আমার বন্ধু আশফাক

আশফাক
আশফাক

আত্মার আত্মীয়রা আমার মনের মানুষ সে হোক রক্তের বা না রক্তের। প্রবাস জীবনে হয়তো এই আত্মীয়দের খোঁজটা একটু বেশী হয়। আমরা সাড়ে পাঁচ ফ্যামিলি থাকি খুব কাছাকাছি যারা সেই রকম আত্মীয়। ওহ, সাড়ে পাঁচ হোল পাঁচটা পূর্ণাঙ্গ ফ্যামিলি আর একজন একা। এই একা বেটাকে তো আর সম্পূর্ণ মর্যাদা দেয়া যায় না। মজার ব্যাপার হোল এই ছয়টি বন্ধুই অনেক ছোট বেলা থেকেই হাঁটছে একসাথে। এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরেফিরে মাসে অন্তত একটা আড্ডা হোতো এই পরিবারগুলোর। ওই আড্ডাগুলো ওই হাফ বেটা আশফাক বেশ জমিয়ে রাখতো। “কিরে, বিয়েটা কি হবে কোনদিন?” সবসময়ের হাসি মুখটা বলতো, “নারে, জেনেশুনে একটা মেয়ের ক্ষতি করতে চাইনা”। ওর কোন কাজই একবারে হতো না। তাই ভয়টা ছিল বিয়ের পরেই যদি আর একটা বিয়ে করতে হয়! পেশায় একজন ডাক্তার। ক্যান্সারের উপরে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে একটা রাজ্য সরকারের গবেষণাগারে কাজ করছিল। ওর পার্ট টাইম জব ছিল আমাদের পাঁচ ফ্যামিলির টুং টাং শব্দগুলো থামিয়ে দেয়া। একদিক থেকে আমি হয়তো কল করলাম তো আরেক দিক থেকে আমার বউ। মাঝে মাঝে বলতো, “তোরা ইদানিং বেশি বেশি বমি করিস, আমি এতগুলো আর পরিস্কার করতে পারবো না”।

এক রবিবার দুপুরের দিকে কল করে ওর বাসায় যেতে বললো। আমি আর আমার বউতো অবাক। এই প্রথম, আমরাই সবসময় ওকে ডাকি। ফুট খানেক তুষারে ডোবা রাস্তায় ১৫ মিনিটের জায়গায় দেড় ঘন্টায় হাজির হলাম। সেই স্বভাব সুলভ হাসিমুখের অভ্যর্থনার সাথে আড্ডা শুরু। একটা বিশেষ গান বারবার বাজে চানাচুর আর কফির সাথে। একসময় রেগে গেলাম, “তুই কি আমার সাপ্তাহিক ছুটিটা ছেলেদের কাছ থেকে নিয়ে নিলি নাকি”? এবার সে আরো বেশি বেশি হাসি মুখ করেই বললো, “আমার লিউকিমিয়া হয়েছে”। মাথাটা আমার নীচু হয়ে গেলো ক্যামন করে জেনো। আরামদায়ক ঘরে আমার ঘাম ঝরছে। একসময় দেখি কে জেনো আমার বি পি মাপছে। জোরে একটা চীৎকার করতে পারছিনা। কখন যেনো বাইরে চলে গেলাম বিরূপের মাঝে স্বস্তি খুঁজতে মনে হয়। একটা কল করা দরকার, কাকে করব জানি? ও হ্যা, ওর বড় বোনটাকে। না, আমার দ্বারা হবেনা। সাবুকে করি। কে শোনে কার কথা। পাঁচ বন্ধু একসাথে কে কি বলছে কে শোনে কার কথা। একসময় নদীর ওপারের রাজ্যের দিকে রওয়ানা দিলাম ওকে নিয়ে। এর মধ্যে অন্য সবাই জড়ো হোল সাবুর অফিসে। এবার তোরা যা করার কর। কে কি করবে! কেউতো কারো দিকেই তাকাচ্ছে না। অনেক নাম করা একটা হাসপাতালে ভর্তি করা হোল পরের দিন। ঐ হাফ বেটা আর আমার দেশে যাবার কথা একটা গবেষণার কাজ নিয়ে। দিন যায় রাত যায়। কিছুদিন পরে হাসপাতাল থেকে ছুটি। আমাদের ভয়টা লুকিয়েই আছে। কিছুদিন পরে আবার ফেরত। চলছে সেই কেমো নামের বিষ। দিন দিন হাসিটা কমে যাচ্ছে। ফারসা মানুষটা ক্যামন জেনো তামাটে হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। ওনার আবার একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে হয়েছে। চলে যাই ৬০ মাইল দূরের হাসপাতালে। বড়ো আপা ধমকায় আমাকে, তাতে আমার কি আসে যায়। মাঝে মাঝে থেকে যাই ওর সাথে। রাতে ফিরে যাই সেই সব দিনে। একবার আমার পা ভাংলো ফুটবল খেলায়। হবূ ডাক্তাররা প্লাস্টার কোরে আমার হোস্টেলে নিয়ে আসল। আমার রুমটা চার তলায়। কত প্লান কি করে আমাকে তুলবে। হটাত ওই হাফ বেটা আমাকে পাঁজা কোলা করে তরতর করে উঠে আসলো আমার রুমে। আরো কত কথা। আমার দেশে আসার সময় ঘনিয়ে এলো। আসার আগের রাতে অনেক কথা। একসময় আমার হাতটা চেপে ধরলো জোড়ে। টেনে আমার কানে কানে বললো, “আমি খুলনা যাবো”। চলে আসার সময় জোড়েই বললাম, “আমি দেশে গিয়ে ঘোছানো শুরু করি, এখান থেকে বের হয়ে তুইও চলে আয়। একসাথে খুলনা যাবো”।

