ছুঁয়ে দেয়া

আত্মীয় হাসপাতালে তার ২ সপ্তাহের শিশু নিয়ে। তেমন কিছু না, হেপাটাইটিস। ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার ফটো থেরাপিতে সাধারণত ভালো হয়ে যায়। বলাটা খুব সহজ হলেও গিয়ে যা দেখলাম, তাতে মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। আত্মীয়টা এন আই সি উ এর অপেক্ষা রুমের এক কোনায় বসে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার উপস্থিতিতেও নড়াচড়া নাই। কেমন জেনো একটু অস্বস্তি ভর করে বসলো, কঠিন কিছু নাতো? শিশু ডাক্তারটা আমার বন্ধু। অপেক্ষার বাঁধ ভেঙ্গে ওকেই কল করলাম। আমার ধারনার মধ্যেই আছে এবং একদিনেই ভালো হবার কথা। চেষ্টা করলাম পরিবেশটা হালকা করার। “কত নম্বর বেডে আছে”? যাক, বাঁধতো ভাঙল। কিন্তু হায়, “আমিও যাবো”। চোখ দুটো শুধু ছলছলে নয়, আরো যেন কি বলছে। কিছু খুঁজছে কি? বৃথা চেষ্টা করছি পড়ার। এই সময়গুলো আমার জন্য বেশ পীড়াদায়ক। কি বলতে হয়, কি করতে হয় বুঝি না। সত্যি যদি ভ্যানিসিং ক্রিম থাকতো, এটা হতো উত্তম সময় তা ব্যবহারের। “আমাকে ওরা …কে ছুঁয়ে দিতে দেয়নি”। এটাইতো এই চিকিৎসার একটা অংশ। উদাম শরীরে একটানা ফটো থেরাপি। নির্দিষ্ট সময়ে নার্সরাই ফিড দেবে। কোন ভাবেই ব্যাহত করা যাবেনা চিকিৎসা।  “আমি শুধু একবার ছুঁয়েই চলে আসবো”। কী আছে সেই ছোঁয়ায়? আমার মা ও কি তাই ছেয়েছিলেন?

সময়ের প্রয়োজনেই হয়তো এঘাট ওঘাট করে একসময়ের স্বপ্ন দেশে খুঁটি গেড়েছিলাম সেই তারুণ্য নিয়ে। অদম্য চেষ্টায় পড়ালেখায় শান দেয়া, মায়ের খোঁজ খবর, সংসার এবং অফিসের কাজ কাম, সামাজিক যোগাযোগ, সবইতো চলছিলো ওদেরই মতো। মাঝে মাঝেই মা বলতেন অনেক দিন তোকে দেখিনি। বলা হয়নি কোনদিন, আমি যে উচ্চ প্রত্যাশায় অন্ধ হয়ে গেছি মা। একসময় হতাশা এসে ঝাপটে ধরলো টুটি। তাইতো, দেখতে দেখতে দেড় যুগ হয়ে গেলো মাকে ছুঁয়ে দেইনি। এ হতাশার তো সোজা সমীকরণ।

একরাশ অস্থিরতায় হঠাৎ করে দেশে কাজ করবার একটা প্রস্তাব পেয়ে গেলাম। যাক, কিছুদিনতো মায়ের সাথে কাটাতে পারবো। তেমন কোন চিন্তা ভাবনা না করেই রাজী হয়ে ঘোঁজঘাঁজ রব শুরু করলাম যা একটু কঠিন ব্যাপারই। অনেক দিনের সংসারতো। হাতের জমানো কাজগুলো শেষ করা, ধূমধাম কেনা কাটা, কত কী। কতো জনের কতো চাহিদা। একজনতো আস্ত স্ট্যাচু অব লিবার্টিটা খুঁড়ে নিয়ে আসতে বলল। আর মা, আমার হাত ধরে বসে থাকবি কিছুক্ষণ।

আমার সাথে আরো একটা বন্ধু যাবে আর এই দুইজনের উপরেই আমাদের প্রকল্পটার ভীত। সে আবার বড়োসড়ো একজন ক্যানসার গবেষক। ঝামেলা বাঁধল ও যখন নিজের গবেষণার বিষয় নিজেই বনে হাসপাতালে শুয়ে পরলো। প্রকল্প ভবিষ্যৎ মোটামুটি চরক গাছে উঠার মত। তারপরও আমরা আশা নিয়েই বেঁচে থাকি, ভালো হয়ে যাবে একসময়। সময় চলছে সময়ের তালে। এইতো আর মাস খানেক বাকী মার কাছে যাবার।

