শ্রীপদ হাঁটতে হাঁটতে যমুনার ঘাটে আসে। শরতের চাঁদ তখন মেঘের আড়ালে লুকিয়েছে। নরমুণ্ডুটা পাশে রেখে নদীর জলে জোনাক আলোতে লাশের কালচে রক্ত মাখা হাত মুখ ধোয় শ্রীপদ। হঠাৎ মেঘের আড়াল থেকে উঁকি মারে শরৎ পূর্ণিমার চাঁদ। জলের উপড় নিজের রক্ত মাখা মুখমণ্ডল দেখে শ্রীপদ ভয়ে চিৎকার করে উঠে। সে চিৎকারের শব্দ প্রতিধ্বনি করতে করতে দূর বাতাসে মিলিয়ে যায়। চাঁদ আবার মেঘের চাদরে নিজেকে ঢাকে। শ্রীপদ নদীর ঘাট থেকে উঠে সোজা রওনা দেয় নিতাই ডোমের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
নিতাই ডোমের বাড়ি ডোমপাড়ারই একটু দূরবর্তী জায়গায়। নিতাই ডোমের বাড়ির প্রশস্থ উঠানে এসে থামে শ্রীপদ, হাঁপাতে থাকে। নিতাই ডোমের ঘরের দরজায় জোরে জোরে শব্দ করে। জোরে জোরে ডাকে, ‘নিতাই কাকা, নিতাই কাকা!’ অকস্মাৎ শ্রীপদের মনে হয় দরজায় টোকাটা ঠিক লাগছে না। বিষয়টা অনেকটা স্বপ্নে চিৎকার করার মতো মনে হয়। হঠাৎ দরজা খুলে সামনে এস দাঁড়ায় মুণ্ডুবিহীন এক দেহ। সে কথা বলে ওঠে, ‘কে হ রে? হামার মাথাঠো লাগাদে হাম কুচ্ছু দেখেনেইখে সকতিন!’ শ্রীপদ ভয়ে চিৎকার করে। অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যায়।
শ্রীপদের চিৎকার শুনে নিতাই ডোম ঘর থেকে বের হয়। কাটা মুণ্ডু বুকে নিয়ে শ্রীপদকে পড়ে থাকতে দেখে। নিতাই শ্রীপদের নিকটবর্তী হয়, শ্রীপদকে ডাকে, ‘শ্রীপদ, শ্রীপদ! শ্রীপদ কা ভায় এ? শ্রীপদ!
শ্রীপদ: নিতাই কাকা হাম কাহা?
নিতাই: কারে এইসন চিল্লাও তেরে কাহে?
শ্রীপদ: না এইছেন।
নিতাই: তো এতনা রাতিকে কাহে আনবারে?
শ্রীপদ: কবরছে মাথা কাটকে লেকে আনবানি। ইঠু বেঁচে খাতির তোহারকেনে আনবানি। নিতাই দেখেশুনকে বোলোতে।
নিতাই: বুড়হ আদমিকো মাথা। দু’শো রূপিয়াকে বেশি না পাইবে।
শ্রীপদ: ঠিক বায় কাকা দু’শো রূপিয়া দো। কাকা তোহার ঘরে দারু বায়?
নিতাই: বায়। ঘরমে আউ।
নিতাই ও শ্রীপদ দু’জন মিলে ভরপেট দারু পান করে। শ্রীপদ মদ্য পান করতে করতে যখন দিশেহারা হয়ে যায়। যখন কান লাভার মতো উত্তপ্ত হয়ে যায় তখন সে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করে। পরের দিন সকালে ডোমপাড়া রান্নার গন্ধে মৌ মৌ করে। ডোম পাড়ার মানুষেরা বুঝতে পারে আজ চারুবালা ভালোমন্দ কিছু রান্না করছে। অনেকদিন পর চারুবালার বাড়ি থেকে রান্নার এমন মৌ মৌ করা সুগন্ধ আসছে। এমন সুগন্ধ অনেক দিন পায়নি ডোমপাড়ার মানুষেরা।
হঠাৎ রামু কথা বলে উঠলে মাতাল শ্রীপদ সেই কিশোর বেলার অতীত থেকে আবার বর্তমানে ফিরে আসে।
রামু: মালিক বহুত রাত হোগা। হামরেকে ছোড় দো। হামার লেকাকে তবিয়ত আচ্ছা নেইখে!
