশীল পরিবেশে এতিম, যুদ্ধবন্দিনিদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কিছু নিয়ম সেই সময়ের প্রেক্ষিতে নাজিল হয়। আর এটা স্বাভাবিক ভাবেই বুঝা যায়- অস্থিতিশীল পরিবেশে পালিত নিয়ম স্থিতিশীল পরিবেশের জন্য উপযুক্ত নয়। যেমন- বঙ্গবন্ধু যদি ৭১ এর পরে কিছু বীরাঙ্গনা বিয়ে করতেন আর তার ভক্তদের সেই আদেশ দিতেন তাহলে কিন্তু তা চমৎকার কাজ হত। কিন্তু সেই আদেশ কিন্তু বর্তমান সময়ের জন্য অনুপযোগী হত স্বাভাবিক ভাবেই। চার বিয়ের আয়াতে এতিম ও দাসিদের কথা বলা হয়েছে। আর দাসি বা এতিমদের সাথে স্বাধীনা নারীর তুলনা কিছুতেই হতে পারেনা, এটা লম্পট পুরুষদের আরোপিত।

প্রায় হাজার বছরের অধিককাল থেকে শরীয়তী বিশ্ব কোরানের যে বিধানটির দোহাই দিয়ে একাধিক বিবি ভোগ করে আসছেন সেটি লক্ষনীয় :
১. অইন খিফতুম-তা’উলু [৪: নিছা-৩]। অর্থ: তোমরা যদি আশংকা কর যে, এতিমদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে বিবাহ করবে নারীদের মধ্য থেকে যাকে তোমাদের ভালো লাগে, দুই, তিন অথবা চার; আর যদি আশংকা কর যে, সুবিচার করতে পারবে না তবে একজনকে অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত একজন দাসীকে এতে পক্ষপাতিত্ব না করার অধিকতর সম্ভাবনা।

তত্কা‌লীন মুছলিমগণ নবির নেতৃত্বে একের পর এক যুদ্ধ জয়ের মধ্যে অসংখ্য নারীও বন্দী হয়। যাদের পিতামাতা,স্বামী সকলেই মুছলিমদের হাতে নিহত বা বন্দী হয়। অপরদিকে অসংখ্য মছলিম নারীগণও তাদের স্বামী, মাতা-পিতা তথা অভিভাবক হারায়। উল্লিখিত কোরানের ভাষায় এরা সকলেই এতিম। একমাত্র ঐ সকল অসহায় এতিমদের ব্যাপারেই বর্ণিত আয়াতে বিয়ের নির্দেশনামা।
তৎকালীন যুদ্ধের নিয়ম মোতাবেক যুদ্ধলব্ধ অন্যান্য সম্পদের মতোই এতিম বা অধিকৃতদের সহায়-সম্পদসহ তাদের নিরাপত্তার জন্য সমাজের ক্ষমতাধর কর্তা ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টন করা হতো, যেহেতু তখন কারাগারের সুব্যবস্থা ছিল না। এদের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব, নিরাপত্তাসহ যৌন-ভোগেরও অধিকার ছিল। কিন্তু স্ত্রীর মর্যাদা দেয়া হতো না। দেখুন:

২. অইয়াস্তাফতুনাকা-আলীমা। [৪: নিছা- ১২৭]। অর্থ: এবং লোকেরা তোমার নিকট নারীদের বিষয় জানতে চায়, বল! আল্লাহ তোমাদিগকে তাদের সম্বন্ধে ব্যবস্থা দিয়েছেন। এতিম নারী সম্বন্ধে যাদের প্রাপ্য তোমরা প্রদান কর না অথচ তোমরা তাদের ভোগ করছো এবং অসহায় শিশু ও এতিমদের প্রতি তোমাদের ন্যায্য বিচার সম্বন্ধে কেতাবে যা বিধিবদ্ধ হয়েছে, তার ওপর কায়েম থাকো। যে কোনো সত্‌ কাজ তোমরা করে থাকো আল্লাহ তা জানেন।

এসমস্ত বিবিধ কারণে নব্য মুছলিমগণ সীমাহীন ও অবাধ নারী ভোগের সুযোগ পায়। ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিক চরম অবক্ষয়ের আশংকায় একটি কঠিন শর্তের অধীনে (সমব্যবহার) উল্লিখিত ঐ এতিম নারীদের মধ্য থেকে ২, ৩ বা ৪ জনকে বিয়ে করার অধিকার দিয়ে তাদের স্ত্রী-মর্যাদা প্রদান করত: সীমাহীন অত্যাচার, যৌনাচার সুকঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