ট্রেনে চেপে যাচ্ছি পাশের শহরে একটা ফাইনাল প্রডাক্ট ডেলিভারি দিতে। ফাইনাল টাচটা ট্রেনে বসেই করে নিচ্ছি যা ড্রাইভ করলে করা হতোনা। মনে হচ্ছে সবাই ট্রেনের এই সুবিধাটা ভালো ভাবেই ব্যাবহার করছে। আশেপাশের সবাই নিজের মাঝেই ব্যাস্ত ল্যাপটপ, খবরের কাগজ, মুঠোফোন কিছুনা কিছু নিয়ে। দাদার (বড় ভাই) কল আসলো দেশ থেকে যা সবসময়ই আনন্দের। আস্তে করে আমার অবস্থান জানালাম। আমি আবার আমার ফিরিস্তি দিয়ে কাউকে বিরক্ত করতে চাইনি। “আচ্ছা, বাসায় গিয়েই কল দিস”। অপেক্ষা আমার বন্ধু হতে পারেনি আজও। আমারতো রাত হবে ফিরতে। “মা ক্যামন আছে?” ওপাড়টা ক্যামন জেনো থমথমে হয়ে গেলো। কাল রাতেই তো কথা হলো মার সাথে যে এখন ২৮ দিন গুনছে। “দাদা, মা ক্যামন আছে?” কিছু অস্পষ্ট কথা মাথাটা ভারী করে দিলো। খুট করে একটা শব্দ। না, লাইনটাতো এখনো আছে। আমি ভুল শুনছি, অবশ্যই ভুল। এমনতো কথা ছিলোনা। আশেপাশের মানুষগুলোকে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, কেউ আমার পিঠে একটু হাত বুলিয়ে দাও। সেই স্পর্শে যেন মায়ারা আসে জলকন্যার বেশে।

পুনশ্চঃ আত্মীয় মা কে তার শিশুর ছুঁয়ে দেয়া দেখেছি। তখন তার চোখের কথা আমার পড়া হয়নি, পারিনি পড়তে। দেখা হোলোনা আমার মায়ের সেই না পড়া চোখ দুটি। আমিযে তাকে ছুঁয়ে দিতে দেখিনি।

মোট পড়েছেনঃ ৮৬২জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

৪০টি মন্তব্য

  1. আমরা ছুঁই, ছুঁয়ে দেই, ছুঁতে চাই ই। স্বপ্নে বা বাস্তবতায়, স্বপ্নবাস্তবতায় ও। কিন্তু কিছু কিছু ছোঁয়া ছোঁয়া হয়ে ওঠে না, ছোঁয়া হয় ও না।
    কঠিনতম সত্যটি বুকে ছুঁয়ে থাকে জবর যন্ত্রণা হয়ে, ঝুল বারান্দায়, জুল জুল করে।
    বাহ্‌, সবাই দেখছি লিখক হয়ে গ্যাছে অবেলার বেলায়। প্রশ্ন হলো………
    কুথায় ছিলেন এত্ত এত্ত দিন।
    অবশ্য এ দিন দিন না, আমরা এ ও জানি আরও দিন(রাত্রি ও হতে পারে)আছে সামনে।

  2. ছুঁতে চাই, ছুঁতে পারছিনা, ছোঁয়া হবেনা কোনদিন। এ যন্ত্রণা ঝুল বারান্দায়ই ঝুলে আছে অস্পষ্ট বা স্পষ্ট ভাবে।

    কী যে বলেন আপনি, খুশী মনে রাফ খাতায় যা মনে আসছে আঁকিবুঁকি করছি। ভাগ্য এখনো সহায় আছে, কেউ গালমন্দ দিচ্ছেনা।
    আপনিতো রাতকেও দিন বানিয়ে ছাড়েন মাঝে মাঝে। আর আমি সেই রাতকেও দিনই ভেবে নেই।

    1. দেখুন, আমার আউল-ফাউল লেখা ও মন্তব্য দেখে বিভ্রান্তির বেড়াজালে
      আঁটকে পড়বেন যেন, তা হবে খুব ই শরমিন্দার,
      বেড়া টপকে মগডালে চড়ুন, খুবই মজা।

      এটি রাফ খাতাই, আমরা তো আমরাই সিস্টেমে কেউ গালের মন্দ বানাবে না,
      এগিয়ে চলুন গতিহীন ভাবে,

      1. তা ভালোই বলেছেন, আপনার আউল-ফাউল লেখা! মাঝে মাঝে নয়, প্রায়শই ওগুলো যে আউল-ফাউল, তাও তো বুঝিনা। আপনাকে কোন ভাবেই শরমিন্দায় হামাগুড়ি দিতে হবেনা।
        লেখা কি মগের মুল্লুকের গাছ যে এক লাফেই মগডালে?

