পরীক্ষার কিছুদিন পূর্বে কলকাতায় চলে আসি। হোস্টেল ছেড়ে দিয়েছি। আমার ছোটবোনের স্বামী বরিশালের এডভোকেট আবদুর রব সেরনিয়াবাত তখন পার্ক সার্কাসে একটা বাসা ভাড়া নিয়েছেন। আমার বোনও থাকত, তার কাছেই উঠলাম। কিছুদিন পরে রেণুও কলকাতায় এসে হাজির। রেণুর ধারনা পরীক্ষার সময় সে আমার কাছে থাকলে নিশ্চয়ই আমি পাস করব। বি এ পরীক্ষা দিয়ে পাস করলাম। শেখ [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৫৯) ” শেখ শাহাদাত হোসেন দুই মাসের ছুটি নিয়ে আমাকে পড়তে সাহায্য করেছিল। পরে জীবনে অনেক ক্ষতি আমার সে করেছে। এর জন্য তাকে কোনোদিনই কিছু বলি নাই। ” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
ক্যাটাগরি খ্যাতনামা ব্যক্তি
পরে ময়রা ও মাধাইগঞ্জে ক্যাম্প খুললাম। এই দুই ক্যাম্পে প্রায় দশ হাজার মোহাজের দেওয়া হয়েছিল। অনেক শিক্ষিত ভদ্র ফ্যামিলিও এসেছিলেন। মোহাজেরদের আর আসানসোল এরিয়ায় জায়গা দেওয়া সম্ভব হবে না। আমরা এর পরে বিষ্ণুপুর, অন্ডাল ও বর্ধমানেও কিছু কিছু মোহাজের পাঠালাম। আমার সাথে যে সমস্ত কর্মী ছিল, আহার নিদ্রার অভাব ও কাজের চাপে প্রায় সকলেই অসুস্থ [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৫৮) “আমার সাথে যে সমস্ত কর্মী ছিল, আহার নিদ্রার অভাব ও কাজের চাপে প্রায় সকলেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
প্রথমে ক্যাম্প খোলা হয় ‘নিগাহ’ নামে একটি ছোট্ট গুদামে। সেখানে হাজার খানেক লোক ধরবে। পরে কান্দুলিয়া ক্যাম্প খোলা হল। এতে প্রায় দশ হাজার লোকের জায়গা হবে। আমি এই ক্যাম্পের নাম দিলাম ‘হিজরতগঞ্জ’। মওলানা ইয়াসিন নামটা গ্রহণ করলেন এবং খুশি হলেন। আসানসোল স্টেশনে ও পরে রাণীগঞ্জ স্টেশনে মোহাজেরদের নামানো হত, পরে ট্রাকভরে ক্যাম্পগুলিতে নিয়ে আসা হত। [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৫৭) ” আমাদের খাওয়া-দাওয়ার কোন বন্দোবস্ত ছিল না। মোজাহিরদের জন্য যা পাক করতাম, তার থেকেই কিছু খেয়ে নিতাম।” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
আমরা যখন পাটনায় নামলাম, অবস্থা দেখে রীতিমত ভয় লাগতে লাগল। কাউকেও চিনি না, কোথা থেকে কোথায় যাই! তবে জহির পাটনায় অনেকবার গিয়েছে। আমরা মিস্টার ইউনুস, মন্ত্রী বিহার সরকারের, তাঁর একটা হোটেল আছে—-‘গ্রান্ড হোটেল’, সেই হোটেলে গিয়ে হাজির হলাম। সেখানে মাওলানা রাগীব আহসান সাহেব অফিস খুলেছেন, বেঙ্গল মুসলিম লীগের তরফ থেকে। আবদুর রব নিশতার সাহেব সেদিন [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৫৬) “জনাব আকমল (আইসিএস) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কেমন করে শহীদ সাহেবের পক্ষ থেকে কথা বলতে পারেন?” ” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
কলকাতার মধ্যে জনাব সোহরাওয়ার্দীর মেয়ে মিসেস সোলায়মান, নবাবজাদা নসরুল্লাহর মেয়ে ইফফাত নসরুল্লাহ, বেগম আক্তার আতাহার আলী, সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদিকা নুরজাহান বেগম, বেগম রশিদ, রোকেয়া কবীর এবং মন্নুজান হোস্টেলের ও ব্র্যাবোর্ন কলেজের মেয়েরা খুবই পরিশ্রম করেছেন। রাতদিন রিফিউজি সেন্টারে এরা কাজ করতেন মেয়েদের ভিতর, আমাদের করতে হত পুরুষদের মধ্যে। রাতে অসুবিধা হত, তবুও হাজেরা মাহমুদ [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৫৫) “দাঙ্গা শুরু হওয়ার তিন দিন পরেই আমরা রওয়ানা করলাম পাটনায়। বহু সেচ্ছসেবক রওয়ানা হয়ে গিয়েছে। অনেক ডাক্তারও কলকাতা থেকে গিয়েছিল।” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