বিধানটি সাধারণের জন্য অবশ্যই নয়। বরং বিশেষ কাল, বিশেষ অবস্থায় একমাত্র অসহায়, এতিম নারীদের অধিকারী পুরুষদের জন্য একটি বিশেষ বিধান।

এছাড়া পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কোরানের পুরুষতান্ত্রিক অনুবাদ দিয়ে অনেক সহজ বিষয় ঘোলা করেছে আর নবি ও ইসলাম কে করেছে কলঙ্কিত। যেমন স্ত্রী কে প্রহার করার স্বপক্ষে নিসার আয়াত-

‘পুরুষেরা নারীদের উপর কৃর্তত্বশীল এ জন্য যে, আল্লাহ একের উপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোক চক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে। আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সবার উপর শ্রেষ্ঠ।’ [সুরা নিসা: ৩৪]
এখানে পুরুষের কৃর্তত্বের কারন হিসাবে বলা হয়েছে পুরুষের অর্থ যোগান ভুমিকা পালনের জন্য। তাহলে বিপরীতক্রমে নারী অর্থ যোগান এর দায়িত্বে থাকলে তার কৃর্তত্ব থাকবে বেশি।বউ পিটানোর কথা বলে যেই বাক্য দেখানো হয় সেখানে আসলেই কি তা আছে?

এই আয়াতে দুটি শব্দের অর্থ জানা জরুরি-
১) নুশুযুন (যার মানে করা হয়েছে অবাধ্যতা)
২) ইদরিবুহুন্না (মানে করা হয়েছে প্রহার করা)
নুশুয’ এর অর্থ – বিতৃষ্ণা/ বিরাগ/ তীব্র ঘৃণা/শত্রুতা (আরবি ইংরেজি অভিধান, জে এম কাউয়ান) কোন স্থান থেকে উঠে যাওয়াই যে ‘নুশুয’এর মানে , তা পরিস্কার হবে ৫৮:১১ নং আয়াত পড়লে।
৪:৩৪ আয়াতে স্ত্রী কতৃক স্বামীকে ছেড়ে চলে যাওয়া বা উপেক্ষার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে , অবাধ্যতার কথা বলা হয় নি। এখনো যদি এটা বিশ্বাস না হয় তাহলে ৪:১২৮ নং আয়াত দেখুন , যেখানে স্বামী কতৃক স্ত্রীকে উপেক্ষার কথা বলা হয়েছে ও একি শব্দ ‘নুশুয’ ব্যবহৃত হয়েছে ও একি বিধান দেয়া হয়েছে মানে সমঝোতার বিধান।
‘ইয়াদরিবুহুন্না’ র মূল হলো ‘দারাবা”। এর অর্থ হল- অনুরুপ, তুল্য, চালাক চতুর আরবি ব্যাকরণ মতে শব্দটির সাথে ‘লাম’ যুক্ত থাকলে অর্থ হত প্রহার করা কিন্তু যুক্ত আছা ‘বা’ যার অর্থ হবে সফর করা বা চলা (আরবি বাংলা অভিধান- মুহিউদ্দিন খান)
তাহলে ৪:৩৪ এর মানে দাড়ায় –

“পুরুষেরা নারীদের উপর কৃর্তত্বশীল এ জন্য যে, আল্লাহ একের উপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোক চক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে। আর যাদের মধ্যে (‘নুশুয’ نُشُوزَ)চলে যাওয়ার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং (‘ইদরিবুহুন্না’وَاضْرِبُوهُنَّযেতে দাও যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সবার উপর শ্রেষ্ঠ।”

যুগে যুগে ধর্ম এসেছে মানুষকে শোধরাতে কিন্তু কিছু অমানুষ সেই ধর্ম গুলোকে বিকৃত করে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করে চলেছে। তাই যেকোন ধর্মকে দায়ি করার আগে গবেষণা করে বের করা উচিত আসলেই কি তাই ধর্মে আছে?

এত বড় পোস্ট পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

(কৃতজ্ঞতাঃ ম জ বাসার)

১২১০জন ১২০৮জন
0 Shares

২৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