গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে পহেলা বৈশাখ। এ্কটি নতুন বাংলা বছরের আগমনের পাশাপাশি চলতি বছরের বিদায়। যে বছরটিতে ঘটে গেছে অনেক জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক উল্লেখযোগ্য সুখ দুঃখের ঘটনা। দেশে যাত্রা শুরু করেছে বহুল প্রত্যাশিত জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে গঠিত একটি নতুন নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ঘটেছে ঘটনাবহুল আমেরিকা ও ইরানের যুদ্ধ। যা সারা বিশ্বকে টালমাটাল করে দিয়েছে। অস্থির হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি। পাশাপাশি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলোকে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় গলদঘর্ম হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দেশে জ্বলানি তেলের সঙ্কট, সরবরাহ ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করছে। বিশ্বের এমন এক নাজুক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এবং যুদ্ধাবস্থার কারণে প্রচুর মানুষের প্রাণহানি এবং সম্পদহানির মধ্যেই বাঙ্গালী জাতি বরণ করতে যাচ্ছে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ সালকে।পহেলা বৈশাখ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি সকল বাঙালি জাতির ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের দিন। এটি বাঙালির একটি সর্বজনীন লোকউৎসব। এদিন আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে। কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হলো নববর্ষ। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদযাপিত হয় নববর্ষ। জানা যায়, পহেলা বৈশাখ প্রথম উদযাপন শুরু হয়েছিল পুরান ঢাকার মুসলিম মাহিফরাস সম্প্রদায়ের হাতে। বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ পালিত হয়ে থাকে। পাশাপাশি এই উৎসবটি শোভাযাত্রা, মেলা, পান্তাভাত খাওয়া, হালখাতা খোলা ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপন করা হয়। ২০১৬ সালে, ইউনেস্কো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত শোভাযাত্রাকে “মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য” হিসেবে ঘোষণা করে।

নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দেশজ কৃষ্টি সভ্যতা ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ স্থাপিত হয়। সত্যিকার অর্থে নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা। এ মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সব প্রকার হস্তশিল্পজাত ও মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী এই মেলায় পাওয়া যায়। মেলাতে থাকে নানা রকম কুটির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থাও থাকে। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তি একসময় প্রচলিত ছিল। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি হয় ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে, যা জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত। পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের খেলনা, মহিলাদের সাজ-সজ্জার সামগ্রী এবং বিভিন্ন লোকজ খাদ্যদ্রব্য যেমন – চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা, বিভিন্ন প্রকার মিষ্টি প্রভৃতির বৈচিত্র্যময় সমারোহ থাকে মেলায়। মেলায় বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগায়ক ও লোকনর্তকদের উপস্থিতি থাকে। তাঁরা যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান, গাজীর গান, আলকাপ গানসহ বিভিন্ন ধরণের লোকসঙ্গীত, বাউল-মারফতি-মুর্শিদি-ভাটিয়ালি ইত্যাদি আঞ্চলিক গান পরিবেশন করেন। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নাটক, পুতুলনাচ, নাগরদোলা, সার্কাস ইত্যাদি মেলার বিশেষ আকর্ষণ। এছাড়া শিশু-কিশোরদের আকর্ষণের জন্য থাকে বায়োস্কোপ।

বর্তমানে নগরজীবনে নগর-সংস্কৃতির আদলে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে নববর্ষ উৎযাপিত হয়। পহেলা বৈশাখের প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নববর্ষের উৎসব। এ সময় নতুন সূর্যকে প্রত্যক্ষ করতে উদ্যানের কোনো বৃহৎ বৃক্ষমূলে বা লেকের ধারে অতি প্রত্যূষে নগরবাসীরা সমবেত হয়। নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এদিন সাধারণত সব শ্রেণীর, ধর্মের এবং বয়সের মানুষ ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাক পরিধান করে। নববর্ষকে স্বাগত জানাতে তরুণীরা লালপেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি, খোপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা এবং কপালে টিপ পরে। আর ছেলেরা পরে পাজামা ও পাঞ্জাবি। এদিন সকালবেলা পানতা ভাত খাওয়া একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। সঙ্গে থাকে ইলিশ মাছ ভাজা। একথা অনস্বীকার্য, লোকজ বর্ষবরণ প্রথাগুলির কোনো কোনোটির অনুসরণের মাধ্যমে গ্রামীণ ঐতিহ্য অনেকটা সংরক্ষিত হচ্ছে। যদিওবা পান্তা ইলিশ গরীব দুঃখী অসহায়দের প্রতি ব্যঙ্গ বিদ্রূপ উপহাস মনে হয়।