একদল লোককে দেখেছি দাঙ্গাহাঙ্গামার ধার ধারে না। দোকান ভাঙছে, লুট করছে, আর কোনো কাজ নাই। একজনকে বাধা দিতে যেয়ে বিপদে পড়েছিলাম। আমাকে আক্রমণ করে বসেছিল। কারফিউ জারি হয়েছে, রাতে কোথাও যাবার উপায় নাই। সন্ধ্যার পরে কোন লোক রাস্তায় বের হলে আর রক্ষা নাই। কোন কথা নাই, দেখামাত্র শুধু গুলি। মিলিটারি গুলি করে মেরে ফেলে দেয়। [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৫৪) “আমরা রওয়ানা করে তাড়াতাড়ি ছুটতে লাগলাম, কোন গাড়ি নাই। আমাদের পায়ে হেঁটেই পৌঁছাতে হবে।” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
তারপরে আর খোঁজ নাই, কি করে খবর নেই! লেডী ব্রাবোর্ন কলেজে রিফিউজিদের থাকার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। দোতালায় মেয়েরা, আর নিচে পুরুষরা। কর্মীদের ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। আমাকেও মাঝে মাঝে থাকতে হয়। মুসলমানদের উদ্ধার করার কাজও করতে হচ্ছে। দু’এক জায়গায় উদ্ধার করতে যেয়ে আক্রান্তও হয়েছিলাম। আমরা হিন্দুদেরও উদ্ধার করে হিন্দু মহল্লায় পাঠাতে সাহায্য করেছি। মনে হয়েছে, [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৫৩) “আমরা ঠেলাগাড়ি আনলাম, কিন্তু ঠেলবে কে? আমি, নূরুদ্দিন ও হুদা (এখন ডিআইটির ইঞ্জিনিয়ার) এই তিনজনে ঠেলাগাড়িতে চাউল বোঝাই করে ঠেলতে শুরু করলাম।” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
লীগ অফিস রিফিউজি ক্যাম্প হয়ে গেছে, ইসলামিয়া কলেজও খুলে দেওয়া হয়েছে। কলকাতা মাদ্রাসা যখন খুলতে যাই, তখন দারোয়ান কিছুতেই খুলতে চাইছে না। আমি দৌড়ে প্রিন্সিপাল সাহেবের কাছে গেলে তিনি নিজেই এসে হুকুম দিলেন দরজা খুলে দিতে। আশে পাশে থেকে কিছু লোক কিছু কিছু খবর দিতে লাগল। বেকার হোস্টেল, ইলিয়ট হোস্টেল পূর্বেই ভরে গেছে। এখন চিন্তা [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৫২) “কলকাতা শহরে মরা মানুষের লাশ বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে।” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
ইসলামিয়া কলেজের কাছেই সুরেন ব্যানার্জি রোড, তারপরেই ধর্মতলা ও ওয়েলিংটন স্কয়ারের জংশন। এখানে সকলেই প্রায় হিন্দু বাসিন্দা। আমাদের কাছে খবর এল, ওয়েলিংটন স্কয়ারের মসজিদে আক্রমণ হয়েছে। ইসলামিয়া কলেজের দিকে হিন্দুরা এগিয়ে আসছে। কয়েকজন ছাত্রকে ছাত্রীদের কাছে রেখে, আমরা চল্লিশ পঞ্চাশজন প্রায় খালি হাতেই ধর্মতলার মোড় পর্যন্ত গেলাম। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা কাকে বলে এ ধারণাও আমার ভাল [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৫১) ” মিনিটে মিনিটে ফোন আসছে, শুধু একই কথা, ‘আমাদের বাঁচাও, আমরা আটকা পড়ে আছি। ” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
১৫ই আগস্ট কে কোথায়, কোন এরিয়ায় থাকবে তা ঠিক হয়ে গেল। ১৬ই আগস্ট কলকাতার গড়ের মাঠে সভা হবে। সমস্ত এরিয়া থেকে শোভাযাত্রা করে জনসাধারণ আসবে। কলকাতার মুসলমান ছাত্ররা ইসলামিয়া কলেজে সকাল দশটায় জড়ো হবে। আমার উপর ভার দেয়া হল ইসলামিয়া কলেজে থাকতে। শুধু সকাল সাতটায় আমরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব মুসলিম লীগের পতাকা উত্তোলন করতে। আমি [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৫০) “কোথায় এরা কাপড় পাবে ব্যান্ডেজ করতে? যার যার ওড়না ছিঁড়ে, শাড়ি কেটে ব্যান্ডেজ করতে শুরু করল। ” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