দেশে আসার তার ৩ সপ্তাহ পরে আল্লাহ ওর কষ্ট থেকে মুক্তি দিলেন যা আমরা দোয়ার মাঝেই চাচ্ছিলাম। ওই কষ্টযে কারোই সহ্য হচ্ছিলোনা আর। ও তো খুলনা যাবে তারাতারি করে, তাই হাসপাতাল থেকেই এয়ারপোর্ট। কিন্তূ ওকে ত আবার মরতে হবে। নাহলে ওর পূর্ণতা হবে ক্যানো। বিমান আর এয়ারপোর্ট এর অ্যাকাউন্ট ঝামেলায় ছাড়তে লাগলো দুই দিনের ও বেশি। বন্ধুদের স্বস্তি যাক দুবার ত হয়ে গেলো, এবার যা খুলনাতে তোর মায়ের কাছে। ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে আমরা কজন মিলে ওকে ফুলের মালা দিয়ে খুলনা দিকে যাত্রা সেই শেষ রাতে। যত এগুচ্ছি ততোই যেন গাড়িটা ভারী হচ্ছে। সবাই যেন পণ করে বসে আছে কথা না বলার। স্মৃতির মায়ারা আশেপাশে ঘুরছে অক্লান্ত ভাবে। কি নেই সেখানে। শুধু মনে পরছে না ওর মলিন মুখ। সুজনের কথা মনে পড়ল হঠা্ৎ। অনেক ভাল লাগার একটা ছোট ভাই পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল। জানাজার সময় সবাই যখন সুজনের মুখ দেখছে, আশফাক আমায় বলেছিলো না দেখার জন্য। সুজনের সুন্দর চেহারাটাই যেন মনে থাকে। আজ আশফাকের ওই কথাটা ফেরত দেয়ার সময়। আমি কবরে নেমে ওর বিছানাটা ঘুছিয়ে দিলাম, শুইয়ে দিলাম, দাঁড়িয়ে থাকলাম। ঘুমা তুই।

সময়কে বলি ছাড়না পিছু,
ও বলে তোর থাকবেনা কিছু।
তারপরও বলি যা না চলে,
সময় চলে সময়ের তালে।