শ্রীপদ: ঠিক বায়। যো কৃষ্ণা।
কৃষ্ণা ও রামু টাল অবস্থায় টলতে টলতে চলে যেতে চায়।
শ্রীপদ: রাম্বা, রাম্বা, রাম্বা, বাহিন আমার… রাম্বা… রাম্বা… রাম্বা…।
কৃষ্ণা: রামু, রামু এ রামু!
কৃষ্ণা ও রামু মাতাল অবস্থায় বাহির দরজা রেখে ভুলে শ্রীপদের অন্দর মহলের দিকে যাত্রা শুরু করে। শ্রীপদ এটা খেয়াল করে রেগে আগুন হয়ে যায়। কৃষ্ণাকে কষে এক চড় মারে।
শ্রীপদ: কারে কেনো ওরি যাতারে?
কৃষ্ণা: মাফ কারদো মালিক রাস্তা ভুলাগাবানি।
ওরা উল্টা ঘুরে আবার সঠিক পথে যাত্রা শুরু করে।
কৃষ্ণা: রামু, রামু এ রামু…!!
(……………………………………চলবে)
আগের পর্বের লিংকগুলো :
১. http://sonelablog.com/archives/12440
২. http://sonelablog.com/archives/12475
৩. http://sonelablog.com/archives/12531
৪. http://sonelablog.com/archives/12788
১৩টি মন্তব্য
লীলাবতী
যেমন ভাবে লিখছেন তাতে পরিবেশের সাথে না মিশে এমন লেখা সম্ভব নয় । এই লেখার জন্য মনে হচ্ছে আপনি ডোম পাড়ায় গিয়েছেন । ভালো লাগছে খুব । পরের পর্বের অপেক্ষায় ।
সাতকাহন
লীলাবতী, ঠিক ধরেছেন। ২০০৭ সালের কথা, তখন সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করতাম দৈনিক জনকণ্ঠে, পত্রিকাটির মালিক আতিকুল্লাহ খান মাসুদ তখন জেলে, ক্ষমতায় কেয়ারটেকার গভর্ণমেন্ট, বেতন বন্ধ ছয় মাস ধরে। কামলা খাটা মানুষ ছিলাম বিধায় নতুন কিছু’র ধান্দা খুঁজতেছিলাম পেট চালানোর জন্য, এরই মাঝে এ্যাকশন এইড থেকে একটি অফার পাই ডোম সম্প্রদায়ের মানোন্নয়ন শীর্ষক একটি কাজের, আমি ছিলাম সেই প্রকল্পের টিম লিডার, সেই প্রকল্পের স্থান বেছে নেই বগুড়ার সারিয়াকান্দি’র ডোমপাড়া। ডোমপাড়ায় ওদের মাঝে ছিলাম ২ মাস ১৩ দিন। বলতে পারেন এক ধরনের ভালোবাসা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো ওদের জন্য। সেখান থেকেই আমার এই কাজ, “সূর্যাই ডোম ও রাম্বা আখ্যান”।
জিসান শা ইকরাম
জীবন থেকে নেয়া।
স্যালুট আপনাকে।
সাতকাহন
জিসান ভাই, আর লজ্জা দিবেন না।
জিসান শা ইকরাম
লজ্জার কিছু নেই
এই সন্মান আপনার প্রাপ্য ।
শুভ কামনা ।
খসড়া
পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।
সাতকাহন
ধন্যবাদ, খসড়া।
জিসান শা ইকরাম
পড়ছি আর মুগ্ধ হচ্ছি
সাতকাহন
ধন্যবাদ জিসান ভাই।
ছাইরাছ হেলাল
নিবিড় অনুসন্ধিৎসা আপনার এ লেখার প্রাণ ।
এখন পরতে পারছি ,প্রায় ।
সাতকাহন
ধন্যবাদ, হেলাল।
প্রজন্ম ৭১
আবার নিয়মিত হয়েছেন দেখে ভালো লাগছে । আগের পর্ব গুলো পড়েছি । লগইন হতে পারছিলাম না বলে মন্তব্য করা হয়নি । সোনেলার সেরা লেখকদের মাঝে আপনি একজন । এত ভালো লেখা থেকে আর বঞ্চিত হতে চাইনা । -{@
সাতকাহন
প্রজন্ম ৭১, ধন্যবাদ।