নীরব সঙ্গী

সার্চ অপশনে গিয়ে আমার নামের আদ্যক্ষর অর্থাৎ M দিয়ে অপরিচিত একজনকে খুঁজছি। এমন কেউ যে খুব দূরের নয়। যার সঙ্গে এই জীবনে আর কখনো দেখা হবে না।

এমন সময় মেসেজ রিকোয়েস্ট আসে। নাম প্লাবন আহমেদ। ওর মেইন প্রোফাইল ঘেটে দেখি। মুরগির মতো চুল ছাঁটা। ভাবলেশহীন। দুুই তিনটা পোস্ট।  খুব বেশি তথ্য নাই। ফেক আইডি মনে হয়। একটু বাজিয়ে দেখলে কেমন হয়?

: আপনি কি লেখক প্লাবন ভাই?

: না।

টাইপিং হচ্ছে…..

: আমি তো আপনাকে চিনি না। আপনি কেমনে চিনবেন?

: ধুর !  তাহলে মেসেজ দিয়েছেন কেনো ?

: ” দুঃখের কথা বলতে চাই ।  ”

: আমাকে তো চেনেন না !

: সেজন্যই সুবিধা। দুঃখ শেয়ার করলে কমে যায়।

এই মেসেজ রিকোয়েস্ট অপশনটা হচ্ছে দূরের গ্রামের হারিকেনের আলো। বেশির ভাগই  হাই, হ্যালো, কেমন আছেন?  বাসা কোথায়?  কি করেন?  কোথায় থাকেন?  আপনার প্রো পিকটা সুন্দর। আবার সুসংবাদ, দুঃসংবাদ, যেগুলো ফরওয়ার্ড করলে সওয়াব পাওয়া যাবে। কী সব অদ্ভুত বিষয়ে যে মানুষ মজে থাকে! আর এতো সময় কই পায়?

টিরিট করে আবার প্লাবনের মেসেজ। পাগল নাকি লোকটা? কৌতূহল একরাশ নিয়ে পড়া শুরু করলাম।

” চাকরী থেকে ছাঁটাই। জমা টাকা ভেঙ্গে খাওয়া শুরু করছি। বড় জোর আর দুমাস। এই সংকটে চাকরী পাওয়া দুষ্কর। বৌ চিরকুট লিখে রেখে গেছে, ” তোমার দুঃখ কমিয়ে দিলাম।”

বিয়ে হয়েছে বছর পাঁচ। বাচ্চা হচ্ছে না। আম্মার প্যানপ্যানানি। একদিন রাতে বৌ এর প্রচুর ব্লিডিং। ডিএনসি করতে হলো। এরপর থেকে মায়ের আর বৌ এর বনাবনি হয় না। পুরা বাংলা সিনেমা চলছিলো। মা একদিন তার বোনের বাড়ি। আর একদিন তার ভাই এর বাড়ি যায়। প্লাবন বলে, আপা আপনি কী রাগ করছেন?

আমি বলি,  না। উঠে গিয়ে এক কাপ চা বানায় নিয়ে আসি। লোকটার হাতের স্পীড ভাল। আমি ক লিখতে এ মনে হয় পাতা ভরায় ফেলবে। ক্যানভাসার না কি? আবার মেসেজ পড়ি।

কেনো সন্তান হয় না, সেজন্য ডাক্তার দেখালাম। কিছুই হলো না। বৌ শুধু হাসে। হয়তো এভাবে দুঃখ লুকায় রাখে।

এ পর্যন্ত পড়ে ঘুমাতে গেলাম। সকালে উঠে রিপ্লাই দিতে গিয়ে দেখি ব্লক। প্লাবন আহমেদ, রাহমান, খান, চৌধুরী কতো কিছু দিয়ে সার্চ দেই। সেই প্লাবন আসে না।

কেমন হয় যদি তার মতো আমিও দুখের কথা শোনাই অপরিচিত, অতিদূরের কাউকে। কোথা থেকে হু হু করে ঠাণ্ডা বাতাস আসে। উঠে জানালাটা লাগাতে যাই।

আকাশের দিকে তাকিয়ে,  ভাবি….. ।  কোনদিন নিভে যাবে না জেনেই সম্ভবতঃ খুব ম্লান আর মলিন এক চাঁদ জ্বলে জ্বলে আকাশকে সঙ্গ দেয়।

 

 

মোট পড়েছেনঃ ১,২৭৯জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

২২টি মন্তব্য

  1. চেনা অচেনা অনেকেই ইনবক্সে মেসেজ দেয়। কিন্তু দুঃখের কথা বলে আবার ব্লক। কেমন যেন রহস্যময় মনে হলো। গল্পটির শেষ জানার তৃষ্ণা রয়ে গেল। খুব ভালো লাগলো গল্পটা। শুভ কামনা অবিরাম। ভালো থাকবেন।

  2. এই মেসেজ রিকোয়েস্ট অপশনটা হচ্ছে দূরের গ্রামের হারিকেনের আলো। বাক্যটা ভালোই চয়ন হয়েছে। প্লাবণ হারিয়েই গেলো! ইসরে কত দুঃখ নিয়েই মানুষের জীবন।

    কেউ বোঝেনা কারো ব্যাথা, নিরবেই শয়ে যায়। মুগ্ধ হয়েই পরলাম।

  3. আস্থায় তৈরী হয়ে বিশ্বাসের ভিত
    নইলে যে জীবন বেতালে হয়ে রয়
    কখনো ডানা ঝাপটানো রাতের পাখি
    আবার কখনো ছোট্ট শিশুর ছুঁ কিত কিত।
    অসাধারণ সমাপ্তি।
    ভীষণ ভীষণ মুগ্ধতায় নিরন্তর শুভ কামনা রাখলাম পাতায়।

  4. বেশ বেশ, ব্লকটা বেশ ফাইন, গল্পে গল্পে আনাড়িরা জেনে যাচ্ছে ‘ফেকবুকের’ কথা।
    অচেনাদের কাছে প্যানোর প্যানোরে এত্ত সুখ! চেনা তবে কৈ যাইবে!!
    ভাল বলতে চাচ্ছি। চালু থাকুক।

  5. দুঃখের কথা শোনার জন্য আর কেউ বসে থাকেনা এখন। সবাই সুখের পায়রা। অনলাইনে কাউকেই বিশ্বাস নেই আর সেই আন্তরিক ফিলটাও আসেনা। এটাই বাস্তবতা।

    সুন্দর লিখেছেন আপু। শুভকামনা।

  6. সবাই সুখের সাথী, দুঃখের সময় থাকে না আজকাল। গল্পের শেষ জানার আগ্রহ থাকল মানেই লেখকের এ লেখা স্বার্থক। মানে পাঠকের তৃপ্তির আকাঙ্খা বাড়ল।।।ভালো লাগল আপু।

মন্তব্য করুন