কতদিন গেলো, কত ফোন বদলালো, ওর নম্বরটা (১-৯১৭-৫৮৪-১২৪৬) মোছা হলোনা আর।

 

মোট পড়েছেনঃ ৯১১জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

৩৩টি মন্তব্য

      1. আসুন চলে যাওয়াদের স্মরণ করি তাঁদের রেখে যাওয়া আনন্দঘন মুহূর্তগুলোর পসরা সাজিয়ে। তাঁরা সর্বদাই আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন আমাদের এমন মূলবান মুহূর্ত উপহার দিয়ে।

        1. মাঝে মাঝে ওদের হোস্টেলে রাত কাটাতাম। সবাই পড়ছে কাল পরীক্ষা বলে। আর ওঁই বেটা তাস নিয়ে নাড়াচাড়া করতো। একবারেতো পাস হবেনা, শুধু শুধু এখন পরবো ক্যানো।

  1. জীবনের কোন না অংশে এমন কঠিন কিছু সত্যের মুখোমুখি আমরা হই,
    নিতান্ত একান্ত অনিচ্ছায়, এ যন্ত্রণা ভাষাহীন, যা আমরা বয়ে নিয়ে যাব অনেক অনেক দূর অব্দি।

  2. প্রায় প্রতিদিন মৃত্যুর মুখোমুখি হই এমনই এক পেশায় আছি বলে। এইতো সেদিন গত জুন মাসে আমার রেগুলার এক ক্লায়েন্ট লাষ্ট স্টেজ ব্লাড ক্যান্সার। মৃত্যু যে কোনো সময়ই নিয়ে যাবে, সেটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলো না। গেলেই রাগ, চরম বাজে ব্যবহার। যেদিন লাষ্ট ভিজিটে যাই হঠাৎ আমার হাতটা ধরে জানতে চাইলো আমার কেন রাগ উঠেনা? তারপর নিজেই বললো ওহ এটা তো তোমার জব। বললাম তুমি সুস্থ হয়ে যাবে। ঈশ্বর অনেক কিছু করতে পারে, জানো? বললো সত্যি বলছো? আমি বাঁচবো? বললাম হুম বাঁচবে। হাসি দিয়ে বললো তুমি আমার মায়ের মতো বলো, যা পাওয়া হবে না আমার মা বলতো আমি সেটা পাবো। হাতটা ছুঁয়ে দিয়ে, মাথায় হাতটা দিয়ে বললাম ডেভিড আমায় যে যেতে হবে। কাল সকালে আবার আসবো। সে আমায় সকাল দেয়নি। বয়স ছিলো মাত্র ৫৬/৫৭। তাই জানেন ভাইয়ু আমি কালকের জন্য কিছু ফেলে রাখিনা। যেটুকু আনন্দ আজই, এখনই।

    আর দুই সপ্তাহ আগে আরেক রোগী সুয়েন সেও একই। শেষ দিন গেলাম, প্রায় অজ্ঞান অবস্থায়। চোখটা একটু খুললো, ওহ নীলা! অনেক কষ্টে উচ্চারণ। পরেরদিন ভোরে ভিজিটে যাবো রেডি হচ্ছি, অফিস থেকে ফোন সুয়েন আর নেই।

    ওরা তো আমার রোগী। কিন্তু তাতেই অনেক কষ্ট হয় আমার। আর উনি তো আপনার বন্ধু। পড়ার পর একটা যন্ত্রণা পাচ্ছি ভেতরে। ঈশ্বর যেনো কখনো কাউকে বন্ধু-হারা না করেন। প্রকৃত বন্ধু অনেক দূর্লভ পাওয়া। ভাইয়ু কিন্তু দেখুন আশফাক ভাইয়ের ভাগ্য আপনি এখনও উনাকে মনের ভেতর রেখে দিয়েছেন। আমি একটা কথা আমার প্রিয়জনদের বলি, আমায় মনের ভেতর রেখো, মনে করোনা। মনের ভেতর রেখে দিলে আর মনে করতে হয়না যে। আপনি উনাকে মনের ভেতর রাখাতে আজও উনি বেঁচে আছেন।