        আপনার ভরসা এবং উৎসাহ আমার পাথেয়।
        অনেক ধন্যবাদ আপনাকে!

  3. আমরা ভাবি আমাদের মত ,কিন্তু সৃষ্টিকর্তার বিধান অনেক সময়ই মেলেনা আমাদের ভাবনার সাথে | কিছু কিছু ইচ্ছের সমাধি রচিত হয় ঠিক এইভাবে | সকালের রোদ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না যে আজ দিনে বৃষ্টি হবেনা |

    1. অনেক কঠিন তবে মানতে যে হবেই, উপায় যে নেই আর।
      সকাল দেখে দিন বোজার ইংরেজী ফ্রেজাটাতে আরো কিছু বিশেষণ লাগানো দরকার।

      অনেক শুভেচ্ছা।

  4. ছুঁয়ে দেয়া হয়নি আমারও। না মা’কে, না বাবা’কে। পৃথিবীর এক প্রান্তে আমি যখন বাবা’র ভাল হয়ে উঠবার আশা আর আনন্দ নিয়ে ঘুমাতে গেলাম, অন্য প্রান্তে তখন আমার সরল সংগ্রামী বাবা হাসপাতালের যন্ত্রগুলোর সাথে যুদ্ধ করে করে হেরে গিয়ে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়লেন।

    মানচিত্রের এই প্রান্তে এক দুপুরে আমি যখন সন্তানকে নিয়ে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম, ঠিক সেই সময়ে অন্যপ্রান্তে আমার সুস্থ সবল মা বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে গেলেন। সে-ই যাওয়া ! আর ফিরেননি। সন্তানদের একলা চলতে শিখিয়ে পাড়ি জমালেন অনন্তের পথে।

    পৃথিবীর পথ চলা ফুরালে বোধ হয় এমনই হয় !!
    ভাল থাকুন।

    1. অন্যের কষ্ট বোঝার কার সাধ্য। তবে এই ক্ষেত্রে আপনারটা কিছু অনুভব মনে হয় করতে পারছি।
      “সন্তানদের একলা চলতে শিখিয়ে পাড়ি জমালেন অনন্তের পথে।” জীবন চক্রর এক নির্মম নিয়ম।

      অনেক ভালো থাকুন। শুভকামনা আপনার জন্য।

  5. লেখা পড়ে ভিতরটা মোচর দিয়ে উঠলো ভাইয়া।কেমন একটা দম বন্ধ অনুভূতি,বুকের ভিতর হাহাকার। মা……… কি লিখবো আর বুঝতে পারছি না।মন্তব্য করতে পারছি না এ লেখায়,কত আবেগ দিয়ে লেখা!

    1. যাদের মা এখনো ছুঁয়ে দিতে পারে, তারা যেন সেই অনুভূতিটা নিতে থাকে প্রান ভরে। এই লেখা চেষ্টা তাদের জন্য।

      ভালো থাকুন।

  6. আবেগ প্রকাশে আপনার নিপুণতা দেখে মুগ্ধই হলাম
    উপরে লীলাবতী ঠিকই বলেছেন,এমন লেখায় মন্তব্য করা কঠিন
    নির্বাক হয়েই শুধু লেখকের অনুভুতির সাথে মিশে যাওয়া যায়।

    শুভ কামনা।

    1. কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে অথচ কাঁদতে পারছিনা, এ যে কি কষ্ট তাতো বোঝানো যাবেনা। এর মানেই কি পাথর বনে যাওয়া!