২৯ জুলাই জিন্নাহ সাহেব অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ কাউন্সিল সভা বোম্বে শহরে আহবান করলেন। অর্থের অভাবের জন্য আমি যেতে পারলাম না। জিন্নাহ সাহেব ১৬ আগস্ট তারিখে ‘ডাইরেক্ট একশন ডে’ ঘোষণা করলেন। তিনি বিবৃতির মারফত ঘোষণা করেছিলেন, শান্তিপূর্ণভাবে এই দিবস পালন করতে। ব্রিটিশ সরকার ও ক্যাবিনেট মিশনকে তিনি এটা দেখাতে চেয়েছিলেন যে, ভারতবর্ষের দশ কোটি মুসলমান [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৪৯) ” অর্থের অভাবের জন্য আমি যেতে পারলাম না। ” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
আমাদের অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ছিল। বাতাসে হাত-পা অবশ হতে চলেছে। আর কিছু সময় চললে আর উপায় নাই।কিছুক্ষণ পরেই ট্রেন থেমে গেল। আমরা নেমে পড়লাম। ‘আনোয়ার’ ‘ আনোয়ার’ বলে ডাকতে শুরু করলাম। মধ্যম শ্রেনীতে আনোয়ার ছিল, ওর কাছেই আমার বিছানা। আমাদের জন্য আনোয়ার খুব উদ্বিগ্ন ছিল। জানালা দিয়ে কোনক্রমে ট্রেনের ভিতরে উঠলাম। ট্রেন ছেড়ে দিল। পরের [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৪৮) “এরপর ভাবলাম কিছুদিন লেখাপড়া করব। মাহিনা বাকি পড়েছিল, টাকা পয়সার অভাবে। ” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
সেলিম চিশতী ছিলেন বাদশাহ আকবরের পীর। আজমীরের খাজাবাবার দরগায় দেখলাম গান বাজনা চলছে সমানে, এখানেও দেখলাম সেই একই অবস্থা। আমাদের বাংলাদেশের মাজারে গান বাজনা করলে আর উপায় থাকত না। খাজাবাবা মঈনুদ্দিন চিশতী ও সেলিম চিশতী দুইজনই নাকি গান ভালবাসতেন। আমরা এক এক করে এবাদতখানা থেকে আরম্ভ করে আবুল ফজলের বাড়ি, হামামখানা, ধর্মশালা, মিনা মসজিদ, যোধাবাঈ [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৪৭) “আমি দুই হাতলের মধ্যে দুই হাত ভরে দিলাম, ওকে বুকের কাছে রাখলাম। মেলট্রেন–স্টেশন কাছাকাছি হবে না। ” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
সূর্য অস্তাচলগামী, আমরাও তাজমহলের দরজায় হাজির। অনেকক্ষণ থাকব, রাত দশটা পর্যন্ত দরজা খোলা থাকে, তারপর দারোয়ান সাহেবরা এসে ঘন্টা দিয়ে জানিয়ে দিবে সময় হয়ে গেছে। তাজকে ত্যাগ করতে হবে, রাতের জন্য। আমরা বসে পড়লাম, একটা জায়গা বেছে নিয়ে কয়েকজন নামাজ পড়তে গেলেন। আজানের ধ্বনি কানে এসেছে। পাকিস্তান হওয়ার পরও আজান হয় কি না জানি না। [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৪৬) ” আজও একুশ বৎসর পরে লিখতে বসে তাজের রুপকে আমি ভুলি নাই, আর ভুলতেও পারব না।” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]
পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম এই তাজ। আমাদের নিজেদের মধ্যে তাজ দেখা নিয়ে অনেক আলোচনা হল। দুনিয়ার বহু দেশ থেকে বহু লোক শুধু তাজ দেখার জন্য ভারতবর্ষে আসত। তাজমহলের কথা জানে না, এমন মানুষ দুনিয়ায় খুব বিরল। আমাদের দেরি আর সইছে না। মনে হচ্ছে ট্রেন খুব আস্তে আস্তে চলছে, কারন তাজ দেখার উদগ্র আগ্রহ আমাদের পেয়ে [বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৪৫) “তাজকে ভালভাবে দেখতে হলে আসতে হবে সন্ধ্যায় সূর্য অস্ত যাবার সময়, চাঁদ যখন হেসে উঠবে তখন।” ——শেখ মুজিবুর রহমান।]