    উনার মজার মজার গল্পগুলো নিয়ে তো লিখুন। আনন্দ দিলে আনন্দ মেলে। জানেন তো ভাইয়ু? অনেক ভালো থাকুন -{@

    1. আমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন এতো আমার পরম পাওয়া। ঈশ্বর আমায় ভাগ্য মাটিতে বানিয়েছেন। আমার বন্ধু আছে, আমি কৃতজ্ঞ। জগতের বৃত্তে অনেকের সাথেই জাগতিক সাক্ষাৎ হয়ে ওঠেনা কারনে অকারনে। তবুও আছি সেই বৃত্তেরই কক্ষে। এ আমার অনেক পাওয়া।

      সোনালা হাটুক পদ্মের মতন সাদা কিছু প্রানের সাথে।

      1. ভাইয়ু দূরত্ত্ব ব্যাপার না, দেখা-না দেখাও ব্যাপার না। আসল হচ্ছে মনের টান। এই যে পরিচয়, এটুকুই অনেক। কতো সুন্দর একটা মন্তব্য করেছেন আপনি, এর প্রতি মন্তব্যে কি লিখবো সেটা ভাবতে গিয়ে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছি। শুধু বলবো আপনি অনেক শুদ্ধ একজন মনের মানুষ, আর তাই এমন একটি পোষ্ট দিতে পেরেছেন। একেই সত্যিকারের লেখা বলে, আর আপনি স্বার্থক লেখক।

        ভালো থাকুন যেভাবে মন চায়। -{@

  3. কি লিখবো বুঝতে পারছি না
    স্মৃতির মায়ারা এভাবেই থাকে আমাদের মাঝে চিত জাগরুক হয়ে
    যেখানে মৃত্যু নেই কারো
    অদৃশ্য থেকেও দৃশ্যমান সব
    থাকুক এরা এভাবেই হৃদয়ের গহীন কোনে।
    ভালো থাকুক আশফাক …………

    নাম্বারটা থাকুক দৃশ্যমান স্মৃতি হয়ে।

    1. কি লিখবো এর উত্তরে। ফেসবুকে একটা ছবি দেখলাম তিন দিন আগে যেখানে আমার অনেক ভালোলাগার মানুষরা আছে। আশফাককে দেখে ক্যামন যানি কুঁচকে উঠল মনটা।
      আমি সত্যিই অনেক ভাগ্যবান। আমার বন্ধু আছে, নাহোক জাগতিক দর্শন সবসময়। ওরা আছে আমার মনের গহীনে।
      মাঝে মাঝে কল করি। ওর কাছে তা পৌছায় না।

  4. কিছু মানুষ, মানুষ হয়ে আসেনা, আসে আনন্দের অবতার হয়ে। তারা কোনদিন মরেও যায়না, টিকটিক করে ঠিকঠিক থেকে যায়। শুধু আপনি নন, আপনার বন্ধুটিও ভাগ্যবান বটে। বড় ব্যস্ত সবাই, তবুযে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
    চারটা লাইন বুঝিয়ে দিল অনেক কিছুই। নাম্বার মুছে দিলেই বা কি!!

    1. কিছু মানুশকে আমরা ভুলে থাকতে পারবনা। আমার এই ধারনাটা অনেক দিনের। হয়তো ঠিক নয়তো নয়।
      সময়কেকে পাশ কাটিয়ে যেতে কি পারছি আমরা? ভাল থাকুন।

      1. সময়কে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়না ঠিক, তবে সময়ের কাছে পুরোপুরি সমর্পন করতে চাইনা নিজেকে। ভুলে থাকতে হবে কেন? মস্তিস্ক আর ব্রেইনে আমাদের প্রচুর শুন্যতা।
        কবিতা দিন ভাইয়া। প্লিজ?

মন্তব্য করুন