      আপনার আন্তরিকতা মনের মাঝেই গেঁথে রাখলাম। অনেক বেশী ভালো থাকুন।

    1. এটাই হয়তো নিয়ম যা ভাঙ্গা যায়না। কত কি যে আছে, সাধ্য কি মোদের সব বুঝে নেবার।

      আপনাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা ইদানীং। ভালো থাকুন।

      1. সেটাই নিয়ম ভাঙ্গা যায়না।
        বলছেন কি ভাইয়ূ আমায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা? মন থেকে খুঁজে দেখুন এখানেই আছি।
        যাবো আর কই?
        ভালো আছি, স্বপ্ন-রঙীন জালে। আপনিও নিজেকে ভালো রাখুন।

  7. এ ছুঁয়ে দেয়ার আক্ষেপ কি ফুরাবে কখনো? কি যে চাই আমরা!! কেন যে ছুটি এদিক ওদিক!! সাত সমুদ্র দূরে।
    কিছু আছে লেখায়, জানিনা কি তা। তবে ইচ্ছেটা পেড়িয়ে গেলো হট্টগোল আর জানজটের শহরে। কবে ছুঁয়ে দেব!! 🙁

    1. মনে ত হয় ফুরাবে না যা আমরা মেনে নিতে চাইনা। চাঁপা একটু কষ্ট ঝেরে দেবার বৃথা চেষ্টা করলাম। মা কে অনেক দিন দেখিনি আর কোনদিনই দেখবো না। আমিতো নিজের অন্যায়ের শাস্তিই পাচ্ছি।
      ছুঁয়ে দেবার সুযোগ হলে মিস করবেন না প্লিজ। পরে কষ্ট হতে পারে।

    1. অনেক কঠিন হলেও সত্যি যা আমাদের মেনে নিতেই হয়।
      মন থাকলেই নাকি ওটা মাঝে মাঝে খারাপ হয়।

      শুভকামনা রইলো তাড়াতাড়ি মন ভালো করার।

    1. না বুঝেও তো কম বলেননি। লেখাটা আপনাকেও ছুঁয়ে দিয়েছে, এইতো লেখার তৃপ্তি।
      মন ভালো করার বড়ি পাঠাবো। ভালো থাকুন।

      আর হ্যাঁ, আপনার রেডিমেট মন্তব্য লিস্টে আরো কিছু যোগ করুন। আমি অনেক লেখায় মন্তব্য করতে পারছিনা।

      1. রেডিমেট মন্তব্য প্রায় সব লেখায় মন্তব্য করার জন্য করা হয়েছে।ইমো টিমো দিয়ে কর্ম সম্পাদন করুন ভাইয়া 🙂
        নতুন পোষ্ট চাই আপনার।

      2. উল্টাপাল্টা ইমো দিয়ে নিজেকে আর বাহবা দিতে চাইনা। আদিকালের মানুষ আমি।

        লেখার চাইতে পড়ায় মন বসে বেশী। ভালো লাগে এখানের লেখা সাথে উপাদেয় মন্তব্যগুলো।
        অনেক দিন আপনাকে দেখিনি। অবশ্য আমি নতুন এ বাড়ীতে। তারপরও ক্যামন যেন আপন আপন মনে হয় অনেক সাদা মনের মানুষের মাঝে।
        ভালো থাকুন।

  8. লেখা শুধু লেখা নয়, অনেক কিছুই বহন করে।
    মঙ্গলময় তাঁকে ভালো রাখুন।
    মায়েরা ছুঁয়ে দিতে চায়, ছুঁয়ে বুঝতে চায় তার সন্তান পুরোপুরিভাবে ঠিক আছে কিনা।ফ

    1. তাইতো। লেখায় মাঝে মাঝে মনের কথাই বলে দেয় মনে হয়। নিজেকে বেশ অপরাধী মনে হয়। দেড় যুগ দেখিনি আর কোনদিন দেখবোনা।
      যেখানেই থাকুন, সবাই যেনো ভালো থাকেন।
      আত্মীয় মা টা সেদিন হাসপাতালে আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়েতো তাই দেখালো যে তার সন্তান পুরোপুরিভাবে ঠিক আছে কিনা।
      পুরানো পোস্ট ঘাঁটছেন বলে অনেক বড় একটা ধন্যবাদ।।

      1. যা হয়ে গেছে তা নিয়ে আফসোস করে আর কী হবে? এরচেয়ে প্রার্থনায় তাঁকে রাখুন নিয়মিত।
        ঘাঁটাঘাঁটি না ঠিক, পুরনো পোস্টগুলো পড়ছিলাম আর কি!

      2. তারপরও কি যেন থেকে যায়। একটা ভারী কিছু বয়ে বেড়াচ্ছি। প্রার্থনায় আছে সব সময় এবং মাফও চেয়ে যাচ্ছি একসাথে।
        আমি কাজ এবং সংসারের মাঝে একটা স্যান্ডউইজ। ইচ্ছে হয় অনেক সময় সোনেলাতেই থাকি যা হয়ে উঠেনা।

        ভালো থাকুন টিচার। অনেক শুভেচ্ছা আপনার জন্য।

মন্তব্য করুন