হালখাতা হলো বছরের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। বছরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা তাদের দেনা-পাওনার হিসাব সমন্বয় করে এদিন হিসাবের নতুন খাতা খোলেন। এজন্য খদ্দেরদের বিনীতভাবে পাওনা শোধ করার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, শুভ হালখাতা কার্ড’-এর মাধ্যমে ঐ বিশেষ দিনে দোকানে আসার নিমন্ত্রণ জানানো হয়। এই উপলক্ষে নববর্ষের দিন ব্যবসায়ীরা তাদের খদ্দেরদের মিষ্টিমুখ করান। খদ্দেররাও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী পুরোনো দেনা শোধ করে দেন। আগেকার দিনে ব্যবসায়ীরা একটি মাত্র মোটা খাতায় তাদের যাবতীয় হিসাব লিখে রাখতেন। এই খাতাটি বৈশাখের প্রথম দিনে নতুন করে হালনাগাদ করা হতো। হিসাবের খাতা হাল নাগাদ করা থেকে “হালখাতা”-র উদ্ভব। নববর্ষের দিন সকল ক্রেতা বা দর্শকদের মিষ্টি ও ঠান্ডা পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করে বাঙালি মুসলমান ব্যবসায়ীরা। হালখাতার মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি হয়। যদিও প্রযুক্তির দাপটে বদলে গেছে ব্যবসার ধরন, হিসাবের খাতা জায়গা ছেড়েছে কম্পিউটার ও সফটওয়্যারকে। তবুও বাঙালির ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘হালখাতা’ এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। গ্রামের কিছু পুরোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও খাতা প্রস্তুতকারকদের হাত ধরে শত বছরের এ প্রথা টিকে আছে, যদিও আগের মতো জৌলুস নেই। পহেলা বৈশাখ এলেই লাল কাপড়ে মোড়ানো নতুন খাতার চাহিদা বাড়ে। পুরোনো দেনা-পাওনা মিটিয়ে নতুন হিসাব শুরু করার এই রীতি এখন অনেকটাই প্রতীকী হলেও কিছু ব্যবসায়ীর কাছে এটি এখনও আবেগ ও ঐতিহ্যের বিষয়। নগরের টেরিবাজার, আন্দরকিল্লা ও বক্সিরহাট এলাকায় এখনও দেখা মেলে হালখাতা তৈরির ব্যস্ততা।

পহেলা বৈশাখের আনন্দ, উৎসব আর পার্বণ এদেশের মুসলমান, হিন্দু,বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই মিলেমিশে পালন করে থাকে। এটি কোন ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি হচ্ছে আমাদের একটা বাংগালী রীতি বা রেওয়াজ। দেশজ কৃষ্টি সভ্যতা সংস্কৃতির মেলবন্ধন। ব্যবসায়ীদের বাৎসরিক হিসাব কিতাব দেনা পাওনা শেষ করে তাঁরা নতুন করে আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার মাধ্যমে হাল খাতা শুরু করে। এটি ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন। একসময় বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা।এ উপলক্ষ্যে দোকানে দোকানে মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। তাছাড়া থাকতো সুগন্ধি দেয়া, পানের আয়োজন। আবার অনেকে আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে মিষ্টান্ন পাঠাতেন। সুখের বিষয় হালখাতার হাল আগের মতো না থাকলেও চিরায়ত এ অনুষ্ঠান্টি কিন্তু এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।নববর্ষের মাধ্যমে বাঙ্গালীদের নিজস্বতা স্বকীয়তা সতন্ত্র লোকায়ত সংস্কৃতির লালন পালন বিকাশের মাধ্যমে আমাদের পারস্পরিক সামাজিক বন্ধন ঐক্য দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়। আমাদের প্রত্যাশা দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সহনশীলতা, সহিষ্ণুতার পাশাপাশি আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। নারী নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ খুনের দুষ্টুচক্র থেকে দেশ বেরিয়ে আসবে। দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি অবসানের পাশাপাশি ভূমি দস্যুতা, ব্যাংক লুট, বিদেশে অর্থ পাচার বন্ধ হবে। মানুষকে অহেতুক রাজনৈতিক কারণে অত্যাচার নির্যাতন গুম খুন করা হবে না। জড়ানো হবে না ভুয়া মামলা মোকাদ্দমায়। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, বাহুবল প্রদর্শন থেকে নিরীহ মানুষকে সুরক্ষা দিতে হবে রাষ্ট্রকে। জাতির প্রত্যাশা একটি নিরাপদ সন্ত্রাসমুক্ত শান্তি স্বস্তি আর সমৃদ্ধির আগামীর বাংলাদেশ হবে বাংলা ১৪৩৩ সাল। শুভ সুখী সুন্দর আনন্দদায়ক হোক আমাদের সকলের পথচলা। শুভ নববর্ষ।

১৯৫জন ২৬জন

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